ঢাকা, শুক্রবার 28 October 2016 ১৩ কার্তিক ১৪২৩, ২৬ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কবি ফররুখ আহমদ-এর ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন

কালজয়ী কবি ফররুখ আহমদ-এর ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন উপলক্ষে ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশনের আয়োজনে ১৯ অক্টোবর ২০১৬, বুধবার, বিকাল ৫টায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে (বাংলামোটর, ঢাকা) এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক মুহাম্মদ মতিউর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট প্রবীণ সাংবাদিক আলমগীর মহিউদ্দিন, সম্পাদক দৈনিক নয়া দিগন্ত। বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন ডক্টর মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ, সাবেক চেয়ারম্যান, এনবিআর ও বিশিষ্ট লেখক ও কূটনীতিক ডক্টর মুহম্মদ সিদ্দিক। স্বাগত ভাষণ প্রদান করেন প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক মুহাম্মদ আব্দুল হান্নান। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট ফয়জুল কবির, বিশিষ্ট কথাশিল্পী মাহবুবুল হক, কবিপুত্র আহমদ আখতার, সৈয়দ ওহিদুজ্জামান বাচ্চু ও বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম। কবির কবিতা থেকে আবৃত্তি, কবি ফররুখকে নিবেদিত স্বরচিত কবিতা পাঠ ও গান পরিবেশন করেন বিশিষ্ট কবি-শিল্পী ও আবৃত্তিকারগণ।
প্রধান অতিথি তাঁর ভাষণে বলেন, ১৩৫০ এ দুর্ভিক্ষের সময় তাঁর লেখা ’লাশ’ ও অন্যান্য কবিতায় তিনি মানবতার জয়গান গেয়েছেন। কবি ফররুখ আহমদ শুধু মুসলিম রেনেসাঁর কবি নন, তিনি এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কবি। অনেকে ফররুখ আহমদকে মুসলিম রেনেসাঁর কবি বলেন। কিন্তু আমি বলি তিনি মানুষের কবি। এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের কবি, যেহেতু এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম, সে হিসাবে তিনি মুসলিম রেনেসাঁর কবি। ইসলামের মূল বাণীকে তিনি মানবতার বাণী বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মুসলমানদের দুর্দিনে কখনো কখনো মেসেঞ্জারের মতো কিছু কবি এসেছেন। তাঁরা কিছু মেসেজ দিয়ে গেছেন, জাতিকে পথ বাতলে দিয়ে গেছেন। কবি নজরুল ইসলাম, আল্লামা ইকবালের মত ফররুখও তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি বলেন, নজরুলের পরে এসে তিনি নজরুলের মতই মুসলিম জাতিকে ঐকব্যদ্ধ করে গেছেন। তিনি বলেন, আজ এ মুহূর্তে নজরুল ও ফররুখ সম্পর্কে আলোচনা করা এবং আমাদের তাঁদের মেসেজ অনুধাবন করে জাতিকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। মানবতার এ মহান কবিকে ‘নকিব’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখন ফররুখের মতো আরেক কবির দরকার। বাংলাদেশে মুসলমানদের যে আত্মবিস্মৃতি ঘটেছে তা থেকে যেন তারা ফিরে আসতে পারে। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে পাঠ্যপুস্তকে ইসলাম সম্পর্কে ভালো লেখকদের লেখা বাদ দিয়ে অন্য লেখা দেয়া হচ্ছে। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, তবে কি ৯২ শতাংশ মুসলিমের নকিবের লেখা আমরা ছাপাবো না? নৈতিকতাহীনতাকে আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের দেশে এখন সত্য কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং সত্য বললে লাভ হবে কি না সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ অতিথি ড. আব্দুল মজিদ বলেন, ফররুখ আহমদ একজন আধুনিক ভাবধারার কবি। নজরুলের পরে ইসলামি ঐতিহ্য ও ভাবধারাকে আধুনিক শিল্পসম্মতভাবে তুলে ধরেন ফররুখ আহমদ। তিনি আমাদের আদর্শ ও ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছেন। ফররুখ আহমদ একজন শিল্প-সচেতন প্রতিভাবান আধুনিক কবি। সমকালে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল অসাধারণ। তাঁর জীবনকালে তিনি ছিলেন কবিদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য। তাঁর ব্যক্তিত্ব যেমন ছিল তীক্ষè, তেমনি তাঁর কবিতা ছিল প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত ও ওজস্বিতাপূর্ণ। বর্তমানে আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে একধরনের উন্নাসিকতা ও নৈরাজ্য বিরাজ করছে। আমাদের দীর্ঘ লালিত আদর্শ-ঐতিহ্য থেকে এখন আমরা বহুলাংশে বিচ্যুত। শিকড়হীন পরগাছার মতো আমরা ভিন্ন আদর্শ ও বিজাতীয় অপসংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে একধরনের অবক্ষয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছি। এক্ষেত্রে ফররুখ আহমদের চর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফররুখের আদর্শের প্রতি দৃঢ় আস্থা, ঐতিহ্য-সংলগ্নতা ও বলিষ্ট জীবন-চেতনা আমাদেরকে আত্মমর্যাদাশীল স্বাধীন জাতি হিসাবে গড়ে উঠতে সাহায্য করতে পারে। তাই ফররুখ আজ আমাদের একান্ত প্রাসঙ্গিক ও অপরিহার্য কবি হিসাবে বিবেচিত হতে পারে।
বিশেষ অতিথি ডক্টর মুহম্মদ সিদ্দিক বলেন, পৃথিবীর মহান ব্যক্তিগণ সকলেই ছিলেন অস্তিবাদী। ঈসা আ. বা যীশু খ্রীষ্ট তিনি ছিলেন আল্লাহর নবী ও রাসূল। তিনি একত্ববাদ প্রচার করে গেছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর অনুসারীগণ তাঁর উপর নাযিলকৃত ঐশী গ্রন্থ বিকৃত করে ত্রিত্ববাদের প্রচার করেছে। সমগ্র খ্রীষ্টান জাতি সে ভ্রান্ত ধারণা আজ বহন করে চলেছে। গৌতমবুদ্ধও একত্ববাদ প্রচার করেছিলেন। তিনি মূলত প্রতিমাপূজা ত্যাগ করে সত্য ও মানবতার আদর্শ প্রচার করে গেছেন। কিন্তু তাঁর অনুসারীরা তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে মূর্তিপূজার প্রচলন করে। যে গৌতমবুদ্ধ ছিলেন প্রতিমাপূজার ঘোর বিরোধী, তাঁরই মূর্তি বানিয়ে তাঁর অনুসারীরা মূর্তিপূজার প্রচলন করেছে। হিন্দুধর্মেও ‘এক মেবাদ্বিতীয়াম’ অর্থাৎ এক ঈশ্বরের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এক ঈশ্বরের বদলে তারা তেত্রিশ কোটি দেব-দেবীর পূজার প্রচলন করেছে। একমাত্র ইসলাম একেশ্বরবাদী চেতনার ধারক, বাহক ও প্রচারক। কবি ফররুখ এ একেশ্বরবাদী চিন্তাধারার বলিষ্ট ধারক হিসাবে তাঁর কবিতায় মানবতার জয়গান গেয়েছেন।
এডভোকেট ফয়জুল কবির তাঁর বক্তৃতায় বলেন, একমাত্র রিভিল্ড বা প্রত্যাদিষ্ট জ্ঞানই মানুষকে সত্য, সুন্দর, কল্যাণ ও মানবতার পথে পরিচালিত করতে সক্ষম। কবি ফররুখ আহমদ সেই রিভিল্ড জ্ঞানের ধারক-পোষক ছিলেন। তিনি তাঁর কাব্যের পুষ্পিত ভা-ার সাজিয়েছেন সে চিরায়ত জ্ঞানের আলোকে। তাই তাঁর কাব্যে চিরন্তন-শাশ্বত-সত্য ও মানবতার কল্যাণময় আদর্শের পরিস্ফূটন ঘটেছে। কথাশিল্পী মাহবুবুল হকও তার আলোচনায় ফররুখকে প্রত্যাদিষ্ট জ্ঞানের বলিষ্ঠ ধারক ও বাহক হিসাবে আখ্যায়িত করে বাংলা কাব্যে তাঁর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পরিচয় তুলে ধরার প্রয়াস পান।
সভাপতির ভাষণে অধ্যাপক মতিউর রহমান বলেন, ফররুখ আহমদ তাঁর সমকালে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি হিসাবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর নিজস্ব কাব্যভাষা, শিল্পনিপুণ নির্মাণ কৌশল ও বলিষ্ট মানবতাবাদী চেতনা বাংলাকাব্যে তাঁকে এক অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তিনি শুধু কবি নন, কবিদের কবি, যাঁকে বলা যায়, শিল্পীকবি। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত চিন্তা-চেতনাকে কাব্যে এমনভাবে প্রকাশ করেছেন, যা তাঁর স্বজাতির চিন্তা-চেতনা ও স্বপ্ন-কল্পনায় পুষ্পিত রূপ লাভ করেছেন। তিনি বলেন, ১৯৯৮ সালে ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কবির উপর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবছর কবির জন্ম ও মৃত্যদিবস উপলক্ষে দু’টি করে সেমিনার ও ফররুখ একাডেমি প্রত্রিকা প্রকাশ করার মাধ্যমে ফররুখ আহমদের চর্চাকে ব্যাপক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, দেশের বিশিষ্ট লেখক-গবেষকদের ফররুখ চর্চায় সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত যথেষ্ট সফলতা অর্জন করেছে। ফররুখ আহমদের ‘সাত সাগরের মাঝি’, ‘সিরাজুম মুনীরা’ কাব্যসহ ফররুখের নির্বাচিত কবিতার ইংরাজি অনুবাদ প্রকাশ ও বিদেশীদের নিকট তা প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে আমাদের নানা সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা প্রয়োজনীয় আরো অনেক কাজ করতে সক্ষম হইনি। আশা করি, ভবিষ্যতে সকলের আন্তরিক সহযোগিতা পেলে আমরা ধীরে ধীরে ফররুখ চর্চার ক্ষেত্রে আরো অনেক দূর অগ্রসর হতে পারবো।
তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করনে যে, আর মাত্র দু’বছর পর ২০১৮ সালে ফররুখের জন্মশতবার্ষিকী। জন্মশতবার্ষকী যথাযোগ্যরূপে পালনের জন্য তিনি সরকারি-বেসরকারী বিভিন্ন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতি কর্মসূিচ গ্রহণের আহ্বান জানান
-আহমাদুর রহমান

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ