ঢাকা, বুধবার 26 October 2016 ১১ কার্তিক ১৪২৩, ২৪ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

যে কোনো মূল্যে ক্ষমতা চাই

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : আওয়ামী লীগের সদ্য সমাপ্ত কাউন্সিল শেষে জনপ্রতিনিধিত্বহীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যে করেই হোক আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করে আনতে হবে। আর বিএনপি জামায়াতকে কিছুতেই ক্ষমতায় আসতে দেয়া যাবে না। তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে ‘যে কোনো মূল্যে ক্ষমতা’ আবার তাদের চাই-ই চাই এবং বিএনপিকে একইভাবে ক্ষমতার বাইরে রাখা চাই। তার এই বক্তব্যের মধ্যে গণতন্ত্র বা গণতান্ত্রিক মূল্যেবোধের লেশমাত্র উপস্থিত নেই। গণতন্ত্রে কে ক্ষমতায় যাবে কে যাবে না, সেটা নির্ধারিত হয় জনগণের ভোটে, কারো খেয়াল খুশির উপর নয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোটামুটি রায় দিয়ে দিয়েছেন যে আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় যাবে আর বিএনপি জামায়াতকে তার ধারে কাছে ঘেঁষতে দেয়া যাবে না। এখানে বিষয়টি খুব পরিষ্কার যে, সরকার হয়তো পরিকল্পনা করে বসে আছে যে, সকল দলের সঙ্গে আলোচনা করে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনের যে দাবি তা তারা মানবে না। রকিব কমিশনের মতো একটি স্বাক্ষীগোপাল নির্বাচন কমিশন দিয়ে তারা প্রহসনমূলক একটি নির্বাচন করে পছন্দসই লোকদের নির্বাচিত ঘোষণা করে দেবে। এ ক্ষেত্রে যদি কেউ কোনো বাধা দিতে চায় তাহলে র‌্যাব পুলিশ ছাত্রলীগ দিয়ে একযোগে তাদের উপর হামলা চালানো হবে।  আর শূন্য বুথেও শতাধিক শতাংশ ভোট পড়বে।
কোনো কোনো পন্ডিত এমনও বলেছিলেন যে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি বড় ভুল করেছে। তবু তো তাদের ভিক্ষাপাত্রে দু’চারটা আসন হয়তো জুটতো। কিন্তু তা দিয়ে গণতন্ত্র হতো না। এটি এসব পন্ডিতেরা বুঝতে চাননি। রকিব কশিশনের মতো নির্লজ্জ বেহায়া মেরুদণ্ডহীন নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনো আসেনি। ফলে সরকার যেভাবে হুকুম করেছে, তারা সেভাবেই নির্বাচনের ফল প্রকাশ করেছে। এরপরে এসেছিল উপজেলা নির্বাচন। তারপর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। তাতে যখন সরকার দু’হাতে ভোট লুট করে নিলো, তখন ঐসব পন্ডিত একেবারে নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। কোথায়ও ভোট সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয়নি। এর মধ্যদিয়েও যারা ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে গেছেন, তাদের অধিকাংশই আছেন কারাগারে কিংবা ডজন ডজন মামলা মাথায় দিয়ে পলাতক। গাজীপুর, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, হবিগঞ্জ এসব জায়গায় যারা মেয়র পদে জিতেছিলেন, তাদের মামলার পর মামলা দিয়ে বছরের পর বছর কারারুদ্ধ করে রাখা হচ্ছে। এমন কি দেশের সর্বোচ্চ আদালত তাদের জামিন দিলেও বের হবার পূর্বেই নতুন মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া হচ্ছে। পুনরায় কারাপ্রাচীরের অন্তরালে।
শুধু নির্বাচিতরা বলেই নয়, বিএনপি জামায়াতের লক্ষ লক্ষ লোকের বিরুদ্ধে হাজারে হাজার মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় উদ্বাস্তু হয়ে গেছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। সম্পন্ন কৃষক হয়ে গেছেন পথের ভিখারী। কেউ কেউ শহরগুলোতে এসে মুটে মজুর রিকশাচালকের পেশা গ্রহণ করে আত্মগোপন করে আছেন। আর দিন গুণছেন কবে এই দুঃশাসনের অবসান হবে। আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাবার কৌশল মোটামুটি আমাদের জানা হয়ে গেছে। ক্ষমতায় তাদের যেতেই হবে, কারণ দুর্নীতি গুম খুন লুন্ঠনের যে পর্বত তারা তৈরি করেছেন, তা একদিনে মিশে যাবে না। যে প্রকল্পই তারা হাতে নিচ্ছে, সে প্রকল্পেই দুর্নীতি আর লুন্ঠনের মহোৎসব চলছে। কী লুট করছে না আওয়ামী লীগাররা। এমন কি হতদরিদ্রের নামে পঞ্চাশ লক্ষ লোককে মাসে ত্রিশ কেজি যে চাল ১০ টাকা কেজি দরে দেয়ার কথা, সেটিও ট্রাকে টনে টনে লুট করে নিয়ে যাচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। নিরন্ন দরিদ্র মানুষ শুধু সেদিকে তাকিয়ে থাকছে। কোনো প্রতিকার দেখছে না। প্রথম দিকে আওয়ামী লীগের নেতা পাতি-নেতারা বলতে শুরু করেছিলেন যে, দুর্নীতি সামান্যই, দু’চারটি ঘটনা মাত্র। কিন্তু খাদ্যমন্ত্রী শিকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে দুর্নীতি ধারণার চাইতেও অনেক ব্যাপক। আওয়ামী লীগের নব্য কোটিপতিরা ঐ চাল নিজেদের কবজায় নিয়ে অধিক মূল্যে বাজারে বিক্রি করে দিয়ে আঙুল ফলে বটগাছ হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু প্রতিকার কোথায়ও পাওয়া যাচ্ছে না। এক বাড়ি এক খামার প্রকল্পের হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়ে গেছে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।
শেখ হাসিনা বলেছেন মানুষকে গিয়ে বুঝাতে হবে। তাদের বলতে হবে, উন্নয়নের ধারাবহিকতা ধরে রাখতে আবারও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানোর দরকার। এ কথা মানুষের কাছে বলতে গেলে আওয়ামীদের ঝাড়ুপেটা হওয়ার আশংকাই বেশি। ফলে এ আহ্বান কোনো কাজে দেবে না। কেউ সাধারণ মানুষকে বোঝাতে তাদের কাছে যাবে না। সে মুরোদ তাদের নেই। বরং দুর্নীতির মাধ্যমে তারা আরও অর্থ বানাবে, অস্ত্র কিনবে, ভোটে দাঁড়াতে গেলে, ভোট দিতে এলে নির্বিচারে গুলী চালাবে এবং তাদের সঙ্গে যোগ দেবে র‌্যাব পুলিশ। এ দৃশ্য আমরা আগেও দেখেছি। আগামী তথাকথিক নির্বাচনেও সে অবস্থার কোনো পরির্বতন হবে বলে মনে হয় না।
সুতরাং আওয়ামী লীগকে আগামী নির্বাচনেও ভোট নিতে হবে অস্ত্রের জোরে, সন্ত্রাস সৃষ্টি করে, মানুষকে ভয় দেখিয়ে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা দায়ের করে তাদের তাড়া করা হচ্ছে। প্রয়োজনে লাখ লাখ মামলা করা হবে। তারপরে আর কার সাধ্য আছে নির্বাচনে দাঁড়াতে আসে। এটা অনেকটা আওয়ামী লীগদের টেন্ডারবাজির মতো। আওয়ামী লীগের বাইরে কেউ টেন্ডার ফেলতে এলে তার লাশ পড়ে যায়। কিংবা বাস্তবিকই শুরু হয়ে যায় সশস্ত্র যুদ্ধ। ফলে এখন তা একচেটিয়া ব্যাপার হয়ে গেছে। ভোটের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম আশা করা যায় না।
জামায়াতের আমীর মাওলানা নিজামীর ফাঁসি হওয়ার পর জামায়াতের নতুন আমীর নির্বাচিত হয়েছেন মকবুল আহমাদ। যতোদিন ধরে সরকার যুদ্ধাপরাধ যুদ্ধাপরাধ করছে, তার মধ্যে কোনো দিনই কেউ ভুলেও মকবুল আহমাদের নাম যুদ্ধাপরাধী হিসেবে উচ্চারণ করেননি। কিন্তু যেই না তিনি জামায়াতের আমীর নির্বাচিত হলেন, অমনি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঘোষণা করে বসলো যে, জামায়াতের নবনির্বাচিত আমীর মকবুল আহমাদ যুদ্ধাপরাধের সাথে জড়িত কিনা তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কেন এই আয়োজন? তিনি যদি আমীর না হতেন, তাহলে হয়তো কোনো দিনই তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনার চেষ্টা করা হতো না। অর্থাৎ যে-ই জামায়াতের রাজনীতির সাথে নেতৃত্ব পর্যায়ে জড়িত হবে তাকেই কি তবে যুদ্ধাপরাধীর তকমা দিয়ে ফাঁসিরকাষ্ঠে ঝুলিয়ে দেয়া হবে? এ প্রশ্ন এখন উঠছে। বর্তমান সরকারের রাজনীতি প্রতিহিংসাপরায়ণতার রাজনীতি। অনেকেই তো এমনও আশঙ্কা করছেন যে, নানা মামলায় বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নানা মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়ে তাদের নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করা হবে। সেটি দ্বিতীয় পন্থা। প্রথম পন্থা র‌্যাব পুলিশ ছাত্রলীগ দিয়ে তাদের ঠেঙানো।
উপরন্তু গুম, খুন, ক্রসফায়ার তো নিত্যনৈমিত্যিক ঘটনাই। প্রতিদিন জামায়াত বিএনপির কোনো না কোনো নেতাকর্মীকে কোনো না কোনো এলকায় ক্রসফায়ারে খুন করা হচ্ছে। এখন আর এ কথা কেউ বিশ্বাস করে না যে, সত্যি সত্যি ক্রসফায়ার বলতে কিছু আছে, ক্রসফায়ারে যখন হান্ডকাফ পড়া তরুণের লাশ মেলে, যখন কল্যাণপুরে নিহত এগার জনের প্রত্যেকে পিঠে ও মাথার পেছনের দিকে গুলীর চিহ্ন পাওয়া যায়, তখন প্রশ্ন হয়ে  দেখা দেয়  যে, তারা ক্রসফায়ার না হত্যার শিকার। কখনো কখনো তারা এমনও বলে বসেন যে, নিহতদের কাছে পাওয়া গেছে বোমা পিস্তল গুলী। এসব কথিক জঙ্গি বোমা পিস্তল গুলী হাতে রেখে সেগুলো ব্যবহার না করে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকে পিঠ পেতে দিল যে, গুলী করে আমাদের হত্যা করো।
বহু মামলায় এখন র‌্যব পুলিশ এক এক সংস্থা এক এক রকম কথা বলছে। কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ র‌্যাবের বিরুদ্ধে আবার র‌্যাব পুলিশের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উত্থাপন করছে। গুলশানে তাবেলা সিজার হত্যাকাণ্ডে পুলিশ বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়ে দিয়েছে। তারাই আসলে ঘাতক। কিন্তু র‌্যাবের প্রধান সম্প্রতি বলেছেন, অন্য কেউ নয়, তাবেলা সিজারের ঘাতক নব্য জেএমবি। এই নব্য জিএমবির তত্ত্ব এসেছে গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলায় ২২ জন নিহতের ঘটনার পর। তাহলে দাঁড়ালো কি? দাঁড়ালো এই যে, যেকোনো হামলা, হত্যাকা-, গাড়ি ভাংচুর, মিছিল হলেই বিএনপি জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে চার্জশিট দিয়ে দেয়া যাবে। এমনকি দ্রুত মামলার রায়ও হয়ে যাবে এবং তাদের নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করা হবে। আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে যে নতুন কমিটি এসেছে, সেখানেও যে স্বস্তির আভাস আছে তাও নয়। সাধারণ সম্পাদকের পদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়ে লন্ডনে চলে গেছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে আশরাফ বলেছেন, পদ ছাড়ার বিষয়ে তিনি সময় হলে কথা বলবেন। তার আগে সৈয়দ আশরাফ আওয়ামী লীগের গণতন্ত্র চর্চার এক হাস্যকর ইঙ্গিত দিয়েছলেন। তিনি বলেছিলেন, দলের কমিটিতে কে কোথায় থাকবে তা তিনি আর প্রধানমন্ত্রী ছাড়া অন্য কেউ জানে না। তাহলে কিসের কাউন্সিল? কিসের নির্বাচন? পাঁচ দশক ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করছেন তোফায়েল আহমদ। কাউন্সিলের পর তিনি যে আঁস্তাকুড়ে ছিলেন সে আঁস্তাকুড়েই আছেন। এখন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে আছেন। স্বস্তিতে নাই সংস্কারপন্থিরাও, তারা যে তিমিরে ছিলেন সে তিমিরেই আছেন। আমরা বলতে চাইছি যে, যে ধারার নির্বাচনের পরিকল্পনা করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসনিা সে ধারায় সব সময় একই ফল ফলবে, এটা বলা যায় না। গণতন্ত্র গণতন্ত্রই। এখন প্রায় একদলীয় বাকশাল চালু হয়ে গেছে। বরং বলা যায় সরকার পিছিয়ে গেছে আরও অনেক পেছনে। জেলা পরিষদ নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। আইয়ুব খানের আমলের মৌলিক গণতন্ত্রের ভোট চালু করছেন। এখানে জনগণ ভোট দেবে না, ভোট দেবে কারচুপি আর জবরদস্তির মাধ্যমে নির্বাচিত উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা। আলোকিত মানুষেরা এগিয়ে যায়, ভুতের পা কেবলই পেছনে চলে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ