ঢাকা, বুধবার 26 October 2016 ১১ কার্তিক ১৪২৩, ২৪ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গা মুসলিমদের বাস্তুচ্যুত করার নির্মম পদক্ষেপ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর

অক্টোবর ২৫, আলজাজিরা/রয়টার্স/পার্স টুডে : মিয়ানমারের একটি গ্রামের প্রায় দুই হাজার মুসলমানকে গত রোববার তাদের ঘরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। বার্মিজ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ওপর সাম্প্রতিক হামলার জের ধরে সংখ্যালঘু মুসলমানদের বিরুদ্ধে এই নির্মম পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
মিয়ানমারের সেনারা রোববার মধ্যাঞ্চলীয় মান্দালাই প্রদেশের ‘কি কান পিন’ গ্রামে প্রবেশ করে। এ সময় তারা সেখানকার সব মুসলিম অধিবাসীকে গ্রামটি ত্যাগ করার নির্দেশ দেয়। এ সময় জরুরি প্রয়োজনীয় সামগ্রী ছাড়া হতভাগ্য রোহিঙ্গাদের অন্য কিছু নিতে দেয়া হয়নি। বর্তমানে এসব মুসলমান পার্শ্ববর্তী বন ও ধান ক্ষেতে লুকিয়ে দিনাতিপাত করছেন।
নিজ ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া একজন মুসলমান গত সোমবার বিকেলে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে আমার পরিবারের সব সদস্যসহ প্রায় ২০০ মানুষ ধানক্ষেতে অবস্থান করছি। আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি। সেনারা গ্রামে ঢুকে আমাদের দ্রুত ঘরবাড়ি ত্যাগের নির্দেশ দিয়ে বলে, কথা না শুনলে তারা আমাদের গুলি করবে। ”
মিয়ানমার সরকারের একজন মুখপাত্র দাবি করেছেন, সরকারের পক্ষে ওই এলাকার কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। কারণ এলাকাটি সেনা অভিযানের একটি ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত।
২০১২ সালের জুনে মিয়ানমারে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গায় নিহত হন কয়েকশ রোহিঙ্গা মুসলিম। বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন রাখাইন রাজ্যের দুটো গ্রামের ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় উগ্রপন্থী বৌদ্ধরা। অন্তত এক হাজার ৬০০ ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। দাঙ্গায় অন্তত ৩০ হাজার মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হন। উগ্র বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সহায়তায় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাসাকা, পুলিশ ও ‘লুন্টিন’ বাহিনী এই মুসলিমবিরোধী তা-ব চালায়। জাতিসংঘের মতে, বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নিগৃহীত সংখ্যালঘু হচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলিমরা।
এদিকে মিয়ানমারের সংঘাতকবলিত রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্বিচারে গ্রেফতার এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তদন্তের জন্য সে দেশের সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থার বিশেষজ্ঞরা। কয়েক সপ্তাহ আগে বাংলাদেশের সীমান্তের কাছে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কয়েকটি চৌকিতে হামলায় ৯ জন পুলিশ নিহত হবার পর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী সে অঞ্চলে ত্রাণকর্মী এবং সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। সে হামলার জন্য রোহিঙ্গা মুসলমানদের দায়ী করছে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী।
সে এলাকায় মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন চালাচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা বলছেন মিয়ানমারে তাদের স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করে জানা যাচ্ছে যে, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা রোহিঙ্গা মুসলমানদের বহু বাড়িতে আগুন দিয়েছে এবং অনেককে গুলী করে মেরেছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বৌদ্ধ এবং সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের মধ্যে অস্থিরতা চলছে। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের সে দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না।
সম্প্রতি রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সংঘাত শুরুর পর থেকে স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে যাতায়াত সীমিত করে দিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। কিন্তু রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীডনের বিভিন্ন ছবি এবং ভিডিও নানাভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। তবে সেসব ভিডিও কিংবা ছবি নিরপেক্ষ সূত্র থেকে যাচাই করা রীতিমতো অসম্ভব।
ছবি এবং ভিডিও বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালাচ্ছে। গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় চলমান সংঘাত নিয়ে তদন্তের জন্য এ প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। বহু কূটনীতিক এবং সাহায্য সংস্থাগুলো রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে এমন কিছু বলতে চায় না যেটি বার্মার সরকারকে বিব্রত বা রাগান্বিত করতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ