ঢাকা, মঙ্গলবার 25 October 2016 ১০ কার্তিক ১৪২৩, ২৩ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পান

আফরোজ ইসলাম : গ্রামের নাম কিতাবপুর। নদীর ধারে তরুলতার মত বেড়ে উঠা এক গ্রাম। এতে আজও লাগেনি আধুনিকতার ছোঁয়া, নব্যপৃথিবীর সুকৌশল স্পর্শ। শান্তিপূর্ণভাবে মানুষের বসবাস এতে। গাঁয়ে চলছে রথের মেলা। আষাঢ় মাস। বৃষ্টি বাদলার দিন। বোঝা মুশকিল কখন বৃষ্টি হবে আর কখন থামবে। হিন্দুদের রথযাত্রা শুরু হয়েছে। রথের মেলা বসেছে কিতাবপুর থেকে ক্রোশ দুই দূরের এক গঞ্জে। নাম বালাগঞ্জ। মানুষের ভিড়ে পুরো জায়গাটা সরগরম হয়ে উঠেছে। এ যেন মানব স্রোতের বিশালতার দৃষ্টান্ত। প্রতিবছর আষাঢ়ের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে রথযাত্রা শুরু হয়। সনাতন ধর্মমতে দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর কৃষ্ণের বৃন্দাবন ফিরে আসাকে স্মরণ করে রাখতেই এই উৎসব। হরেক রঙের পসরা সাজিয়ে বসেছে দোকানীরা। ছেলেপেলেদের খেলনা, মাটির হাতি, ঘোড়া, গিন্নিদের ব্যবহার্যের ফুলওয়ালা নকশাকাঁটা মাটির বাসন-কোসন, চুড়ি, আলতা, ফিতে, রুপার মাদুলি। ছেলেমেয়ের দল ওই বাতাসা, মুড়কি, কটকটি, খোরমার দোকানের সামনে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। কতগুলো মৌমাছি আর মাছি মিষ্টির গন্ধে উড়াউড়ি করছে ময়রার দোকানে। গঞ্জের কোনার দিকের দোকানগুলোতে লোহার  তৈরী জিনিসপত্র-বঁটি, দা, কুড়াল। ঠিক মাঝখানে ছোট একটু জায়গা দখল করে বসে আছে পানের দোকান। এ যে সে পান নয়, বিশপদী মশলার পান! পানে কি কি মশলা দেওয়া হয় তা জানতে চাইলে দোকানী কাদের দু একটির নাম বলে আর বলেনা- খড় দিয়ে পান খাওয়া কালো দাঁতে হেসে বলে- পান খাইলেই বুঝবেন, কওয়া লাগবনা। ছোট্ট এই দোকানটা নিয়ে ভিড় কম নয়। বরং বলা যায় এতে অন্যসব দোকানের চাইতে ভিড় বেশী। ছেলেবুড়ো থেকে শুরু করে মেয়েলোক, বাচ্চারা পর্যন্ত এ পানের দোকানে ভিড় করে আছে। কাদের একা পান সাজিয়ে কুলাতে পারেনা তাই তার বারো বছর বয়সী ছেলেকেও সাথে আনে। লোকে একবারে চার-পাঁচ খিলি করে পান নিয়ে একটা মুখে দিয়ে বাকিটা জামার পকেটে ভরে আরামসে পানে ঝাঁঝালো স্বাদ ও সাথে ব্যবহৃত অন্যান্য মশলা সহ গুলবাহার জর্দার স্বাদ নিয়ে তৃপ্তির সাথে চিবুতে চিবুতে মেলায় ঘোরে। পান শেষ হয়ে গেলে আবার আসে। আগে এ ব্যবসা ছিল কাদেরের বাপের। বাপের হাতের গুন ছেলে পেয়েছে হুবহু। তাই গেল তিন বছর আগে কলেরায় বাপটা মারা যাওয়ার পরও পানের চাহিদায় ভাটা পড়ে নাই। মেলা পুরোদমে চলছে। পুরো গঞ্জটাই হইহুল্লোড় কেনা বেচায় মুখর হয়ে রয়েছে। হঠাৎ হইচই পড়ে গেল কাদেরর পানের দোকানের আসে পাশে। মেলায় এসছিলেন কিতাবপুরগ্রামের মাতবর সাহেবও। ছোট ছোট নাতি নাতনী মেলায় না নিয়ে আসা পর্যন্ত পিছুই ছাড়ছিল না। জটলা আর হইচই দেখে নাতি নাতনীকে চাকরের হাতে দিয়ে এগিয়ে এলেন কাদেরের পানের দোকানটার কাছে। তার বয়সী একলোককে ধরে মারছে লোকে। ভিড় ঠেলে সে ভেতরে প্রবেশ করতে লোকজন একটু দূরত্বে সরে গেল। যে সকল লোক মারছিল এরাও দমে গেল। কি হয়েছে জানতে চাওয়াতে একজন বলল
-মাতবর চাচা, এই বেডা কাদেরের মশলা পানের থিকা খাবলা দিয়া কয়েক খিলি পান নিয়াই দৌড় দিছে। ট্যাকা দেয়নাই। এক নম্বরের চোর বেডায়।
লোকটাকে থামতে বলে পান চুরি করা লোকটার দিকে তাকায় মাতবর সাত্তার ম-ল। তারই বয়সের অর্ধপাকা চুল দাঁড়িতে মুখভরা। চোখে শূন্য দৃষ্টি। একটু কি যেন ভাবতে লাগল মাতবর। কোথাও যেন দেখেছে লোকটিকে। হুম, চোখ জ্বলজ্বল করে উঠে তার, চিনেছে! লোকটির কাছে গিয়ে নিচু স্বরে বলেন-
-তাঁরা মিয়া না? তাঁরা মিয়াই তো! তোমার এমুন দশা ক্যান? এতকাল কই ছিলা? সেই যে বাড়ি থিকা উধাও হইলা আর কুনোদিন আইলা না!
অদ্ভুত দৃষ্টিতে শূন্যে তাকিয়ে থাকে মাতবরের ভাষার তাঁরা মিয়া। তার নিরবতা দেখে মাতবর শুধায়-
-আমারে চিনবার পার নাই? আরে আমি সাত্তার, ছোডকালে কত খেলছি একলগে!
এবারেও কথিত তাঁরা মিয়ার মুখে কথা নেই। জ্বলন্ত লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কাদেরের দোকানের মশলার পানের দিকে। খেয়াল করে সাত্তার ম-ল। লোকজনকে উদ্দেশ্য করে বলেন-
-মিয়ারা, এ চোর না মিয়ারা। আমার গেরামের লোক। পাগল হইয়া বাড়ি ছাড়ছিল মেলা বছর আগে। সকলেই তো ভাবছিল মইরা গেছে। লোকজনের গুঞ্জন থামে তার কথায়। কাদেরের পানের দাম মিটিয়ে দিয়ে তাঁরা মিয়াকে হাত ধরে উঠিয়ে নাতি নাতনীসহ বাড়ির দিকে রওনা দেন, ইশারায় চাকরকে বলেন বেশি করে মশলা পান কিনে নিয়ে আসতে।
বাড়ি ফিরতে না ফিরতেই ঝুম বৃষ্টি নামে। আষাঢ়ের বাদল। অন্ধকার রাত। গরুর গাড়িতে বসা নাতি-নাতনীকে দুহাতে আগলে ধরে গাড়ির পেছনের খেলা দিকটার পর্দা ফেলতে বলেন সাত্তার গাড়োয়ানকে। তাঁরা মিয়া খোলা অংশটার কাছেই গোল হয়ে হাত পা গুটিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ চমকের আলোয় এক-আধবার আলোকিত হয় চারপাশ। তারই আলোয় একবার চোঁখ পড়ে সাত্তারের তারা মিয়ার দিকে। বাল্যস্মৃতিতে ফিরে যান তিনি। এমন বৃষ্টিতে কত মাঠে জলকাঁদায় মাখামাখি করে খেলেছেন তারা। তাঁরা তখন বাপের সাথে তাদের বাড়িতেই কাজ করতে আসত। শক্ত সমর্থ ছিল ছোট থেকেই। চাকরের ডাকে স্মৃতি থেকে ফিরে আসেন তিনি। বাড়ি চলে এসেছেন। ঘরে ঢুকে তাঁরা মিয়ার কাপড় বদলে খাওয়ার আয়োজন করতে বললেন তিনি চাকরদের।
নিজে ধাতস্ত হয়ে তারা মিয়া কে যে ঘরে রাখার ব্যবস্থা করেছেন সে ঘরে ঢুকলেন। মাটিতেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে তাঁরা মিয়া। পাশেই থালার খাবার ওমনি পড়ে আছে- খায়নি। মাছি পড়ে ভন ভন করছে খাবারে। ঘরের কোনে রাখা চৌকিটায় বসেন সাত্তার। তাঁরা মিয়ার ঘুমন্ত নির্লিপ্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
তারা মিয়া দুরন্ত ডানপিটে ছিল। যুবক বয়সে আরও শক্ত সমর্থ হয়ে উঠে। পাশের গাঁয়ের সুন্দরী এক মেয়েকে বিয়ে করে। লোকে বলে- প্রেমেই পড়েছিল তাঁরা ওই মেয়ের। ভীষণ ভালোবাসত বউকে। আশ্বিনের এক সন্ধ্যায় ছোট্ট- গোল মুখের-ডাগর নয়না এক চঞ্চলা বালিকা তার বউ হয়ে আসে। ছোট হলেও সংসারের কাজকর্মে ভীষণ পাকা ছিল টিয়া। ওর কাজকর্ম, সংসার গোছানোর গুন দেখে তাজ্জব বনে যেত পাড়াপড়শিরা। পাড়ার বউ-ঝি’রা বলত- তারার বউ এর নামও যেমন টিয়া, রূপে গুনেও টিয়া। টিয়া যখন সারারাত ঢেঁকিতে ধান ভানত কিংবা নবান্নের দিনে পিঠা বানাত পুরুষলোকেরা টিয়াকে দেখিয়ে বউদের শাসাত।
বলত- ‘দ্যাখ তোরা, ওইটুকুন মাইয়া কেমুন কইরা কাম করে। আর তোগো কাম করতে দিলে খালি বাহানা’। এমন কথার পর স্ত্রীমহল টিয়া কে যে কি পরিমাণ ঈর্ষা করত তা বলার মত ছিল। সারাবাড়ি দাপিয়ে বেড়াত টিয়া। কখনও গোয়ালের গরুগুলোকে খড়-বিচালি দেওয়া, কখনও দুধ দোয়ানো, কখনও গোবর কাঁদা মিশিয়ে ঘর লেপা, শিকে তোলা, নকশি কাঁথা বোনা। সর্বক্ষণ দৌড়ে বেড়াত ওইটুকুন পায়ে এমাথা ওমাথা। তারার মা মারা গিয়েছিল তার জন্মেও সময়ই। বৃদ্ধা দাদী আর বাবার কোলেই বড় হয়েছিল। তারার এমন কর্মচঞ্চল, লক্ষ্মীমনা বউ দেখে দাদী শান্তি পান, আনন্দে চোখের পানি মোছেন, উপরওয়ালার কাছে দু’হাত তুলে মোনাজাত করে দোয়া করেন এই যুগলের জন্য। কিন্তু একটা মাত্র দোষ ছিল টিয়া’র। মুড়ি চাবানোর মত পান চাবাত। পান ছাড়া তার মুখকে একদ-ও খালি রাখত না। ওই গুলবাহার জর্দা আর পাথরঘাটার চুন মিশানো পান তার মুখেই থাকত সবসময়। একটা খেত, আর দুই তিন খিলি আঁচলে বেঁধে রাখত। তারার দাদী, সে নিজে কত বকেছে এর জন্য কিন্তু উহু, টিয়া’র পান ছাড়ানো সম্ভব হয়নি। হাটের দিন কিংবা কোন মেলা’র দিন- এই রথের মেলা’র সময় টিয়া’র জন্য তারা যদি পান নিয়ে না আসত তবে কা- হত। আপেলের মত গোলাপি আভা ছড়ানো মুখটা কষটে স্বাদের পেয়ারার মত ফুলিয়ে রাখত। ভাতও খেত না সেদিন। অন্যসব মেয়েছেলের মত আলতা-চুড়ি-শাড়িতে মন ছিলনা টিয়ার।ওর সকল সাধ কেবল ওই পানে। কাদেরর বাপ তাহেরের বিশপদী মশলার পান ছিল তার দুনিয়ার মধ্যে প্রিয়বস্তু। মেলার দিন এ পান পেলে খুশিতে ডগমগ হয়ে যেত টিয়া। কাঁচের চুড়ি পড়া লতানো কলমির মত দু’বাহু দিয়ে তারার গলা জড়িয়ে কানে কানে বলত- ‘আপনে অনেক ভালা মানুষ’।
বিয়ের পর প্রথম মেলা থেকে পান না আনায় রাগে তারার গায়ের নতুন গেঞ্জি টেনে ছিড়ে ফেলেছিল। পরে অবশ্য এ কথা বলে অনেক ক্ষেপাত তারা।
বউটা তখন তার সাত মাসের পোয়াতী। সবই ঠিক চলছিল। হঠাৎ কি এক রোগে ধরল, সারা রাতদিন খালি কাশত। কাশতে কাশতে শ্বাসটান উঠত টিয়ার। তারা মিয়া বউ এর কষ্ট সইতে পারত না। কতগ্রাম থেকে কত কবিরাজের ওষুধ এনে খাইয়েছে। যখন যে যে কবিরাজের কথা বলেছে সেখান থেকেই ওষুধ এনেছে। কিন্তু লাভ হচ্ছিল না। কাশির মাত্রা বেড়েই চলছিল। এরই মাঝে একদিন ব্যথা উঠে টিঁয়া’র। ওর দাদী ওকে ডেকেগ্রামের দাইকে আনতে বলে। সেদিনও ঝুম বুষ্টির দিন। রথের মেলা চলছিল। টিয়া এ অসুখের মাঝেও তাকে মেলা থেকে পান এনে দিতে বলেছে। না, সেবার আর কানে নেয়নি তারা মিয়া। কবিরাজ বলেছিল জর্দাওয়ালা পান না দিতে। কত অনুনয় বিনয় করেছে টিয়া, তারা মিয়া অটল থেকেছে। দাদীর কথায় ঝড়বৃষ্টি পরোয়া না করে দাইকে ডেকে আনে। ততক্ষণে মেয়েটা তার জন্ম নিয়েছে পৃথিবীতে। দাই দেখে বলল- বউ মেয়ে কারও অবস্থাই ভালো না। মেয়ে সাতাশে। এমন বাচ্চা বেশির ভাগই বাঁচে না। বুকটা হুঁ হুঁ করে উঠে তারা মিয়ার। সন্ধ্যার দিকে টিয়া’র অবস্থা আরও খারাপ হয়। কাশতে কাশতে গলা দিয়ে রক্ত বেরহয়। কাশির জোরে তলপেটেও চাপ পড়ে। বাইরে দাওয়ায় বসেছিল তারা মিয়া। দাদী এসে বলল- অবস্থা সুবিদার না। বউ তোরে ডাকে।
এ ক’দিনেই চাঁদের মত উজ্জ্বল চেহারাটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে টিয়া’র। ছোট্ট দেহখানা শুকিয়ে আরও ছোট্ট হয়ে গিয়েছে। ঘরে ঢুকতেই হাতের ইশারায় ডাকে তারাকে। চৌকিতে টিয়া’র পাশে বসে তাঁরা। শুকনো, ফেঁটে যাওয়া খসখসে ঠোঁটজোড়া নেড়ে ভগ্ন গলায় বলে- আমার মুনে হয় সময় শ্যাষ। আমি মইরা গেলে আপনে কিন্তু আর বিয়া করবেন না, তাইলে আমার মাইয়াডা এতিম হইয়া যাইব। শ্যাষ বারের মত আমাওে একটা পান দিবেন? মশলা পান? অহন কিছু হইবনা আর। দেন একটা বিশপদী পান!
কথা দেয় তারা পান এনে দেওয়ার। ছোটে রথের মেলায়। রথের মেলা তখনও চলছিল। তাহেরের বিশপদী মশলার পান নিয়ে আসে সে দৌড়াতে দৌড়াতে। বাড়ির কাছে আসতেই থেমে যায় তার পায়ের গতি। মরা কান্নার রোল ভেসে আসে কানে।
নেই! টিয়া চলে যায় সব ফেলে। সাধের পান আনার আগেই চলে যায়। উঠানে জলকাদার উপরই বসে পড়ে তারা মিয়া। বুকটা ভেঙে যায় তার। পরদিন বউয়ের জন্য আনা পান টিনের কৌটায় সুন্দর করে রেখে দেয় তারা মিয়া। টিঁয়া’র রেখে যাওয়া মেয়েটাকে তাকিয়ে দেখে। মায়ের মতই সুুন্দর হয়েছে। কিন্তু মেয়েটাও টেকেনা তার। তার পরদিনই মায়ের কাছে চালে যায় মেয়েটাও। কষ্টে, বেদনায় মুষড়ে পড়ে তারা মিয়া। তারপর থেকেই কেমন চুপ হয়ে যায় সে। পান রাখা টিনের কৌটাটা ধরে সারাদিন রাত বসে থাকত। সবাই বলাবলি করত তারা মিয়া বউ এর শোকে পাগল হয়ে গেছে। এরপরের দু’তিন বছর মেলায় তাহেরের বিশপদী মশলার পানের দোকান থেকে মুঠোভর্তি খিলি নিয়ে দৌড় দিত। একবার লোকে ধরেওছিল কিন্তু তাহেরসহ এ গাঁয়ের লোকেরা জানত বলে ওকে কিছু বলেনি। তাহের নিজেই একবার তারা’র হাতে পান গুজে দিয়েছিল। কি কারণে হঠাৎ তারা মিয়া একদিন নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। কত খোঁজ করেছে গ্রামের লোকে কিন্তু পায়নি তারার কোন সংবাদ। দিন গিয়ে বছরে নামে কিন্তু তার হদিশ পায়নি। তারার বৃদ্ধা দাদী আর বাপ বিলাপ করতে করতে একদিন চলে যায় ওপাড়ে। তারপর কত বছর পার হয়েছে। আজ আবার তারার দেখা মেলে!
বউ এর ডাকে হুশ ফিরে যেন মাতবরের। তারাকে ঘুম থেকে আর ডাকেন না। ভাবেন, ঘুমাক!
পরদিন সকাল। সাত্তার গিয়ে দেখেন তারা উঠেছে।কাঁচুমাচু হয়ে হাঁটু গেড়ে বসে কোথায় যেন তাকিয়ে আছে। অবাক হয়ে সাত্তার খেয়াল করলেন তারা মিয়ার হাতে ছোট্ট একটা টিনের কৌটা। সেই মশলা পানের কৌটা! মনে মনে হাফ ছাড়েন সাত্তার মন্ডল। ইশারায় দূরে দাঁড়ানো চাকরটাকে গতরাতে মেলা থেকে কিনে আনা পানগুলো নিয়ে আসতে বলেন। গতরাতে বানানো পান, একটু কেমন বিবর্ণ হয়ে গেছে, ভেতরের মশলার খুশবাই ছুটেছে বাতাসে। সাত্তার মাতবর পানগুলো নিয়ে ধীরে ধীরে তারা মিয়ার কাছে বসেন। তারা মিয়ার হাত দু’টোকে নিজের হাতে নিয়ে তাতে মশলা পানগুলো আলগোছে গুজে দেন। তারা মিয়ার দৃষ্টি এবার নড়ে উঠে। অদ্ভুত দৃষ্টিতে একবার সাত্তারের দিকে আরেকবার হাতে রাখা পানগুলোর দিকে তাকায়। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ শিশুদের মত হাঁউমাউ করে কেঁদে উঠে। অবোধ্য বিলাপ মিশ্রিত কান্না! সাত্তার বুকে জমে থাকা শ্বাসটুকু ফেলে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ান। তার চোঁখের কোনায়ও জল চিকচিক করছে। ঘর থেকে তাঁরা মিয়ার বিলাপ মিশ্রিত কান্না ভেসে আসছে তখনও...

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ