ঢাকা, শনিবার 29 October 2016 ১৪ কার্তিক ১৪২৩, ২৭ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

শেভরনের ১৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ কেনার উদ্যোগ পেট্রোবাংলার

  • বাংলাদেশ ছাড়ছে কোম্পানিটি

কামাল উদ্দিন সুমন : বাংলাদেশ থেকে চলে যাচ্ছে বহুজাতিক কোম্পানী শেভরন। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দরপতনে বিশ্বব্যাপী লোকসানে পড়েছে এমন অজুহাতে শেভরণ এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। লোকসান কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে সম্পদ বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে এখানের সম্পদ ও স্বার্থ বিক্রির খরিদ্দার খুঁজছে। যথাযথ অর্থ পেলেই বিক্রি করে চলে যাবে। শেভরন বর্তমানে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বিদেশী বিনিয়োগ করা কোম্পানি। দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস ক্ষেত্র জালালাবাদ, মৌলভী বাজার ও বিবিয়ানা পরিচালনা করে তারা। বাংলাদেশে তাদের প্রায় ২০০ কোটি ডলার বা প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের সম্পদ রয়েছে। 

শেভরন বাংলাদেশের ব্যবস্থাপক শেখ জাহিদুর রহমান বলেন, আকর্ষণীয় দাম পাওয়ার উপরে এবিষয়ে সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে। এই মুহূর্তে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে বিক্রির বাণিজ্যিক আলোচনা চলছে। সুবিধামতো ও আকর্ষণীয় দর পেলে শেভরণের স্বার্থ বিক্রি করা হবে। 

তবে শেভরনের সম্পদ কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে পেট্রোবাংলা। শেভরন পরিচালিত তিনটি গ্যাসক্ষেত্র কিনতে চায় সংস্থাটি। এজন্য লাভ লোকসানের হিসাব করছে পেট্রোবাংলা। হিসাব যথার্থ করার জন্য পরামর্শক নিয়োগ দেয়ারও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ইসতিয়াক আহমেদ বলেন, সম্পদ, বিনিয়োগ, সক্ষমতা ইত্যাদি বিষয় পর্যালোচনা করেই এবিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কত গ্যাস আছে, কত দিন চলবে, পরিচালন খরচ কত, দীর্ঘ মেয়াদে লাভজনক হবে কিনা, পেট্রোবাংলার উপর বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ আসবে কিনা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করেই এবিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তিনি বলেন, এটা শুধু পেট্রোবাংলার সিদ্ধান্ত নয়। সরকারেরও সিদ্ধান্ত। সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে পেট্রোবাংলা সেটা বাস্তবায়ন করবে।

সূত্র জানায়, লোকসান কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে সম্পদ বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে শেভরন। বাংলাদেশে থাকা তাদের প্রায় ২০০ কোটি ডলার বা প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের সম্পদ বিক্রি করতে চাইছে। বাংলাদেশের সম্পদ ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের সম্পদ বিক্রি করতে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানা গেছে।

সংশি¬ষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে থাকা সম্পত্তি বিক্রির জন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগ দিয়েছে শেভরন। এরই মধ্যে একাধিক দেশি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠান তাদের সম্পদ কেনার আগ্রহ দেখিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দরপতনে বিশ্বব্যাপী লোকসানে পড়েছে বলে শেভরণ এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলে জানা গেছে। 

সূত্র জানায়, বাংলাদেশে বর্তমানে মোট গ্যাসের অর্ধেকের বেশি শেভরন উত্তোলন ও সরবরাহ করে। উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি (পিএসসি) করে জালালাবাদ, মৌলভীবাজার ও বিবিয়ানা তিনটি গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনা করছে। বুধবার শেভরন তিন ক্ষেত্র থেকে ১৫৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করেছে। আর এদিন দেশে মোট গ্যাস উৎপাদন হয়েছে ২৭৪ কোটি ঘনফুট।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, শেভরনের গ্যাসের উৎপাদন গত দুই বছর কমেছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছর শেভরন প্রায় চার হাজার ৬০০ কোটি টাকার গ্যাস পেট্রোবাংলাকে বিক্রি করেছে। যা ২০১৫-১৬ সালে এসে তা কমে হয়েছে চার হাজার কোটি টাকা। চলতি বছর এখন পর্যন্ত বিক্রি করেছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার গ্যাস। এই তিন গ্যাসক্ষেত্রে এক বছরের ব্যবধানে শেভরনের বিনিয়োগ কমেছে ১৯ শতাংশ। এ তিন ক্ষেত্রে ২০১৪ সালে শেভরন খরচ করেছে ৪১ কোটি ২৯ লাখ ডলার। ২০১৫ সালে করেছে ৩৩ কোটি ৫৬ লাখ ডলার। অন্যদিকে, ২০১৩ সালে খরচের পরিমান ছিল ৪৮ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। এ হিসাবে দুই বছরে বাংলাদেশে শেভরনের বিনিয়োগ কমেছে ২২ কোটি ৮৯ লাখ ডলার।এদিকে, বর্তমানে বাংলাদেশে শেভরনে দুই হাজার জনবল আছে। এর মধ্যে স্থায়ী, অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক জনবল আছে। গত একবছরে নতুন করে আর চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের নবায়ন করেনি শেভরন। চুক্তি নবায়ন না করায় বিভিন্ন সময় আন্দোলনের মুখে পড়তে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে। সেসব অবস্থা কাটিয়ে তারা বর্তমানে ঢাকাসহ গ্যাসক্ষেত্রের কার্যালয়গুলোতে খরচ কমানোর বিষয়ে নানা উদ্যোগ নিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শেভরনের বাংলাদেশ থেকে চলে যাওয়ার খবরের পর পেট্রোবাংলা পর্যালোচনা করার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রয়োজনে বিদেশী পরামর্শক দিয়ে শেভরনের সম্পদ পর্যালোচনা করবে। যদিও পেট্রোবাংলার কাছে বাংলাদেশের সকল বিদেশী গ্যাস কোম্পানি তাদের সার্বক্ষণিক হিসাব জমা দিতে বাধ্য থাকে। যৌথ কমিটির অনুমোদন ছাড়া বিনিয়োগ করতে পারে না। গ্যাসের হিসাবও দিতে বাধ্য থাকে।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তির এই গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা পেট্রোবাংলার নেই। শেভরনের তিন ক্ষেত্র কিনে নিলেও তা পরিচালনা করার জন্য বিদেশীদের দারস্থ হতে হবে। এজন্য সে খরচও বিবেচনায় আনতে হবে। তবে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি লিমিটেড, সিলেট গ্যাস ফিল্ড লিমিটেড ও বাপেক্স দেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনা করছে।

উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি (পিএসসি) করে জালালাবাদ, মৌলভীবাজার ও বিবিয়ানা তিনটি গ্যাসক্ষেত্রে পরিচালনা করছে। এগুলো যথাক্রমে ১৯৮৯, ১৯৯৭ ও ১৯৯৮ সালে গ্যাস ফিল্ড আবিষ্কার হয়েছে। যে হারে গ্যাস তোলা হচ্ছে, আর যে পরিমাণ নিশ্চিত মজুদ আছে তাতে আগামী ১০ বছরে এই তিন ক্ষেত্রর বর্তমান নিশ্চিত মজুদ গ্যাস শেষ হয়ে যাবে।

এই তিন গ্যাসক্ষেত্রে নিশ্চিত, সম্ভাব্য ও সম্ভাবনা মিলিয়ে প্রায় ১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদ আছে। এরমধ্যে বিবিয়ানাতে আছে আট ট্রিলিয়ন ঘনফুট। মৌলভীবাজার ও জালালাবাদে দেড় টিসিএফ করে মজুদ আছে। এরমধ্যে নিশ্চিত মজুদ আছে তিন দশমিক আট ট্রিলিয়ন ঘনফুট। বিবিয়ানাতে নিশ্চিত মজুদ আছে তিন দশমিক ৪৮ টিসিএফ, মৌলভীবাজারে ১৪৬ বিসিএফ ও জালালাবাদে ১৮৯ বিসিএফ গ্যাস। এপর্যন্ত তিন ক্ষেত্র থেকে গ্যাস তোলা হয়েছে সাড়ে তিন টিসিএফ গ্যাস। বিবিয়ানা থেকে গ্যাস তোলা হয়েছে দুই দশমিক ২৭০ টিসিএফ, মৌলভীবাজার থেকে ২৮২ বিসিএফ এবং জালালাবাদ থেকে ৯৯৫ বিসিএফ গ্যাস। 

বর্তমানে বিবিয়ানা থেকে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে গড়ে ১২৪ কোটি ঘনফুট, যা বাংলাদেশে মোট গ্যাস উৎপাদনের ৪০ ভাগ। জালালাবাদ থেকে ২৭ কোটি ঘনফুট, যা মোট উৎপাদনের ১০ ভাগ এবং মৌলভিবাজার থেকে চার কোটি ঘনফুট গ্যাস, যা মোট উৎপাদনের দুই শতাংশ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ