ঢাকা, সোমবার 31 October 2016 ১৬ কার্তিক ১৪২৩, ২৯ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আমেরিকার সামনে কঠিন বিপদ?

রামের জন্মের আগে বাল্মিকী ‘রামায়ণ’ রচনা করেছিলেন। তেমনি এক ফরাসি জ্যোতিষী আমেরিকা নামক রাষ্ট্রটির জন্মের আগে ১৬৪০ সালে তার শেষ প্রেসিডেন্টের কথা বলে গেছেন। তিনি বলেছেন, আমেরিকা নামক এক রাষ্ট্রের উত্থান হবে, আর এক কালো লোক তার প্রেসিডেন্ট হবেন। তিনি দুই দুই বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন এবং তিনি হবেন আমেরিকার শেষ প্রেসিডেন্ট।

ফরাসি এ জ্যোতিষী আরও বহুকথা বলেছেন। নেপোলিয়নের কথা, কেনেডি হত্যার কথা- প্রায় কথাইতো মিলেছে। বারাক ওবামাতো কালো লোক। আফ্রিকান-আমেরিকান এবং দু’বার প্রেসিডেন্টও নির্বাচিত হয়েছেন। জ্যোতিষীর মতে তিনি ‘শেষ’ প্রেসিডেন্ট। তা হলে কি আগামী ৮ নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর আমেরিকা বিপর্যয়ের মুখে পড়ে ভেঙে যাবে। না অন্য কিছু।
দক্ষিণ আমেরিকা কৃষিসমৃদ্ধ অঞ্চল। একবার দাস প্রথা উচ্ছেদের বিরোধ নিয়ে বাণিজ্য ও শিল্পসমৃদ্ধ উত্তর আমেরিকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে চেয়েছিল। উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যে গৃহযুদ্ধও চলেছিল বহুদিন। তখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন লিংকন। লিংকনের দৃঢ় পদক্ষেপ আমেরিকাকে দ্বিখ-িত হওয়ার হাত থেকে উদ্ধার করেছিল। লিংকনের মতো বিজ্ঞ লোকের হাতে পড়েছিল বিরোধটা, না হয় আমেরিকার দ্বিধাবিভক্তি অবধারিত ছিল। গৃহযুদ্ধের সময় রণক্ষেত্রের জায়গায় জায়গায় লিংকন পরাজিতও হয়েছেন কিন্তু তিনি সব সময় অবিচল ছিলেন। তার অবিচল নিষ্ঠাই তাকে জয় এনে দিয়েছিল। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও এক ও অভিন্ন রয়েছে। অবশ্য ব্লুমের ‘দ্য ক্লোজিং অব দ্য আমেরিকান মাইন্ড’ বা এরিক হবসবমের ‘এইজ অব এক্সট্রিম’ পড়লে মনে হবে না আমেরিকানরা সুখে আছে। ম্যাকইন্টায়ার তো ডিস ইউনাইটেড স্টেট কথাটা ব্যবহার করেই ফেলেছেন।
কোনও সুস্থ মস্তিস্কের লোক কামনা করবে না যে, আমেরিকার পতন হোক। কারণ আমেরিকার অর্থনীতি বিশ্বের প্রধান অর্থনীতি। তিন ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি। এ অর্থনীতির পতন হলে পৃথিবী কাঁপবে। বিশ্বের ছোট ছোট অর্থনীতির দেশগুলো আহত হবে। এছাড়া বিশ্বব্যবস্থা বিন্যাস করার মতো বড় রকমের শক্তি সামর্থ্য অন্য কোনও দেশের নেই, যারা নতুন কোনও আন্তর্জাতিক বিধিমালা সম্মতভাবে তৈরি করতে পারে। কয়দিন আগে রাশিয়ার পুতিন স্বীকার করেছেন, আমেরিকা এখনও বিশ্বে একক শক্তি।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট খুবই শক্তিশালী ব্যক্তি। তাদের শাসনতন্ত্রই তাদের প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাবান বানিয়েছে। সে কারণেই আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মেধা ও যোগ্যতা দু’টাই জরুরি। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন লোক প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে যান, যারা দুনিয়াটাকে লণ্ডভণ্ড করে ফেলেন। ২০০০ সালে এবং ২০০৪ সালে বুশ জুনিয়রের নির্বাচিত হওয়াটাই ছিল তেমন একটি ব্যাপার। দুনিয়ার প্রচুর ক্ষতি করে গেছেন বুশ জুনিয়র। আমেরিকার লাভ যে কিছু করতে পেরেছেন তা নয়, বরং আমেরিকাকে ফতুর করে দিয়ে গেছেন, পথে বসিয়েছেন।
আফগান আক্রমণ করতে গিয়েছিলেন বুশ। আফগান যে কী! বুশ তা হয়তো জানেন না কিন্তু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ারতো জানেন। অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধ যখন হয়, তখন ব্রিটিশরাই দুনিয়ার ভাগ্য নিয়ন্তা। চার হাজার সৈন্য নিয়ে ব্রিটিশরা অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আফগান যুদ্ধে গিয়েছিলেন, যুদ্ধ শেষে সৈনিকদের মাঝে শুধু ফিরে এসেছিলেন মাত্র একজন।
ম্যাকনাটেন ছিলেন অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধের ব্রিটিশ পক্ষের নেতা। অবশেষে তিনি গিয়েছিলেন আকবর খানকে টাকা দিয়ে একটা সন্ধি করে ব্রিটিশের ইজ্জত বাঁচানোর চেষ্টা করতে। আকবরও তার সম্মতির কথা জানান। তাতে উৎফুল্ল ম্যাকনাটেন গিয়েছিল আকবর খানের ক্যাম্পে। ম্যাক যখন ঘোড়া থেকে নামেন তখন আকবর অভ্যর্থনার ভঙ্গিতে তার কাছে গিয়ে মুখে পিস্তল ঢুকিয়ে ম্যাকনাটেনকে হত্যা করেছিলেন।
ব্রিটিশেরা ম্যাকনাটেনের মৃতদেহ কলকাতায় নিয়ে এসেছিলেন। আমার কোনও পাঠক যদি কলকাতা যান তবে দেখতে চাইলে কলকাতার সার্কুলার রোডের খ্রিস্টান গোরস্তানে ম্যাকনাটেনের সমাধিতে দেখতে পাবেন তার সমাধিফলকে ব্রিটিশের এক লজ্জাজনক পরাজয়ের বিবরণটি স্বল্পকথায় লেখা রয়েছে।
লাদেন আর আল-কায়েদাকে শায়েস্তা করতে এবং তালেবান সরকারকে উৎখাত করতে বুশ সৈন্য পাঠিয়েছিলেন আফগানিস্তানে, কারণ নাইন ইলেভেন-এর ঘটনায় আমেরিকানরা মনে করেছিল যে তাদের পৃথিবীটা বুঝি উল্টে গেল। ওসামা বিন লাদেন কিন্তু হো চি মিন নন। তার কোনও রাষ্ট্র নেই। তোরাবোরা পর্বতের গুহা তার ঠিকানা। ঠিকানা ছাড়া লোককে ছড়ি ঘুরাতে দিলে বিপদ যে ভয়াবহ আকারে আসবে নাইন-ইলেভেনের পর আমেরিকা তা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিল। আমেরিকার উপলব্ধিটা অন্যায়ও নয়, অহেতুকও নয়। আসলে ওসামা বিন লাদেন বিশ্ব সভ্যতাকেই একটা ঝুঁকির মাঝে টেনে এনেছেন। মুসলমানদের অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর কাছে হেয় করেছেন।
একজন মুসলমান যুবক প্লেনে ওঠার সময় মোবাইলে কথা বলতে বলতে উঠছিল এবং প্লেনের সিটে বসে সে কথা শেষ করেছিল ‘ইনশাল্লাহ্ পরে কথা হবে’ বলে, ‘ইনশাল্লাহ’ বলাতে প্লেন তাকে নেয়নি। তাকে নামিয়ে দিয়েছিল। এটাই হচ্ছে লাদেনের অবদান।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এখন শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছে গেছে। আগামী ৮ নভেম্বর নির্বাচন। কোনও কোনও রাজ্যে আগাম ভোট দেওয়ার কাজও চলছে। তবে রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেট কারও প্রার্থীই ভালো নন। কলিন পাওয়েল আমেরিকায় বর্তমান সময়ে সম্মানীত ব্যক্তি তিনি বলেছেন ট্রাম্প পাগল আর হিলারি লোভী। কোনও প্রার্থীই ভোটারদের নতুন পথের নিশানা দেখাতে পারেননি। আমেরিকায় কয়লা খনিগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাতে হাজার হাজার লোক বেকার হচ্ছে অনেক শিল্প কারখানা উঠে যাচ্ছে। সেখানেও হাজার হাজার লোক বেকার হচ্ছে মন্দার কষাঘাতে।
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বহু ব্যবসা নষ্ট হয়ে গেছে তারাও বেকার হয়ে গেছে ট্রাম্পের অভিবাসন বিরোধী কথাবার্তায়। এ বেকার লোকগুলো উজ্জীবিত হয়েছে এবং ট্রাম্পের পেছনে সারিবদ্ধ হয়েছে। তারা মনে করছে অভিবাসন বন্ধ হলেই তাদের ললাট ফিরবে আবার সেন্ডার্স বলেছেন সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়েছে ওয়ার্ল্ড স্ট্রিটওয়ালাদের হাতে। যুবা বয়সের লোকেরা তার পেছনে এসেছিল ধন বৈষম্যের কথা শুনে সমাজতন্ত্রের কথা শুনে। সেন্ডার্স মনোনয়ন পাননি কিন্তু তিনি তার জনসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন। হিলারিকে সমর্থন করে। হিলারি জাতিকে কোনও দিশা দেখাননি। তিনি ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট-এর লোক। সম্ভবত হিলারি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন। তিনি যদি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ট্রাম্প-এর পেছনে জড়ো হওয়া হতাশাগ্রস্ত জনগোষ্ঠী আর সেন্ডার্সের পেছনে জড়ো হওয়া যুবগোষ্ঠী কি ঘরে ফিরে যাবে? সম্ভবত এখানেই আমেরিকার জন্য ভবিষ্যৎ বিপদ অপেক্ষা করছে।
-বখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ