ঢাকা, শনিবার 29 October 2016 ১৪ কার্তিক ১৪২৩, ২৭ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আমাদের শিক্ষার মান

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা : উপনিবেশবাদী শিক্ষানীতি এখনো চালু থাকায় আমরা শিক্ষাক্ষেত্রে অনেকটাই অনগ্রসর। এজন্য শুধুই বিদেশী শাসকদের দায়ি করেই নিজেদের দায় শেষ করা যুক্তিযুক্ত হবে না বরং ক্ষেত্র বিশেষে আমাদের অপরিণামদর্শিতা এবং দাসপ্রবণ মানসিকতাও  এজন্য কম দায়ী নয়। ১৭৫৭ সালে পলাশী ট্র্যাজেডির পর আমরা প্রায় দু’শ বছর পরাধীনতার জিঞ্জিরে আবদ্ধ ছিলাম। কিন্তু আমরা সেই ক্রান্তিকালে খুব একটা বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে পারিনি। ইংরেজ শাসনামলে ইংরেজি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। সরকারি চাকরিসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যারা নিয়োজিত হতেন তাদের জন্য ইংরেজি ভাষা জানা আবশ্যক ছিল। তাই যারা ইংরেজি ভাষা শেখেননি, তাদের ভাগ্যেও তেমন কিছু জোটেনি। অর্ধশতাব্দীর অধিককাল আগে ঔপনিবেশিক শাসনের  অবসান হলেও আমরা এখনো সেই সনাতনী শিক্ষা কারিকুলামের মৌলিক কোনও পরিবর্তন আনতে পারিনি। ফলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যাগুলো যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। তাই আমাদের শিক্ষা একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় খুব একটা সহায়ক হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। মূলত সে সময় যারা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণে ব্যর্থ হন বা ইচ্ছা করেই ইংরেজি বর্জন করেন তখন তাদের কোন সরকারি চাকরি তো দূরের কথা চৌকিদারের চাকরিও দেয়া হয়নি। আর ভারতীয় মুসলমানরা অতিযতœ সহকারেই খ্রিস্টানী ভাষা তকমা দিয়ে ইংরেজি শিক্ষা বর্জন করেছিল। আর এ সুযোগ কোনভাবেই হাতছাড়া করেনি ঔপনিবেশিক শাসকচক্র। যেহেতু  কুসংস্কার ও অপরিণামদর্শিতার কারণে মুসলমানরা ইংরেজি ভাষা শিখতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, আর সে সুযোগ কাজে লাগিয়েই ইংরেজদের পক্ষে শিক্ষাকে দ্বিধাবিভক্ত করে ‘Divide & Rule’ Theory বাস্তবায়ন করা সহজতর হয়েছিল। সেদিনের ভুলের কারণেই আমরা তার প্রায়াশ্চিত্য এখনো করছে। বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করে কুসংস্কারকে আঁকড়ে ধরার কারণেই আমরা আজও শিক্ষা-দিক্ষায় অনেকটায় পশ্চাদপদ। পক্ষান্তরে হিন্দুরা আমাদের অপরিণামদর্শিতাকে কাজে লাগিয়েছিল পুরোপুরি। ফলে তারা যেমন শাসক গোষ্ঠীর আনুকুল্য পেয়েছিল এবং রাষ্ট্রের শীর্ষপদগুলোও তারা করায়ত্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। আর মুসলমানরা মসজিদ, মক্তব, খানকার বৃত্তের আটকা পড়েছিল। আর সে বৃত্ত থেকে বেড়িয়ে আশা তাদের জন্য মোটেই সহজসাধ্য ছিল না। কিন্তু স্যার সৈয়দ আহমদ যখন উপলব্ধি করতে পারলেন যে, মুসলমানরা ইংরেজি শিক্ষা নিয়ে চরম বিভ্রান্তির মধ্যে আছে এবং ইংরেজি শিক্ষা বর্জনের কারণে তারা পুরোপুরি পশ্চাৎপদ হয়ে পড়েছে, ততদিনে ভাগিরথীতে অনেক জল বয়ে গেছে। তিনি সাহসিকতার সাথেই মুসলমানদের ইংরেজি শিখতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু ততদিনে হিন্দুরা অনেক এগিয়ে গিয়েছিল। অনেক পেছনে থেকে দৌড় শুরু করা মুসলামনা এখনও তাদের ধারের কাছেও পৌঁছতে পারেনি। আর এটাই আমাদের চরম দুর্ভাগ্য। মুসলমানরা যে শুধু ইংরেজি শেখার ব্যাপারেই অনিহা প্রকাশ করছিল এমনটা নয় বরং বাংলা ভাষা শেখা ও চর্চার বিষয়েও তাদের মারাত্মক অনিহা ছিল। কারণ, তারা মনে করতো বিজাতীয় ভাষা বাংলা শিক্ষা ও চর্চা করা মোটেই ইসলামসম্মত নয় বরং চরম গর্হিত ও পাপের কাজ। এ ব্যাপারে শুধু যে, মুসলমানরাই কুসংস্কারাচ্ছন্ন তা নয় বরং বর্ণ হিন্দুরাও বাংলা ভাষা চর্চাকে গর্হিত ও পাপের কাজ মনে করতো। এমনকি হিন্দুদের পক্ষে একথা বলা হতো যে, যেসব হিন্দু বাংলাভাষা শিক্ষা ও চর্চা করবে তাদের নিশ্চিত স্থান হবে ‘রৌরব’ নামক নরকে। যাহোক মাতৃভাষা তথা বাংলা ভাষা বিদ্বেষ মুসলিম কবি আব্দুল হাকিমকে বেশ সোচ্চার হতে দেখা যায়। তিনি তার ‘বঙ্গভাষা’  কবিতায় লিখেন-
‘যেসবে বঙ্গেতে জন্মি
হিংসে বঙ্গবাণী
সেসবে কাহার জন্ম
নির্ণয় ন জানি’॥

বাংলা ভাষা নিয়ে এক সময় মুসলমানদের একশ্রেণির মুসলমানের বিদ্বেষের বিষয়টি ফুটে ওঠে সরদার জয়েন উদ্দীনের ‘কেফায়াতুল মুসাল্লিন’ গ্রন্থে। তিনি অনেকটা খেদোক্তি করেই তার গ্রন্থের মুখবন্ধে লিখেছেন-

‘আরবীতে সকলে ন বুঝে ভালমন্দ
 তে কারণে দেশী ভাষে রচিলু প্রবন্ধ।

মুসলমানী শাস্ত্র কথা বাঙ্গালা করিলু
বহু পাশ হইলো মোর নিশ্চয় জানিলু।
কিন্তু এমন আশা আছে মনান্তরে
বুঝিয়া মোমিন দোয়া করিবে আমারে।

 মোমিনের আশীর্বাদে পুণ্য হইবেক
 অবশ্য গফুর আল্লাহ্ পাপ ক্ষেমিবেক’॥

মূলত বঙ্গীয় মুসলমানদের শিক্ষাক্ষেত্রে অনগ্রসরতার জন্য শুধুমাত্র বিদেশী শাসকচক্রই দায়ী নয় বরং কুসংস্কার ও অহমিকাও কিছুটা হলেও দায়ী। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে না নেয়া এবং আপরিণামদর্শিতাকে একজন্য অনেকাংশে দায়ি করা যায়। ফলে ঔপনিবেশিক শাসকচক্র চক্রান্ত মুসলামানদের শিক্ষাক্ষেত্রে অনগ্রসর রাখার চেষ্টা করেছে, ঠিক তেমনিভাবে আমরাও তাদের পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে তাদের ষড়যন্ত্রের ষোলকলা পূর্ণ করতে সহযোগিতা করেছি। আর সে ষড়যন্ত্রের ফসলই হলো শিক্ষাকে দ্বিধাবিক্তকরণ। মূলত শিক্ষাবিভাজনের মাধ্যমে জাতিকেই বিভাজিত করা হয়েছে। আর আমরা ধর্মশিক্ষার সুযোগ অবারিত হয়েছে মর্মে অনর্থক পুলকবোধ করেছি। যা এখন অনেকটা আত্মঘাতীই মনে হচ্ছে।
মূলত শিক্ষাকে দ্বিধাবিভক্ত করে জাতিকেই বহুধাবিভক্ত করতে সক্ষম হয়েছিল বিদেশী শাসকচক্র। তাদের উদ্দেশ্য ছিল এদেশে তাদের শাসন-শোষণ দীর্ঘায়িত করা। এতে তারা বেশ সফলতাও পেয়েছিল। উপমহাদেশের শিক্ষা কারিকুলামকে এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছি যাতে শিক্ষার্থীরা কোন বিষয়ে পারদর্শী না হয়ে সকল বিষয়ে অপর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করে এবং এদের দিয়ে কোনওভাবেই যেন আত্মমর্যাদাশীল জাতি গঠনে কোন ভূমিকা রাখা সম্ভব না হয়। আসলে সাধারণ শিক্ষার নামে উপনিবেশবাদীরা ভারতীয়দের জন্য যে শিক্ষা চালু করেছিল, সেখানে নৈতিক শিক্ষার বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়েছিল। ফলে সাধারণ শিক্ষা যেমন জাতির আশা-আকাঙ্খা পুরনে ব্যর্থ হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে শিক্ষার্থীদের যোগ্য নাগরিক হিসাবে গড়ে তুলতে পারেনি বরং ক্ষেত্র বিশেষে সে শিক্ষা আত্মমর্যাদাহীন নকলনবীশ তৈরি করতেই সহায়ক হয়েছে। আর সে ধারা এখনও অনেটাই অব্যাহত আছে। পক্ষান্তরে মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষার নামে যে মাদরাসা শিক্ষার প্রবর্তন করা হয়; সে শিক্ষা যেমন শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং ধর্মের মর্মবাণী উপলব্ধিতে ব্যর্থ হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে বৈষয়িক জ্ঞানেও তারা পশ্চাদপদ থেকেছে। ফলে মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিতরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধ সম্পর্কে খুব কমই জেনেছে। আর আধুনিক যুগ জিজ্ঞাসার জবাবেও তারা নিজেদেরকে যোগ্যতর হিসাবে গড়ে তুলতে পারিনি। উপনিবেশবাদীরা মাদরাসা শিক্ষা কারিকুলামকে বেশ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছে। তাই মাদরাসা শিক্ষায়  ইসলামের সর্বজনীন ও বৈপ্লবিক রূপ থেকেছে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে নিকাহ্-তালাক, হায়েজ-নিফাস, ওজু- গোসলসহ আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব বিষয়গুলো। উপেক্ষিত থেকেছে ইসলামের সর্বজনীন বিষয়গুলো। ফলে ইসলাম সম্পর্কে খুবই কমই জানতে পেরেছে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা।
দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে যেখানে একমুখী শিক্ষায় কাম্য ছিল, সেখানে সাধারণ শিক্ষা ও মাদরাসা শিক্ষার নামে শিক্ষাকে বিভাজিত করে জাতিকেও বিভাজিত করা হয়েছে। পরিতাপের বিষয় যে, আমরা বারবার স্বাধীনতা লাভ করলেও দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে এখনও মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে সক্ষম হয়নি। সাধারণ শিক্ষায় এখনও নৈতিকশিক্ষার বিষয়টি পুরোপুরি অনুপস্থিত। মাদ্রাসা শিক্ষার কারিকুলামকে এখনও সময়োপযোগী ও যুযোপযোগী করে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ফলে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য এখনও ব্যাহত হচ্ছে। দেশের পাবলিক পরীক্ষায় ফলাফল বিপ্লব লক্ষ্য করা গেলেও শিক্ষার মান এখনও কাক্সিক্ষত লক্ষ্যের চেয়ে অনেক দূরে। শিক্ষাক্ষেত্রে সংখ্যাগত বিপ্লব লক্ষ্য করা গেলেও গুণগত দিকটি বেশ উপেক্ষিতই থেকেছে।
শুধু শিক্ষা কারিকুলামই নয় বরং আমাদের দেশের শিক্ষা অবকাঠামোও অনেকটাই সেকেলে। জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে সর্বাধিক বরাদ্দের কথা বলা হলেও শিক্ষার্থীদের জন্য এখনও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। দেশের জনসংখ্যার তুলনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এখনও অপ্রতুলতা রয়েছে। শিক্ষকদের জন্য পর্যাপ্ত ও যৌক্তিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়নি। শিক্ষকতায় যখন সর্বোচ্চ মেধাবীদের প্রয়োজন, সেখানে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবেই মেধাবীরা এপেশায় আসতে খুব একটা আগ্রহ দেখান না। ফলে শিক্ষার মানের বিষয়টি অনেকটাই অধরায় থেকে যাচ্ছে।  মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্তসংখ্যক যোগ্য ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক। কিন্তু শিক্ষার্থীর অনুপাতে শিক্ষক সংখ্যাও বেশ কম। সকল শিক্ষকের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি শিখন ও গবেষণার পরিবেশ কাক্সিক্ষত মানের নয়। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ও তাদের আবাসনসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়নি। সর্বোপরি নেই  বৈশ্বিক জ্ঞানলাভের পর্যাপ্ত সুযোগ। মূলত আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় সকল ক্ষেত্রেই রয়েছে অনাকাক্সিক্ষত সংকট। ফলে মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। যা আমাদের জাতিসত্তাকে ক্রমেই দুর্বল হতে দুর্বলতর করে ফেলছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) তথ্য বলছে, উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার মানের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিচে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। আর বৈশ্বিক পরিম-লে উচ্চশিক্ষার মানের দিক দিয়ে ১৩৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারত। তালিকায় ভারতের বৈশ্বিক অবস্থান ২৯তম। বাকি দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলংকা ৪১, পাকিস্তান ৭১ ও নেপালের অবস্থান ৭৭তম। সার্বিক দিক বিবেচনায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার যে বাস্তবচিত্র ফুটে উঠেছে তা সত্যিই উদ্বেগজনক। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাধীনতার পর তিন দশকের বেশি সময় উচ্চশিক্ষা তেমন গুরুত্ব পায়নি। এ কারণে একটা বড় সময় ধরে অবহেলিত ছিল দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা। মানে পিছিয়ে পড়ার এটি একটি কারণ হতে পারে। এছাড়া গত দুই দশকে এ খাতের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। অর্থ বরাদ্দ কম থাকার ফলে পরিধি বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নয়ন করা সম্ভব হয়নি। বারবার সরকারের  পরিবর্তন হলেও শিক্ষাকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করার বিষয়টি বরাবারই উপেক্ষিত হয়েছে।
সম্প্রতি সর্বশেষ বৈশ্বিক সক্ষমতা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ডব্লিউইএফ। প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ১২টি স্তম্ভের দু’টিই শিক্ষাবিষয়ক। সূচকের পঞ্চম স্তম্ভ উচ্চশিক্ষা-বিষয়ক। এ স্তম্ভে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কম থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
ডব্লিউইএফ’র বৈশ্বিক সক্ষমতা প্রতিবেদন ২০১৬-১৭ অনুযায়ী, বাংলাদেশে উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। যদিও নেপালে এ হার ১৬, শ্রীলংকায় ২১ ও ভারতে ২৪ শতাংশ। ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের তথ্যের ভিত্তিতে হিসাবটি করা হয়েছে। এটিই সর্বশেষ তথ্য। শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের দেশে জনসংখ্যার তুলনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা একেবারেই কম। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও তা ব্যয়বহুল হওয়ায় দেশের মানুষের বড় একটা অংশ উচ্চশিক্ষা নিতে পারে না। তাছাড়া জনসংখ্যার বড় অংশ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর শেষ করেই কর্মজীবনে প্রবেশ এবং দেশের বাইরে চলে যাওয়ায় উচ্চশিক্ষা  গ্র্র্রহণের হার কম। আবার অনেকেরই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গ্রহণের সামর্থ্য নেই। এ কারণে এ হার কম। তবে গত কয়েক বছর ধরে এ হার বাড়ছে। বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষার মানের দিক থেকেও পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ। বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষার বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬তম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এ অবস্থান সর্বনিম্নে। তালিকায় অন্তর্ভুক্ত বাকি দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলংকা ২৮, ভারত ৪৪, নেপাল ৮৬ ও পাকিস্তান ৯৮তম অবস্থানে রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানের দিক থেকেও বাংলাদেশের অবস্থান নিম্ন সারিতেই। প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানের সূচকে বাংলাদেশ ১০৯তম। এক্ষেত্রে পাকিস্তান  বাংলাদেশ থেকে ছয় ধাপ পিছিয়ে (১১৫তম) থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো এগিয়ে রয়েছে। বাকি দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলংকা ৩৮তম, ভারত ৪০তম ও নেপাল ৯৪তম অবস্থানে রয়েছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের আবাসনের ব্যবস্থা না করেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ না করেই নতুন নতুন বিভাগ চালু করা হচ্ছে। দু’-একজন শিক্ষক দিয়েই কোনো কোনো বিভাগের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। আর উচ্চশিক্ষায় অর্থ বরাদ্দও খুবই অপ্রতুল। এ যদি হয় অবস্থা, তখন র‌্যাংকিংয়ে এগিয়ে থাকার সুযোগ কোথায়? তাই শুধু বিশ্ববিদ্যালয় খুলে বসে থাকলে চলবে না। যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেয়া, হল নির্মাণ, গবেষণাগার নির্মাণ ও গবেষণায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেয়াসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সব বিষয় শিক্ষাব্যবস্থায় নিশ্চিত করতে হবে।  সেকেলে ও দায়সারা ধ্যান-ধারণার কারণেই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও বৈশ্বিক মানে উন্নীত হয়নি। যদিও পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল বেশ সন্তোষজনক। কিন্তু গুণগত দিকটি কাক্সিক্ষত মানের না হওয়ায় আমরা এখনও অনেকটাই পশ্চাৎপদ। ফলে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে আমরা খুব একটা সুবিধা করতে পারছি বলে মনে হয় না। তাই একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করতে হবে। জনসংখ্যা অনুপাতে মানসম্মন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়াতে হবে। মেধাবীরা যাতে শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন এজন্য শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির কোনও বিকল্প নেই। শিক্ষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন নিশ্চিত ও শিক্ষা উপরকরণ সহজলভ্য করতে হবে। দেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার সম্প্রসারণ করতে হবে। সর্বপরি সবার জন্য চাই বিশ্বমানের শিক্ষার নিশ্চয়তা। তাহলেই আমরা নতুন শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সক্ষম হবো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ