ঢাকা, সোমবার 31 October 2016 ১৬ কার্তিক ১৪২৩, ২৯ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গাদের অনিশ্চিত গন্তব্যে যাত্রা

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা : মহামতি খ্যাত গৌতমবুদ্ধ প্রবর্তিত বৌদ্ধধর্মকে পৃথিবীর সবচেয় শান্তিপূর্ণ ও অহিংস ধর্ম হিসাবে মনে করা হয়। বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও তাদের ধর্ম প্রচারের সময় ‘অহিংসা পরমধর্ম্মং’ তথা বিদ্বেষহীনতাই নিজেদের ধর্মের মর্মবাণী হিসাবে প্রচার করে থাকেন। বৌদ্ধ ধর্মে জীব হত্যাকে মহাপাপ বলা হলেও মায়ানমারের বৌদ্ধ উগ্রবাদীরা রোহিঙ্গা মুসলমানদের যেভাবে হত্যা করে চলেছে, তাতে তাদের দাবির অসারতায় দিবালোকের মত ষ্পষ্ট হয়ে ওঠে। মিয়ানমারের প্রাচীন রোসাঙ্গের অধিবাসী মুসলমানরা এখন বৌদ্ধ উগ্রপন্থীদের ধর্মান্ধতায় শুধু জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তায় ভুগছেন না, বরং তারা স্বদেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে যাত্রা করতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু বিশ্ব জনমত সম্পূর্ণ নির্বিকার। মুসলমানরাও সঠিক দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না।
কথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যোদ্ধারা ও তথাকথিত মানবাধিকারের ধ্বজাধারীরা তাদের ইন্দ্রিয়গুলোকে অনুভূতির বাইরে রেখেছেন বলেই মনে হচ্ছে। বিশ্বে অর্ধশতাধিক মুসলিম রাষ্ট্র থাকলেও রোহিঙ্গা মুসলমানদের দুর্দিনে তারাও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না বা চেষ্টাও করছে না। মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষায় প্রতিষ্ঠিত ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি)কে মাঝে মাঝে নর্তন-কুর্দন করতে দেখা গেলেও তা কখনোই ফলদায়ক হতে দেখা যায় না। মূলত রোহিঙ্গা সমস্যা যে তিমিরে ছিল সে তিমিরেই রয়ে গেছে। ফলে প্রতিনিয়ত মিয়ানমারের রাজপথ মুসলমানদের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে। সহায়-সম্পদ, স্বজন ও ভিটেমাটি হারিয়ে তারা এখন ইতিহাসের মারাত্মক ভাগ্যবিড়ম্বনার শিকার।
সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়েছে। নির্বিবাদে তাদেরকে হত্যা ও বাস্তুচ্যুত করা হচ্ছে। আবালবৃদ্ধবনিতার কেউই এই বৌদ্ধ ধর্মান্ধদের জিঘাংসা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। হয়তো তাদের স্থান হচ্ছে কোন বনে-জঙ্গলে বা উন্মুক্ত কোন অনিরাপদ স্থানে। নির্যাতিত রোহিঙ্গারা এখন নিজ দেশেই পরবাসী জীবন যাপন করছেন। গত বছরের সাধারণ নির্বাচনের পর মনে করা হয়েছিল যে নতুন সরকার মুসলমানদের সমস্যা সমাধানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কিন্তু শান্তিতে নোবেল বিজয়ী নেত্রী অং সান সূচীর দল ক্ষমতায় আসলেও পূর্বাবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি বরং অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। সম্প্রতি মিয়ানমারের একটি গ্রামের প্রায় দুই হাজার মুসলমানকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। বার্মিজ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ওপর সাম্প্রতিক হামলার জের ধরে সংখ্যালঘু মুসলমানদের বিরুদ্ধে এই নির্মম পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
মিয়ানমারের সেনারা মধ্যাঞ্চলীয় মান্দালাই প্রদেশের ‘কি কান পিন’ গ্রামে প্রবেশ করে সেখানকার সব মুসলিম অধিবাসীকে গ্রামটি ত্যাগ করার নির্দেশ দেয়। এ সময় জরুরি প্রয়োজনীয় সামগ্রী ছাড়া হতভাগ্য রোহিঙ্গাদের অন্য কিছু নিতে দেয়া হয়নি। বর্তমানে এসব মুসলমান পার্শ্ববর্তী বন ও ধান ক্ষেতে লুকিয়ে দিনাতিপাত করছেন। যা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের মারাত্মক লংঘন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো রহস্যজনকভাবে নীরব।
রোহিঙ্গা মুসলমানদের দুর্দশা এখন নিত্যদিনের সঙ্গী হয়েছে। এর আগে ২০১২ সালের জুনে মিয়ানমারে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গায় নিহত হন কয়েকশ রোহিঙ্গা মুসলিম। বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন রাখাইন রাজ্যের দুটো গ্রামের ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় উগ্রপন্থী বৌদ্ধরা। অন্তত এক হাজার ৬০০ ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। দাঙ্গায় অন্তত ৩০ হাজার মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হন। উগ্র বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সহায়তায় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাসাকা, পুলিশ ও ‘লুন্টিন’ বাহিনী এই মুসলিমবিরোধী তান্ডব চালায়। জাতিসংঘের মতে, বর্তমান বিশ্বের অধিক নিগৃহীত সংখ্যালঘু হচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলিমরা।
এদিকে মিয়ানমারের সংঘাতকবলিত রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্বিচারে গ্রেফতার এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের অভিযোগ তদন্তের জন্য সে দেশের সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থার বিশেষজ্ঞরা। কয়েক সপ্তাহ আগে বাংলাদেশের সীমান্তের কাছে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কয়েকটি চৌকিতে হামলায় ৯ জন পুলিশ নিহত হবার পর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী সে অঞ্চলে ত্রাণকর্মী এবং সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। সে হামলার জন্য রোহিঙ্গা মুসলমানদের দায়ী করছে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী।
সে এলাকায় মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন চালাচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা বলছেন মিয়ানমারে তাদের স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করে জানা যাচ্ছে যে, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা রোহিঙ্গা মুসলমানদের বহু বাড়িতে আগুন দিয়েছে এবং অনেককে গুলী করে মেরেছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বৌদ্ধ এবং সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের মধ্যে অস্থিরতা চলছে। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের সে দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না।
সম্প্রতি রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সংঘাত শুরুর পর থেকে স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে যাতায়াত সীমিত করে দিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। কিন্তু রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীডনের বিভিন্ন ছবি এবং ভিডিও নানাভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। ছবি এবং ভিডিও বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালাচ্ছে। গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় চলমান সংঘাত নিয়ে তদন্তের জন্য এ প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। বহু কূটনীতিক এবং সাহায্য সংস্থাগুলো রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে এমন কিছু বলতে চায় না যেটি বার্মার সরকারকে বিব্রত বা রাগান্বিত করতে পারে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রোহিঙ্গা আদিবাসী জনগোষ্ঠী পশ্চিম মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। এরা ইসলাম ধমের্র অনুসারি। রোহিঙ্গাদের আলাদা ভাষা থাকলেও তা অলিখিত। মায়ানমারের আকিয়াব, রেথেডাং, বুথিডাং, মংডু, কিয়ক্টাও, মাম্ব্রা, পাত্তরকিল্লা এলাকায় এদের বাস। প্রায় ৮,০০,০০০ রোহিঙ্গা মায়ানমারে বসবাস করে। মায়ানমার ছাড়াও ৫ লক্ষের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এবং প্রায় ৫লাখ সৌদি আরবে বাস করে বলে ধারণা করা হয়, যারা বিভিন্ন সময় বার্মা সরকারের নির্যাতনের কারণে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। জাতিসংঘের তথ্যমতে, রোহিঙ্গারা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী।
বর্তমান মিয়ানমারের রোহিং (আরাকানের পুরনো নাম) এলাকায় এ জনগোষ্ঠীর বসবাস। রাখাইন প্রদেশের উত্তর অংশে বাঙালি, পার্সিয়ান, তুর্কি, মোগল, আরবীয় ও পাঠানরা বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর বসতি স্থাপন করেছে। তাদের কথ্য ভাষায় চট্টগ্রামের স্থানীয় উচ্চারণের প্রভাব রয়েছে। উর্দু, হিন্দি, আরবি শব্দও রয়েছে। রাখাইনে দুটি সম্প্রদায়ের বসবাস ‘মগ’ ও ‘রোহিঙ্গা’। মগরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। মগের মুল্লুক কথাটি বাংলাদেশে পরিচিত। দস্যুবৃত্তির কারণেই এমন নাম হয়েছে ‘মগ’দের। এক সময় তাদের দৌরাত্ম্য ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। মোগলরা তাদের তাড়া করে জঙ্গলে ফেরত পাঠায়। উল্লেখ্য, ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের রোহিঙ্গা স্বাধীন রাজ্য ছিল। মিয়ানমারের রাজা বোদাওফায়া এ রাজ্য দখল করার পর বৌদ্ধ আধিপত্য শুরু হয়।
১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করে এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু হয়। সে সময়ে পার্লামেন্টে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। এ জনগোষ্ঠীর কয়েকজন পদস্থ সরকারি দায়িত্বও পালন করেন। কিন্তু ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে মিয়ানমারের যাত্রাপথ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে। রোহিঙ্গাদের জন্য শুরু হয় দুর্ভোগের নতুন অধ্যায়।
সামরিক জান্তা তাদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে। তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ধর্মীয়ভাবেও অত্যাচার করা হতে থাকে। নামাজ আদায়ে বাধা দেওয়া হয়। হত্যা-ধর্ষণ হয়ে পড়ে নিয়মিত ঘটনা। সম্পত্তি জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়। বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হতে থাকে। তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নেই। বিয়ে করার অনুমতি নেই। সন্তান হলে নিবন্ধন নেই। জাতিগত পরিচয় প্রকাশ করতে দেওয়া হয় না। সংখ্যা যাতে না বাড়ে, সে জন্য আরোপিত হয় একের পর এক বিধিনিষেধ। মিয়ানমারের মূল ভূখন্ডের অনেকের কাছেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ‘কালা’ নামে পরিচিত। বাঙালিদেরও তারা ‘কালা’ বলে। ভারতীয়দের একই পরিচিতি। এ পরিচয়ে প্রকাশ পায় সীমাহীন ঘৃণা।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বলা হয় “বিশ্বের সবচেয়ে কম প্রত্যাশিত জনপদ” এবং “বিশ্বের অন্যতম নিগৃহীত সংখ্যালঘু”। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের ফলে তারা নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হন। তারা সরকারি অনুমতি ছাড়া ভ্রমণ করতে পারে না, জমির মালিক হতে পারে না এবং দুইটির বেশি সন্তান না নেওয়ার অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে হয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দেয়া তথ্য অনুসারে, ১৯৭৮ সাল থেকে মায়ানমারের মুসলিম রোহিঙ্গারা মানবাধিকার লংঘনের শিকার হচ্ছে এবং তারা প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে রোহিঙ্গাদের চলাচলের স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং তাদের অধিকাংশের বার্মার নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। তাদের উপর বিভিন্ন রকম অন্যায় ও অবৈধ কর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের জমি জবর-দখল করা, জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা, ঘর-বাড়ি ধ্বংস করা এবং বিয়ের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও উত্তর রাখাইন রাজ্যে গত দশকে বাধ্যতামূলক শ্রমিকের কাজ করা কমেছে তারপরও রোহিঙ্গাদের রাস্তার কাজে ও সেনা ক্যাম্পে বাধ্যতামূলক শ্রমিকের কাজ করতে হচ্ছে।
১৯৭৮ সালে মায়ানমার সেনাবাহিনীর ‘নাগামান’ (‘ড্রাগন রাজা’) অভিযানের ফলে প্রায় দুই লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। সরকারিভাবে এই অভিযান ছিল প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যে সব বিদেশী অবৈধভাবে মায়ানমারে বসবাস করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এই সেনা অভিযান সরাসরি বেসামরিক রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চলছিল এবং ফলে ব্যাপক হত্যা, ধর্ষণ ও মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা ঘটে।
১৯৯১-৯২ সালে একটি নতুন দাঙ্গায় প্রায় আড়াই লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে। তারা জানায় রোহিঙ্গাদের বার্মায় বাধ্যতামূলক শ্রম প্রদান করতে হয়। এছাড়াও হত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হতে হয়। রোহিঙ্গাদের কোনো প্রকার পারিশ্রমিক ছাড়াই কাজ করতে হত। ২০০৫ সালে জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে, কিন্তু রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে বিভিন্ন ধরণের মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগে এই উদ্যোগ ভেস্তে যায়।
অনেক ডাচ পর্তুগীজ সন্তান ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়েছে- এমন ঘটনা নিয়ে একটি গল্প ডাচ ইতিহাসে পাওয়া যায়। জানা যায়, আরাকানের ম্রাউক-ই রাজবংশের রাজত্বকালে কোনো বিদেশী ইচ্ছা করলে আরাকানী নারীদের বিয়ে করতে পারতো। কিন্তু আরাকান থেকে চলে যাওয়ার সময় আরাকানী স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে যেতে পারতো না। ডাচ ইতিহাসের ভাষ্য অনুযায়ী-
This prohibition often constituted a serious hardship in individual cases and we find Europeans resorting to all sorts of expedients to smuggle their families out of the country. There were cases of wives being hidden in large martaban jars and Smuggled on board ship. The Pious Dutch Calvinists were also not a little worried because their children left in Arakan were brought up to be Muslims.
অর্থাৎ- আরাকানে অবস্থানরত ডাচ’দের ফেলে যাওয়া সন্তান-সন্তুতি মুসলমান হয়ে যেত; বিধায় চলে যাওয়ার সময় বড় বড় মটকায় স্ত্রী-পুত্রদের লুকিয়ে আরাকান থেকে নিয়ে যেত ডাচরা। এ ঘটনাটি নিঃসন্দেহে তদানীন্তন আরাকানের সামাজিক সাংস্কৃতিক অবস্থান কেমন ছিল তা জানতে আমাদের সাহায্য করে। অর্থাৎ ইসলামই ছিলো তৎকালীন আরাকানের সমাজ জীবনে মূল প্রভাব বিস্তারকারী শক্তি।
মহাকবি আলাওল ‘পদ্মাবতী’ কাব্যে রোসাঙ্গের জনগোষ্ঠীর একটি পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দিয়েছেন, “নানা দেশী নানা লোক শুনিয়া রোসাঙ্গ ভোগ আইসন্ত নৃপ ছায়াতলে’। সন্দেহের অবকাশ নেই যে, রোহিঙ্গারাই ইতিহাস প্রসিদ্ধ রোসাঙ্গ সভ্যতার ধারক বাহক। তবে এটুকু বলা চলে, নানা জাতির সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে এই রোহিঙ্গা জাতি।
মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানগণ বিশ্বের সবচেয়ে ভাগ্যাহত জনগোষ্ঠী। এককালে যাদের ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তি এখন তারাই সন্ত্রাসী বৌদ্ধদের অমানুষিক নির্যাতনের শিকার। মিয়ানমারের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাগ্য বিড়ম্বনার ইতিহাস যে কাউকে তাড়িত করবে। এই উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সর্বপ্রথম যে কয়টি এলাকায় মুসলিম বসতি গড়ে উঠে, আরাকান তার মধ্যে অন্যতম। রোহিঙ্গারা সেই আরাকানী মুসলমানের বংশধর। এক সময় আরাকানে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৪৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম শাসন দুইশ বছরেরও অধিককাল স্থায়ী হয়। ১৬৩১ সাল থেকে ১৬৩৫ সাল পর্যন্ত আরাকানে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ হয়। এরপর মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। ১৬৬০ সালে যালিম রাজা থান্দথুধম্মা আরাকান রাজ্যে আশ্রিত মোঘল সম্রাট শাহযাদা সুজাকে সপরিবারে হত্যা করে। এরপর শুরু হয় মুসলমানের উপর তার নিষ্ঠুর অমানবিক অত্যাচার নিপীড়ন। প্রায় সাড়ে তিনশ বছর মুসলমানদের কাটাতে হয় এই দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে।
১৭৮০ সালে বর্মী রাজা বোধাপোয়া আরাকান দখল করে নেয়। সেও ছিল ঘোর মুসলিমবিদ্বেষী। বর্মী রাজা ঢালাও ভাবে মুসলিম নিধন করতে থাকে। ১৮২৮ সালে বার্মা ইংরেজদের শাসনে চলে যায়। তবে ১৯৩৭ সালে বার্মা স্বায়ত্তশাসন লাভের পর বৌদ্ধদের পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ব্যাপক রূপ নেয় এবং তারা প্রায় ৩০ লাখ মুসলিম হত্যা করে। ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। তারা থেকে যায় ভাগ্য বিড়ম্বিত। স্বাধীন দেশের সরকার তাদেরকে নাগরিকত্ব দূরে থাক, মানবিক অধিকারটুকুও দেয়নি।
নাসাকা বাহিনী ও সন্ত্রাসী বৌদ্ধদের হামলার শিকার হয়ে রোহিঙ্গা মুসলিমরা পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশসহ বিশ্বের আনাচে-কানাচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। এরা বিশ্বের রাষ্ট্রহীন নাগরিক। ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের যালিম সরকার রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিকত্ব বাতিল করে দেয় এবং সরকারিভাবে তাদেরকে সেখানে ‘বসবাসকারী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাদের নাগরিক অধিকার নেই। নেই কোনো সাংবিধানিক ও সামাজিক অধিকার। নিজ দেশে পরবাসী তারা। তারা মিয়ানমারের অন্য প্রদেশে অনুমতি ছাড়া যেতে পারে না। এক সময় যেখানে রোহিঙ্গারা ছিল সংখ্যাগুরু আজ সেখানে তারা সংখ্যালঘু। রাখাইন (মগ সন্ত্রাসী) বৌদ্ধদের সেখানে এনে মুসলিমদের সংখ্যালঘু বানানো হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এরা বাংলাদেশ থেকে আগত বাঙালি আদিগোষ্ঠী। এদের সঙ্গে মিয়ানমারের কোনো সম্পর্ক নেই। সে মতামত প্রতিষ্ঠা করতে মিয়ানমার সরকার তাদের উপর এমন অমানবিক নির্যাতন চালায়, যাতে করে তারা দেশ ছেড়ে পালায় অথবা দাসত্ব স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়। এদের এ নাজুক পরিস্থিতি দেখে মেডিসিনস স্যান ফ্রন্টিয়ারস বলেছে, পৃথিবী থেকে বিলুপ্তপ্রায় আদিগোষ্ঠীর তালিকায় ভয়াবহ অবস্থানে রয়েছে রোহিঙ্গারা। এছাড়া সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার পর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীসহ মিয়ানমারের সব মিলিয়ে ১৩৫টি আদিবাসী গোষ্ঠীর উপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে চলেছে। তবে বৌদ্ধ ধর্মান্ধ সামরিক জান্তাদের চোখে রোহিঙ্গা মুসলমানরা ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীতে পরিগণিত হয়। ফলে রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতায় মুসলমান আদিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ঠেকাতে তাদের ঘরবাড়ি পর্যন্ত পুড়িয়ে দেয়া হয়। রোহিঙ্গাদের সাধারণত স্থানীয়ভাবে ‘কালারস’ নামে অভিহিত করা হয়।
সাম্প্রতিক এ দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমারের ‘দ্য ভয়েস’ নামক সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি লেখা থেকে উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে। সাময়িকীতে একজন বর্মী পাঠক তার মতামত দিতে গিয়ে লিখেছে, “আমাদের উচিত ‘কালারস’ হত্যা করা অথবা ধ্বংস করা, তা না হলে এ দেশ থেকে বৌদ্ধ ধর্মের অস্তিত্ব মুছে যাবে।” এমন উদ্ধৃতি থেকে সহজেই বোঝা যায়, বার্মিজ ও রোহিঙ্গারা ধর্মগত দিক থেকে দ্বান্দ্বিক ও পৃথক সত্তার অধিকারী। সংখ্যাগরিষ্ঠ যালিম বার্মিজরা চায় সেখানে বৌদ্ধদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক। সে মতবাদের আলোকে রোহিঙ্গারা ক্ষুদ্র ও ভিনদেশী বলে পরিচিত। দেশটির সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রায়ও তাদের কোনো স্থান নেই বলে বিশ্বাস করে নেপিডোর সরকার। রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করা হয়েছে মিয়ানমার বিদ্বেষী ও বৌদ্ধদের শত্রু হিসেবে। শুধু তাই নয়, জাতীয়তার প্রশ্নে তাদের গোনায় ধরা হয় না। অর্থাৎ অভিন্ন পতাকার তলে মিয়ানমারের জাতীয়তার স্বীকৃতি পায়নি তারা। ফলে যাযাবরের জীবন কাটাতে হচ্ছে তাদের।
সাম্প্রতিক এক হিসাবে জানা যায়, প্রায় তিন লাখ শরণার্থী রোহিঙ্গা বাস করছে বাংলাদেশে। কিন্তু এরা কোনোভাবেই বাংলাদেশী নাগরিক নয়- তা আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত। ফলে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাদের চলে যেতে জোর তাগিদ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু মিয়ানমার সীমান্তে কাঁটাতার ডিঙিয়ে তারা নিজ দেশে ফিরতে পারছে না। এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের পরিচয় এসে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রহীন জাতিতে। তাছাড়া আরাকান অঞ্চলে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও তা রোধ করার জন্য কৌশল প্রণয়ন করেছে বর্মী সরকার। অনুমতি ব্যতীত মুসলমানদের বিয়ে করার সুযোগ নেই। আর অনুমতি দিলেও রোহিঙ্গাদের জন্য বিয়ের আগে নিবন্ধন করার বাধ্যবাধকতা করা হয়েছে। ফলে নিজ দেশেই ফেরারি জীবনযাপন করে তারা। আর এ নির্মম অত্যাচার তাদের প্রতিশোধপরায়ণ করে তুলেছে। বহুদিনের জমানো ক্ষোভের বিস্ফোরণে জ্বলে উঠেছে রোহিঙ্গারা।
অন্যদিকে ১৭০০ শতকের সময় এশিয়ার বিখ্যাত বাণিজ্য নগরী বলে পরিচিত আরাকানের এমরায়ুক ইউ শহরের স্বাধীন সুলতান ছিলেন একজন মুসলমান। এথেকে বোঝা যায়, রোহিঙ্গা ও দেশটির অন্য আদিবাসী মুসলমানরা মিয়ানমারে ভুঁইফোড় অথবা উড়ে আসা অধিবাসী নয়। কিন্তু উগ্রবাদী বৌদ্ধরা মায়ানমারে মুসলামানদের অস্তিত্বই স্বীকার করতেই নারাজ। তারা যেকোন মূল্যে সেদেশ থেকে মুসলামানদের নির্মূল বা উৎখাত করতে চায়। তাদের সে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবেই বিভিন্ন অজুহাতে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর হত্যাযজ্ঞ ও নির্মম নিধনযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে উগ্র বৌদ্ধদের নির্মমতা ভয়াবহভাবে বেড়েই চলেছে।
কয়েকদিন আগে রোহিঙ্গাদের একটি গ্রামে সেদেশের সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে মুসলমানদের বসতভিটা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিবেক সম্পূর্ণ নির্বিকার। ভাগ্যবিড়ম্বিত রোহিঙ্গা মুসলমানরা কি এক সময়ে কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে না তাদের হৃত গৌরব ফিরে পাবে-এ প্রশ্ন এখন বিশ্বের তাবৎ শান্তিপ্রিয় ও আত্মসচেতন মানুষের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ