ঢাকা, শুক্রবার 28 October 2016 ১৩ কার্তিক ১৪২৩, ২৬ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

২৮ অক্টোবরের নির্মমতা বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে!

মুহাম্মদ আবদুল জব্বার : ২৮শে অক্টোবর আমাদের জাতীয় জীবনে এক রক্তাক্ত কালো অধ্যায়ের নাম। শোকাহত বেদনা বিধুর দিনটি ঘটেছিল বেশ ক’বছর আগে। কিন্তু সেই রক্তাক্ত দিনের স্মৃতি আমাদের হৃদয় থেকে মুছে যায়নি। ওহ! কি ভয়াবহ লোমহর্ষক নিষ্ঠুরতা? ক্ষমতা লিপ্সুদের হিংস্র থাবায় সেদিন রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল রাজধানীর পিচঢালা কালো রাজপথ। সেদিন ক্ষমতালিপ্সুদের আঘাতে আমরা হারিয়েছিলাম মুজাহীদ, শিপন, মাসুমসহ বেশ ক’জন ভাইকে, ক্ষত-বিক্ষত হয়েছিল অসংখ্য তাজা প্রাণ। হায়েনাদের অমানবিকতার কাছে বাকরুদ্ধ হয়েছিল মানবতা! লজ্জায় রক্তাভা বর্ণ ধারণ করেছিল আকাশ, ভারী হয়ে উঠেছিল বাতাস। সহকর্মীদের হারানোর কষ্টে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা হয়েছিল স্তব্ধ ও বাকরুদ্ধ! মানুষ যে মানুষের প্রতি এত অমানবিক হতে পারে বাংলাদেশ ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরে আগে তা কখনো দেখেনি। মানুষ নামের অমানুষের রং-রূপ কেমন হতে পারে, এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ সেদিনের খুনিরাই প্রদর্শন করেছিল। সেদিন নিরীহ,নিরস্ত্র ইসলামপন্থীদের উপর লাঠি-বৈঠার র্নিমম আঘাতে “আল্লাহুয়াকবারের উচ্চকিত আওয়াজ”কে চিরতরে নিঃশেষ করে দেয়াই ছিল ইসলাম বিদ্বেষীদের টার্গেট! লাশের উপর সে কি নর্তন-কুর্দন! মিডিয়ার সুবাদে আওয়ামী হায়েনাদের বীভৎসতা, নিচুতা ও পাশবিকতা প্রত্যক্ষ করেছিল বিশ্বমানবতা। এই দিনটি দেশের ইতিহাসে যতদিন বছর ঘুরে ফিরে আসবে ততদিন এই দিনটিকে দেশবাসী কালো অধ্যায় হিসেবে স্মরণ করবে, আর খুনিদের প্রতি ছড়াবে ঘৃণা। 

বেশ ক’বছর কেটে গেল। সেদিনের তান্ডবে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিল তারাই আজ দেশের ক্ষমতার ধারক-বাহক। বিচারহীনতার কারণে এখনো খুনিরা প্রশাসনের নাকের ডগায় দিব্যি দাবিয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের জন্য দেশে যেন কোন আচার-বিচার নেই! সেই খুনিরা বিচারহীনতার সুবাদে নতুন নতুন জিঘাংসা সংঘটনের উন্মত্ততায় মেতে উঠছে। কলিজা ছেঁড়া ধন সন্তান হারানোর বেদনায় মা-বাবাদের ক্রন্দন এখনো থামেনি। খুনী,অত্যাচারী,জুলুমবাজদের বিচারে সময়ের সাক্ষী পঙ্গুত্ব বরণকারী ভাইদের অপেক্ষার পালা এখনো শেষ হয়নি। জান্নাতের মেহমান শহীদরা ,পাখি হয়ে ঘুরছেন জান্নাতে। বছর ঘুরে ২৮ অক্টোবর আসে। শহীদের সাথীরা প্রতিশোধ নেয়ার স্পৃহায় নব উদ্দীপনায় জাগ্রত হয়। আজ আন্দোলনের কর্মীদের কাছে ২৮ অক্টোবর প্রেরণার সুউচ্চ মিনার। যদিও বা ক্ষমতা লিপ্সুরা ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার লালসায় বাংলার জমিনে এখন ক্ষণে ক্ষণে ঘটিয়ে চলছে নতুন নতুন ২৮ অক্টোবর।

কেন ২৮শে অক্টোবর?

চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সরকারে ক্ষুদ্রতম অংশ ছিল। এসময় নতুন মাত্রায় বাংলাদেশে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সম্ভাবনা আঁচ করতে পেরে চক্রান্তকারীদের টনক নড়ে ওঠে। তাই তাদের অগ্রযাত্রায় ঈর্ষান্বিত হয়ে সা¤্রাজ্যবাদীরা একজোট হয়ে কূটকৌশল পাকাতে শুরু করে। সুযোগের অপেক্ষায় তারা প্রহর গুনছিল। জোট সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন ২৮শে অক্টোবর ২০০৬ সালে নিরীহ নিরস্ত্র ইসলামপ্রিয় জনতার ওপর আওয়ামী ছত্রছায়ায় ইতিহাসের নৃশংস হত্যাকান্ডের মাধ্যমে ক্ষমতার আসনে অধিষ্ঠিত হতে ষড়যন্ত্রের প্রক্রিয়া শুরু করে। ষড়যন্ত্রকারীরা বিশ্বাস করত এ যাত্রায় যদি ক্ষমতায় আসা না যায় তাহলে ইসলাম ও জাতীয়তাবাদই হবে বাংলাদেশের একমাত্র চালিকাশক্তি। ষড়যন্ত্রকারীদের অপকৌশল বৃথা যাওয়ার ভয়ে তারা বেছে নিলো ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম ঘৃণ্য পথ। এরপরের ইতিহাস সবার জানা। ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নির্বাচন! এরপর যুদ্ধাপরাধের ধুঁয়া তুলে বাংলাদেশ থেকে ইসলামী নেতৃত্ব হত্যা ও জঙ্গিবাদের হাস্যকর দোহাই দিয়ে ইসলামী সংগঠন নিষিদ্ধের ষড়যন্ত্র পরিচালনা করে। ২৮শে অক্টোবরের ইতিবৃত্ত সবার কাছে আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। ২৮শে অক্টোবর সংঘটিত হওয়ার পেছনের কারণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সদ্য নির্বাচিত আমীর জনাব মকবুল আহমাদ বলেছিলেন, “পরিকল্পিতভাবেই ২৮শে অক্টোবর নৃশংস ঘটনা ঘটানো হয়েছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পথ রুদ্ধ করে অগণতান্ত্রিক শাসনের পথ সৃষ্টি করা। গণতান্ত্রিক পরিবেশ ধ্বংস করে অগণতান্ত্রিক শক্তির সহযোগিতায় ক্ষমতায় আসাই ছিল আওয়ামী লীগের লগি- বৈঠার তান্ডবের আসল লক্ষ্য। তাই এখন বিনা দ্বিধায়ই বলা যেতে পারে যে, ২৮শে অক্টোবরের ঘটনার ফলশ্রুতিতেই ১/১১ সৃষ্টি হয়েছিল। এ ঘটনার ফলেই মইনুদ্দীন ও ফখরুদ্দীন সরকার ক্ষমতায় এসেছিল এবং পরবর্তীতে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনাও স্বীকার করেছেন যে, “আমাদেরই আন্দোলনের ফসল ছিল ১/১১-এর জরুরি সরকার।”

২৮শের বিয়োগান্ত ঘটনা

২৮শে অক্টোবর চারদলীয় ঐক্যজোটের সরকারের মেয়াদকালের পরদিন নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ছিল প্রথম দিন। পল্টনে বিএনপি ও বায়তুল মোকাররম উত্তর গেট ছিল জামায়াতের পূর্বনির্ধারিত এবং অনুমোদিত সভাস্থল। পাল্টা আওয়ামী লীগও পল্টন ময়দানে সভা করার ঘোষণা দেয়। এ যেন রাজনীতির চরম শিষ্টাচারিতার লঙ্ঘন। যার কারণে বিএনপি সংঘাত এড়িয়ে নির্ধারিত স্থানে তাদের সমাবেশ না করে নয়া পল্টন দলীয় কার্যালয়ের সামনে তাদের কর্মসূচি পালন করছিল। আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালা মুখে বললেও তাদের ভূমিকা সবসময় ঠিক এর উল্টো। সেদিন তাদের নেতৃবৃন্দের নেতৃত্বে নির্মম নিষ্ঠুরতা তারা প্রদর্শন করে। তাদের কার্যালয় বাদ দিয়ে জামায়াতের নির্ধারিত সভাস্থল বিনা উসকানিতে দখলের চেষ্টা করে সাহারা, তোফায়েল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মায়া, ডাক্তার ইকবাল ও হাজী সেলিমের লগি-বৈঠা বাহিনীর নেতৃত্বে। তাদের গতিবিধি আচার-আচরণ দেশবাসীর কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়েছিল যে এ ধরনের আচরণ ছিল অত্যন্ত পূর্বপরিকল্পিত। এ ছিল চোরাপথে ক্ষমতায় আসার ডিজিটাল নাটকের মঞ্চায়ন। কথিত স্বাধীনতার চেতনার একক দাবিদার আওয়ামী হায়েনাদের তান্ডবে সেদিন জান্নাতের পাখি হয়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন টগবগে অকুতোভয় তরুণ শহীদ মুজাহিদ, শিপন, রফিক, ফয়সাল, মাসুম ও শাহাজাহান আলী। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আরো যারা সৌভাগ্যবানদের কাতারে নাম লিখালেন শহীদ জসিম-১, সাবের, শহীদ জসিম-২, আরাফাত, আব্বাস, রুহুল আমিন, হাবিব ও বয়োবৃদ্ধ জাবেদ আলী। 

যারা সেদিন অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাদের জীবনের স্বপ্নসাধ তাদেরকে মুহূর্তের জন্যও স্থির লক্ষ্য হতে বিচ্যুত করতে পারেনি। এ যেন শাহাদাতের পেয়ালা পানের এক অপ্রতিরোধ্য প্রতিযোগিতা! আন্দোলনের সাথীরা ইয়ারমুকের যুদ্ধের মতো পানি পান না করে পাশের ভাইকে পানি পান করানো, নিজের সুরক্ষা নয়, আন্দোলনের ভাইয়ের সুরক্ষার জন্য ইস্পাত দেয়াল হয়ে যায়। দুনিয়ার মায়ামমতা যেন তাদের কাছে তুচ্ছ। নিজেরা মজলুম হয়েছিল সেদিন, জালিমের কাতারে শামিল না হয়ে শহীদের কাতারে রিক্তহস্তে নিজেদের শামিল করে। তাঁরা আজ কালের অনাগত বিপ্লবীদের প্রেরণা “মিনার”। সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব চিরন্তন, সত্য-অসত্য কখনো এক হতে পারে না; যেভাবে আলো-আঁধার এক হতে পারে না। দেশে সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতার পরিবর্তন হবে, রায়ের মাধ্যমে দেশবাসী তাদের নেতৃত্ব বাছাই করে নেবে এটাই রাষ্ট্র পরিচালনার স্বাভাবিক পদ্ধতি। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদীদের নখরে ফ্যাসিবাদীদের জয়ধ্বনিতে বাংলাদেশের রাজধানী থেকে শুরু করে অজপাড়াগাঁয়েও এর আঁচড় লেগেছিল। যে কারণে একটি অনাকাঙ্খিত পরিবেশ তৈরি হলো। যার মাধ্যমে পরবর্তীতে সাজানো নির্বাচন প্রত্যক্ষ করল সমগ্র জাতি।

আওয়ামী লগি-বৈঠার নির্মম আঘাত!

খুন করে ঘটনাস্থল থেকে লাশ চুরি করে অপরাজনীতি করার মতো নির্লজ্জ ইতিহাস উপহার দিতেও আওয়ামী লীগ কুণ্ঠিত হয়নি। পাতানো নির্বাচনের মাধমে কুৎসিত ফ্যাসিবাদীদের চেহারা পুনরায় প্রকাশ করল আওয়ামী লীগ। সারাদেশে ইসলামপন্থীদেরকে নানা অভিযোগে দমনের ভয়ঙ্কর ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো চলতি অবৈধ সরকার। সত্যপন্থীদের জীবন দিয়ে হলেও আন্দোলনের সুরক্ষার তীব্রতায় দিশেহারা হয়ে আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে একটি স্পর্শকাতর কথিত ‘যুদ্ধাপরাধ’ ইস্যু এনে ঘায়েল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল ক্ষমতাসীন নীলনকশার সরকার! সেদিন ২৮শে অক্টোবরের কালো অধ্যায় রচনাকারীদের স্বপ্নসাধ সাময়িকভাবে বাস্তবায়ন হলেও শহীদের সাথীরা রক্তের বদলা নিতে কফিন ছুঁয়ে দ্বীনি আন্দোলনের কাজ পূর্ণোদ্যমে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দীপ্তশপথ গ্রহণ করেন। 

২৮শে অক্টোবর দেশ ও ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশবিশেষ

জাতীয় নেতৃবৃন্দের মন্তব্যে বোঝা যায়, ২৮শে অক্টোবর ছিল দেশ ও দেশে ইসলামী অগ্রযাত্রার বিরুদ্ধে ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের অংশবিশেষ। জনাব মরহুম মাওলানা মুফতি ফজলুল হক আমিনী বলেছিলেন, “কোন সভ্য দেশে এই ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটতে পারে না। এ ধরনের ঘটনার নজির বিশ্বের কোথাও নেই। এই ঘৃণ্য ঘটনা সারা বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন করেছে। বিবেকবান কোন মানুষ তা মেনে নিতে পারে না। এই নৃশংস বর্বরতাকে সবসময় ঘৃণা করা ও প্রতিহত করার মানসিকতা নিয়ে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। আর এর একমাত্র পথ হলো ইসলামী চিন্তাচেতনা মানুষের মধ্যে জাগ্রত করা।”

জনাব শফিউল আলম প্রধান বলেছিলেন, “আমি এটাকে শুধু কালো অধ্যায় বলব না, বরং আমাদের অর্জিত স্বাধীনতা হরণের চক্রান্ত শুরু করে, লাখো শহীদের রক্তের কেনা বাংলাদেশের আজাদি হরণের চক্রান্ত। সুতরাং এটা শুধু কালো অধ্যায় নয়, এটা কালো অধ্যায়ের চেয়েও ভয়াবহ।”

জনাব মরহুম মাওলানা মুহিউদ্দীন খান বলেন, “২০০৬ সালের ২৮শে অক্টোবর বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায়। শুধু এ দেশে নয়, বরং গোটা বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি জঘন্য ও বর্বর ঘটনা। ঐ দিন আওয়ামী লীগ দিনে-দুপুরে লগি-বৈঠা দিয়ে রাস্তায় প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড চালায়। কারো ইঙ্গিতে ক্ষমতার পালা বদল করার জন্য পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে। আমি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি আখেরাতে তারা এর প্রতিদান পাবেন। কারণ আল্লাহই একমাত্র সাক্ষী, কুরআনের আয়াতগুলো বারবারই আমার হৃদয়ে দাগ কাটে, ‘‘ঐ ঈমানদারদের সাথে ওদের দুশমনি ছাড়া অন্য কোনো কারণ ছিল না যে, তারা এমন আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল, যিনি মহাশক্তিমান ও যিনি কারো প্রশংসার ধার ধারেন না।” (সূরা বুরুজ : ৮) সুতরাং তাদের সাথী ভাইদের হারানোর কিছুই নেই। তাদেরকে আরো সতর্ক থাকতে হবে। যেখানে আইন ও সুবিচার নেই সেখানে সতর্কতা ও বিচক্ষণতার বিকল্প নেই। কিন্তু কাজ চালিয়ে যেতে হবে। আল্লাহর রাস্তায় যারাই কাজ করে তারা পরিণামের পরোয়া করে না। কারণ, পরিণাম আল্লাহরই হাতে, সাহাবায়ে কেরাম (রা)-এর জীবনী থেকে আমরা এই শিক্ষাই পাই।”

বিএনপি মহাসচিব জনাব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “পল্টনে লগি-বৈঠা দিয়ে যে মানুষ হত্যা করা হয়েছিল, সেটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি কলঙ্কময় অধ্যায়, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই এবং দুঃখজনকভাবে লগি-বৈঠা নিয়ে আসতে বলেছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং এই নির্দেশ দিয়ে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সন্ত্রাসের একটি কালো অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন। তার মাশুল শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে দিতে হয়েছে এবং আমরা দেখেছি সেই কারণেই কিন্তু পরবর্তীতে দেশে একটি রাজনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছিল যার ধারাবাহিকতায় একটি অসাংবিধানিক কেয়ারটেকার সরকার দেশের ওপর চেপে বসেছিল।”

২৮শে খুনীদের বিচার হয়নি

দেখতে দেখতে প্রায় ১১ বছর ফুরিয়ে গেল। ২৮শে অক্টোবরে খুনি অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে মামলা-মোকদ্দমা থেকে বেকসুর খালাস পেয়েছে। খুনিদের বিচারতো দূরের কথা উল্টো সেদিন যাদেরকে হত্যা করা হয়েছিল তাদের পরিবার ও সহকর্মীদের মাথার উপর এখনো মিথ্যা মামলার খড়গ। এমন বিচারহীনতার কারণে দেশে প্রতিদিন খুনখারাবি বেড়েই চলছে। নতুন নতুন জজমিয়া নাটক মঞ্চস্থ করা হচ্ছে। সভ্য কোন সমজ এভাবে চলতে পারেনা।

সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার চিরন্তন সংঘাত

সত্য-মিথ্যা কখনো এক হতে পারে না, আলো-আঁধার যেমন এক নয়। রাসূলে আকরাম (সাঃ) যখন আরবের নাস্তিক্যবাদের সামনে প্রকৃত সত্য হাজির করেছিলেন আবু জাহেল-আবু লাহাবরা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেছিল; রাসূল (সা)কে হত্যার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছিল। ঠিক আধুনিক যুগে নব্য আবু জাহেলরা দেশে দেশে সত্য প্রতিষ্ঠিত হোক, মিথ্যা বানের পানির মতো ভেস্তে যাক তারা তা মেনে নিতে পারছে না। কুরআনে সত্য ও অসত্যপন্থীদের পথপরিক্রমার বর্ণনা এভাবেই দেয়া হয়েছে, “যারা ঈমান এনেছে তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে, আর যারা কুফরি করেছে তারা তাগুদের পথে লড়াই করে। তাই শয়তানের সাথীদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাও। জেনে রাখ, শয়তানের চক্রান্ত বড়ই দুর্বল।” (সূরা নিসা : ৭৬) সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার চিরন্ত সংঘাত পৃথিবীর দিগি¦দিকে ঘটছে, অনাগত ভবিষ্যতে ঘটতে থাকবে। এটাই চিরন্তন এটাই বাস্তব।

আদর্শ কখনো মরে না

ইসলাম একটি কালজয়ী আদর্শের নাম, যা আজো সমহিমায় বিশ্বব্যাপী মাথা উঁচু করে আছে। যদিওবা ইহুদি, খৃষ্টান ও জায়নবাদীরা নানা চক্রান্তের মাধ্যমে এর আলোক দ্যুতিকে নিভিয়ে দিতে চেয়েছে। এই আদর্শকে যদি ইসলামবিদ্বেষীরা পরাস্ত করতে পারত তাহলে বদর, ওহুদ, খন্দক ও কারবালায় সংঘটনের পরও পারত। কিন্তু প্রতিটি বদর থেকে কারবালায় মুসলমানরা শাহাদাতের নব চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ইসলামী চেতনা বুকে লালন করে সম্মুখে দ্বিধাহীনচিত্তে এগিয়ে চলছে। এই আদর্শ এমন একটি চেতনার নাম, আদর্শের ধারকদের হত্যা করা যায় কিন্তু আদর্শকে হত্যা করা যায় না, আদর্শ কখনো মরে না।

আমীরে জামায়াত জনাব মকবুল আহমাদ ২৮শে অক্টোবরের বিয়োগান্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে বলেছিলেন, “আল্লাহ যাদের শহীদ হিসেবে কবুল করেন তারাই সৌভাগ্যবান। জীবন-মৃত্যুর ফয়সালা আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়। শাহাদাতের মৃত্যু সবচাইতে মর্যাদাবান মৃত্যু। এ মৃত্যু সকলেরই কামনা করা উচিত। ইসলামের দুশমনেরা এ হত্যাকান্ড চালিয়ে ইসলামী আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা পারেনি এবং ভবিষ্যতেও পারবে না ইনশাআল্লহ।”

২৮শে অক্টোবর আমাদের ধমনিতে, রক্তে, শিরায়-উপশিরায় ইসলামবিদ্বেষী ক্ষমতান্ধদের বিরুদ্ধে প্রচ- এক দ্রোহের নাম। যে ইতিহাস খুনিদের বিরুদ্ধে কাল থেকে কালান্তেের ঘৃণা ছড়াবে, যে ইতিহাস বাতিলের কাছে শির নত না করে জীবন বিলিয়ে দিয়ে দ্বীনের মর্যাদা রক্ষায় অনুপ্রেরণা জোগাবে। আজ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে কারবালার মতো নিষ্ঠুরতা চলছে। অক্টোবর বা মে’র বিয়োগান্ত ঘটনা প্রবাহ শুধু আমাদের দেশে ঘটে চলছে তা নয়; বরং আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, ইরাক, সিরিয়া, মিয়ানমার লেবাননসহ বিভিন্ন স্থানে মুসলমানরা একদিকে এজিদের অনুসারী সরকার প্রধান এবং অন্য দিকে কোথাও কোথাও কাফির, মুশরিক ও ইহুদিদের হাতে চরমভাবে নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত হচ্ছে। সেই শোককেই আজ আমাদের শক্তিতে পরিণত করতে হবে। সেই ঈমানী শক্তির বলেই আমরা বলীয়ান হয়ে পরাজিত করব সকল অন্যায় জুলুমাতকে। 

লেখক : সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

[email protected]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ