ঢাকা, মঙ্গলবার 01 November 2016 ১৭ কার্তিক ১৪২৩, ৩০ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিস্ময় বালক মিরাজ আজ বিশ্বসেরা ক্রিকেটার

আব্দুর রাজ্জাক রানা : জীবনের শুরুতে সাফল্য ছুঁয়ে দেখা মেহেদী হাসান মিরাজের পিতা জালাল হোসেন চাইতেন না ছেলে ক্রিকেটার হোক। এমনকি ক্রিকেট খেলার জন্য বাড়ি থেকে কয়েকবার মিরাজকে বের করেও দিতে চেয়েছিলেন তিনি। তবে মা তাকে উৎসাহ যুগিয়েছেন। মিরাজের আজকের সাফল্যের পেছনে তার মা মিনারা বেগম ও প্রশিক্ষক আল মাহমুদেরই অবদান বেশি। খুলনার কৃতী সন্তান। দেশের গর্ব। যুব বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সর্বশেষ আসরে স্বাগতিক বাংলাদেশকে ট্রফি এনে দিতে না পারলেও অধিনায়কত্ব আর ব্যক্তিগত খেলায় মুগ্ধ করেছেন ক্রিকেটপ্রেমীদের। তার ধারাবাহিক সাফল্যে এখন মিরাজ ক্রেজে ভাসছে বাংলাদেশ। মিরাজের ধারাবাহিক সাফল্যে গোটা খুলনার মানুষও আনন্দে মেতে উঠেছে। অনেকেই সকাল-বিকেল ফুল এবং বিভিন্ন উপহার নিয়ে ছুটছেন মিরাজের বাড়িতে। তার গর্বিত পিতা-মাতাকে জানাচ্ছেন শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। অনেকেই তাকে বণার্ঢ্য সংবর্ধনা দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে গতকাল সোমবার মিরাজের খুলনা আসার কথা থাকলেও বিসিবি থেকে বলা হয়েছে আজ (গতকাল) তিনি আসছেন না বলে জানিয়েছেন মিরাজের বাবা।
সরু গলির মধ্যে রোড লাইটের আলো নেই। তবু অন্ধকার মাড়িয়ে ক্রিকেট ভক্তরা মিরাজের পিতা-মাতাকে শুভেচ্ছা জানাতে তার বাসায় পৌঁছে গেছেন। হাতে মিষ্টির প্যাকেট। উচ্ছ্বাস ভরা হাসি নিয়ে মিষ্টি খাইয়ে দিচ্ছেন মিরাজের গর্বিত পিতা জালাল হোসেনকে। ঘরে বসতে দেয়ার মতো জায়গা নেই তাই রাস্তায় চেয়ার দিয়ে সবার বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এত মানুষকে বসার ও মিষ্টি বিতরণের কাজটা নিজ হাতেই সামাল দিচ্ছেন মিরাজের পিতা। এর মধ্যে আবার ফোনে আত্মীয়স্বজনের শুভেচ্ছা গ্রহণ করছেন তিনি। রাত আটটার দিকে মিরাজের বাড়িতে মিষ্টি নিয়ে যান খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) সহকারী কমিশনার মো. কামরুল ইসলাম। তিনি মিরাজের পিতাকে জড়িয়ে ধরেন। মিষ্টি তুলে দেন তার মুখে। এছাড়া গতকাল সোমবার সকাল থেকেই সাংবাদিক ও ভক্তদের ভিড়ে মুখরিত ছিলো মিরাজের বাসা।
খুলনা মহানগরীর খালিশপুর থানাধীন বিআইডিসি সড়কের নর্থ জোনের ৭নং প্লটে বৃহত্তর বরিশাল কল্যাণ সমিতির অফিসের পেছনে সামান্য একটু জায়গা নিয়ে তৈরি করা টিনের ভাড়া বাসা মিরাজদের। ছোট ছোট দু’টি রুম। একটি রুমের শোকেসের ওপরে এবং ভেতরে মিরাজের পাওয়া বিভিন্ন ট্রফি ও মেডেল রাখা। মিরাজরা দুই ভাই-বোন। মিরাজের বোনের নাম রুমানা আক্তার মিম্মা। মিম্মা নগরীর দৌলতপুরের সরকারি বিএল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে পড়ছে। আর মিরাজ এ বছর এইচএসসি পাশ করেছে। মিরাজ ছোটবেলা থেকেই ছিল ক্রিকেট পাগল। ও যখন আসমা সরোয়ার স্কুলে প্রাইমারিতে পড়তো তখন থেকেই ক্রিকেট খেলা শুরু করে। তারপরে হাজি শরীয়াতুল্লাহ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং সর্বশেষ দৌলতপুর দিবা/নৈশ কলেজে সে পড়ালেখা করছে। মিরাজের পিতা মো. জালাল হোসেন একজন গাড়ী চালক। মা মিনারা বেগম একজন গৃহিনী।
তার পিতা জালাল হোসেন বলেন, ‘ছেলের এই সাফল্যে শুধু খুলনা নয়, সারাদেশে আনন্দের বন্যা বইছে। মিরাজ যে স্বপ্ন নিয়ে খেলতে নেমেছে সে স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আল্লাহর কাছে এর জন্য শুকরিয়া জানাই। আমি টিভিতে ছেলের খেলা দেখেছি। খুব ভালো লেগেছে। তিনি জানান, মিরাজের সাফল্য নিয়ে মিষ্টির ছড়াছড়ি। নিজে এ পর্যন্ত ২০-২৫ কেজি মিষ্টি কিনেছেন। ভক্ত ও স্বজনদের খাইয়েছেন। যারা আসছেন তারা তো নিয়েই আসছেন। এই সাফল্য যেনো ধারাবাহিক হয় সে জন্য তিনি দেশবাসীর কাছে ছেলের সাফল্যও কামনা করেন।
গরিব গাড়ি চালক বাবা সংসারের দৈন্যতাকে খুব ভয় পেতেন। ছেলের অনিশ্চিত জীবনের শঙ্কায় বার বার ক্রিকেট খেলতে বাধা দিতেন। বললেন, ‘ছোট বেলা থেকে মিরাজ আমাকে ফাঁকি দিয়ে ক্রিকেট খেলতে যেতো। আমাকেই সে বেশি ফাঁকি দিয়েছে। স্কুল থেকে চুপি চুপি ক্রিকেট খেলতে মাঠে চলে যেতো আল মাহমুদের (প্রশিক্ষক) সাথে। ছেলের এমন অভাবনীয় সাফল্যে আনন্দে আত্মহারা পিতা জালাল হোসেন। কৃতজ্ঞতা জানালেন এক সময়ের দারুণ অপছন্দের মিরাজের সেই ক্রিকেট প্রশিক্ষককের প্রতি।
তিনি আরো জানান, মিরাজ ১৯৯৭ সালের ১৬ মে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার হলদিয়াপুর গ্রামে এক মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ২০০১ সালের তার জন্মের ৫ বছরের সময় তাকে নিয়ে তার পিতা-মাতা খুলনার খালিশপুর এলাকায় চলে আসেন। এখানে তার একমাত্র বোন জন্ম গ্রহণ।
জানা গেছে, খালিশপুর কাশীপুর ক্রিকেট একাডেমীর প্রশিক্ষক মো. আল মাহমুদের হাত ধরেই মিরাজের ক্রিকেট যাত্রা শুরু। প্রশিক্ষক আল মাহমুদ জানান, মিরাজের মধ্যে ছোটবেলা থেকে ক্রিকেটে মারকুটে ভাব ছিলো। ওর মধ্যে ক্রিকেটের সম্ভাবনা দেখেই তাকে প্রশিক্ষণ দিতে ভালো লাগতো। অসীম ধৈর্য আর চেষ্টায় সেই মিরাজ হয়েছেন আজকের মিরাজ। কাশীপুর ক্রিকেট একাডেমির সভাপতি শেখ খালিদ হাসান বলেন, ২০০৭ সালে খুলনা জেলা ক্রীড়া সংস্থা আয়োজিত অনূর্ধ্ব-১৩ খেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রথম পুরস্কার ওঠে মিরাজের হাতে। মিরাজের সাবেক আরেক প্রশিক্ষক মো. শাহনেওয়াজ বলেন, মিরাজ ছোটবেলা থেকেই অসম্ভব ভালো খেলতো। বিভিন্ন সময় তাই ওকে হায়ারে অনেকে খেলতে নিয়ে যেতো। তখনই বুঝেছিলাম মিরাজ একদিন ক্রিকেট বিশ্বে জায়গা করে নেবে। আজ সে স্বপ্ন পূরণ হলো। আমরা গর্বিত মিরাজকে নিয়ে।
মিরাজের মা মিনারা বেগম বলেন, ‘ক্রিকেট ভাল না বুঝলেও ছেলেকে দেখার সুযোগ তিনি ছাড়েন না। দিনভর ছেলের খেলা দেখেছেন তিনি। ছেলের ধারাবাহিক সাফল্যে তিনি সবথেকে বেশি খুশি। যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি। সে আরও ভাল করুক, দেশের সেরা খেলোয়াড় হোক, আল্ল¬াহর কাছে এটাই কামনা করেন তিনি।’
মিরাজের বোন রুমানা আক্তার মিম্মা বলেন, ‘ভাইয়া যে বিশ্বরেকর্ড করেছে তার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। তিনি বলেন, যুব বিশ্বকাপের খেলার চেয়েও এই টেস্টের গুরুত্ব অনেক বেশি। তার ভাই টেস্টে এতটা ভাল করেছে, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। ঘরে টিভির সামনে বসে খেলা দেখলেও যেন মাঠে বসেই খেলা দেখেছেন বলে মনে হয়েছে তার।’
মিরাজের চাচা মো. ইফসুফ বলেন, ‘মিরাজের টেস্ট অভিষেক উপলক্ষে পুরনো টিভি পাল্টে নতুন টিভি কিনেছেন। দোকানে কেনা-বেচার চেয়ে খেলা দেখাতেই তার মনোযোগ বেশি ছিল।’
ছোট মামা রিয়াজ গাজী বলেন, ছুটিতে মালয়েশিয়া থেকে তিনি দেশে এসেছেন এবং খুলনায় মিরাজের বাসায় বোন-দুলাভাইর সাথে অবস্থান করছেন। মিরাজের নানী বরিশাল থেকে খুলনায় এসেছেন। সকলে মিলেই মিরাজের টেস্ট ম্যাচ দেখেছেন। টেস্ট ম্যাচটি মিরাজের জন্য অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তার স্বজনরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ