ঢাকা, বৃহস্পতিবার 27 October 2016 ১২ কার্তিক ১৪২৩, ২৫ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান

জিডিপি তথা মোট দেশজ উৎপাদন বাড়ছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জোর প্রচারণা চালানো হচ্ছে। মঙ্গলবার ঘোষিত সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, জিডিপি ৬-এর ঘর ছাড়িয়ে ৬ দশমিক ১১ শতাংশে পৌঁছেছে। শুনতে সুখবর মনে হলেও বিপরীত একটি খবরও কিন্তু যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গেই আলোচিত হচ্ছে। সে খবরটি কর্মসংস্থান বা চাকরির সুযোগ সৃষ্টি সংক্রান্ত। বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ ও মন্তব্যসহ দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এই খবরে জানানো হয়েছে, জিডিপিতে প্রবৃদ্ধি হলেও সে তুলনায় কর্মসংস্থানে প্রবৃদ্ধি হয়নি। এখনো হচ্ছে না বরং কিছু কিছু খাতে প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হয়ে পড়ছে। এমন অবস্থাকেই ১৯৯৩ সালে ইউএনডিপি ‘কর্মহীন প্রবৃদ্ধি’ হিসেবে অভিহিত করেছিল। বিশ্বের অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও বর্তমানে একই অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা।
এ সম্পর্কিত তথ্য-পরিসংখ্যানেরও উল্লেখ রয়েছে দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে। পর্যালোচনায় জানা গেছে, বিগত প্রায় ১৫ বছর ধরে জিডিপি বা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ছে ধারাবাহিকভাবে। কিন্তু সে তুলনায় চাকরির সুযোগ সৃষ্টি তো হচ্ছেই না বরং বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে এবং কোনো কোনো বছর কর্মসংস্থানের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। যেমন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ‘এমপ্লয়মেন্ট ডায়াগনস্টিক’ শীর্ষক ২০১৬ সালের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০০৫-০৬ সময়কালে বাংলাদেশের জিডিপির গড় প্রবৃদ্ধি যেখানে ছিল ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ সেখানে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। একইভাবে ২০০৫-০৬ থেকে ২০১০ পর্যন্ত সময়কালে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ১১ হলেও এ সময়ে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৩২ শতাংশ। ২০১০ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত সময়কালে জিডিপির প্রবৃদ্ধি যেখানে ছিল ৬ দশমিক ২ শতাংশ সেখানে বাড়ার পরিবর্তে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ২ দশমিক ৩৯ শতাংশে। সর্বশেষ পরিসংখ্যানেও কর্মসংস্থান বাড়ার ব্যাপারে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, যদিও জিডিপির প্রবৃদ্ধি অনেক বেশি দেখানো হয়েছে।
প্রাসঙ্গিক উদাহরণ হিসেবে রিপোর্টে নির্মাণ ও কৃষিখাতের পরিসংখ্যান উল্লেখ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, বেশ কয়েক বছর ধরেই এ দুটি শ্রমঘন খাতের কর্মসংস্থানে স্থবিরতা চলছে। যেমন ২০০৫-০৬ থেকে ২০১০ পর্যন্ত নির্মাণ খাতের কর্মসংস্থানে ১৩ দশমিক ৫২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ঋণাত্মক হয়ে প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ২৮ শতাংশে নেমে আসে। একই নি¤œমুখী প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে শ্রমঘন কৃষি খাতেও। ২০০৫-০৬ থেকে ২০১০ পর্যন্ত সময়কালে খাতটিতে ৪ দশমিক ২৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও ২০১০ থেকে ২০১৩ সময়কালে প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ১ দশমিক ৬ শতাংশে। সেবাখাতেও প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী হয়ে পড়েছে। ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০০৫-০৬ সময়কালে ৩ দশমিক ৯১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও পরের পাঁচ বছরে তা কমে হয় ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ২০১০-১৩ সময়ে এই প্রবৃদ্ধি আরো কমে হয়েছে ১ দশমিক ২১ শতাংশ। 
জিডিপিতে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও কর্মসংস্থান খাতে এভাবেই প্রবৃদ্ধি ক্রমাগত কমে চলেছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী অবশ্য আশার কথা শুনিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটা পর্যায়ে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি নাকি কিছুটা কমে যায় এবং বর্তমান বাংলাদেশ নাকি সে পর্যায়ই অতিক্রম করছে। প্রতিমন্ত্রী আরো বলেছেন, শিল্পায়নের গতি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসবে এবং এজন্য সরকারের শিল্পায়ন পরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এই অপেক্ষা আর কত বছর করতে হবে সে ব্যাপারে প্রতিমন্ত্রী অবশ্য কিছু জানাননি।
অন্যদিকে জিডিপির প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কর্মসংস্থানে কেন প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না তার কারণ ব্যাখ্যাকালে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, গার্মেন্টের মতো শ্রমঘন খাতগুলো ক্রমশই যান্ত্রিক তথা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে, যার ফলে এসব শিল্পে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও কর্মসংস্থানের দিকটি সংকুচিত হয়ে পড়ছে। নতুন কোনো চাকরির সুযোগ তো সৃষ্টি হচ্ছেই না, যন্ত্রের বেশি ব্যবহারের কারণে শ্রমিকরা উল্টো চাকরি হারাচ্ছে। এজন্যই জিডিপির প্রবৃদ্ধির তুলনায় কর্মসংস্থানে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না। তাছাড়া কেবল প্রবৃদ্ধি হলেই চলবে না, প্রবৃদ্ধির গুণগত মানও ভালো হতে হবে। এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই বিশেষজ্ঞদের অভিমত, মানসম্পন্ন প্রবৃদ্ধির জন্য এমন নীতি গ্রহণ করা দরকার যাতে সব খাতের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, জিডিপির প্রশ্নসাপেক্ষ প্রবৃদ্ধির তুলনায় কর্মসংস্থান তথা চাকরির প্রবৃদ্ধি অনেক কমে যাওয়ার খবর নিঃসন্দেহে অত্যন্ত আশংকাজনক। বিশেষজ্ঞরা এমন অবস্থার যেসব কারণ উল্লেখ করেছেন আমরা সেগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। বস্তুত কেবলই সংখ্যা ও পরিমাণের দিক থেকে শিল্প-কারখানা এবং সেসবের উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে টাকার অংকে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন একটি দেশের জন্য মোটেও যথেষ্ট হতে পারে না। ইউএনডিপির ভাষায় এমন ‘কর্মহীন প্রবৃদ্ধি’ জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে কোনো অবদান রাখতে সক্ষম নয়। প্রবৃদ্ধি অবশ্যই হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণÑ শিল্প-কারখানা স্থাপনের পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ালেই শুধু চলবে না, একই সঙ্গে এমন পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে বেকারদের জন্য চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয়। আমরা আশা করতে চাই, সরকার এ বিষয়টিতে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে মনোযোগ দেবে এবং ‘কর্মহীন প্রবৃদ্ধি’ অর্জনের পরিবর্তে ভারসাম্যপূর্ণ প্রবৃদ্ধির ব্যাপারে উদ্যোগী হয়ে উঠবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ