ঢাকা, মঙ্গলবার 25 October 2016 ১০ কার্তিক ১৪২৩, ২৩ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

দু’টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ৫ মাস পর রহস্যজনকভাবে দায়মুক্তি

মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, রংপুর অফিস : রংপুর মহানগরীতে ৮ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে কয়েক বছর ধরে এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা দিনাজপুর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে রহস্যজনকভাবে নির্বিকার রয়েছে। ফলে রংপুর মহানগর এবং সদর উপজেলার ৬৮ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী প্রতিবছর অনিবার্য বঞ্চনা এবং মেধা বিকাশের ক্ষেত্রে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রংপুর মহানগরীর অভিভাবক-শিক্ষকসহ সকল শিক্ষার্থীর মধ্যে এক পর্যায়ে ক্রমান্বয়ে চাউর হয়ে উঠে। এর প্রেক্ষিতে চলতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত ২০১৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার সময় সংঘটিত দুর্নীতির নিবির তদন্তের মাধ্যমে দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৭ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এন এস আই)-এর মহাপরিচালকের দপ্তর একটি গোপন তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করে। ঐ রিপোর্টের প্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সালমা জাহান স্বাক্ষরিত এক পত্রে (স্মারক নং ৩৭.০০.০০০০.০৭২.৩৯.০২৯.১৫.৯৪৮, তারিখ ঃ ১০-০৪-২০১৬) সূত্র নং- ৬৭(২)১/২০৫-৮০, তারিখ ঃ ১৮-০২-২০১৬ অনুযায়ী রংপুরের কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক ফেরদৌসী বেগম ও মনিরা বেগম এবং রংপুর পুলিশ লাইন স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক শাহানারা বেগম, বাদল কুমার, এ কে এম রবিউল আলম, বিজন কুমার রাও এবং জাহাঙ্গীর আলমকে এসএসসি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তরপত্র সরবরাহের বিভিন্ন দুনীতি এবং অনিয়মের দায়ে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।  এদিকে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একই উপসচিব স্বাক্ষরিত গত ২৭-০৯-২০১৬ তারিখের ২৭০ নম্বর স্মারকের এক পত্রে জানানো হয় যে- জেলা প্রশাসক রংপুর-এর (স্মারক নং ০৫.৫৫.৮৫০০.০১৬.১১.০১০.১৬-৫২৭, তারিখঃ ২৭-০৭-২০১৬) তদন্ত প্রতিবেদনে উপরোল্লিখিত অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। তাই সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের অভিযোগের দায় হতে অব্যাহতি দেয়া হলো।  দেশের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং দায়িত্বশীল গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদনকে অসত্য প্রতিয়মান করে অভিযোগের যে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায়মুক্তি দিতেই যেন জেলা প্রশাসনের এই রহস্যজনক তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছে। এ ব্যাপারে একটি গোযেন্দা সংস্থার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জেলা প্রশাসনের দায়মুক্তির প্রতিবেদনটির ব্যাপারে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

প্রাপ্ত অভিযোগে জানা গেছে, রংপুর মহানগর এবং সদর উপজেলার ৬৮ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর জন্য রংপুর মহানগরীর ৯ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিগত কয়েক বছর ধরে অঘোষিতভাবে স্থায়ী এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছে। এর ধারাবাহিকতায় ৮ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রে পরস্পরের মধ্যে রহস্যজনক নিবির সমঝোতার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কতিপয় শিক্ষকের সহযোগিতায় এসএসসি পরীক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তরপত্র সরবরাহের অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

প্রাপ্ত তথ্যে আরও জানা গেছে, এ বছর ফেব্ররুয়ারি মাস পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ২০১৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় রংপুর জিলা স্কুল কেন্দ্রে সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ ৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। আবার রংপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে রংপুর জিলা স্কুলসহ ৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা নেয়া হয়। একইভাবে ক্যান্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে বর্ডার গার্ড রাইফেলস পাবলিক হাই স্কুলসহ ১৩টি, আবার বর্ডার গার্ড রাইফেলস পাবলিক হাই স্কুল কেন্দ্রে ক্যান্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ ও তাদেরই সহযোগী প্রতিষ্ঠান মিলেনিয়াম স্টারস স্কুল এন্ড কলেজসহ ৫টি, পুলিশ লাইন স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজসহ ১১টি, আবার কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে পুলিশ লাইন স্কুল এন্ড কলেজসহ ৪টি, লায়ন্স স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে সমাজ কল্যাণ বিদ্যা বিথী স্কুল এন্ড কলেজসহ ১২টি, আবার সমাজ কল্যাণ বিদ্যা বিথী স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে লায়ন্স স্কুল এন্ড কলেজসহ ৭টি এছাড়া কারমাইকেল কলেজিয়েট স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে ৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। উল্লিখিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীদের এই পারস্পরিক অবস্থানের সুযোগে প্রতিষ্ঠানগুলো পরীক্ষায় অনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। আগামী বছর জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিতব্য ২০১৬ সালের আসন্ন এসএসসি পরীক্ষায় অনুরূপ কর্মকাণ্ডের নীরব প্রক্রিয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে একটি সূত্রে জানা গেছে। 

এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রংপুর মহানগরীর অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা এই পারস্পরিক সুযোগের পরীক্ষা পদ্ধতি বন্ধ করার জন্য জেলা প্রশাসনসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও দিনাজপুর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছে।

এ ব্যাপারে দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর আহমেদ হোসেন জানান, এ বিষয়ে আমাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব প্রথমে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে একটি চিঠি দিয়ে অভিযুক্ত ৭ শিক্ষককে পাবলিক পরীক্ষার দায়িত্ব না দেয়ার নির্দেশনা দিলে আমি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার কাছে একটি চিঠি ইস্যু করেছি। তবে যেকোন পাবলিক পরীক্ষায় কেউ যাতে উত্তরপত্র সরবরাহের মতো জঘন্য অনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে না পারে সেজন্য আমাদের সর্বোচ্চ নজরদারি আছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ