ঢাকা, শনিবার 29 October 2016 ১৪ কার্তিক ১৪২৩, ২৭ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

শেরে বাংলার জন্মস্থান সংরক্ষণ কাজ কতো দূর?

আতিকুর রহমান ঝালকাঠি: গত ২৬ অক্টোবর, ১৮৭৩ সালের এই দিনে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া মিয়াবাড়ির মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্বপ্নদ্রষ্টা শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক। এ মহান নেতার জন্মগৃহ এবং তার প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি আজও অবহেলায় পড়ে রয়েছে।
দেশ বিদেশের অসংখ্য পর্যটক এখানে এসে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
সাতুরিয়া গ্রামের শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের জন্মভবনটি প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণার প্রায় ৬ বছর হলেও সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়নি।
নামে মাত্র ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন ও আতুরঘরটি ছাদ সংস্কার হলেও অযত্ন আর অবহেলার মধ্যে পড়ে রয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রবক্তা ও বাংলার অবিসংবাদিত এ নেতার বিভিন্ন স্মৃতি চিহ্নগুলো। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনা।
 তথ্য মতে, এ দিন মধ্যরাতে ‘বাংলার বাঘ’ জন্ম নেন সাতুরিয়ার নানাবাড়িতে। বাড়িটি ‘সাতুরিয়া মিয়াবাড়ি’ নামে পরিচিত। শেরে বাংলার শৈশব ও কৈশোরের অনেকটা সময় কেটেছে এ গ্রামে।
এখানকার একটি মক্তবে তিনি লেখাপড়া করেন। যে পুকুরে তিনি সাঁতার কাটতেন তা আজও বিদ্যমান। ১৯৪১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সাতুরিয়া এমএম হাইস্কুল।
এক সময় তিনি সাতুরিয়াকে রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহার করেন।
এছাড়াও সাতুরিয়ায় ছড়িয়ে রয়েছে তার অনেক স্মৃতি। মহান এ নেতার জন্ম নেয়া ভবনসহ মোঘল আমলে নির্মিত আরও কয়েকটি ভবন এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে। তবে অধিকাংশই জরাজীর্ণ।
দীর্ঘদিন সংস্কার করা হয়নি। ইমারতগুলো যে কোন মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে। ইতিমধ্যে অনেক স্মৃতিচিহ্ন হারিয়েও গেছে। এক সময়ে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের কর্ণধার, কোলকাতা সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেও তিনি একাধিক বার সাতুরিয়ায় এসেছিলেন। তার ছেলে মরহুম একে ফাইজুল হক ও বাংলাদেশের মন্ত্রী ছিলেন। অথচ শেরে বাংলার জন্ম ভিটা এবং সাতুরিয়ায় তার নিজের প্রতিষ্ঠিত স্কুলটিও আজ জরাজীর্ণ। জন্ম ভবনে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন তার মাতুল বংশধররা।
স্কুলটিতে ঝুঁকি নিয়ে চলছে পাঠদান। বহুবার এখানে একটি যাদুঘর স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হলেও এ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। যে নেতার জন্য বাংলার কৃষকরা জমিদারদের শোষণ নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল তার জন্ম ও মৃত্যু দিবস পালনেও বিভিন্ন মহলে রয়েছে অনিহা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও প্রসারের লক্ষ্যে ২০০৮-০৯ অর্থ বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে পর্যটন সুবিধা গড়ে তোলার জন্য পর্যটন স্থান/স্পট চিহ্নিতকরণের কাজ করে। এ সময় শেরে বাংলার জন্মস্থানটিকে এর আওতায় নেয়া হয়। এর প্রেক্ষিতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর শেরে বাংলার জন্মভবনকে ১৯৬৮ সালের প্রত্নতত্ত্ব সংরক্ষণ আইন (১৯৭৬ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণযোগ্য বিবেচিত হওয়ায় ভবনটি সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রত্নসম্পদ আইনের ১০ ধারা (১) উপ-ধারার প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার ১ নং সাতুরিয়া মৌজার তিনটি খতিয়ান ও দাগের মোট দশমিক ৬১ একর জমি সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ বলে ঘোষণা করে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে এ ব্যাপারে ২০১০ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ২০১০ সালের ১৮ মার্চের গেজেটে তা প্রকাশ করা হয়।
এরপর ওই জমির খতিয়ান, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও মালিকানা স্বত্ব নিয়ে দু’জন ওয়ারিশ লিখিতভাবে আপত্তি জানালে জটিলতা দেখা দেয়। এ নিয়ে যাচাই-বাছাই কাজে চলে যায় দীর্ঘ সময়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের খুলনাস্থ আঞ্চলিক পরিচালক শিহাব উদ্দিন আকবর ওই সময় জানিয়েছিলেন, জরুরিভাবে এখন শুধুমাত্র শেরে বাংলার জন্মভবনটি সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অল্প দিনের মধ্যেই প্রকৌশলী টিম এলাকা পরিদর্শন করবে। এরপর বাজেট বরাদ্দ মিললে ৪-৫ মাসের মধ্যেই মূল কাজ শুরু হবে। কিন্তু দীর্ঘ ৬ বছর  অতিবাহিত হলেও শুধু জন্মস্থানে ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন ও আঁতুড়ঘরের ছাদ সংস্কার হয়েছে বলে জানা গেছে। শেরে বাংলার মতো নেতাকে সঠিকভাবে মর্যাদা না দেয়ায় অভিযোগে এলাকাবাসীর ক্ষোভের শেষ নেই।
শেরে বাংলার নিকটাত্মীয় নজরুল ইসলামের সাংবাদিকদের জানান, শেরে বাংলাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। বর্তমান সময়েও বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। এর পিছনেও কোন অদৃশ্য শক্তি থাকতে পারে। সাতুরিয়া এমএম মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক ফজলুল হক আকন জানান, কোন সরকারই মহান নেতার স্মৃতি সংরক্ষণে এগিয়ে আসেনি। শেরে বাংলার প্রতিষ্ঠিত এমএম হাইস্কুলে বর্তমানে ৬ষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণীতে ৬ শতাধিক ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করছে। ফলফলও ভাল। কিন্তু স্কুলের অবকাঠামো উন্নয়নে তেমন একটা নজর দেয়া হয়নি বলেও অভিযোগ প্রধান শিক্ষকের। তিনি বলেন, ১৯৬৭ সালে নির্মিত একটি ভবন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ভবনটি সংষ্কার বা পুনঃনির্মাণসহ সার্বিক উন্নয়নের জন্য একাধিকবার আবেদন করেও কোন ফল মেলেনি। শেরে বাংলার জন্মভবনে দীর্ঘদিন যাবত বাস করছেন তার নিকটাত্মীয় হোসনে আরা বেগম বুলু ও তার পরিবারের সদস্যরা। তারাও চান জরুরিভাবে ভবনটি সংষ্কার করা হোক। কিন্তু আগে তাদের জন্য বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে বলেও তাদের দাবি।
তারা নিজ উদ্যোগে ওই ভবনের কিছু সংস্কারও করেছেন। শেরে বাংলার স্মৃতি রক্ষাসহ তাঁর জীবনাদর্শ ও অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যে ১৯৯৪ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় শেরে বাংলা স্মৃতি একাডেমী। সংগঠনের মহাসচিব এসএম রেজাউল কবির পল্টু জানান, সাতুরিয়ায় রাষ্ট্রীয়ভাবে শেরে বাংলার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালন করার জন্য তারা দীর্ঘদিন যাবত সরকারের কাছে দাবি করে এলেও আজও তা মেনে নেয়া হয়নি। ঝালকাঠি জেলা পরিষদের মাধ্যমে ২০০৮ সালে শেরে বাংলার নামে একটি পাঠাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এজন্য টাকাও বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু নানা জটিলতায় তা আলোর মুখ দেখেনি। সম্প্রতি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়ে জন্মস্থানে ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন ও জন্মগৃহের ছাদটি নামমাত্র সংস্কার করে।
এছাড়া সাতুরিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নসহ শেরে বাংলার নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয়, ডাকবাংলো ও মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন ঢাকাস্থ ঝালকাঠি সাংবাদিক সমিতির নেতৃবৃন্দরা। সাতুরিয়াসহ রাজাপুরবাসীর প্রানের দাবী দ্রুত এ স্থানটি সংরক্ষণের। ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ রফিকুল ইসলাম জানান, সম্প্রতি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ শেরে বাংলার জন্মস্থানে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। আশা করি দ্রুত তার জন্মস্থানটি সংরক্ষণ এবং একটি জাদুঘর নির্মাণ করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ