ঢাকা, শনিবার 29 October 2016 ১৪ কার্তিক ১৪২৩, ২৭ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সমাজের সর্বাত্মক পচন

আশিকুল হামিদ : বাংলাদেশে মাদকের আগ্রাসন যে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে সেকথা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন আর কোনো লুকোচুরির ব্যাপার নেই, সবাই প্রকাশ্যেই মাদক সেবন করে- তা সেটা হেরোইন বা ফেন্সিডিল হোক কিংবা হোক না ইয়াবার মতো ভয়ংকর কোনো নেশার সামগ্রী। ওষুধের দোকানে তো বটেই, নেশার সামগ্রীগুলো পাওয়া যায় এমনকি পান ও সিগারেটের দোকানেও। অথচ আমাদের ছোট বেলায়, ১৯৬০-এর দশকে কলেজ পড়ুয়া বড় ভাই এবং তার বন্ধু ও সমবয়সীদের দেখতাম লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেট খেতে। হঠাৎ আমাকে বা আমার বন্ধুদের দেখলেও তারা সিগারেট লুকিয়ে ফেলতেন। সূর্যের আলোতে সিগারেটের ধোঁয়া বরং আরো উজ্জ্বল ও স্পষ্ট হয়ে উঠতো। ফলে লুকিয়ে কোনো লাভ হতো না। আমরা বরং লুকোনোর সে ব্যর্থ চেষ্টাকে উপভোগ করতাম। এরপর আমার কাজই ছিল বাসায় ফিরে আম্মাকে জানিয়ে দেয়া। আম্মা ভাইকে ধমক দিতেন, শাসন করতেন। অন্যদিকে আমার ভাগ্যে জুটতো উত্তম-মধ্যম। তখনও ‘ধূমপানে বিষপান’ ধরনের প্রচারণা তেমনভাবে শুরু হয়নি। বিষয়টিকে সেকালে সামাজিকভাবে অত্যন্ত খারাপ মনে করা হতো। সে কারণে মুরুব্বিদের সামনে তো বটেই, আমার মতো কিশোর-বালকদের সামনেও কলেজগামী বড় ভাইয়েরা সিগারেট খেতেন না। অনেকে শুধু সিগারেট খাওয়ার জন্যই বিকেলে বা সন্ধ্যায় শহরের বাইরে খোলা কোনো জায়গায়, গ্রামের দিকে চলে যেতেন, যাতে সহজে কারো চোখে না পড়তে হয়। এখন অবশ্য অবস্থার অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। আমি নিজেও মুরুব্বির পর্যায়ে পৌঁছে গেছি। এতে তাই বলে লাভ হয়নি। কারণ, আগে মুরুব্বিদের দেখলে ছোট বা কমবয়সীরা সিগারেট লুকাতো, আজকাল মুরুব্বিরাই এমনভাবে অন্যদিকে তাকিয়ে ও পাশ কাটিয়ে চলেন যেন তারা কিছু দেখতে পাননি! আমাকেও মাঝেমধ্যে এমন অবস্থায় পড়তে হয়। 
এত কথার আসল কারণ সম্পর্কে সম্ভবত বিস্তারিত জানানোর দরকার পড়ে না। শুরুতে একটি তথ্য জানিয়ে নেয়া যাক। এই মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তির পরিচিতি জানতে চাইলে যে কেউ নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম বলবেন। সেই তিনিও সম্প্রতি একটি ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তীব্র ক্ষোভের সঙ্গে প্রশ্ন করেছেন, ‘কেউ মেয়েটিকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলো না। কেন মানবিক মূল্যবোধগুলো হারিয়ে গেলো?’ পাঠকরা সম্ভবত বুঝতে পেরেছেন, ঠিক কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রশ্নটি করেছেন। চলতি মাস অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সিলেটে কলেজ ছাত্রী খাদিজাকে চাপাতি দিয়ে গুরুতররূপে আহত করেছে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী নেতা বদরুল আলম। কারণ ছিল প্রেম প্রত্যাখ্যান। কলেজ প্রাঙ্গণে চাপাতি দিয়ে খাদিজাকে কোপানোর দৃশ্য অনেকেই দেখেছে, দু’চারজন আবার মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় দৃশ্যটি ধারণ করে ফেসবুকসহ ইন্টানেটে ছড়িয়েও দিয়েছে। কিন্তু কেউই মেয়েটিকে বাঁচাতে এগিয়ে যায়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভের কারণও সেটাই। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের আলোচনায় কিন্তু এগিয়ে না যাওয়ার কারণ সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবেই জানা গেছে। কারণটি হলো, সিলেটের ওই সন্ত্রাসী বদরুল ছাত্রলীগের একজন ‘সোনার ছেলে’! তাকে বাধা দেয়ার বা প্রতিহত করতে যাওয়ার পরিণতি কতটা ভয়ংকর হতে পারে- সে সম্পর্কে ধারণা রয়েছে সবারই। সেজন্যই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হলেও কেউই সাহস করে মেয়েটিকে বাঁচাতে যায়নি।
সিলেটের মতো এবং তার চাইতেও ভয়ংকর অনেক ঘটনা কিন্তু সারা দেশেই ঘটে চলেছে। যেমন খাদিজার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ঝিনাইদহে এক স্কুল ছাত্রীকে ছুরি দিয়ে কুপিয়েছে এক বখাটে যুবক। এর পরপর প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া না দেয়ায় গাজীপুরের কুতুবদিয়ায় মুন্নি আক্তার নামের এক স্কুল ছাত্রীকে তার নিজের বাসায় শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে এক বখাটে। এরও পাঁচদিন আগে দিনাজপুরে পাঁচ বছরের এক শিশুকে অপহরণের পর ধর্ষণ করা হয়েছে। গত ২২ অক্টোবর রাজধানীর দক্ষিণখানে বাসায় ঢুকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে স্বজনদের সামনেই এক কিশোরীকে ধর্ষণ করেছে একদল দুর্বৃত্ত। এর পরের রাতে পুরনো ঢাকার লালবাগে নিজের বাসায় এক নারীকে ধর্ষণ করেছে তিন বখাটে যুবক। একই দিন ধামরাইয়ের কাতরবাইল্যা গ্রামে বাসায় ঢুকে ষষ্ঠ শ্রেণীর এক ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছে স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। খাদিজার পর মাত্র দু’সপ্তাহের মধ্যে রাজধানীর মিরপুরে দুই কলেজ ছাত্রীর ওপর হামলা চালিয়েছে বখাটেরা। একই দিন মুন্সিগঞ্জে হামলার শিকার হয়েছে একজন স্কুল ছাত্রী। এভাবেই মেয়েদের ওপর একের পর এক হামলা চালানো হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বোঝানোর জন্য একজন জমির আলী সম্পর্কে বলতেই হবে। বছর বিশেক ধরে বহু কষ্টে উত্তরা সংলগ্ন এলাকায় ছোট্ট একটা বাড়ি বানিয়েছি। একতলা বাড়িটি এখনো ‘নির্মাণাধীন’ রয়েছে! লোকে বলে, আমি নাকি ‘ভুয়া’ সাংবাদিক। কারণ, আসলেও সাংবাদিক হলে অনেক আগেই সেখানে নাকি পাঁচতলা বাড়ি ‘কমপ্লিট’ হয়ে যেতো! সে যা-ই হোক, জমির আলী আমার সে বাড়ির কেয়ারটেকার। হাজার নয়, বিভিন্ন সময়ে লাখের অংকে টাকা গায়েব করেছে সে। খারাপ লাগলেও এবং ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কিছু করার ছিল না। করার চেষ্টাও করিনি কখনো। এ ব্যাপারে তার নিজের ভাই ও বউ-ছেলে-মেয়েসহ এলাকার সবাই জানে। সবাই আমাকে বোকাও বলে থাকে। আমি তবু জমির আলীকে বিদায় করিনি। কারণ, নতুন কোনো ‘জমির আলী’ আরো বেশি খারাপ ও ক্ষতিকর হতে পারে।
এবার আমার সে জমির আলীর কেচ্ছা শুনুন। সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় আগে গ্যাসের সংযোগ আনার কথা বলে ষাট হাজারের মতো টাকা নিয়েছিল সে। বলেছিল, কয়েক হাজার টাকা দালালকে দিতে হবে। তিতাসের লোকজনকে তো দিতে হবেই। এই টাকা নেয়ার জন্য দু’তিনবার আমার বাসায় এসেছিল জমির আলী। প্রতিবারই আমার স্ত্রীর চোখে তার চেহারায় এবং সাজ ও পোশাকে পরিবর্তন ধরা পড়েছে। তিনি আমাকে তার সন্দেহের কথা বলেছেনও। কিন্তু আমি বিশ্বাস করিনি। তিন-চার মাসের মধ্যে অবশ্য সবকিছু জানতে পেরেছিলাম। আমার স্ত্রীর অনুমানই সত্য ছিল। জমির আলী এর মধ্যে বিয়ে করেছিল। একটি বা দুটি নয়, পর পর খান চারেক! যার নিজের ছেলে ও মেয়ের ঘরে নাতি-নাতনি রয়েছে এমন কেউ এই বয়সে আবার বিয়ে করতে পারে এমনটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু আমার কষ্টে জমির আলীর কিছুই যায়-আসেনি। আমারও যেতো-আসতো না, যদি সে গ্যাসের জন্য নেয়া টাকা নয়-ছয় না করতো। কিন্তু একদিন হঠাৎ গ্যাসের স্থানীয় দালাল আমার অফিসে এসে হাজির। তাকে নাকি চুক্তি অনুযায়ী ৪০ হাজারের মধ্যে মাত্তরই ১৬ হাজার টাকা দিয়েছে জমির আলী। সে কারণে আমার বাসায় গ্যাসের সংযোগ দেয়া যাচ্ছে না।
জমির আলী কোথায় জানতে চাইলে দালাল নির্বিকারভাবে বলেছিল, সে তো মাস তিনেক ধরে জেলখানায়! কেন? তার প্রথম বউ নাকি মামলা ঠুকেছে। ওদিকে বাসার জন্য গ্যাস বলে কথা! বাকি ২৪-এর স্থলে পুরো ৩০টি হাজার টাকা গুণতে হলো আমাকে। দালাল চলে গেলো। কিছুদিনের মধ্যে বাসায় গ্যাসের সংযোগও এলো। কিন্তু বিলের বই পেলাম না। কারণ, ওই দালাল নাকি তিতাসের লোকজনকে চুক্তি অনুযায়ী তাদের পাওনা পরিশোধ করেনি। এবার আরো ২০ হাজার টাকার ধাক্কা। এর মধ্যে জমির আলী জেলখানা থেকে বেরিয়ে এসেছে। পাঁচ নম্বর বউ নিয়ে সুখে-শান্তিতে বসবাস করছে। নতুন স্ত্রীর মাধ্যমে একটা ছেলেও হয়েছে তার। ওদিকে স্থানীয় ওই দালালের কোনো খবর নেই। খোঁজ করতে গিয়ে জানলাম, জমির আলীর সঙ্গে তার এখন দহরম-মহরম চলছে। দু’জনই নাকি ইয়াবাসহ নানান মাদকের নেশা করে একসঙ্গে। আমার কাছ থেকে শুধু নয়, আরো অনেকের কাছ থেকেও তারা গ্যাসের কথা বলে টাকা নিয়ে মেরে দিয়েছে। কিন্তু কারো পক্ষেই কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, একে তো ইয়াবাখোর, তার ওপর আবার দু’জনই নাকি ক্ষমতাসীন দলের ‘নেতা’ এবং পুলিশের ‘সোর্স’ হয়ে বসে আছে! রসিকজনেরা প্রসঙ্গক্রমে জানালেন, ইয়াবার ‘তেজেই’ নাকি জমির আলী একের পর এক তরুণীদের বিয়ে করছে এবং ষাটের কাছাকাছি বয়সেও ঘোষণা দিয়ে বাপ হচ্ছে! গ্যাসের ওই দালালও নাকি নতুন নতুন বিয়ের ধান্দায় রয়েছে! বলা দরকার, বহুদিন বিভিন্ন সময়ে চেষ্টা করেও আমি কিন্তু দু’জনের কাউকেই খুঁজে পাইনি। দু’জনের মধ্যে শুধু জমির আলী একবার মোবাইলে আমাকে জানিয়েছিল, তার কাছে আমি নাকি কোনো টাকাই পাই না! অথচ গ্যাসের জন্য দেয়া টাকা তো বটেই, বাড়ি ভাড়ার সাত-আট মাসের টাকাও রয়েছে তার কাছে।    
ওপরে সংক্ষেপে একজন মাত্র জমির আলীর কেচ্ছা শোনানো হলেও বাস্তবে সমগ্র বাংলাদেশেই মাদকের এই আগ্রাসন ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সৃষ্টি হচ্ছে লাখ লাখ জমির আলীর। ছাত্র ও যুবকসহ জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশ এই আগ্রাসনের শিকারে পরিণত হয়েছে। রিকশাওয়ালা ও দিনমজুর থেকে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা পর্যন্ত সবাই এরই মধ্যে মাদকের কবলে পড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। ছাত্রী এবং মেয়েরাও পিছিয়ে নেই। তারাও ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চুটিয়ে নেশা করছে। সংবাদপত্রের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশকে হিসাবে রেখে ভারত এবং মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে মাদক তৈরির শত শত কারখানা। এসব কারখানায় হেরোইন ও ফেন্সিডিল থেকে ইয়াবা পর্যন্ত অসংখ্য নাম ও ধরনের বিপুল পরিমাণ মাদক দ্রব্য উৎপাদিত হচ্ছে। সীমান্তে নজরদারি না থাকায় এবং কিছু কিছু অঞ্চলে থাকলেও বিজিবি ও কোস্টগার্ডের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিংবা নগদ অর্থে ঘুষের বিনিময়ে সেগুলো সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশের ভেতরে চলে আসছে। মাদক ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে রাতারাতি পৌঁছে যাচ্ছে খোলা বাজারে। অবস্থা এমন হয়েছে যে, দেশে এখন বিভিন্ন নেশা ও মাদক সামগ্রীর ছড়াছড়ি চলছে। ওষুধের দোকানে শুধু নয়, এসব কিনতে পাওয়া যাচ্ছে এমনকি পানের দোকানেও। রাজধানীতে তো বটেই, প্রতিটি জেলা ও উপজেলা শহর থেকে গ্রামের হাট-বাজারে পর্যন্ত প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন নেশার সামগ্রী।
সত্যি বলতে কি, নেশার ভয়াবহ বিস্তার ঘটে এসেছে আসলে স্বাধীনতার পর থেকেই। বাজারে এসেছে নতুন নতুন নামের মাদক সামগ্রী। গাঁজা ও ভাঙের মতো সুদূর অতীত থেকে চলে আসা সামগ্রীগুলো আজকাল অচল হয়ে পড়েছে বলা যায়। পরিবর্তে পালাক্রমে এসেছে নতুন নতুন সামগ্রী। এই প্রক্রিয়ায় ভারতে তৈরি ফেন্সিডিলের পর প্রথমে শুনতে হয়েছিল হেরোইনের নাম। এরও প্রধান সরবরাহ এসেছে ভারত থেকেই। তারপর বছর সাত-আটেক আগে হঠাৎ শোনা গেছে ইয়াবার নাম। নেশার জন্য শুধু নয়, শরীরের অন্য কিছু বিশেষ চাহিদা পূরণের জন্যও ইয়াবা নাকি তুলনাহীন! ইয়াবা তাই বাজার পেয়েছে রাতারাতি, ‘জনপ্রিয়’ও হয়ে উঠেছে! ইয়াবার চালান এবং এ ধরনের প্রচারণার সঙ্গে বিশিষ্ট কোনো কোনো ব্যবসায়ী এবং তাদের ভাই-ভাতিজাদের নামও শোনা গেছে। অভিযুক্তদের কেউ কখনো জেলখানায় থাকেন, চিকিৎসার নামে হাসপাতালে রাজকীয় জীবন উপভোগ করেন। কখনো আবার বেরিয়ে এসে মুক্ত হাওয়া সেবন করেন। সরকার, পুলিশ এবং প্রশাসনের সঙ্গে তাদের যোগসাজশ সম্পর্কেও শোনা যায় মাঝেমধ্যেই। সম্ভবত সে কারণেই তারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকেন। গ্রেফতারের নামে নাটকও নাকি তাদের উদ্যোগেই সাজানো হয়। এজন্যই বড় কোনো ব্যবসায়ীর কখনো শাস্তি হয়েছে বলে শোনা যায় না।
বিষয়টি অনেক পুরনো এবং সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও বর্তমান পর্যায়ে কথা উঠেছে বিশেষ করে ইয়াবার ব্যাপক চোরাচালানের পরিপ্রেক্ষিতে। ইদানীং ক’দিন পরপরই চোরাচালানের অবৈধ পথে দেশে আনা ইয়াবার চালান ধরা পড়ছে। সংখ্যা বা পরিমাণের দিক থেকে এসব চালান চমকে ওঠার মতো। বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও পুলিশের বিভিন্ন অভিযানে আটক হচ্ছে আরো লাখ লাখ ইয়াবার কয়েকটি চালান। সব চালানই এসেছে মিয়ানমার থেকে। এত অভিযান এবং ধরা পড়া সত্ত্বেও চোরাচালানিরা কিন্তু থেমে নেই। তারা বরং নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করে চলেছে। যেমন বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের বরাত দিয়ে জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, এতদিন যেখানে সড়ক পথে চোরাচালান করা হতো এখন সেখানে করা হচ্ছে নৌপথে। নতুন নতুন রুট বেছে নিচ্ছে চোরাচালানিরা। বড় কোনো জাহাজে পাঠানোর পরিবর্তে তারা পাঠাচ্ছে ইঞ্জিন চালিত ছোট ছোট নৌকায় এবং ট্রলারে করে, যাতে সহজে সীমান্তরক্ষীদের চোখে ধরা না পড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, নাফ নদীর তীরবর্তী কোনো একই বিশেষ স্থানে বারবার পাঠানোর পরিবর্তে সাবরাং, মোগপাড়া এবং শিকদারপাড়ার মতো বিভিন্ন এলাকায় তারা চালান পৌঁছে দিচ্ছে। বেশিরভাগ চালান আসছে নাফ নদী দিয়ে। প্রসঙ্গক্রমে মিয়ানমার সরকারের নীতি ও ভূমিকাও তীব্রভাবেই সমালোচিত হচ্ছে। কারণ, বিজিবির সঙ্গে অনুষ্ঠিত প্রতিটি সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠকেই মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী চোরাচালান বন্ধের জন্য ব্যবস্থা নেয়ার অঙ্গিকার করেছে। কিন্তু চোরাচালান বন্ধ করা দূরে থাকুক, মিয়ানমার বরং ইয়াবার কারখানা স্থাপনের ব্যাপারেই অনেক বেশি উৎসাহ দেখিয়ে চলেছে। প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, নাফ নদীর অপর পাশে অবস্থিত মংদাও নামের শহরে এরই মধ্যে অন্তত ৩৭টি ইয়াবার কারখানা স্থাপিত হয়েছে। কারখানাগুলোতে উৎপাদনও চলছে রাতদিন। বাংলাদেশে প্রধানত এসব কারখানায় তৈরি ইয়াবাই পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িত দু’একজনকে গ্রেফতার করা হলেও বাকি সকলে রয়েছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
এদিকে ভারত তো কেবল এগিয়েই চলেছে। বাংলাদেশের মাদকের বাজার অনেক আগেই ছেয়ে গেছে ভারতীয় মাদক সামগ্রীতে। উদ্বেগের কারণ হলো, দু’দেশের সরকারের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে মাদকের চোরাচালান প্রতিরোধের লক্ষ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও আখেরে বাংলাদেশের কোনো লাভ হয়নি। চোরাচালান বন্ধ করা দূরে থাকুক, ভারত বরং ইয়াবা ধরনের মাদক সামগ্রীর কারখানা স্থাপনের ব্যাপারেই বেশি উৎসাহ দেখিয়ে চলেছে। বাংলাদেশ সংলগ্ন এমন কোনো সীমান্ত এলাকার নাম বলা যাবে না, যেখানে মাদকের ডজন ডজন কারখানা স্থাপিত না হয়েছে। কারখানাগুলোতে উৎপাদনও চলছে রাতদিন। বাংলাদেশে প্রধানত এসব কারখানায় তৈরি ইয়াবা এবং অন্যান্য মাদকই পাঠানো হচ্ছে। জনমনে উদ্বেগও বেড়ে চলেছে একই কারণে। উদ্বেগের অন্য একটি কারণ হলো, সময়ে সময়ে অভিযান চালানো হলেও এবং চুনোপুঁটি ধরনের দু’চারজন ব্যবসায়ী বা বিক্রেতা ধরা পড়া সত্ত্বেও চোরাচালানিরা কিন্তু থেমে নেই। তারা বরং নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। দিনের পর দিন বাজার বড়ও করছে তারা।
বলার অপেক্ষা রাখে না, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মরণ নেশার ছোবলে ক্ষতবিক্ষত হওয়ার এই খবর গোটা জাতির জন্যই ভয়াবহ এবং গভীর উদ্বেগের কারণ। আশংকার অন্য কিছু কারণও লক্ষ্য করা দরকার। মাদক সামগ্রীগুলোর মধ্যে বিশেষ করে ইয়াবার দাম যেহেতু সাধারণ মাদকাসক্তদের নাগালের অনেক বাইরে সেহেতু টাকা যোগানোর জন্য নেশাখোররা চুরি-ছিনতাই ও ডাকাতির মতো ভয়ংকর পথে পা বাড়িয়েছে। অনেকে এমনকি নিজেদেরই বাবা-মায়ের অর্থ ও সোনা-গহনা চুরি করছে। এভাবে বাংলাদেশের পুরো সমাজেই পচন ধরেছে। এখনই যদি প্রতিহত না করা যায় তাহলে স্বল্প সময়ের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যাবে বর্তমান প্রজন্ম। আগামী প্রজন্মও তাদের অনুসরণ করবে। ফলে দেশ ও জাতির উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির কোনো ক্ষেত্রেই তারা সামান্য অবদান রাখতে পারবে না। তেমন মেধা ও যোগ্যতাই থাকবে না তাদের।
একই কারণে ইয়াবাসহ মাদক সামগ্রীর বিরুদ্ধে অবিলম্বে দরকার সর্বাত্মক অভিযান চালানো। ইয়াবার চোরাচালান প্রতিহত করতে হবে যে কোনো পন্থায়। চাল-ডাল ধরনের পণ্যের মতো যেখানে-সেখানে ইয়াবা যাতে বিক্রি করা সম্ভব না হয় এবং ছাত্রছাত্রীসহ মাদকাসক্তরা যাতে সহজে কিনতে না পারে তার ব্যবস্থা নিতে হবে সুচিন্তিতভাবে। নেশার ক্ষতি সম্পর্কে শিক্ষামূলক প্রচারণা চালাতে হবে গণমাধ্যমে। কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ করে ভারত ও মিয়ানমারের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে হবে যাতে দেশ দুটির ব্যবসায়ীরা ইয়াবা, হেরোইন ও ফেন্সিডিল জাতীয় পণ্যের উৎপাদন করতে না পারে। দুটি দেশই যাতে মাদকের সকল কারখানা নিষিদ্ধ করে, সেগুলোকে উচ্ছেদ করে এবং বাংলাদেশে যাতে কোনো নেশার সামগ্রী ঢুকতেই না পারে। এ ব্যাপারে বিজিবি, কোস্ট গার্ড এবং র‌্যাব ও পুলিশকেও তৎপর করতে হবে। তাহলেই রক্ষা করা যাবে জাতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে, ঠেকানো যাবে আমার সেই জমির আলীদেরও।
সবশেষে বলা দরকার, ইয়াবা ধরনের নেশার সঙ্গে নারী ও শিশুদের ওপর চলমান যৌন নির্যাতনের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। যৌন নির্যাতন কেন বেড়ে চলেছে তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সমাজবিজ্ঞানী ও মানবাধিকার কর্মীসহ বিশেষজ্ঞরা প্রধানত আইনের শাসন না থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন, সুশাসন না থাকায় কোনো অপরাধীকেই বিচারের মুখোমুখি করা যায় না। আইনের ফাঁক গলিয়ে তারা সহজেই পার পেয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যবহার করা হয়। তারা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকায় পুলিশ সহজে মামলা নিতে চায় না। মামলা নিলেও এমনভাবেই অভিযোগপত্র দাখিল করে যাতে হাতেনাতে ধরা পড়া অপরাধীরাও জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে। বাস্তবেও তারা বেরিয়ে আসে এবং এসেই নতুন নতুন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এভাবে সব মিলিয়ে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যখন বখাটে-দুর্বৃত্তরা ধরেই নিয়েছে যে, অপরাধ যতো মারাত্মকই হোক না কেন, তার জন্য কখনো শাস্তি পেতে হবে না। এমন অবস্থাকেই সমাজবিজ্ঞানীরা অপরাধ বেড়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ বলে মনে করেন। এজন্য সবার আগে দরকার ইয়াবা ধরনের নেশার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। তেমন ব্যবস্থা নেয়া হলে নারী ও শিশুদের ওপর যৌন নিয়াতনও অনেক কমে যাবে। এমনকি পর্যায়ক্রমে তা বন্ধও হয়ে যেতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ