ঢাকা, সোমবার 31 October 2016 ১৬ কার্তিক ১৪২৩, ২৯ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করুন

সরকারের তরফ থেকে বিগত ২-৩ বছর ধরে অষ্টপ্রহর দাবি করা হচ্ছে যে, দেশে বিপুল উন্নয়ন হচ্ছে। এতো বেশি উন্নয়ন হচ্ছে যে উন্নয়নের সেই ধারাকে অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজনে গণতন্ত্রকে কাটছাট করতে হবে। এর পাশাপাশি গত বৃহস্পতিবার ঢাকার বিভিন্ন সংবাদপত্রে এই মর্মে ফলাও করে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে যে, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের দিক দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭ নম্বরে। বাংলাদেশের নিচে রয়েছে আফগানিস্তান। বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে পাকিস্তান। ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ প্রভৃতি ছোট ছোট দেশও বাংলাদেশের ওপরে। এ বিষয়টি আজ আমি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবো। তার আগে উন্নয়নের স্বার্থে গণতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার যে থিওরি সরকারের তরফ থেকে দেয়া হচ্ছে সেটা নিয়ে দুটো কথা বলা দরকার।
উন্নয়নের স্বার্থে গণতন্ত্রকে কাটছাট করতে হবে অথবা গণতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, এই ধরনের কথা বর্তমান সরকার নতুন করে বলছে না। এসব কথা শোনা গেছে অতীতে, সেই পাকিস্তান আমলে। তখন ক্ষমতায় ছিলেন জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ূব খান। জেনারেল আইয়ূব খান দেশবাসীর কাছে উন্নয়ন ও গণতন্ত্র সম্পর্কে একই রকম বক্তব্য দিয়েছিলেন। তার বক্তব্য ছিলো, Development rather than Democracy অর্থাৎ গণতন্ত্রের চেয়ে উন্নয়ন আগে দরকার। আইয়ূব খানের এই দর্শনের বিরুদ্ধে তৎকালীন সমগ্র পূর্ব বাংলায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পূর্ব বাংলার প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক দল সে সময় মন্তব্য করেন যে, মানুষ একটির পরিবর্তে আরেকটি চায় না অথবা একটিকে কাটছাট করে আরেকটির বিকাশ চায় না। মানুষ চায়, গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন দুটিই পাশাপাশি চলুক। নির্ভেজাল গণতন্ত্র থাকলেও যে উন্নয়ন হয় তার জলজ্যান্ত নজির হলো আমেরিকা ও পাশ্চাত্যের উন্নত দেশগুলি এবং এই উপমহাদেশে ভারত। পশ্চিমা গণতন্ত্রের কথা বাদই দিলাম। আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতবর্ষে আজ ৬৯ বছর হলো গণতন্ত্র সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। গণতন্ত্রের এই স্বর্ণযুগেও এসব দেশে, বিশেষ করে ভারতে, একটি বারের জন্যও গণতন্ত্র ব্যাহত হয়নি। গণতান্ত্রিক সমাজ এবং অর্থনৈতিক পরিকাঠামোতে এসব দেশ অনেক উন্নতি করেছে। ভারতে এক সময় প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। তার পরেও ভারতে একটি বারের জন্যও গণতন্ত্র বিপর্যস্ত হয় নাই। সেই ধারা বাংলাদেশে অব্যাহত রাখা হোক।
গণতন্ত্রের জন্য অতীতে পূর্ব বাংলার মানুষ অনেক দুর্ভোগ সয়েছে। কিন্তু গণতন্ত্রের আকুতি থেকে তারা এক চুলও নড়েনি। আওয়ামী লীগ নিজেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের দোহাই দিয়ে গণতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আইয়ূব খানের তীব্র সমালোচনা করেছে এবং গণতন্ত্রের দাবিতে রাজপথে থেকেছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, আজ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গিয়ে তার সমস্ত অতীত ভুলে গেছে এবং আইয়ূব খানের মতো স্বৈরাচারী সরকারের ভাষায় গণতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে। কিন্তু আইয়ূব খানের প্রচেষ্টা অতীতে যেমন সফল হয়নি তেমনি বর্তমান সরকারের প্রচেষ্টা সফল হবে না। এখন আমরা ফিরে যাচ্ছি আমাদের মূল আলোচনায়।
উন্নয়নের কথা বলতে গিয়ে সরকার অনেক নতুন নতুন থিওরি দেশবাসীকে শুনিয়েছে। বলা হচ্ছে যে, চলতি প্রান্তিকে বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধির দিক দিয়ে শুধুমাত্র লক্ষ্যমাত্রাই অর্জন করেনি, বরং লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ৭.১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। সরকারের এসব দাবিকে আমরা ভিত্তিহীন বলছি না। কিন্তু সরকারের এসব দাবি এবং আরো অনেক দাবি অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সরকার দাবি করছে যে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই নি¤œ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। ধীরগতিতে উন্নতি হচ্ছে। সেই গতি যদি অব্যাহত থাকে তাহলে বাংলাদেশ শীঘ্রই মধ্যম আয়ের দেশে প্রবেশ করবে। সরকারের আরো দাবি যে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের টার্গেট থাকা সত্ত্বেও ২০২১ সালের পূর্বেই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে প্রবেশ করবে। এসব দাবি যদি সত্য হয় তাহলে প্রশ্ন ওঠে, দেশে বিনিয়োগ এতো কম কেনো? দেশীয় পুঁজি স্বেচ্ছায় বিনিয়োগের জন্য এগিয়ে আসছে না কেনো? দেশীয় পুঁজিতো আসছেই না, বিদেশী পুঁজিও প্রত্যাশা মোতাবেক এগিয়ে আসছে না। ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট বা প্রত্যক্ষ্য বিদেশী বিনিয়োগ অনেক দূরে সরে আছে। এই সেদিন গণচীনের প্রেসিডেন্ট বিশাল বিনিয়োগের কমিটমেন্ট করে গেলেন। তার আগে তো আমরা বড় আকারের কোনো বিদেশী বিনিয়োগ দেখিনি। ভারত এ পর্যন্ত মোট ৩ বিলিয়ন বা ৩০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের আশ্বাস দিয়েছে। যতোদূর জানা গেছে, এই ৩০০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র ৬০০ মিলিয়ন ডলার রিলিজ করা হয়েছে। অবশিষ্ট ২৪০০ মিলিয়ন ডলার রিলিজ করা হয়নি। কবে যে এই অবশিষ্ট অর্থ ছাড় করা হবে সেটিও অনিশ্চিত।
॥ দুই ॥
দেশীয় বিনিয়োগ বা বিদেশী বিনিয়োগে বিনিয়োগকারীর এতো অনীহা কেনো? এর একটি কারণ হতে পারে। আর সেটি হলো, বাংলাদেশে ব্যাবসাবান্ধব পরিবেশ নাই। সেই কথাটি আর এখন শুধু বাংলাদেশীরাই বলছেন না, বিদেশীরাও বলছেন। ২০১৬ সালের ১লা জুন পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য নিয়ে বিভিন্ন দেশের ব্যবসা পরিস্থিতি কতখানি ব্যবসাবান্ধব সে বিষয়ে বিশ্বব্যাংক একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। গত বুধবার সারা বিশ্বে একযোগে এই রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। ব্যবসা করা কতটা কঠিন অথবা সহজ সে বিষয়টিই মূলত এ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনের ১০টি মূল সূচক হলো, ব্যবসা শুরু, অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি, বিদ্যুতের প্রাপ্যতা, সম্পত্তি নিবন্ধন, ঋণের প্রাপ্যতা, ক্ষুদ্র বিনিয়োগ কারীদের সুরক্ষা, কর পরিশোধ, বৈদেশিক বাণিজ্য, চুক্তির বাস্তবায়ন ও অসচ্ছলতা দূরীকরণ। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১০টি সূচকের মধ্যে বিদ্যুৎ প্রাপ্যতায় সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। বিদ্যুৎ প্রাপ্যতা সূচকে বিশ্বের ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮৭। গত বছরও বাংলাদেশের অবস্থান এ সূচকে একই ছিল। বাংলাদেশে শিল্প স্থাপনে বিদ্যুতের সংযোগ পেতে গড়ে সময় লাগে ৪২৮ দিন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যবসা করার পরিবেশের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। এ তালিকায় বাংলাদেশের চেয়ে ভুটানও এগিয়ে, তার অবস্থান ১০৩। অন্যান্য দেশের মধ্যে নেপাল ১০৭, শ্রীলঙ্কা ১১০, ভারত ১৩০, মালদ্বীপ ১৩৫, পাকিস্তান ১৪৪তম স্থানে রয়েছে। ব্যবসা করা সহজ করতে চলতি বছর এ অঞ্চলে সর্বোচ্চ তিনটি সংস্কার কার্যক্রম শেষ করেছে পাকিস্তান। ভারত এ বছর দুটি সংস্কার কাজ শেষ করলেও বাংলাদেশ নতুন করে কোনো সংস্কার কাজ করতে পারেনি। যে ১০টি সূচকের ভিত্তিতে দেশগুলোর র‌্যাংকিং নির্ধারণ করা হয়েছে তার অন্যতম হলো কর পরিশোধ। এই ব্যাপারে বাংলাদেশের অবস্থা সবগুলো দেশের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ।
এই রিপোর্টটি পড়ার পর অনেক প্রশ্নের উদয় হয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির প্রধান শর্ত। এই শর্তটি বাংলাদেশে বিগত প্রায় ২ বছর হলো পূর্ণমাত্রায় পূরণ হয়েছে। বাংলাদেশে বিগত ২ বছর হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পূর্ণমাত্রায় বিরাজ করছে। যে দেশে কোনো মিটিং নাই, মিছিল নাই, সভা-সমিতি নাই, এমন কি সরকার বিরোধী কোনো রকম তৎপরতা নাই, সে দেশের চেয়ে ভালো ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ আর কোথায় হতে পারে? আলোচ্য রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ১০টি সূচকের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পে বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছে দেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে খারাপ। অথচ বিগত কয়েক বছর হলো সরকার অব্যাহতভাবে দাবি করে আসছে যে, দেশে আর কোনো বিদ্যুৎ সংকট নাই। সরকার বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করেছে। অসংখ্য রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল করে, বিদ্যুতের দাম ৫ গুণ বাড়িয়ে, সরকারের দাবি অনুযায়ী বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান হয়েছে। তাই যদি হবে তাহলে শিল্প, ব্যবসা ও বাণিজ্যে বিদ্যুৎপ্রাপ্তি সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে কেন?
॥ তিন ॥
দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭ নম্বরে। বাংলাদেশের নীচে রয়েছে একমাত্র আফগানিস্তান। আফগানিস্তান একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ। ২০০১ সালে এই দেশটি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে আমেরিকা দখল করে নেয়। আজও মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তান ছেড়ে যায়নি। ফলে যখন তখন যেখানে সেখানে মার্কিন দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা আক্রমণ চলছে। প্রতি সপ্তাহে শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে, অসংখ্য স্থাপনা উড়ে যাচ্ছে। বিগত ১৫ বছর ধরে দেশটিতে এই অবস্থা চলছে। এমন একটি গৃহযুদ্ধ বিক্ষত দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির প্রশ্নই ওঠে না। তাই এই দেশের অবস্থান যে বাংলাদেশের নীচে হবে সে কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশের ওপরে অবস্থান করে কি করে?। তার চেয়েও যেটি মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন সেটি হলো পাকিস্তান। পাকিস্তানের মতো একটি দেশ যেখানে ভয়াবহ সন্ত্রাস সেই দেশটির কণ্ঠলগ্ন সহচর, সেই দেশটিও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপরে অবস্থান করে কিভাবে? অথচ বিগত ১ দশক ধরে এই দেশটিতে কোনো মামুলি  সন্ত্রাস নয়, রীতিমত ভয়াবহ সন্ত্রাস নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই তো গেল মঙ্গলবার সে দেশের বেলুচিস্তানে পুলিশ ক্যাডেট কলেজে সন্ত্রাসী হামলায় ৬১ জন ক্যাডেট পুলিশ মারা গেছেন। এই সেই দেশ যেখানে বেনজির ভুট্টোর মতো সবচেয়ে বড় নেত্রীকে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হতে হয়েছে এবং ঐ হামলায় আরো ১৩০ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এটি সেই দেশ যেখানে সন্ত্রাসী হামলায় মিলিটারি প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। এই হামলায় একটি শক্ত ব্রিজ উড়ে যায়। ৩টি গাড়ি উড়ে যায়। যেদেশে আমেরিকানরা নিয়মিত ড্রোন হামলা করে। সে দেশটিও বাংলাদেশের ওপরে অবস্থান করে। এর বিপরীতে যদি আমরা বাংলাদেশের দিকে তাকাই তাহলে দেখা যাবে যে, এখানে সন্ত্রাসবাদ নাই বললেই চলে। হলি আর্টিজানে যে সন্ত্রাসী হামলা হয় সেখানে ২০ জন মানুষ মারা যায়। এর ফলে অর্থনীতির বড় একটা ক্ষতি হয় নাই। এই হামলা ছাড়া বাংলাদেশে বড় ধরনের কোনো সন্ত্রাসী হামলা হয় নাই। বিক্ষিপ্তভাবে যেসব ঘটনা ঘটেছে সেগুলো মফস্বলের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। আর ঢাকায় হয়েছিলো হোসেনী দালানে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি মোতাবেক, সেই সন্ত্রাসবাদও সরকারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। এমন একটি শান্ত এবং সরকারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধীন রাজনৈতিক পরিবেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের শর্তগুলো অর্থাৎ ঐ ১০টি সূচক পূরণ হওয়া উচিত ছিলো এবং ব্যবসা বাণিজ্যও অনেক বেশি সম্প্রসারিত হওয়ার কথা ছিলো।
Email: [email protected]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ