ঢাকা, শনিবার 29 October 2016 ১৪ কার্তিক ১৪২৩, ২৭ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ঢাকার হারিয়ে যাওয়া পঞ্চায়েত

নূরুল আনাম (মিঠু) : আদিম মানব সমাজের গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন থেকেই গণতন্ত্র ও স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার ভিত্তি রচিত হয়েছিল। প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যের গোত্র ভিত্তিক জীবনধারা কিংবা প্রাচীন ভারতের ষোড়শ মহাজনপদ অথবা প্রাচীন গ্রীসের নগর রাষ্ট্রে যে ধরনের গণতান্ত্রিক চিন্তাধারায় বিকাশ ঘটেছিল বলে মনে করা হয় তা হয়তো আধুনিককালের গণতান্ত্রিক সংস্কারের সাথে মেলানো যাবে না। কিন্তু সে যুগের মাপকাঠিতে এক বিশেষ ধরনের গণতন্ত্র ও স্থানীয় শাসনেরও বিকাশ সাধিত হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের গোত্রীয় গণতন্ত্রের উন্নত ও সংশোধিত রূপ হলো ইসলামী ও এর সাথে সম্পৃক্ত শূরা ও সালিশী ব্যবস্থা। চূড়ান্তভাবে একথা বলা যায় যে, অঞ্চলভিত্তিক নেতৃত্ব বিকাশের ইতিহাস মোটেই সাম্প্রতিক নয়। আধুনিক ঢাকা শহরের গোড়াপত্তন কবে হয়েছিল তা আজও নিশ্চিন্ত হওয়া যায়নি। তবে শহর না হোক অন্তত উন্নত বসতি হিসাবে ঢাকার যাত্রা মুসলিম যুগের পূর্বকাল থেকে শুরু হয়েছিল তা মনে করা যায়।
কারণ এর স্বপক্ষে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ আছে। বিশেষত গুপ্ত যুগের মুদ্রাসহ অনেক নিদর্শন পাওয়া যাওয়ায় এই মত দৃঢ়মূল হয়েছে। সেই শহর নিশ্চিন্তভাবেই অনেক ছোট ছিল এবং বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী স্থানেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে ঢাকায় আধুনিক প্রশাসন সৃষ্টি হওয়ার আগে থেকেই প্রচলিত ছিল পঞ্চায়েত ব্যবস্থা। ঠিক কবে থেকে এই ব্যবস্থার পত্তন হয় তা অবশ্য জানা যায় না। তবে মোগল আমল থেকেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন এসেছে বার বার, আইন-কানুন হয়েছে নতুন, শাসন ও বিচার ব্যবস্থা হয়েছে আধুনিক ও যুগোপযোগী। উত্থান-পতন ও ভাঙ্গাগড়ায় ঢাকার নাগরিক জীবন হয়েছে বিপর্যস্ত। কিন্তু ঢাকার সনাতন পঞ্চায়েত ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটেনি। এর ফলে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত এই ব্যবস্থা সুচারুভাবে পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু ৪৭-এর মহারাষ্ট্রবিপ্লবের পর থেকে এই ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে গেছে। পঞ্চায়েত সাধারণত মহল্লার জনগণের রুটিরুজির ব্যবস্থা, কাজ-কর্মে উৎসাহ দান, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, গোলযোগের ব্যবস্থা, জটিল মামলা মোকদ্দমা থেকে বিরত রাখা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুস্থদের সাহায্য ও সহযোগিতা করা, পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদ নিষ্পত্তি করা, গরিব বিবাহযোগ্য মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করা, মৃতদেহের সৎকার করা ইত্যাদি জনহিতকর কাজ করতো।
আগেই বলা হয়েছে যে, কোনদিন কোন ক্ষণে ঢাকায় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালু হয়েছিল তা আজও কেউ সুনিশ্চিত করে বলতে পারেননি। আগেই এও বলা হয়েছে যে, মোগল আমলেই এ ব্যাপারে পরোক্ষ প্রমাণ মেলে। তবে ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে ঢাকার তৎকালীন নবাব আবদুল গনির প্রচেষ্টায় তা নতুন করে জীবন লাভ করে। তার উদ্যোগে বাইশটি প্রধান প্রধান মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মহল্লা নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় পঞ্চায়েত গঠিত হয় যা বাইশ পঞ্চায়েত নামে পরিচিত। পঞ্চায়েতের সুনির্দিষ্ট না থাকলেও মাঝে মাঝে নতুন পঞ্চায়েত গঠিত হতো।
নবনির্বাচিত পঞ্চায়েত সর্দার, নায়েব সর্দারদের বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অভিষিক্ত করা হতো।  নবনির্বাচিত পঞ্চায়েত সরদার, নায়েব সরদারদের মাথায় পাগড়ি পরিয়ে দিতেন স্বয়ং ঢাকার নবাব। নবনির্বাচিত সর্দারদের সংবর্ধনা জানানোর জন্য মহল্লাবাসী বা গ্রামবাসী চাঁদা তুলে এক বিরাট প্রীতিভোজের আয়োজন করত। প্রথমদিকে পঞ্চায়েতগুলোর আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিল। প্রচুর টাকা জমা থাকত পঞ্চায়েত তহবিলে। এসব টাকা নিজেদের বা অন্যের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে কিংবা এককালীন দানের মাধ্যমে জমা রাখা হতো। পঞ্চায়েতের টাকা কেউ ব্যক্তিগতভাবে বা অন্যায়ভাবে ব্যয় করতে পারত না। একমাত্র সমাজকল্যাণ কাজেই এটাকে ব্যয় করা হতো। সাধারণত সর্দারের কাছেই এ টাকা জমা থাকত। হিসাবপত্রের সব ব্যবস্থাও তিনিই করতেন। সরদারদের সহযোগিতা করার জন্য নয়েক বেরাদরদের তথা বিশিষ্ট মহল্লাবাসীদের নিয়ে একটি কমিটি থাকত। পঞ্চায়েতের সব কাজ পরিচালনা, সভা-সমিতি, আচার-বিচার করার জন্য মহল্লার মধ্যে একটি সার্বজনীন বাংলাঘর থাকত। এই বাংলাঘর মহল্লার অধিবাসীদের প্রচেষ্টাতেই করা হতো। এখনও এসব বাংলাঘরের কোন কোনটি টিকে আছে। এখন পর্যন্ত টিকে থাকা বাংলাঘরগুলোতে প্রাথমিক বিদ্যালয় বা মাদ্রাসা পরিচালিত হয়ে থাকে। সেই যুগে আবার বাংলাঘরগুলো এলাকাবাসীর একটি মিলিত হওয়ারও স্থান ছিল। সবাই এখানে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা, সংবাদ বিনিময়, কুশল আদান-প্রদান, অবসর বিনোদন সেই সাথে পান-তামাকেরও আসর বসত। এর মাধ্যমেই মহল্লাবাসীদের মধ্যে গড়ে উঠত সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও সখ্যতা।
পঞ্চায়েতগুলোতে বারোয়ারী কাজের জন্য উপযোগী আসবাবপত্র, যথা: হ্যাজাক বাতি, সামিয়ানা, বিছানাপত্র, বাসনকোসন, বড় বড় ডেকচি, গোলাপদান, আতরদান, বর সাজানোর পোশাক-পরিচ্ছদ, মৃত ব্যক্তিদের সৎকারের সব রকম সরঞ্জাম যতœ সহকারে মজুদ থাকত। আগেই বলা হয়েছে, ৪৭-এর রাষ্ট্রবিপ্লবের মহাপ্লাবন পঞ্চায়েত ব্যবস্থাও মুক্ত ছিল না। আর তাই বর্তমানে অধিকাংশ মহল্লার পঞ্চায়েত ব্যবস্থা খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছে। নিভু নিভু প্রদীপের মত কোন কোন মহল্লায় পঞ্চায়েত চালু থাকলেও আগের দিনের জনহিতকর কাজ করা সাধ্যাতীত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর কারণ কয়েক দফা রাষ্ট্র-বিপ্লব হয়েছে। অনেক পরিবর্তন বিবর্তন এসেছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে।
তবে এখনও একে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। তবে তাকে অবশ্যই বর্তমান পরিস্থিতির সাথে সঙ্গতি রেখে যুগোপযোগী করে তুলতে হবে। কারণ পঞ্চায়েত ব্যবস্থার সনাতন দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োগ বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক নিয়মেই প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এত কিছুর পরও পঞ্চায়েত ব্যবস্থা একটি জনকল্যাণকর সামাজিক সংস্থা। সামাজিক কল্যাণের সর্বস্তরে এ সংস্থা আজও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আজকের সমাজে সৌহার্দ্য ও জানাশোনাকে (যা দিন দিন কমে আসছে) একই সাথে গতিশীল ও স্থিতিশীল করে সুখী সমৃদ্ধ সমাজ গড়তে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার ভূমিকা অনস্বীকার্য। সমাজের উন্নয়ন সাধনই যে সংস্থার একমাত্র লক্ষ্য, তাকে সামাজিকভাবেই পুনর্গঠিত করতে হবে। সব শেষে বাইশ পঞ্চায়েতের কয়েকজন সরদারের নাম উল্লেখ করা হলো।
তারা হলেন, সরদারদের সরদার মির্জা আবদুল কাদের সরদার, নাজিরাবাজারের মতি সরদার, আবদুল মাজেদ সরদার ও চাঁন সরদার, লক্ষ্ণীবাজারের রহমতউল্লা সরদার, আমলীগোলার আবদুর রহিম সরদার ও মওলা বখশ সরদার, চাঁনখারপুলের মিয়া সরদার ও পেয়ারু সরদার, মগবাজারের ওসমান সরদার, কলতাবাজারের নাসির উদ্দিন সরদার, রায় সাহেব বাজারের ইলিয়াস সরদার ও সবুর ব্যাপারী সরদার, লোহারপুলের আহসান উল্লাহ সরদার (ইনি বাইশ পঞ্চায়েতের সেক্রেটারি ছিলেন), চকবাজারের জুম্মন বেপারী ওরফে আহসান মোহাম্মদ নবী (ইনি বাইশ পঞ্চায়েতের শেষ জেনারেল সেক্রেটারী ছিলেন)। বাবু বাজারের চুনু সরদার ও গনি মিয়া সরদার, পোস্তগোলার নওলাক সরদার ও বেল্লাত আলী সরদার, ফরিদাবাদের গোলাম আলী সরদার, আলমগঞ্জের কাদের সরদার, রহমতগঞ্জের বসুরুদ্দিন সরদার ও আরেফ সরদার, বাসাবোর পাণ্ডব আলী সরদার, গোয়ালঘাটের হাজী ইউসুফ আলী সরদার, সাতরওজার সালাম সরদার, ইসলামপুরের আলী মিয়া সরদার, দয়াগঞ্জের আবদুল আলী সরদার, ইমামগঞ্জের সাহাবউদ্দীন সরদার, জিন্দাবাহারের সাত্তার সরদার, বংশালের আনিসুর রহমান সরদার, লালবাগের আবদুল বারেক সরদার, খাজে দেওয়ানের নবাব মিয়া সরদার, নবাবগঞ্জের চাঁনমাল সরদার, হাজারীবাগের এনায়েতউল্লাহ সরদার ও জামালখান সরদার, আলুরবাজারের আবদুল হাই সরদার, দক্ষিণ মৈশ-ির ফকির চাঁন সরদার ও নারিন্দার লেটকু সরদার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ