ঢাকা, শনিবার 22 October 2016 ৭ কার্তিক ১৪২৩, ২০ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনী কারচুপি বিরল ঘটনার মধ্যেই ভুয়া ভোটার বিতর্ক

২১ অক্টোবর, ইন্টারনেট : জনমত জরিপে প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনের চেয়ে নিজের ব্যবধান ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকায় দিশেহারা হয়ে উদ্ভট মন্তব্য করছেন রিপাবলিকান দলীয় প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত করলেন মৃত আমেরিকান ও অবৈধ অভিবাসীদের।
গত সোমবার রাতে উইসকনসিনে এক নির্বাচনী সমাবেশে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ট্রাম্প অভিযোগ করে বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে নর্থ ক্যারলিনা অঙ্গরাজ্যে বারাক ওবামা ১৪ হাজার ভোট বেশি পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন এবং সেটি ঘটেছিল অবৈধ অভিবাসীরা ভোট দেয়ায়।
ট্রাম্প আরো বলেন, তবে অবৈধদের ভোট ছাড়াই এবারের নির্বাচনে আমি জয়ী হবো। অবৈধ অভিবাসীর ভোট আমি চাই না। ১৮ লাখ ভোটারের হদিস উদঘাটিত হয়েছে, যারা ইতিমধ্যেই মারা গেছেন। মৃত ব্যক্তিরাও রয়েছেন ভোটার তালিকায়। তবে আমি মৃতদের ভোটে জয়ী হতে চাই না। হিলারির প্রতি ইঙ্গিত করে ট্রাম্প ৮ নবেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ১৮ লাখ মৃত ব্যক্তি ভোট দেবে অন্য কাউকে বলে জানান।
ট্রাম্পের অভিযোগ, ভোট ডাকাতির ষড়যন্ত্রও করছেন হিলারি ক্যাম্প। এমন অনেক তথ্য তার কাছে এসেছে বলে দাবি করেছেন ট্রাম্পের। ১০ বছর আগে মারা গেছেন, এমন  ব্যক্তিরা এখনও ভোটার তালিকায় রয়েছেন। অনেক রাজ্যে অবৈধ অভিবাসীদের ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে।
২০১২ সালে পিউ রিসার্চ সেন্টার পরিচালিত গবেষণায় ভোটার তালিকায় ১৮ লাখ মৃত ব্যক্তির নাম উদঘাটিত হয়। সেই তালিকা এখনও রয়েছে বলে মনে করছেন ট্রাম্প। যদিও সে ধারণা সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন মার্কিন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা।
হিলারি ক্লিনটন ও ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষ থেকে অবৈধ অভিবাসীদের দলে দলে কেন্দ্রে এনে মৃতদের ব্যালট সংগ্রহ করে সেখানে হিলারিকে জিতিয়ে নেয়ার ফন্দি আঁটা হয়েছে বলেও ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন।
হিলারি ক্যাম্প থেকে ট্রাম্পের এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও পাগলের প্রলাপ বলে অভিহিত করা হয়েছে। ভোটারদের প্রতি আহবান জানানো হয়েছে, ব্যালট যুদ্ধে ট্রাম্পের মত ধাপ্পাবাজ ও দুর্নীতিবাজ, লম্পটদের ধরাশায়ী করতে হবে। আসন্ন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আবারো যুক্তরাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে যে, আমেরিকাই শ্রেষ্ঠ এবং বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে পরীক্ষিতরাই হোয়াইট হাউজে বসেন। ট্রাম্পের মত মানুষের কথায় ভোটাররা যাতে বিভ্রান্ত না হন সে ব্যাপারে সকলকে সজাগ থাকার আহবান জানিয়েছে হিলারি ক্যাম্প।
সিটিজেনরাই কেবলমাত্র ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে পারেন। ভোট কেন্দ্রেও ভোটারের আইডি পরীক্ষা করা হয় ব্যালট প্রদানের আগে। অবৈধ অভিবাসী দূরের কথা, যাদের গ্রীনকার্ড রয়েছে তারাও ভোট দিতে পারেন না। ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত হবার সুযোগ নেই।
সাম্প্রতিক সময়ের জরিপ ও গবেষণায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয় নিয়ে ক্ষীণ সম্ভাবনার চিত্র প্রতিফলিত হওয়ায় নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততো বেশি উদ্ভট ও অনুমান নির্ভর অভিযোগ করছেন ট্রাম্প। ভোট জালিয়াতির হাস্যকর অভিযোগও করেছেন ট্রাম্প। শুধু তাই নয়, জরিপ পরিচালনাকারি সংস্থা এবং মিডিয়াকেও আক্রমণ করে বক্তব্য দিচ্ছেন তিনি।
রিপাবলিকান পার্টির এই প্রার্থীর সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ব্যবস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করার সামিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করেছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের আগে পরিচালিত জনমত জরিপের শত ভাগ প্রতিফলন ঘটে নির্বাচনী ফলাফলে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য বিপজ্জনক হয়ে দেখা দিয়েছেন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। আগস্টে প্রথমবারের মতো এমন অভিযোগ তুললেও নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, তত পৌনঃপুনিকভাবে তিনি নির্বাচনী জালিয়াতির আওয়াজ তুলছেন। ট্রাম্পের এ মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এমনকি আমেরিকান নাগরিকদের মধ্যে গণঅসন্তোষ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বিরক্ত হয়ে মঙ্গলবার বলেছেন, ট্রাম্প অযথা ঘ্যান ঘ্যান করছেন। আমি জীবনেও দেখিনি যে কোনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ভোট হওয়ার আগেই আসন্ন নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এটা নজিরবিহীন। এরকম অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য এরই মধ্যে অনেকেই আগাম ভোট দিয়েছেন এবং তা অব্যাহত আছে। নির্বাচনী জরিপের ফলাফলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ডেমোক্রেটিক পার্টির হিলারি ক্লিনটনের চেয়ে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছেন, এমন চিত্র প্রকাশ পাওয়ার পর ট্রাম্প তার অভিযোগের মাত্রা আরও বাড়িয়ে তুলেছেন। যদিও বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনে কারচুপি বিরল ঘটনা। সর্বশেষ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কলোরাডোর গ্রান্ড জাংশনে এক নির্বাচনী প্রচারণা সমাবেশে ট্রাম্প বলেছেন, ‘সংবাদপত্রগুলো কারচুপির একটি ছক তৈরি করেছে আর ভোটারদের মন বিষিয়ে তুলছে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের মন্তব্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মূলনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কেন না দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলেও নির্বাচনে সব সময় সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা হতো। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক মাইকেল হেনি বলেন, ‘কোনো ধরনের ব্যাখ্যা ছাড়া এ ধরনের মন্তব্য নির্বাচনী ব্যবস্থার বৈধতাকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।’ এক দশক ধরে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি মার্কিনিদের আস্থা কমে যাচ্ছে।
২০০৮ সালে তা কমে ৪৩ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০১২ সালে মাত্র ৩১ শতাংশ ভোটার বলেছেন, ভোট গণনা নির্ভুল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটার তালিকা ও ভোট গণনায় প্রতারণার অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ১৯৬০ সালে জন এফ কেনেডি ও রিচার্ড নিক্সনের লড়াইয়ে ভুয়া ভোটারের ভোট দেয়ার অভিযোগ উঠেছিল। কারণ ভোটার তালিকায় অনেক মৃত মানুষের নাম ছিল।
রটজার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ‘দ্য মিথ অব ভোটার ফ্রড’ গ্রন্থের লেখক লরেন মিনিট বলেন, ‘আমাদের ৫০ রাজ্যে ৫০ রকম ভোট গ্রহণ পদ্ধতি। জাতীয়ভাবে একক কোনো পদ্ধতি নেই।’ ২০০০ সালের নির্বাচনে ফ্লোরিডায় ভোট পুনর্গণনার দাবি উঠেছিল। তাতে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী আল গোর জর্জ ডব্লিউ বুশের কাছে হেরে গিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের সুষ্ঠুতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি বা ফল প্রত্যাখ্যান করেননি। এখন ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব বক্তব্যের মাধ্যমে আসন্ন নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যানের ভিত্তি তৈরি করছেন বলেই মনে করছেন কয়েকজন বিশ্লেষক। ওহাইও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইলেকশন ল’ পড়ান অধ্যাপক ডান টোকাজি। তিনি বলেন, ‘কারচুপির অভিযোগে ট্রাম্প নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করলে জনগণের মধ্যে অস্থিরতা ও সহিংসতা তৈরি হতে পারে। মনে হচ্ছে, ট্রাম্প সহজে তার পরাজয় মেনে নেবেন না।’
তবে ট্রাম্পের প্রচারণা ম্যানেজার ক্যালিয়েন কনওয়ে মঙ্গলবার বলেছেন, ফল যাই হোক, ট্রাম্প তা মেনে নেবেন। তবে তিনি দাবি করেন, ‘নির্বাচনে আমরাই জয়ী হতে যাচ্ছি।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ