ঢাকা, সোমবার 31 October 2016 ১৬ কার্তিক ১৪২৩, ২৯ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিলুপ্তপ্রায় ঘড়িয়ালের আবারো দেখা পাওয়া গেলো পদ্মায়

সরদার আবদুর রহমান : বাংলাদেশের পদ্মা নদী থেকে বিলুপ্তপ্রায় ঘড়িয়ালের বংশধরের অবশেষে দেখা মিললো। সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় পদ্মা নদীতে বিলুপ্তপ্রায় এই প্রজাতির একটি ঘড়িয়াল ছানা ধরা পড়ে। এর ফলে ধারণা করা যায় যে, এই ছানাটির পিতা-মাতা তথা বংশধর অবশিষ্ট আছে।
গত ২৬ অক্টোবর বুধবার সকালে শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা ইউনিয়নের ঠুটাপাড়ার কাছে পদ্মা নদীতে তরিকুল ইসলাম বাবুল নামে এক জেলের জালে আটকা পড়ে এই ঘড়িয়ালটি। আগের রাতে মাছ ধরার জন্য বাবুল নদীতে জাল পেতে রাখেন। সকালে জাল তোলার সময় এটি জালে আটকা পড়ে থাকতে দেখা যায়। এটি পুরুষ এবং এর দৈর্ঘ লেজসহ ৪ ফুট লম্বা, ওজন ৬/৭ কেজির মতো। প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তাদের ধারণা, এর বয়স আনুমানিক এক-দেড় বছর। এটি প্রথমে রাজশাহী বন্যপ্রাণী ব্যবস্থা সংরক্ষণ বিভাগে পাঠানো হয়। পরে তা সাফারি পার্কে প্রেরণের কথা জানা যায়।
মূল্যবান প্রাণী ঘড়িয়াল বিলুপ্তির পথে
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত মূল্যবান প্রাণী ঘড়িয়াল আজ বিলুপ্তির পথে। শক্ত বর্মযুক্ত জলপাই রংয়ের সরীসৃপ শ্রেণীর এই প্রাণী দুইশ’ মিলিয়ন বছর আগে ট্রাইসিক যুগ থেকে আজ অবধি বেঁচে আছে নদীমাতৃক বাংলার প্রধান নদী একমাত্র পদ্মায়। ঘড়িয়ালকে অনেকে মেছো কুমির বলে আখ্যায়িত করে থাকে। আবার অনেকে কুমির বলে ভুল করে। যদিও ক্রোকোডাইল পরিবারভুক্ত অন্য দুই প্রজাতির কুমীর এবং এলিগেটর থেকে ঘড়িয়ালকে আলাদা প্রজাতি হিসেবে চেনা যায়। এরা সাধারণত দশ থেকে পনের ফুট লম্বা হয়। তবে রাজশাহী পদ্মায় ইতিপূর্বে ২৭ ফুট দীর্ঘ ঘড়িয়াল দেখা গিয়েছিলো বলে শোনা যায়। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, মালেশিয়ায় ঘড়িয়ালের দেখা পাওয়া যায়। ভারতের গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মহানন্দা, মিয়ানমারের কালাদান, আরাকান, ভোমা ও বাংলাদেশের পদ্মায় ঘড়িয়াল শত বছর আগে প্রায়ই চোখে পড়তো। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে এই প্রাণী আজ বিলুপ্তির মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। এই উপমহাদেশের প্রাণীবিজ্ঞানীরা ঘড়িয়ালের সংখ্যা ক্রমে কমে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন। বর্তমানে বিহারের নারায়ণী নদী, কোশী নদী, মহানদী এবং উড়িষ্যার চম্বল নদীতেই এদের নিবাস সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশের একমাত্র পদ্মায় এর বসবাস ছিলো। বর্তমানে রাজশাহী চিড়িয়াখানায় দুটি ঘড়িয়াল সংরক্ষণ করা হচ্ছে। স্ত্রী জাতীয় এ দুটি ঘড়িয়াল ৮০’র দশকে পদ্মা থেকেই ছানা অবস্থায় পাওয়া যায়।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশ এবং ভারতে ঘড়িয়ালের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাওয়ার ফলে ১৯৬১ সালে আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন তাদের রেড ডাটা বইয়ে ঘড়িয়ালকে এনডেনজারড স্পেসিজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। বাংলাদেশের প্রাণীবিজ্ঞানী ড. রেজা খান বাংলাদেশের ঘড়িয়াল ও তার অবস্থানের ওপর ব্যাপক অনুসন্ধান চালান। রাজশাহীর বিভিন্ন চর এলাকায় দিনের পর দিন ঘুরে ঘড়িয়াল সম্পর্কে ব্যাপক তথ্য তুলে ধরেন এবং বাংলাদেশ সরকারের বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বন্য প্রাণী শাখার কর্মকর্তাদের নিকট তিনি বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীটি রক্ষার জন্য অনুরোধ করেন। পরবর্তীতে বন বিভাগের আমন্ত্রণে ১৯৮১ সালে এফএও-এর বিশেষজ্ঞ রমলাস হুইটেকার রাজশাহী এসে ড. রেজা খানের সঙ্গে ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে এবং পরিসংখ্যান গ্রহণ করার পর বিলুপ্তির হাত থেকে এই মূল্যবান প্রাণী রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি স্যাংচুয়ারী নির্মাণের জন্য রিপোর্ট পেশ করেন। কিন্তু ঐ রিপোর্টটি বন বিভাগের হিমাগারে রয়ে গেছে। দেখভাল না থাকায় গত কয়েক বছর ধরে পদ্মার চরে ঘড়িয়াল ডিম পাড়ছে কিনা অথবা অসচেতন চরবাসীরদের হাতে কোন ডিম নষ্ট হচ্ছে কিনা তা জানা যাচ্ছে না। এপ্রিল থেকে জুন মাস ঘড়িয়ালের প্রজনন কাল। এর আগে পদ্মার চরের বিভিন্ন স্থানে ঘড়িয়াল ডিম পাড়তো। ঘড়িয়ালের ডিম যাতে নষ্ট না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখারও বিশেষ প্রয়োজন ছিলো। এজন্য যে এলাকায় ঘড়িয়ালের ডিম পাড়ার সম্ভাবনা দেখা যায় সেসব এলাকাবাসীদের মধ্যে সচেতনতা বোধ জাগিয়ে তোলার জন্য কার্যক্রম গ্রহণ করা দরকার। পাশর্^বর্তী ভারত ও নেপাল ঘড়িয়াল সংরক্ষণে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করায় বেশ সাফল্য লাভ করেছে। অথচ দেশের একমাত্র ঘড়িয়াল বিচরণ ক্ষেত্র পদ্মায় এদের সংরক্ষণ ও নির্ভয় চলাচল এবং বংশ বৃদ্ধি করার কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ঘড়িয়াল প্রজনন সমস্যা সমাধানের জন্য রমলাস হুইটেকার ও ড. রেজা খান বারাবার পথ নির্দেশ করলেও তা নিয়ে গুরুত্বসহকারে ভেবে দেখা হয়নি। বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা, বিলুপ্ত প্রায় এই প্রাণী সংরক্ষণের জন্য পদ্মায় কিছু অংশ সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এই সংরক্ষণ প্রকল্পে যে ব্যয় হবে তা মোটেই অলাভজনক হবে না বলে তারা মত ব্যাক্ত করেছেন। কেননা প্রাকৃতিক দিক দিয়ে ঘড়িয়ালের মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু অর্থকরী হিসেবে এর চামড়াসহ মূল্য লক্ষ টাকার উপরে। ঘড়িয়ালের বংশ বৃদ্ধি ও উৎপাদন করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। ইতিপূর্বে বন বিভাগের উদ্যেগে এ ধরনের একটি প্রকল্প নেয়ার কথা শোনা গিয়াছিলো। এতে একটি বিদেশী সংস্থার অর্থ সাহায্য দেবার কথা ছিলো। কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনার অভাবে প্রকল্পটি আর বাস্তবে রূপ লাভ করেনি। প্রাকৃতিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাণীটির বিলুপ্তি রোধে নতুন করে চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন জরুরী হয়ে পড়েছে। ঘড়িয়ালের বংশবৃদ্ধিও জন্য কৃত্রিম প্রজনন খামার স্থাপন করার পদক্ষেপ নিতে হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ