ঢাকা, মঙ্গলবার 25 October 2016 ১০ কার্তিক ১৪২৩, ২৩ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

১০ টাকার চাল নিয়ে বেসামাল দশা

সরদার আবদুর রহমান : সারা দেশে সরকার প্রদত্ত ১০ টাকা কেজির চালে দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে চলছে বেসামাল দশা। আর এনিয়ে কিছুতেই যেন সামলানো যাচ্ছে না সরকারি দলের লোকদের। বেশিরভাগ স্থানে সরকারদলীয় চেয়ারম্যান-মেম্বারদের প্রভাব-প্রতিপত্তির কাছে হার মানতে হচ্ছে প্রশাসনের লোকদের।

সরকারী উদ্যোগে দেশের হতদরিদ্রদের মানুষদের সহায়তা দেয়ার লক্ষ্যে গত মাস থেকে এই কার্যক্রম শুরু করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী একটি দুস্থ পরিবার প্রতিমাসে ১০ টাকা কেজি দরে ৩০ কেজি চাল কিনতে পারবে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে এই চাল বিক্রিতে প্রতিনিয়ত পাওয়া যাচ্ছে নানা অভিযোগ। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, গত প্রায় এক মাস যাবৎ এই চাল বিক্রি ও বিতরণ নিয়ে দেশের অধিকাংশ স্থানেই নানা প্রকার অভিযোগের পাহাড় জমেছে। 

এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তালিকাভুক্ত করেছে অনেক সচ্ছল পরিবারের সদস্যদের নাম। রয়েছে ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ। আবার ওজনে চাল কম দেয়া, কালোবাজারে বিক্রিসহ বিভিন্ন অভিযোগ। দুস্থদের চাল পাচ্ছেন চেয়ারম্যান-মেম্বারদের আত্মীয়-স্বজন ও সচ্ছল ব্যক্তিরা। কোথাও দেয়া হচ্ছে ওজনে কম। ১০ টাকার চালে কোথাও আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। এই চাল কালোবাজারেও বিক্রি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। চলছে ভুয়া তালিকা তৈরী করে চাল দেয়ার কাজ। এমনকি প্রবাসীর নামও থাকছে তালিকায়। রয়েছে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নাম। ডিলার নিয়োগে করা হয়েছে স্বজনপ্রীতি। চাল বিক্রির জন্য ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞদের অগ্রাধিকার দেয়ার নিয়ম থাকলেও মানা হয়নি। 

অভিযোগ রয়েছে, সরকার দলীয় নেতাদের সুপারিশের ভিত্তিতে দলীয় নেতাকর্মীদের দেয়া হয়েছে এই চাল বিক্রির ডিলারশিপ। চেয়ারম্যান-মেম্বারদের আত্মীয়-স্বজনরাই পেয়েছেন ডিলারশিপ। কোন কোন স্থানে ডিলারের কোন গুদাম ঘর নেই। যার কারণে চাল রাখা হয় কাপড়ের দোকান, পরিত্যক্ত টিনের ঘর। এমনকি স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় কার্যালয়গুলোতেও চাল গুদামজাত করার কথা জানা যায়। বিভিন্ন স্থানে নিয়োগকৃত ডিলাররা ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। তবে এদের অধিকাংশ প্রকৃত ব্যবসায়ী নয়। চাল মাপে কম দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে কোন কোন ডিলারের বিরুদ্ধে। চালক্রেতা অভিযোগ করেন, ডিলার থেকে চাল কিনে অন্যত্র মেপে দেখতে পান ৩০ কেজির স্থলে ২৬ কেজি।

১০ টাকা কেজি দরের চাল অবৈধভাবে বিক্রি করে রাতের আঁধারে সরানোর সময় পুলিশ উদ্ধার করে কোন কোন স্থানে। এ সময় ডিলারসহ হাতেনাতে আটক হবার ঘটনাও ঘটে। ডিজিটাল মেশিনে মাপার স্থলে চাল মেপে দেয়া হচ্ছে বালতি দিয়ে। কম থাকছে ওজনে। ওজনে চাল কম দেয়ায় একটি জেলায় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও চাল ডিলারকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এক স্থানে চালের প্রতিটি কার্ডের বিনিময়ে একশ’ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। দুর্নীতির কারণে বিভিন্ন স্থানে ডিলারশিপ বাতিল করা হয়। এক স্থানে একজন ইউপি সদস্য নিজেই আত্মসাৎ করেন ১০ টাকা কেজির চাল। এলাকার দরিদ্রদের কার্ডের চাল তার নিজের পরিবারের মাঝে প্রদান করেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। অনেক ডিলার নামমাত্র চাল বিতরণ করে বাকিগুলো কালোবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন। এমনকি কার্ড পেয়েও অনেকে চাল না পেয়ে বিফল মনে ফিরে আসছেন। এলাকার চেয়ারম্যান-মেম্বাররা ১০ টাকা দরে চাল বিক্রির এই হতাশাজনক অবস্থার কথা স্বীকার করেছেন। এ কর্মসূচির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কিছু পদক্ষেপ নিলেও ব্যাপক অনিয়ম বন্ধে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছেন না। কোন কোন স্থানে ডিলার নিজে ও তাদের আত্মীয়স্বজনরা হতদরিদ্র সেজে নিজেদের নামে কার্ড করেছেন। দুস্থদের অভিযোগ, গরিবের চাল ধনীরাই খাচ্ছে। আবার চেয়ারম্যান-মেম্বাররা দুই ভাগ হয়ে তালিকা করার ফলে এনিয়ে বিরোধের জেরে চাল বিক্রির কার্যক্রমই বন্ধ করে দিতে হয়েছে। একপক্ষ বলছে, প্রকৃত হতদরিদ্রের নামের তালিকা না দিয়ে নিজেদের পছন্দের লোকজন যারা হতদরিদ্র কিংবা দুস্থ নয় এমন সব লোকের নামের তালিকা দেয়ায় সেগুলোর মধ্যে কিছু কেটে প্রকৃত ব্যক্তিদের তালিকা করা হয়েছে। অন্যপক্ষের দাবী, নিজেদের লোকদের তালিকাভুক্ত করতেই এই তালিকা নিয়ে তেলেসমাতি করা হচ্ছে। এমনও ঘটেছে, চাল বিতরণ কার্যক্রম শেষ করা হয়েছে ১০ দিন আগে। কিন্তু তালিকাভুক্তদের অনেকেই চাল পায়নি আদৌ। 

কিছু জায়গায় রাজনৈতিক দলের কার্যালয়কে চাল বিক্রির কেন্দ্র বানানো হয়েছে। এই কার্যক্রমকে সরাসরি রাজনৈতিক রূপ দিয়ে স্থানীয়ভাবে ফায়দা নেবার চেষ্টা করার কথা জানা গেছে। এর ফলে অনেক অরাজনৈতিক মানুষ যথার্থ ভোক্তা হলেও চাল নেয়া থেকে বিরত থাকছেন। এই কার্যক্রমকে বিগত ও আগত দিনের ভোটের সুবিধার দিকে খেয়াল রেখেও ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। হতদরিদ্রদের এই দশ টাকা কেজি দরের চাল বিতরণ করা হয়েছে এমন লোকদের যাদের পাকাবাড়ি, ৮/১০ বিঘা জমিসহ পুকুর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিত্তশালীদের মধ্যে অনেকেই এসব চাল মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করেছেন এমন অভিযোগও রয়েছে। সংসারে কোনো অভাব নেই- এমন লোকদেরও তালিকায় রাখা হয়েছে। ভোটের সময় তারা চেয়ারম্যানকে নানাভাবে সহায়তা করেছেন বলে চেয়ারম্যান ‘ভালোবেসে’ তাদের নামে চালের কার্ড দিয়েছেন। লোক দিয়ে তারা সেই চাল তুলিয়েছে- এমন কথাও জানা গেছে। দুস্থদের কার্ড এমনকি ডিলারদের কাছে রেখে জালিয়াতির কথা জানা গেছে। কোন কোন স্থানে চাল বিতরণ তদারকির জন্য সরকারিভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা অথবা উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেয়া হলেও তাদের মান্য করছে না ডিলাররা। তদারকি কর্মকর্তাদের আক্ষেপ, ‘আমরা মাঠপর্যায়ের ছোট কর্মকর্তা। ডিলাররা প্রত্যেকেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত স্থানীয় প্রভাবশালী। অনভিজ্ঞ ডিলারদের অধিকাংশ তদারকি কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতে চাল বিতরণের নামে বেশির ভাগ চাল কালোবাজারে বিক্রি করছেন।’ 

এদিকে, ওজনে কম দেয়ার ব্যাপক ঘটনার কথাও জানা গেছে। কোন কোন স্থানে পরিস্থিতি মোকাবেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পর্যন্ত স্থাপন করতে হয়। সাজা দিতে হয়েছে অভিযুক্তদের। যাদের মধ্যে সরকারি দলের নেতারাও রয়েছেন। চাল বিতরণের এই বিপর্যস্ত অবস্থা নিয়ে প্রধানত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাগণ পড়েছেন বেকায়দায়। এবিষয়ে কোথাও কোথাও অসহায় প্রশাসন এই বলে দায় সারছেন যে, ‘১০ টাকার চাল বিক্রিতে মৌখিকভাবে অনিয়মের অনেক অভিযোগ পেলেও লিখিত না পাওয়ায় ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ