ঢাকা, রোববার 30 October 2016 ১৫ কার্তিক ১৪২৩, ২৮ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

‘প্রশ্নবিদ্ধ হবে বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য’

রূপ অরূপ -সাজজাদ হোসাইন খান : এককালের ‘বঙ্গই’ বর্তমানের বাংলাদেশ। সীমা-পরিসীমার কতকটা হেরফের হবে হয়তো। রমেশ চন্দ্র মজুমদারের মতে বঙ্গের সীমা ছিল পশ্চিমে ভাগীরথি, উত্তরে পদ্মা, পূর্বে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা এবং দক্ষিণে সমুদ্র। তাই ঐতিহাসিকগণ মনে করেন ঢাকা, ফরিদপুর এবং বরিশাল অঞ্চল ছিল প্রাচীন বঙ্গের অংশ। এই জনপদে যারা বসবাস করতেন তাদেরকেই চিহ্নিত করা হয় ‘বঙ্গাল’ বা ‘বাঙ্গাল অভিধায়। যদিও বঙ্গাল শব্দটি ব্যাপক পরিচিতি পায় সুলতানী আমলে। এর আগে অবশ্য কোন শাসকই ‘বঙ্গলার’ প্রতি তেমন সুনজর দেয়নি বা গ্রাহ্যের মধ্যে আনেনি। সুলতান ইলিয়াস শাহই ‘বঙ্গলা’কে মর্যাদার আসনে স্থাপন করেন। আশেপাশের বিস্তৃত অঞ্চল তার রাজ্যভুক্ত করেন, এরপর নিজেকে ঘোষণা করেন শাহ-ই-বাঙ্গালা। তাই ‘বাঙ্গালা’ নামের প্রচলন শুরু হয় সুলতান ইলিয়াস শাহর যুগ থেকেই। এর আগে এ ভূভাগ ‘বঙ্গ’ নামেই পরিচিত ছিল। প্রাচীনকালে বঙ্গ রাঢ়, গৌড় সমতট, হরিকেল ইত্যাদি নামে চিহ্নিত হতো। শাসকও ছিল নাকি ভিন্ন ভিন্ন। বর্তমানে অবশ্য বঙ্গ বা বাংলা ছাড়া অন্যগুলোর কোনো অস্তিত্ব নাই, এ নামগুলো ইতিহাস গ্রন্থেই কেবল পাওয়া যায়; তবে রাঢ় শব্দটি এখনো মিটমিট করে জ্বলছে। রাঢ় বঙ্গের পশ্চিম সীমান্তে, দুই অঞ্চলের মাঝ বরাবর ভাগীরথি নদী। বর্তমান বর্ধমান জেলাকেই রাঢ় অঞ্চল বলে ভাবা হয়। তাছাড়া প্রাচীন গৌড় অঞ্চলটিও ছিল রাঢ়ভূমির আশেপাশে। ইতিহাস বলে মুর্শিদাবাদ বীরভূম এবং মালদহ অঞ্চলই গৌড়ের আদি এলাকা। দেখা যাচ্ছে গৌড় এবং রাঢ় এলাকাটি পাশাপাশি থাকলেও বঙ্গ বা বঙ্গলা থেকে একেবারেই ভিন্ন জনপদ। ভিন্ন ভূ-ভাগ। যে কারণে আচার-আচরণ, ইতিহাস, ভূগোল আলাদা অন্যরকম।
বঙ্গের মূল ভূ-ভাগটিই এখন বর্তমানের বাংলাদেশ। সুলতান ইলিয়াস শাহ তার সুবে বাঙ্গালা’র সীমা বিস্তৃত করেছিলেন। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব ছিলেন সিরাজ উদদৌলা। তখন বিহার এবং উড়িষ্যাও ছিল বঙ্গ সাম্রাজ্যভুক্ত। যদিও তখনকার বাংলার রাজধানী ছিল মুর্শিদাবাদ। যার অবস্থান গৌড় অঞ্চলে। এমনটা হতেই পারে। কাজের সুবিধার্থে অথবা শাসকের মেজাজ-মর্জিমাফিক রাজধানী স্থানান্তর হয়। তখনও হয়েছিল। যেমন সুবেহ বাঙ্গালার রাজধানী ঢাকার সোনারগাঁও থেকে সরিয়ে নেয়া হয় গৌড়ে। এক সময় সুলতানদের পদভারে প্রকম্পিত হতো সোনারগাঁও। সোনারগাঁও অর্থাৎ ঢাকা। প্রাচীন ‘বঙ্গালা’কেই উপস্থাপন করে ঢাকা। বর্তমানেও সমগ্র বাংলাদেশকেই রিপ্রেজেন্ট করে ঢাকা। তাই ঢাকা আর বাংলাদেশ এক এবং অভিন্ন।
তাই বাংলা শব্দটি উচ্চারিত হলেই নজরে চলে আসে ঢাকা শহর, এক প্রাচীন জনপদ। সম্প্রতি একটি খবর ঢাকাবাসীর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠে আসছে। জন্ম দিচ্ছে বিভ্রম-বিভ্রান্তির। ভারতের পূর্বপ্রান্তে একটি প্রদেশের নাম পশ্চিমবঙ্গ বা পশ্চিম বাংলা। সে অঞ্চলের অধিবাসীগণ স্থির করেছে তারা এখন পশ্চিম শব্দটি ত্যাগ করে শুধু বাংলা নামে পরিচিত হবে। কে কি তার নাম রাখবে সেটি তাদের নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু অন্যের নাম ছিনতাই করে কেন? যেখানে পাশেই রয়েছে বাঙ্গালা বা বাংলাদেশ নামের একটি আলাদা সার্বভৌম রাষ্ট্র। যার ইতিহাস-ঐতিহ্য অন্যরকম, পার্থক্য আছে ভূগোলে-পরিবেশে। বাংলা শব্দটির প্রতি এ অঞ্চলের মানুষজনদের একটা উষ্ণ মমত্ববোধ জাগ্রত থাকে দিবস-রজনী। সে অবস্থায়, অন্য কেউ বাংলা নামে পরিচিত হোক তা কখনো গ্রাহ্যের মধ্যে আনতে পারে না। কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, মালদহ এক সময় বাঙ্গালার শাসনাধীন থাকলেও এসব এলাকা ছিল মূল ভূখণ্ডের বাইরে। বিশাল নদী দিয়ে বিভক্ত, ভাগীরথির এপার-ওপার। বেশ কিছুদিন থেকেই বিষয়টি নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছিল কলকাতায়। এখন নাকি জল্পনার পরিসমাপ্তি ঘটেছে। শুরুর পশ্চিম শব্দটি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বর্তমানে শুধু বাংলা। যা কিনা ঐতিহাসিকভাবে বিভ্রান্তিকর এবং সাংঘর্ষিক। ওদের এমন সিদ্ধান্তে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ানো উচিত ছিল সরকারের। কারণ বাংলাদেশ এবং বাংলা প্রায় অভিন্ন। তাছাড়া বাংলাদেশের অনেক উৎসাহমূলক আচরণে কেবল বাংলা শব্দটি ব্যবহার করা হয়। জাতীয় সঙ্গীতেও বাংলা শব্দটির ঝংকৃত হয় শতকণ্ঠে। যদি আরো একটি বাংলার উদ্ভব ঘটে তাহলে শতকণ্ঠে উচ্চারিত বাংলা কোন্ বাংলাকে তুলে আনবে? বিশ্ববাসী তখন ঢাকা না কলকাতাকে বুঝবে? সরকারিভাবে এখনো কোনো প্রতিবাদ বা পরামর্শ উপস্থাপিত হয়নি। হওয়া উচিত ছিল, বাংলাদেশের স্বার্থেই। একশ্রেণীর ‘বুদ্ধিজীবী’ও এ বিষয়ে শীতল। ব্যাপারটি এমন যে ভাসুরের নাম মুখে আনা বারণ। এরা কেবল স্বপক্ষ বিপক্ষ শব্দ দুটি আওড়াতে পারলেই যেন তাদের কর্ম শেষ ভাবেন। দেশপ্রেমের এমন পরাকাষ্ঠা সত্যিই দুঃখজনক।
আচার-আচরণে সবাই আর লেন্দুপ দর্জি বা বিভীষণদের কাতারভুক্ত নয়। ঈসা খানদের অস্তিত্বও আছে বাংলাদেশে; তাই তারিফ করতেই হয় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কর্ণধারদের। এ ব্যাপারে তারা সরব হয়েছেন, আলোচনা সভার আয়োজন করেছেন। বিলম্বে হলেও বিষয়টি যে দেশপ্রেমকেই তুলে আনে তা হয়তো বলাইবাহুল্য। আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ ‘বাংলা’ হলে প্রশ্নবিদ্ধ হবে বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য। এটি একটি চরম সত্য কথন। জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুসের ভাষ্য হলো ‘পশ্চিমবঙ্গের’ নাম পরিবর্তন করে যদি বাংলা হয়, তাহলে আমরা যে জাতীয় সঙ্গীত গাই ‘আমার সোনার বাংলা’ এর মাধ্যমে কি তবে আমরা পশ্চিমবঙ্গকে বুঝাবো? আমাদের এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে’। এছাড়া ‘বাংলাদেশ ও জয় বাংলা : পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনে অদূরদর্শিতা’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ পাঠ  করেন কবি মুহাম্মদ সামাদ। সে সভায় অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন নিয়ে আরো আগেই জাতীয়ভাবে প্রতিবাদ করার প্রয়োজন ছিল। রাজনীতিবিদ এবং ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসের প্রতি যারা শ্রদ্ধাশীল তাদের সমস্যাটি উপলব্ধি করা দরকার।’
আলোচনা সভার আয়োজন করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট প্রকারান্তরে পশ্চিমবঙ্গের এমন অলিক এবং উদ্ভট সিদ্ধান্তের বিপক্ষে নিন্দা এবং প্রতিবাদকেই সামনে নিয়ে এসেছে। বলাবাহুল্য, এই নিন্দা এবং প্রতিবাদ সমগ্র বাংলাদেশীদের, দেশপ্রেমিকদের। পশ্চিমবঙ্গ একটি জবরদস্তিমূলক নাম। বৃটিশদের আরোপিত ওয়েস্ট ব্যাংগলের বঙ্গানুবাদ মাত্র। এ অঞ্চলটি কখনো বঙ্গ নামে পরিচিত ছিল না। রাঢ় এবং গৌড় অঞ্চলে ছিল এর অবস্থান। ভাষা সাহিত্য অনেকটা এক হলেও ইতিহাস-ঐতিহ্যতো এক নয়। ভূগোলেও ভিন্নতা আছে। বঙ্গ বা বাংলা এলাকায় পা রাখতে হলে ভাগীরথি নদী পার হতে হয়। বখতিয়ার খিলজী বাংলায় প্রবেশ করেছিলেন নদীয়া অতিক্রম করে। মোগলদেরও বাংলা বিজয় সম্পন্ন হয়েছিল সোনারগাঁও এবং ঢাকা পতনের পর। কথিত পশ্চিমবঙ্গ যদি মূল বাংলার অংশ হতো তাহলে বখতিয়ার খিলজী বা শাহবাজ খাঁ-মানসিংহদের ভাগীরথি ডিংগাতে হতো না। কলিকাতা-মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত পৌঁছেই বাংলা বিজয়ের ঘোষণা দিতো। কিন্তু তারাতো এমনটা করেনি। তাদেরকে ঢাকা অবধি আসতে হয়েছে।
যে খোঁড়া যুক্তি সামনে এনে ‘বাংলা’ নাম রাখার ব্যাপারে ওরা হৈ চৈ করছে তা কোনভাবেই ইতিহাসসিদ্ধ নয়। যুক্তিগ্রাহ্য হতে পারে না। কারণ বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন দেশ যেখানে বর্তমান। যদিও এক সময় সে এলাকাগুলো বাংলা সালতানাতের আওতাভুক্ত ছিল। কিন্তু এখন তো আর সে পরিবেশ বা ভূগোল উপস্থিত নাই যে, তাদেরকেও বাংলা পরচিতিতে আনাটা তেমন কোনো অপরাধ বা অসুদ্ধির মধ্যে পড়বে না। বর্তমানে যা একেবারেই অসম্ভব। অন্য আর একটি দেশ বাংলা নাম ধারণ করলে বাংলাদেশের বহু কর্মই প্রশ্নবিদ্ধ হবে পদে পদে। তাছাড়া রাজনৈতিক এবং বৈষয়িক বিবেচনায় বিশ্বব্যাপীই বাংলাদেশ হোঁচট খাবে। কোনো কোনো সময় খেতে বাধ্য হবে। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ আর বাংলাকে বিভাজিত করা হবে দুঃসাধ্য। ভাবনায় ফেলবে অনেককেই। তাতে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবে বাংলাদেশ। তাই পশ্চিমবঙ্গের নাম পাল্টানোর হুজুগ একটি অপরিপক্ব সিদ্ধান্ত। এ রকম ভ্রান্তিবিলাস থেকে সরে আসাটাই বুঝি মঙ্গল উভয়পক্ষের জন্যে। ভারতে অবশ্য অনেক শহর নগর এবং সড়কের নামই পাল্টানো হয়েছে। তা করা হয়েছে পেছনের দিকে সরে গিয়ে। কোনো একটি পৌরানিক নামকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। অথবা আদি নামের দ্বারস্থ হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বাংলা প্রেমিকগণ এমন ভাবনা মাথায় নিলে অসুবিধাটা কোথায়? তারা ‘গৌড়’ বা ‘রাঢ়ে’ ফিরে যেতে পারে অবলীলায়। এতে ইতিহাসকেও মান্য করা হলো। অন্যদিকে বাংলাদেশও বিভ্রান্তি থেকে উদ্ধার পেলো। যদিও প্রবাদ আছে ‘নামে কি বা আসে যায়।’ এর বিপরীতেও কথা আছে ‘নামে নামে যমে টানে।’ তাই বাংলাদেশী বা বঙ্গদেশীদের এখন মহাভাবনায় ফেলেছে দুটি প্রবাদবাক্যের মাঝখানে দাঁড়াতে গিয়ে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ