ঢাকা, বুধবার 19 October 2016 ৪ কার্তিক ১৪২৩, ১৭ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মহাকাশের বিস্ময় : কোয়াসার

নূরুল আনাম (মিঠু) : বিশাল মহাকাশ বিশাল রহস্যেরও আধার বটে। এর মধ্যে সব চাইতে রহস্যময় যেটি সেটি হল কোয়াসার। আভিধানিকভাবে কোয়াসার শব্দের অর্থ হল নক্ষত্র সদৃশ বেতার তরঙ্গ বা নক্ষত্র সদৃশ বস্তু। ১৯৬০ সালে প্রথমবারের মত এদের সন্ধান পাওয়া যায়। তা এত দূরবর্তী স্থানে যে সেখানকার অন্য কোন জ্যোতিষ্কের দেখা মিলে না। এমনকি তার নিকটেও অনেক গ্যালাক্সি থেকে যায় অদৃশ্য। এগুলো দেখতে অনেকটা ক্ষীণ আলো ও ক্ষুদ্র আকৃতির তারার মতো। কিন্তু বর্ণালি চিত্রগ্রহণ যন্ত্রে তাদের আলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেল যে তারাদের থেকে তাদের বর্ণালি উজ্জ্বল নিঃসরণ রেখা এবং কালো শোষণ রেখার সমাবেশ রীতিমত ভিন্ন। শুধু তারা কেন? মহাবিশ্বে লক্ষ্য করা যায় এমন কোন জ্যোতিস্কের সাথেও এর কোন মিল খুঁজে পাওয়া গেল না। তাছাড়া দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে দূরের তারারাও কালক্রমে তাদের গ্যালাকসি কেন্দ্রিক কার্যক্রমে একটুখানি সরে যায়। তা সে যত সামান্যই হোক। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও এই অদ্ভূত নক্ষত্রের মতো বস্তুগুলোর সামান্যতম যথার্থ গতিও আবিস্কার করা যায়নি। কিছুকাল এই বিভ্রান্তি চলার পর ১৯৬২ সালে প্যালোমার মানমন্দিরের বিজ্ঞানী মার্টিন স্মিডট এই রহস্যের সমাধানে এগিয়ে আসেন। কনগরাশিতে ৩-সি-২৭৩ নামের একটি কোয়াসার আছে। প্রথমে আবিস্কৃত ও উজ্জ্বলতম কোয়াসারদের মধ্যে এটি একটি। স্মিডট বললেন যে এর বর্ণালি চিত্রের রহস্যের যে ব্যাখ্যা পাওয়া যায় তাতে বোঝা যায় এটি প্রতি সেকেন্ডে ৪৮০০০ কিলোমিটার অর্থাৎ আলোর গতির প্রায় ১৬ শতাংশ গতিতে দূরে সরে যাচ্ছে। এর দূরত্ব প্রায় ৩০০ কোটি আলো বছর। এ রকম আরো দুটি কোয়াসার যথাক্রমে ৩ সি-৪৮ ও ৩-সি-১৪৭ দূরত্ব ৭০০ ও ১০০০ কোটি আলো বছর। অর্থাৎ আমাদের মহাকাশের প্রায় প্রান্তসীমায়। যেখানে আজ পর্যন্ত গ্রহ তারাতো দূরের কথা এমনকি গ্যালাক্সিও সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে কোন কোন কোয়াসার আবার ১২০০ কোটি আলো বছর দূরে। তাহলে প্রশ্ন জাগে কি ধরনের বস্তু থেকে এই অবিশ্বাস্য আলোর বন্যা বইতে পারে। মহাকাশ গবেষণায় আজ পর্যন্ত এরকম কোন কিছুর সন্ধান পাওয়া যায় নি। এতো গেল শুধু একদিক। অন্যদিকটাও কম রহস্যময় নয়। আর সেটা হল তাদের আয়তন। তাদের সৃষ্ট আলোর অনুপাতে আয়তনে তারা অত্যন্ত ছোট। কোন কোনটি আয়তনে আমাদের সৌরজগতের সমান।
অথচ আলো দিচ্ছে হাজার হাজার গ্যালাক্সির সমান। আর তাই জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এরা এত দূরে কেন? আমাদের জানা মহাবিশ্বের প্রান্তসীমায় এদের দেখা যায় কেন? আজ আমরা যে সব কোয়াসারকে দেখছি তা আমাদের কালের নয় তা কম করে হলেও তা ৩০০ কোটি বছর আগের অর্থাৎ সেগুলো মহাবিশ্বের অতীতের বিষয়। আর তাই গুরুতর প্রশ্নটি উঠে যে, কোয়াসাররা কেবলই অতীতের, মহাকাশের কৈশোর বয়সের কেন? এ যুগের ব্যাপার নয় কেন? অতীত বিশ্বে কোয়াসার ছিল, এখন নেই কেন? কোয়াসারদের এই ক্ষুদ্র আয়তন ও বিপুল শক্তি আজও এক দুর্ভেদ্য রহস্য হয়েই আছে। তবে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য একটি ব্যাখ্যা হচ্ছে এই যে এগুলো আসলে মহাবিশ্ব সৃষ্টির আদি যুগের নিদর্শন মাত্র। মহাবিশ্বের বস্তু, গ্যাস, ধূলিকণা প্রভৃতি আদিতে কোয়াসারের আকারে সৃষ্টি হয়েছিল। যা অতিমাত্রায় সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে স্থিত হয়ে পর্যায়ক্রমে নানান রূপ বিক্রিয়ার মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে নীহারিকা, গ্রহ, তারা প্রভৃতি সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ এটি মহাবিশ্বের জ্যোতিষ্ক সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় প্রাথমিক স্তর মাত্র। আজ আমরা যে সব গ্যালাক্সি, নীহারিকা দেখতে পাচ্ছি সেগুলো হয়ত আদিতে কোয়াসারই ছিল। এমনকি এ কথা আমাদের সৌরজগত ও মিল্কিওয়েসহ সব গ্যালাক্সিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আগেই বলা হয়েছে যে এটি পূর্ণাঙ্গ মত নয়। এই রহস্যের সমাধান পাওয়ার জন্য আমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ