ঢাকা, বৃহস্পতিবার 27 October 2016 ১২ কার্তিক ১৪২৩, ২৫ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ওরা সিরিয়ার রাজনীতিকে যৌক্তিক পরিণতির দিকে এগুতে দিচ্ছে না

সিরিয়ার আলেপ্পোতে বোমা হামলা বন্ধের লক্ষ্যে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত সমাধান প্রস্তাবটিতে ভেটো দিয়েছে রাশিয়া। গত ৮ অক্টোবর ভিতালিচুরকিন এ ভেটো দেন। তাছাড়া রাশিয়ার পাল্টা একটি প্রস্তাব ৯টি দেশের বিরোধিতায় বাতিল হয়ে যায়। আলেপ্পোতে সিরিয়া সরকার ও তাদের মিত্র দেশ রাশিয়ার বিমান হামলা এবং সিরীয় ও রুশ বিমানের টহল বন্ধের দাবি জানিয়ে ফ্রান্স ও স্পেনের উদ্যোগে জাতিসংঘে ওই প্রস্তাবটি উত্থাপিত হয়েছিল।
আলেপ্পো শহরের বাসিন্দারা এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে। বোমা হামলায় বিপর্যস্ত মানুষদের জীবনে দুর্ভোগের মাত্রা বেড়েই চলেছে। আলেপ্পোর নাগরিকদের রক্ষায় যে সমাধান প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল, তাও বাতিল হয়ে গেল রাশিয়ার ভেটোর কারণে। আলেপ্পো পরিস্থিতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বিশিষ্ট মুসলিম স্কলার ড. শেখ ইউসুফ আল কারজাভিরও। অবরুদ্ধ আলেপ্পো শহরের বাসিন্দাদের সহায়তায় এগিয়ে আসার জন্য তিনি সারা বিশ্বের মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ইসলামী চিন্তাবিদদের সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মুসলিম স্কলার্সের প্রধান ড. কারজাভি বলেন, ‘মুসলিম উম্মাহ কখনো বিভক্ত হতে পারে না। মুসলিম হিসেবে আমাদের সবার ভাগ্য একই সূত্রে গাঁথা। আলেপ্পো এখন যে দুর্দশায় রয়েছে তা আমাদের সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’। তিনি আরো বলেন, সিরীয় সরকার ও তাদের মিত্র রাশিয়ার হিংস্রতা থেকে আলেপ্পোকে রক্ষায় সবাইকে একত্রিত হতে হবে। প্রসঙ্গত ড. কারজাভি বলেন, ‘মুসলিমরা সহিংসতা ও রক্তপাত পছন্দ করে না এবং আক্রমণকারী ছাড়া কারো প্রতি শত্রুতাও পোষণ করে না’।
ড. কারজাভি যে আহ্বান জানিয়েছেন তা খুবই যুক্তিসঙ্গত এবং মানবিক। শুধু মুসলিমরা নয়, ধর্ম-বর্ণ, নির্বিশেষে বিবেকবান সব মানুষেরই উচিত বিপন্ন আলেপ্পোবাসীদের রক্ষায় এগিয়ে আসা। স্বৈরশাসক ও বৃহৎ রাষ্ট্রের খবরদারির কারণে আলেপ্পোবাসীকে প্রায় প্রতিদিনই হতাহত হতে হচ্ছে। স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে তাদের বঞ্চিত হতে হচ্ছে। বর্তমান সভ্যতায় বিশ্ব মোড়লদের আগ্রাসনের কারণে সিরিয়ার মতো আরো বহু দেশের মানুষকে বিপর্যয়ের মধ্যে দিনযাপন করতে হচ্ছে। এমন অন্যায় চলতে পারে না। এই সব সঙ্কটের স্রষ্টা যখন বিশ্বমোড়লরা, তখন এর সমাধানের দায়িত্বও তাদের  ঘাড়েই বর্তায়। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তাদের আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। আর অপরাধীর শাস্তি অনিবার্য, এটাই ইতিহাসের রায়।
সিরিয়া পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে উপলব্ধি করা যায়, বর্তমান সময়ে বিশ্বরাজনীতি কোন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। নিজস্ব বলয়কে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বৃহৎ শক্তিগুলো যে কোনো নিষ্ঠুর ও অমানবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। আর তাদের ছত্রছায়ায় ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য স্বৈরশাসকরা নিজের দেশের জনগণের ওপর রাসায়নিক অস্ত্রের হামলা চালাতেও কুণ্ঠিত নয়। যেমন ২০১৫ সালের মার্চে সিরিয়ার সেনাবাহিনী মেনাস গ্রামে রাসায়নিক অস্ত্রের মাধ্যমে হামলা চালিয়েছিল। ২১ অক্টোবর এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা একথা জানান। তবে তারা ২০১৫ সালের মার্চে ইদলিব প্রদেশের বিন্নিশে ও ২০১৪ সালের এপ্রিলে হামা প্রদেশের কফরজিতা এলাকায় রাসায়নিক হামলার জন্য দায়ীদের এখনো চিহ্নিত করতে পারেননি। এ সংক্রান্ত রিপোর্টটি ২১ অক্টোবর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপন করা হয়।
জাতিসংঘ নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট ইনভেস্টিগেটিভ ম্যাকানিজম (জেআইএম) গত আগস্টে এক রিপোর্টে জানায়, সিরিয়ার সরকারি বাহিনী ২০১৪ ও ২০১৫ সালে কমপক্ষে দুটি রাসায়নিক অস্ত্রের হামলা চালায় এবং ইসলামিক স্টেট (আইএস) উগ্রবাদীরাও অস্ত্র হিসেবে মাস্টার্ড গ্যাস ব্যবহার করে। জেআইএম-এর চলমান তদন্তে ৯টি রাসায়নিক হামলার তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে ৩টি সিরিয়া সরকার ও একটি আইএস করেছে বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। জেআইএম-এর চতুর্থ রিপোর্টে বলা হয়েছে, সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে একটি বোমা ফেলা হয় এবং বোমা থেকে বের হওয়া বিষাক্ত গ্যাসে মারাত্মক দগ্ধ হয়ে জনগণের হতাহত হওয়ার পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তথ্য-প্রমাণের মাধ্যমে পৃথিবীবাসী সিরিয়ার জনগণের দুরবস্থার কথা না হয় জানতে পারলো। কিন্তু জাতিসংঘ কিংবা অন্য কোনো শক্তি সিরীয় জনগণের দুর্দশা লাঘবে কার্যকর কোনো ভূমিকা পালনে সমর্থ হবে? পরাশক্তিগুলো তো সিরিয়ার রাজনীতিকে স্বাভাবিক ও যৌক্তিক পরিণতির দিকে এগুতে দিল না। জনগণের আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচারী আসাদ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে সিরিয়ায় অবতীর্ণ হলো রাশিয়ার পুতিন সরকার। এরপর আমরা দৃশ্যপটে দেখলাম আমেরিকাকে। সুযোগ বুঝে আইএসও এসে গেল সিরিয়ায়। এরপর শান্তি ও নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সিরিয়ায় শত শত বোমা ফেলা হলো। অস্ত্রের হোলিখেলায় সিরিয়ার জনগণ দেশ ছেড়ে পালাতে লাগলো। অভিবাসী হতে গিয়ে সমুদ্রে ডুবে মরলো অনেকে। কিন্তু শান্তি ও নিরাপত্তার ফাঁকা বুলি এখনো আওড়ানো হচ্ছে। আর এখন তো জানা গেল পরাশক্তির মদদে আসাদ সরকারের বাহিনী নিজ দেশের জনগণের ওপর চালাচ্ছে রাসায়নিক অস্ত্রের হামলাও। প্রহসনের এমন বিশ্বরাজনীতিকে আমরা এখন কোন ভাষায় ধিক্কার দেবো?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ