ঢাকা, মঙ্গলবার 25 October 2016 ১০ কার্তিক ১৪২৩, ২৩ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নবনির্বাচিত জামায়াত আমীরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও মৃত্যুর আগে কুলখানি উদযাপন

দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর ভারপ্রাপ্ত আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর জনাব মকবুল আহমাদ সম্প্রতি সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে জামায়াতের আমীর নির্বাচিত হয়েছেন। তার এই নির্বাচনের পর কিছু কিছু পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেল তার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট কিছু অপপ্রচার ছড়ানোর চেষ্টা করছে। এমনকি তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত করার জন্যও তারা উঠেপড়ে লেগেছে বলে মনে হয়। তার সাথে যুক্ত হয়েছে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু কিছু কর্মকর্তা ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনসমূহের চরিত্রহীন বলে পরিচিত কিছু নেতা-কর্মী। তারা তার এলাকায় গিয়ে ১৯৭১ সালে রাজনৈতিক বা অন্য কোন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও পরিবারসমূহকে নানা প্রলোভন ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে তার বিরুদ্ধে মামলা করার ইন্ধন দিচ্ছে। এরা বছর চারেক আগেও এ ধরনের একটি উদ্যোগ নিয়েছিল কিন্তু কোথাও তার অপরাধ চিহ্নিত করে তা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়ে রণে ভঙ্গ দিয়েছিল। কিন্তু আবার এই উৎপাত শুরু করা হয়েছে বলে মনে হয়। জানা গেছে যে, ফেনী জেলার দাগনভূঁইয়া থানার অধীনে তার গ্রামের বাড়ির আশপাশের কয়েকটি গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের পরিচয়ধারী এক ব্যক্তির ছত্রছায়ায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য ’৭১ সাল কিংবা তার আগে-পরে স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক মৃত্যু ও ক্ষতির শিকার কয়েকটি পরিবারের তালিকা করে ঘটনার সাথে জনাব মকবুল আহমাদকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু অদ্যাবধি কেউই তাদের দুর্দশার সাথে তার সম্পৃক্তির স্বীকৃতি অথবা তার বিরুদ্ধে কোন সাক্ষ্য দিতে রাজি হয়নি। ফেনীর জেলা প্রশাসনের কয়েকজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানিয়েছেন যে, বিষয়টির সাথে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জড়িত এবং তাদের নির্দেশেই খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ কর্মকর্তার মতে, তারা যত জায়গাতেই গেছেন সবাই বলেছেন যে তিনি ভাল লোক, তার দ্বারা স্বাধীনতা যুদ্ধকালে, তার আগে অথবা পরে কোন লোক ব্যক্তিগতভাবে অথবা পারিবারিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবার নজির নেই। কিন্তু কথা হচ্ছে নজির না থাকলে কী হবে, যারা ক্ষমতায় থাকেন তারা ইচ্ছা করলে মিথ্যা নজির সৃষ্টি তাদের জন্য নস্যি ব্যাপার।
জামায়াতের রাজনীতি ও ইসলামী আন্দোলনে জামায়াতের নবনির্বাচিত আমীর জনাব মকবুল আহমাদ একজন সাদাসিদে সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে সুপরিচিত। সদালাপী, বিনয়ী, কর্তব্যনিষ্ঠ, সময়নিষ্ঠ, মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল, পরোপকারী ব্যক্তি হিসেবে সমাজে তার অনন্য ভূমিকা রয়েছে। আমাদের দেশে একটি সম্ভ্রান্ত ও ভদ্র পরিবারের সন্তান হিসেবে যতগুলো গুণ ও বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার তার মধ্যে অধিকাংশেরই সমাবেশ রয়েছে। প্রায় ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমি তাকে চিনি। কিশোর-যৌবনকালে উগ্র, ডানপিটে ও দুষ্ট ছেলের স্বভাব তার মধ্যে ছিল না। স্পষ্টবাদী, ন্যায়পরায়ণ ও সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে তিনি সর্বদা জননন্দিত ছিলেন। স্কুল ও কলেজ জীবনে কোথাও তিনি সন্ত্রাসমূলক কাজ করেছেন অথবা কোন প্রকার রাজনৈতিক বা সামাজিক কোন্দলে জড়িয়ে পড়েছেন এমন নজির নেই। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন লাভের পর তিনি প্রথমে সরকারি চাকরিতে পরে তা ছেড়ে দিয়ে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন। তিনি প্রথমে শর্শদী হাইস্কুলে চার বছর এবং পরে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ফেনী সেন্ট্রাল হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন। ১৯৭০ সালে তিনি এলাকাবাসীর অনুরোধে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। বলা বাহুল্য, ১৯৭০-৭১ সালে তিনি দৈনিক সংগ্রামের ফেনী মহকুমা সংবাদদাতা হিসেবেও কাজ করেছেন। ছাত্রজীবন থেকে তিনি অত্যন্ত ধর্মানুরাগী এবং কুরআন-হাদিস চর্চা ও ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়নের প্রতি অনুরাগী ছিলেন এবং এই অনুরাগ তাকে ইসলামী আন্দোলনের রাজনীতিতে টেনে আনে। তবে তিনি কখনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা বাড়াবাড়ি অর্থাৎ সন্ত্রাস নৈরাজ্যে বিশ্বাস করতেন না। তিনি সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের চরম বিরোধী এবং অন্য ধর্ম অথবা সম্প্রদায়ের সম্পত্তি দখল, তাদের প্রতি জুলুম-নির্যাতন কিংবা তাদের প্রতি কোন প্রকার অবিচারে বিশ্বাস করতেন না। সমাজ কল্যাণমূলক কাজ শৈশব জীবন থেকে তার অনেকটা হবি ছিল। ওমরাবাদ পল্লী মঙ্গল সমিতি, গজারিয়া হাফেজিয়া মাদরাসা, সিলনিয়া আঞ্জুমানে ফালাহিল মুসলিমুন ট্রাস্ট ও তার উদ্যোগে সিলনিয়া মাদরাসা সংলগ্ন মসজিদ উম্মুল মুমেনিন মহিলা মাদরাসা, ফেনী শাহীন একাডেমি, ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, দাগনভূঁইয়া সিরাজুম মুনিরা ট্রাস্টসহ বহু এতিমখানা ও স্কুল তার অনন্য কীর্তিসমূহের অন্যতম।
এ কথা সত্য যে, ১৯৭১ সালে তিনি ফেনীতে ছিলেন কিন্তু তিনি কোন অপরাধের সাথে জড়িত ছিলেন অথবা পাকিস্তান আর্মির সহযোগিতা করেছিলেন এ ধরনের ধারণা ও কল্পকাহিনী ডাহা মিথ্যা। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে আর্মি ক্র্যাক ডাউনের পর নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিসহ তৎকালীন আওয়ামী লীগের সকল নেতা যখন নিরীহ নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকে পাকিস্তান আর্মির হায়েনাদের মুখে ঠেলে দিয়ে জীবন বাঁচানো ও আশ্রয়ের জন্য ভারতে পাড়ি জমিয়েছিলেন তখন ফেনীসহ এই ভূখ-ে মুসলিম লীগ জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারাই তাদের পাশে দাঁড়িয়ে নিরাপত্তা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ঐ সময়ে যারা ব্যক্তিগত শত্রুতা উদ্ধার করেছে অথবা মানুষের ঘরবাড়ি লুটপাট করেছে কিংবা পাকিস্তান আর্মির সহযোগিতা নিয়ে মানুষের উপর অত্যাচার চালিয়েছে জনাব মকবুল তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। থাকলে স্বাধীনতার অব্যবহিত পর তার বিরুদ্ধে থানা বা আদালতে মামলা হতো কিংবা মুক্তিবাহিনী তার কিংবা তার বাড়ি ও পরিবারের উপর চড়াও হতো। কিন্তু তা হয়নি। তিনি শান্তি কমিটির সাথেও জড়িত ছিলেন না। শান্তি কমিটির ফেনী মহকুমা সভাপতি ছিলেন মুসলিম লীগের জনাব খাজা আহমদ। রাজাকার আলবদরের কথাই যদি বলতে হয়, তিনি তাদের নিয়োগ পদায়নের সাথেও জড়িত ছিলেন না। থানার ওসি এবং সার্কেল অফিসার (উন্নয়ন) ঢোল সহরত করে এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিজ্ঞাপন দিয়ে তাদের নিয়োগ দিয়েছেন। জনাব মকবুল আহমাদের মতো একজন ভদ্র-নম্র ও জননন্দিত ব্যক্তিকে জনসমক্ষে হেয় করার সরকারি প্রচেষ্টার একটি কারণই থাকতে পারে এবং তা হচ্ছে ইসলামী আন্দোলনে তার সম্পৃক্ততা এবং জামায়াতের কেন্দ্রীয় আমীর হিসেবে তার নির্বাচন। এটা রাজনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। সংকীর্ণতা নয়, অন্তরের প্রশস্ততা ও মহানুভবতা সুষ্ঠু রাজনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। ছোট মন আর বড় দেশ এই দুয়ের সমন্বয় হতে পারে না। কিছু সময় কিছু লোককে হয় তো বিভ্রান্ত করা যায় কিন্তু সকল সময় সকল লোককে বিভ্রান্ত করা যায় না। আমি আশা করি সরকার বিষয়টি উপলব্ধি করবেন, আয়নায় নিজের মুখ দেখে নোংরা কাজগুলো থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরত রাখবেন।
মৃত্যুর আগে কুলখানি ও একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
সম্ভবত সময়টা ছিল এরশাদের স্বৈরশাসনের আমলের। সর্বজন নন্দিত টিভি উপস্থাপক ফতেহ লোহানী বাংলাদেশ টেলিভিশনে একটি অদ্ভুত ঘটনা নিয়ে আসলেন। ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানে তখন তার পরিচালনায় দেশ বিদেশের অনেকগুলো সামাজিক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যাকে তিনি অত্যন্ত দরদের সাথে তুলে ধরতেন। একবার দেখা গেল সত্তরোর্ধ বয়সের বৃদ্ধ এক ভদ্রলোক তার বাড়িতে পাড়াপ্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং পরিচিত ধনী-দরিদ্র সকল শ্রেণীর লোকদের তার বাড়িতে দাওয়াত দিচ্ছেন। দাওয়াতটা হচ্ছে কুলখানির, মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর চল্লিশ দিন পার হবার পর তার রূহের মাগফিরাত কামনার লক্ষ্যে দোয়ার মাহফিল। নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট সময়ে অভ্যাগত অতিথিরা তার বাড়িতে এসে হাজির। এলাহী কাণ্ড। বৈঠকখানা লোকজনে ভরপুর। একপাশে হাফেজ সাহেবরা কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়া-দরূদ পড়ছেন। বাইরে শামিয়ানা টাঙিয়ে পুরুষ ও মহিলাদের জন্য স্বতন্ত্র আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু সবার মনে একটা প্রশ্ন কুলখানি কার? কে মারা গেলেন? একে-অপরকে জিজ্ঞাসা করেও জবাব পাচ্ছেন না। আবার কেউ কেউ পারিবারিক কবরস্থানে খোঁজাখুঁজি করেও নতুন কোনো কবর দেখলেন না। এই অবস্থায় উৎসুক কয়েক ব্যক্তি কুলখানি অনুষ্ঠানের আয়োজক ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করেই বসলেন যে, কুলখানি কার, কে মারা গেছেন? উত্তরে ভদ্রলোক গম্ভীর হয়ে জবাব দিলেন যে, কেউ এখনও মারা যাননি, তবে কুলখানিটি আমার। অতিথিরা অবাক হয়ে গেলেন। তিনি খোলাসা করে বললেন যে, ‘দিনকাল যা পড়েছে, ছেলেদের যে মতিগতি তাতে আমি মারা যাবার পর ছেলে, আত্মীয়স্বজন কুলখানি করে আমার জন্য দোয়ার অনুষ্ঠান করবে এই ভরসা এখন আমি আর পাচ্ছি না। তাই মৃত্যুর আগেই আমি নিজেই নিজের কুলখানি করে নেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং আপনাদের সবাইকে দাওয়াত দিয়ে এনে কষ্ট দিচ্ছি। ভদ্রলোকের কথা শুনে সবাই হতভম্ব হয়ে গেলেন।
ঘটনাটি মনে পড়লো সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি রাজনৈতিক দলের ৬৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত জমকালো আয়োজন দেখে। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সারা দেশে হাজার হাজার তোরণ। মাথার উপর কোথাও কাঠের, আবার কোথাও কাগজের তৈরি নৌকার রেপ্লিকা। রাজধানী ঢাকা মহানগরী থেকে শুরু করে বিভাগ, জেলা, উপজেলা এবং কোথাও কোথাও ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বর্ণিল আলোকসজ্জা। গ্রামের একটি অশিক্ষিত ছেলে এক সময় নাকি কুমিল্লার লাকসাম রেলওয়ে জংশন এবং শহর দেখতে এসেছিল। সে বিদ্যুৎ বাতি দেখে এতই অভিভূত হয়ে পড়েছিল যে, তার আবেগকে কিছুতেই ধরে রাখতে পারছিল না। গ্রামে ফিরে গিয়ে তার অভিজ্ঞতার অভিব্যক্তি বন্ধু-বান্ধবদের বলতে গিয়ে বলেছিল যে, ‘দেখে আসলাম কত লাকসাম কত বাত্তি’। মফস্বল শহর দেখিনি কিন্তু ঢাকা মহানগরীর রাস্তাঘাট অলিগলির আলোকসজ্জা দেখে আমারও মনে হয়েছিল আসলে ‘কত লাকসাম কত বাত্তি’। মনোরম ও দৃষ্টিনন্দন তোরণ তো আছেই। এই অবস্থা সম্মেলন শুরুর প্রায় সপ্তাহখানেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আশপাশে গাছপালা এবং বৈদ্যুতিক খুঁটি ও সরকারি ভবনগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যে, মনে হচ্ছিল তাদের প্রত্যেকটি এক একটি নতুন বউ। শোনা কথা অনুযায়ী এই সম্মেলনের নিরাপত্তার জন্য সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১০ হাজার লোক নিয়োগ করা হয়েছিল। দল ও অঙ্গ সংগঠনের হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবিরা তো ছিলই। আগেই বলেছি এটি ছিল এক এলাহী কাণ্ড। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের ইতিহাসে কোনো দলের এ রকম জাঁকজমকপূর্ণ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এর আগে আর কখনও পালিত হয়নি। এতে যে খরচ হয়েছে তার হিসাব কষা মুস্কিল। একটি সহযোগী দৈনিক বলেছে, এর মূল মণ্ডপ (পাঠকরা ক্ষমা করবেন ‘মণ্ডপ’ শব্দটি তাদের অনেকের প্রিয় বলে ব্যবহার করছি) বা স্টেজ তৈরি ও আনুষঙ্গিক ব্যয় বরাদ্দ ছিল নাকি ২ কোটি টাকা তা পরে বৃদ্ধি করে ৪ কোটি এবং বাইরের ব্যয় ৮ থেকে ১০ গুণ বাড়িয়ে দিয়ে ২০ কোটি করা হয়েছে। এটা হয়তো দুষ্ট লোকদের কথা।
আসল কথা আয়োজকরাই বলতে পারবেন। ৫০/৬০ হাজার লোকের খাবার-দাবার বাবত মোট বাজেটের সমান অর্থ ব্যয় হচ্ছে বলে জানা গেছে। তাদের মূল এবং ঘোষিত বাজেট হচ্ছে ২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। অতিথি আপ্যায়ন আইন বা সরকারের এঁবংঃ ঈড়হঃৎড়ষ ঙৎফবৎ তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হচ্ছে কিনা জানা যায়নি। ঐ আইন প্রযোজ্য হলে সরকারকে ভ্যাট-ট্যাক্স বাবত প্রায় দু’কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করতে হবে। বিদেশী অতিথিদের আসা-যাওয়ার খরচ, হোটেল ভাড়া, অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ও খাবার-দাবার বাবত ব্যয়িত অর্থের কথা তো আলাদা।
সম্মেলনে দু’দিন আগে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন আওয়ামী লীগ নেতার ভাষ্যমতে আলোক সজ্জা, মঞ্চ নির্মাণ, ঢাকার মূল সড়কে তোরণ নির্মাণ প্রভৃতি মিলিয়ে তারা কয়েক কোটি টাকা ইতোমধ্যেই ব্যয় করেছেন। তার মতে, সপ্তাহ জুড়ে আলোক সজ্জায় শুধু ঢাকা মহানগরীতেই ৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তারা সম্মেলনস্থলে নৌকা প্রতীকের আদলে স্মরণকালের সবচেয়ে সুন্দর ও আকর্ষণীয় একটি মঞ্চ তৈরি করেছেন। ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কসমূহে ২৫টি এলইডি মনিটরও স্থাপন করা হয়েছে। সম্মেলন পর্যবেক্ষণে বিদেশী প্রায় ৫৫ জন অতিথি বাংলাদেশে এসেছেন। তাদের আসা-যাওয়া ও সোনারগাঁও হোটেলে অবস্থান বাবত যাবতীয় অর্থ দলীয়ভাবে বহন করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরাসরি ক্ষমতায় আসার প্রায় ৮ বছর পর (প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী তাদের আন্দোলনের ফসল সেনা সমর্থিত কেয়ারটেকার সরকারের ২ বছর ধরলে ১০ বছর) বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও জাঁকজমকপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীটি পালন করছেন। বাংলাদেশের মানুষ অভিভূত হয়েছেন যদিও সম্মেলনের দিনগুলোতে রাস্তাঘাটে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেয়া অথবা রোড ব্লকের কারণে অথবা বিদ্যুৎ সরবরাহ ডাইভারসানের ফলে নগরবাসী অনেকেই নিদারুণ কষ্ট ভোগ করেছেন। কেউ কেউ এই অনুষ্ঠানের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন যে, গত প্রায় এক দশকের ক্ষমতাসীন অবস্থায় দলটি ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস-নৈরাজ্য, ধর্ষণ-ব্যভিচার, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তির জবরদখল, হত্যা, গুম ও মানুষের উপর বিশেষ করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের উপর জুলুম নির্যাতনের যে অনবদ্য রেকর্ড ও দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে তাতে আগামীতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ এবং অবাধ নির্বাচন হলে দলটির ক্ষমতায় ফিরে আসা খুবই অনিশ্চিত। এ প্রেক্ষিতে ভবিষ্যৎ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের ব্যাপারে শংকিত হয়ে ক্ষমতায় থাকতেই ফতেহ লোহানীর আগাম কুলখানীর ন্যায় জমকালো প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করে নিয়েছে। তবে ঘটনা যাই হোক ব্যক্তিগতভাবে আমি তাদের নতুন নেতৃত্বকে শুভেচ্ছা জানাই। জনাব ওবায়দুল কাদেরের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন দলের সুমতি ফিরিয়ে আনুক এই কামনা করি। জনাব কাদেরের পিতা বসুরহাট হাইস্কুলের অবসরপ্রাপ্ত হেড মাস্টার জনাব মোশাররফ হোসেন এবং নানা খানবাহাদুর আমিনুল্লাহ এবং চাচা এরফানউল্লাহ সকলেই সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন। এদের মধ্যে তার পিতা ও নানা এলাকায় মুসলিম লীগার হিসাবে খ্যাতিমান ছিলেন এবং চাচা এরফান উল্লাহ জামায়াতের রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। আমি দলটির সাথে জনাব কাদেরের শুভ কামনা করি শুধু রাজনীতিবিদ হিসেবে নয়, একজন সাংবাদিক হিসেবে অধুনালুপ্ত বাংলার বাণীর সাব এডিটর হিসেবে তাকে আমার এখনো মনে পড়ে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ