ঢাকা, রোববার 30 October 2016 ১৫ কার্তিক ১৪২৩, ২৮ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গৃহপালিত বিরোধী দল জাতীয় পার্টির ত্রাহি অবস্থা

[দুই]
জিবলু রহমান : পার্টির ভেতরে অর্থ সংক্রান্ত জটিলতায়ও পড়েছেন মিজান চৌধুরী। দলের অনেকেই এ সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন তার বিরুদ্ধে। ফলে চাপের মুখে নিজের অবস্থানে বেশ কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েন তিনি। এক পর্যায়ে দলত্যাগী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন এবং কাজী জাফর আহমদের সঙ্গেও আলোচনা শুরু করেন তিনি। মিজান চৌধুরী জাপা ত্যাগ করেছেন এমন কথা সর্বত্র আলোচিত হতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত তিনি জাতীয় পার্টি ত্যাগ করেও আওয়ামী লীগে ফিরে যান।
১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের সরকার গঠনের সময় একজন সদস্য প্রয়োজন ছিল। জাতীয় পার্টি ও জাসদ (রব) যুগপৎ নিঃশর্ত সমর্থন দিল। শেখ হাসিনা প্রথম মন্ত্রিসভায় জাপার আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে ঐকমত্যের সরকারে নিলেন। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে আসম আব্দুর রবকেও মন্ত্রী করা হলো। এরই মধ্যে ৩০ মহিলা এমপি কোটায় জাপার ৩জনকে এবং আওয়ামী লীগের ২৭জনকে মহিলা এমপি করা হলো। পরবর্তীতে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ আরও ৭টি আসন এবং ২৭জন মহিলা এমপিসহ বর্তমানে সংসদে আওয়ামী লীগের এমপি সংখ্যা ১৮১ জনের মতো যা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়েও ৫টি বেশি। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকার পরিচালনার দেড় বছর পর্যন্ত এরশাদ শাসনামল বিষয়ে কিছু বলেননি। এর আগে এক বছর ধরে তিনি মঞ্জুকে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে পার্টির মহাসচিব থাকতে বলেছিলেন। মঞ্জু তা শোনেননি। অতঃপর এরশাদ নাজিউর রহমান মঞ্জুরকে মহাসচিব করে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে অব্যাহতি দেন। এখানেই চলে যাচ্ছিলো সবকিছুই।
রাজনীতি ও গণতন্ত্রে সহনশীলতা বড় বেশি জরুরি। আর রাষ্ট্র পরিচালনায় যিনি বা যারা থাকবেন-তাঁদের ক্ষেত্রে কথাটা আরও বেশি করে প্রযোজ্য। এদেশে কেন জানি কোনভাবেই এই অভ্যাস ও ডেমোক্রেটিক কালচারটা আজতক গড়ে উঠলো না। সর্বত্রই একটা মারমুখী ভাব। অগণতান্ত্রিক আচার-আচরণ। বিরোধীদলতো একটা অবস্থানে থাকে, তাদের একটু বেশি কথা বলার সুযোগ সঙ্গতকারণেই থাকে। কিন্তু সরকারি দল, বিশেষভবে সরকার প্রধানতো আর লাগামহীন উক্তি এবং অগণতান্ত্রিক কথাবার্তা বলতে পারেন না। পারা উচিত না। তাও একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, যিনি কিনা আইনের শাসন ও গণতন্ত্র, বাক-স্বাধীনতার কথা অহরহ বলেন।
বলছিলাম, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথা। ঘটনার সময় কাল ১৯৯৬-২০০০ সাল পর্যন্ত। পাবনার এক জনসভায় ভাষণদানকালে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘এরশাদের স্থান রাজপথে না লাল দালান, তা নির্ভর করবে তার আচার-আচরণের উপর।’ আগের দিন সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘বর্তমান স্বৈরাচার সরকারের পতন না ঘটানো পর্যন্ত আমার স্থান হবে রাজপথে। আজ থেকে যাত্রা শুরু হলো।’ ওই দিনে ইতিপূর্বে বেরিয়ে যাওয়া কাজী জাফরআহমদ-শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন সমর্থকরা জাতীয় পার্টির মূলধারায় একীভূত হওয়ার উদ্দেশ্যে একটি সম্মেলন আয়োজন করে। জাপা চেয়ারম্যান এরশাদ প্রধান অতিথির ভাষণে উলেখিত মন্তব্যটি করেছিলেন। ঠিক একদিনের মাথায়ই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরশাদকে লক্ষ করে ‘লাল দালান’ অর্থাৎ আবার জেলে অন্তরীণ করার হুমকি দিয়েছিলেন।
জাপার ঐক্য সম্মেলনে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মন্ত্রিসভায় আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর থাকা না থাকা সম্পর্কে বলেন-‘মঞ্জুর পথ দুটি। হয় তিনি বর্তমান সরকারের মন্ত্রী থাকবেন, নতুবা মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়ে জাতীয় পার্টিতে থাকবেন। সিদ্ধান্তটা তাকেই নিতে হবে। আমরা বিরোধী দলে থাকবো, আমার দলীয় একজন নেতা বর্তমানে সরকারের মন্ত্রী থাকবেন এটা হতে পারে না।’ পাবনার সেই উল্লেখিত জনসভায় আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এরশাদকে লক্ষ্য করে কঠোর ভাষায় বললেন, ‘বর্তমান সরকারের কল্যাণেই তিনি মুক্ত মানুষ হিসেবে মুক্ত বাতাসে এসে রাজনীতি করতে পারছেন। যাদের আমলে একদিন অন্ধকার নির্জন প্রকোষ্ঠে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন, তাদের সঙ্গেই আজ ঐক্য করেছেন। এখন আবার সব ভুলে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতায় যাবার স্বপ্ন দেখছেন। অতীতের কথা ভুলে গেলে চলবে না। একথাও মনে রাখা উচিত, ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতায় যাবার দিন শেষ হয়ে গেছে।’
মঞ্জুর এই কঠোর উক্তিতে ২৪ ঘণ্টা যেতে না যেতেই এরশাদ জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান এবং প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে অব্যাহতি দেন। এরশাদ পত্রিকায় বলেছিলেন-‘যে শিশুকে আমি মানুষ করেছি, মন্ত্রি বানিয়েছি। সেই যদি জনসমক্ষে আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করে, আমি কি করতে পারি শুধুই ‘এ্যাক্ট’ করতে পারি। কি ‘রিএ্যাক্ট’ করবো-বলুন।’
এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু তাৎক্ষণিকভাবে বলেন- ‘আমি কি রিএ্যাক্ট’ করবো। আমি কোনভাবেই আনুষ্ঠানিক চিঠি পাইনি। পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছি। যদি এটা ঘটে থাকে তাহলে তা হবে আমার জন্য নববর্ষের শুভেচ্ছা। আমি এখন মুক্ত বিহঙ্গ-আমার যা করার তাই করবো।’ এসব গত বছরের শেষ দিন পর্যন্ত ঘটেছে। পরে শুনেছি, পত্র-পত্রিকায় দেখেছি-মঞ্জুকে আবার জাপায় ফেরত নেয়ার প্রক্রিয়াও চলছে, অন্যদিকে মঞ্জুও নাকি পৃথক জাপা গঠনের প্রক্রিয়াতেও আছেন। সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন, বৈঠকে মিলিত হয়ে ঘণ্টাব্যাপী কথা বলেছেন। (সূত্রঃ দৈনিক জনতা ১ জানুয়ারি ১৯৯৯)
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে এরশাদকে লাল দালান মানে জেলে পাঠানোর পরোক্ষ হুমকি দিয়েছিলেন, তা কতোটা গণতন্ত্রসম্মত এবং আইনের শাসন কায়েম করার অঙ্গীকার বহন করেছিল?
১৯৯৬ সালের পর জাতীয় পার্টি ক্ষমতাসীন দলের লেজুড়বৃত্তি করবে, না আন্দোলনে যাবে-এ প্রশ্নে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এই বিতর্কের এক পর্যায়ে কাজী জাফর আহমেদ ও নাজিউর রহমান মঞ্জুর পরস্পর বিরোধী দুটি গ্রুপের সৃষ্টি করেন। নাজিউর গ্রুপ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকার পক্ষ নেন। আর কাজী জাফরের গ্রুপ বিএনপির সঙ্গে গিয়ে আন্দোলন করার কথা বলেন। এ নিয়ে এই নেতার মধ্যে হাতাহাতি পর্যন্ত হয়। দলের এই উপদলীয় কোন্দল ঠেকাতে এরশাদ কাজী জাফর আহমদকে পরপর তিন দফায় দল থেকে বহিষ্কার করেন। জিনাত গ্রুপ রাতারাতি শক্তিশালী হওয়া এবং আনোয়ার হোসেন মঞ্জু মন্ত্রিত্ব গ্রহণ দলকে উপদলে বিভক্ত করে। মিজানুর রহমান চৌধুরী, কাজী জাফর আহমেদ ও শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন এরশাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। শেষ পর্যন্ত মিজানুর রহমান চৌধুরী ম্যানেজ হলেও কাজী জাফর আহমেদ ও শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন পৃথক জাতীয় পার্টি গঠন করেন। এই দুই শীর্ষ নেতা নিজেদের গ্রুপ বিলুপ্ত করে পুনরায় মূল দলে ফিরে এসেছেন। কিন্তু সরকারি দলকে সমর্থন করা, না করা নিয়ে বিরোধী জাতীয় পার্টিতে পুনরায় উপদলীয় কোন্দল দেখা দেয়। এই কোন্দলে জাতীয় পার্টি পুনরায় দ্বিখণ্ডিত হয়। মিজানুর রহমান চৌধুরী, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, শেখ শহীদুল ইসলাম, মনিরুল হক চৌধুরী, সরদার আমজাদ হোসেন দল থেকে বের হয়ে গিয়ে পৃথক জাতীয় পার্টি গঠন করেন। তাদের সঙ্গে যা এডভোকেট ফজলে রাব্বী, শরফ উদ্দিন ঝন্টু প্রমুখ যোগ দেন। শেষ পর্যন্ত এরশাদ ২০০০ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের উপর থেকে সমর্থন তুলে নেয়ার ঘোষণা নিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। বিনিময়ে তাকে জেলে যেতে হয়।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা হয়েছেন জাতীয় পার্টি নেত্রী রওশন এরশাদ। তার দল সরকারেও আছে। বিদেশী বন্ধু উন্নয়ন সহযোগীরা সরকার ও বিরোধী দলের নেতানেত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন, এটি কূটনৈতিক শিষ্টাচার। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় অফিসিয়াল বিরোধী দলের নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন না বিদেশী কোন মন্ত্রী। যদিও সরকারি পর্যায়ে অনেক বৈঠক করেছেন তারা। ওই নির্বাচন বর্জনের কারণে সংসদের বাইরে থাকা দেশের সবচেয়ে বড় জোট নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাদের বৈঠক হয় সর্বসময়।
দশম সংসদের পাঁচ মাসেও বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে ঢাকা সফরে আসা বিদেশী গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের সঙ্গে বৈঠক না হওয়ার বিষয়ে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন রওশন এরশাদ। একই সঙ্গে তার সহযোগিতা চান। বলেন, ঢাকা সফরে আসা বিদেশী ব্যক্তিত্ব ও প্রতিনিধি দলকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে তার সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রী যেন তার দপ্তরের সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। রওশন বলেন, আমি বিশ্বাস করি, এটা আমাদের সরকার, সংসদ ও দেশের গণতান্ত্রিক চর্চার ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি এতে সংসদে বিএনপির অবস্থান সম্পর্কিত ভুল ধারণাও কেটে যাবে। চিঠি পাওয়ার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার অধঃস্তনদের তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দেন এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে। কর্মকর্তারাও সেই নির্দেশ তামিল করেন। সরকারের তরফে ঢাকাস্থ বিদেশী মিশনগুলোতে চিঠি পাঠিয়ে বর্তমান সরকার ও বিরোধী দলের কাঠামো সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। খালেদা জিয়া এখন আর বিরোধী দলের নেতা নন- সেটিও স্পষ্ট করা হয়। (সূত্রঃ দৈনিক মানব জমিন ২৪ জুন ২০১৪)
অতি সম্প্রতি রওশন এরশাদ ঢাকায় সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাক্ষাৎ পাননি। নিয়ম অনুযায়ী কোনো বিদেশী রাষ্ট্রীয় অতিথি সফরে এলে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে এটাই নিয়ম। কিন্তু একের পর এক রাষ্ট্রীয় অতিথি দেশে এলেও বিরোধীদলীয় নেতা সাক্ষাৎ পাচ্ছেন না। এতে মানুষের কাছে জাতীয় পার্টি মুখ দেখাতে পারছে না। জাতীয় পার্টি যে কাগুজে বিরোধী দল তা আরও স্পষ্ট হয়ে গেল। নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে দেশের বিরোধী দল কে? বিএনপি যদি প্রধান বিরোধী দল হয় তাহলে জাতীয় পার্টির পরিচয় কী?
২০১৫ সালের মাঝামাঝি বাংলাদেশ সফরে আসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সফরের আগে জানা যায়, সফরকালে মোদি বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। কিন্তু সফরকালে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। বৈঠক করা তো দূরের কথা, মোদি সাক্ষাৎ করতেও আগ্রহ দেখাননি। পরবর্তী সময় রওশন এরশাদের অনুরোধে নামেমাত্র সাক্ষাৎ করেন মোদি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির সফরকালেও সাক্ষাৎ পায়নি এ দলটি।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফরে এসে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন। কিন্তু বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ কিংবা জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ- কারও সঙ্গেই দেখা হয়নি তার। অথচ চীনের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফরে আসার প্রাক-প্রস্তুতি হিসেবে ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত মা মিংকিয়াং কিছুদিন আগে এরশাদের সঙ্গে তার বারিধারার বাসভবন প্রেসিডেন্ট পার্কে বৈঠক করেন। (সূত্রঃ দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ১৮ অক্টোবর ২০১৬)
কার্যালয়, জনবল পেলেও কাজ পাননি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। মন্ত্রী পদমর্যাদার ব্যক্তি হিসেবে সরকারি সব সুযোগ-সুবিধাসহ নিরাপত্তা পেলেও কাজ নেই তার। তিনি সরকারি কার্যালয়েও যান না। সরকারও তাকে সক্রিয় করতে চায় না। নির্বাচনে অংশ নেব না-ঘোষণা দিয়েও ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে রংপুর-৩ আসন থেকে এমপি ‘নির্বাচিত’ হন এরশাদ। ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি এরশাদকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত নিয়োগ করার সরকারি আদেশ জারি করা হয়। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন এরশাদ। ওই দিন বিবৃতিতে তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের ও মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে কাজ করবেন। মধ্যপ্রাচ্যে হারানো বাজার ফিরিয়ে আনতেও কাজ করবেন। (সূত্রঃ দৈনিক সমকাল ২১ জুন ২০১৪)
কেউ কেউ বলেছেন, এরশাদ সবচেয়ে বেশি সময় ধরে সেনাপ্রধান ও একটানা নয় বছর দোর্দণ্ড প্রতাপশালী রাষ্ট্রপতি ছিলেন, সেই এরশাদ কীভাবে বিশেষ দূতের একটি পদ পেয়ে সন্তুষ্ট? নেতা-কর্মীদের এসব তির্যক আলোচনা-সমালোচনার পর এরশাদ জানান, কেন তিনি বিশেষ দূতের পদ পেয়ে সন্তুষ্ট। এ পদ নিয়ে তার পরিকল্পনার কথাও জানান। বলেন, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক রয়েছে। এ ঘনিষ্ঠতা ব্যবহার করে ওইসব দেশে জনশক্তি রপ্তানিসহ দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার করবেন। (সূত্রঃ দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ৬ জুলাই ২০১৪)
এরপর মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো কর্মকাণ্ড নেই প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এরশাদের। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক ঘণ্টার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়েছিলেন। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের জানিয়ে এসেছিলেন, কী কী কাজ তিনি করবেন, তা পরবর্তী সময় জানানো হবে। সরকার এরশাদকে কার্যালয় দিয়েছে জাতীয় সংসদে। পেয়েছেন একান্ত সচিব, সহকারী একান্ত সচিব এবং দু’জন অফিস সহকারী। পাচ্ছেন নিরাপত্তা প্রটোকল। সরকারের কাছ থেকে বাড়ি না নিলেও মন্ত্রী পদমর্যাদার ব্যক্তি হিসেবে গাড়ি, সম্মানী ভাতা সবই পাচ্ছেন এরশাদ।
২০১৪ সালের মধ্যভাগে আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেছেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। (সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৪)
সম্প্রতি দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নাজেহাল জাপা দৃশ্যত দুইভাগে বিভক্ত। এমন অবস্থায় বেশ কিছু দিন ধরে বিরোধী দলে থেকে সরকারের অংশ নেয়ার সমালোচনা এড়াতে দলীয় মন্ত্রীদের পদত্যাগের কথা বলা হচ্ছিল দলে। এরশাদ নিজেও একাধিকবার এ বিষয়ে কথা বলেন। মন্ত্রীদের পদত্যাগ নিয়ে আলোচনা চলাকালেই দলের মন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা প্রশ্ন তুলেন মন্ত্রীদের পদত্যাগের আগে এরশাদকেই পদত্যাগ করতে হবে। কারণ, তিনিও মন্ত্রী মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে আছেন। রওশন এরশাদের অনুসারী নেতারাও এমন যুক্তি দিচ্ছেন। এমন অবস্থায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে-মন্ত্রীরা নিজ নিজ দপ্তর চালালেও মন্ত্রী মর্যাদার বিশেষ দূতের কাজ কি? (সূত্রঃ দৈনিক মানব জমিন ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৪)
এখন দেশে যে অবস্থা চলছে, তাতে রাজনৈতিক দলগুলো বিলীন হওয়ার পথে। অর্থাৎ বিরাজনীতির পথে অগ্রসর হচ্ছে দেশ। তাঁবেদার বিরোধী দল ছাড়া দেশে সরকারবিরোধী কোনো রাজনীতি থাকবে না, দৃশ্যত এ পথে দেশ পরিচালিত হচ্ছে। সরকার সম্প্রচার নীতিমালা করেছে। সেখানে বর্ণিত নীতিসমূহ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। কিছু গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, পাশাপাশি কিছু মানবাধিকার সংগঠনের আশঙ্কা, এ নীতিমালা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করবে। দেশের উন্নয়নসহ সার্বিকভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে এ নীতিমালা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সুশাসনের অভাব প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। গুম, খুন, অপহরণ ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে ক্রমান্বয়ে। কারণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৯১ সালের পর থেকে দেশে রাজনীতিতে দলীয়করণের সংস্কৃতি চালু হয়েছে, যা দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। জনগণকে সরকারের তরফ থেকে দুভাবে ভাগ করা হয়েছে। যারা যখন ক্ষমতায় থাকে, অর্থাৎ সরকারি দল (বর্তমানে আওয়ামী লীগ) ও তাদের সঙ্গে যারা জড়িত দলীয় লোকজন প্রথম শ্রেণির নাগরিক হিসেবে গণ্য হন। আর তাঁদের বাইরে সাধারণ জনগণ দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, সুযোগ-সুবিধা বণ্টন ছাড়াও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে শ্রেণিভেদ অনুযায়ী আলাদা করে দেখা হচ্ছে। আইন প্রয়োগে প্রথম শ্রেণির নাগরিকের জন্য করা হয় নমনীয় আচরণ। আরা যাঁরা ক্ষমতাসীনদের বাইরে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক, তাঁদের সঙ্গে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করা হয়, হয়রানির অভিযোগও পাওয়া যায়। পার্টির লোকজন আইনের ঊর্ধ্বে ওঠায় অপরাধীরা যেকোনো প্রক্রিয়ায় সরকারি দলের খাতায় নাম লেখায়। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির এটি অন্যতম প্রধান কারণ।
সে ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সরকারের পরিবর্তনের সুযোগ না থাকলে কোনো না কোনোভাবে আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে এবং তার মাধ্যমে অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অবাঞ্ছিত সংগঠনের নেতৃত্বে সরকারের পতন হতে পারে। সারা দেশে রাজনৈতিক গুমোট ভাব চলছে। এটা ঝড়ের পূর্বাভাস কি না, তা নিয়ে জনমনে আশঙ্কা আছে। কেন না, এ ধরনের পরিস্থিতিতে কেবল সরকারই বিপাকে পড়বে তা নয়, চরম বিশৃঙ্খলা ও হানাহানির সৃষ্টি হয়ে সাধারণ জনগণের জানমালেরও ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে, যা কারও কাম্য হতে পারে না।
এ পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় পার্টির বর্তমান রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ করণীয় কী হতে পারে? জাতীয় পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেট-ঘোষিত বিরোধী দল। জনগণের পক্ষে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার গুরুদায়িত্ব বিরোধী দলের। সরকারের অংশ হিসেবে মন্ত্রিপরিষদে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য থাকলে ওই পার্টির পক্ষে সরকারের জবাবদিহি কার্যক্রম গ্রহণযোগ্য হয় না।
মন্ত্রিপরিষদের অংশ হিসেবে সাংবিধানিক কারণে সংসদে সরকারি প্রস্তাবে জাতীয় পার্টি ‘না’ ভোট দিতে পারবে না। দিলে জাতীয় পার্টির মন্ত্রীদেরও সরকারি প্রস্তাবে ‘না’ ভোট দিতে হবে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বর্ণিত বিধানের কারণে। সে ক্ষেত্রে তাঁদের মন্ত্রিত্ব থাকে না। সংবিধানের ৫৫(৩) ধারায় বর্ণিত, ‘মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের নিকট দায়ী থাকিবেন’ লঙ্ঘিত হবে। ফলে তাঁরা মন্ত্রিপরিষদের সদস্য হিসেবে বহাল থাকার আইনগত অধিকার হারাবেন। আর সবর্দা ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল হিসেবে গণ্য করা যায় না।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি আমরা স্বাধীন করেছি এবং এই রাষ্ট্রের স্বাধীনতার নির্মাতারা একটি সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন নির্ভেজাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যই। আমাদের সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাই হচ্ছে জনগণের ভোটে, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে নির্বাচিত হয়ে দেশ শাসন করা।
বাংলাদেশে ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের আরও বড় কুফল হচ্ছে জাতিসত্তা ও জাতীয় বৈশিষ্ট্যের ওপর এর কুপ্রভাব। বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতি চীন বা সিঙ্গাপুরের মতো নয়। বাংলাদেশের মানুষ মুক্তসমাজ, মানবাধিকার ও প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামী জাতি হিসেবে অনন্য। জাতিগত এই বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলাদেশে একদলীয় শাসন, বাকশাল, সামরিক শাসন বা উপনিবেশবাদ কোনো কিছুই টিকতে পারেনি। যদি পারত তাহলে বাংলাদেশ আর বাংলাদেশ হতো না। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারও যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বাংলাদেশ আর বাংলাদেশের মতো থাকবে না।
৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর থেকে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সংকট নিরসনে সবার অংশগ্রহণে একদিকে মধ্যবর্তী ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি তোলা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী উত্তরে একবার বলেছেন, আরেকটি নির্বাচন কি বিএনপি-জামায়াতকে ক্ষমতায় আনার জন্য চাওয়া হচ্ছে? এমন বক্তব্য প্রাথমিকভাবেই ভুল এ কারণে যে উচ্চ আদালতের রায়ের কারণে নির্বাচনে এখন জামায়াতের অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। আর মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে জিতে এলে তা হতে দেওয়াই গণতন্ত্র এবং আমাদের সংবিধানের সারকথা।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতা ছাড়লে জাতীয় পার্টির নেতাদের ‘বোরকা পার্টিতে’ যোগ দিতে হবে। ’৯০-এর পট পরিবর্তনের পর যেমন সিনিয়র নেতাদের অনেকেই বোরকা পড়ে পালিয়েছিলেন; সামনে আবার সে অবস্থায় পড়তে হবে জাতীয় পার্টির নেতাদের। কারণ বিএনপিসহ সাধারণ মানুষ মনে করে জাতীয় পার্টির কারণে ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন করতে পেরেছে আওয়ামী লীগ।
বর্তমানে দালালচক্রের কারণে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের কৌশলের যে খাদে পড়েছে সেখান থেকে তুলে আনা কঠিন হবে। বর্তমানে দেশ যেভাবে চলছে এভাবে বেশিদিন চলবে না। পরিবর্তন হবেই। তখন জাতীয় পার্টির এই সুবিধাভোগী দালালদের ইরাকের ক্ষমতাসীন নূরে আল মালিকী সরকারের মন্ত্রী এমপিদের মতো বোরকা পড়ে পালাতে হবে। ইরাকের আইসিস বিভিন্ন শহর বন্দর দখল করছে আর ক্ষমতাসীন দলের নেতারা জীবন বাঁচাতে বোরকা পড়ে, নর্তকীর পোশাক পড়ে পালাচ্ছেন; জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন জাপার নেতাদের সে পরিণতি হবে না তার নিশ্চয়তা কে দেবে? [সমাপ্ত]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ