ঢাকা, মঙ্গলবার 01 November 2016 ১৭ কার্তিক ১৪২৩, ৩০ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খুন ও বিনা বিচারে হত্যার প্রতিটি ঘটনার আন্তর্জাতিক তদন্ত হওয়া উচিত

গত সপ্তাহে প্রকাশিত এই স্তম্ভের প্রথম অনুচ্ছেদে নবনির্বাচিত জামায়াত আমীর জনাব মকবুল আহমাদের বিরুদ্ধে কথিত ও বানোয়াট মানবতাবিরোধী অপরাধ খুঁজতে যাওয়া আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় প্রদানে অনিচ্ছুক একজন সদস্যের উদ্ধৃতি দিয়ে আমি লিখেছিলাম যে- তার মতে, উপরের নির্দেশেই তাদের স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর এই কাজে নামতে হয়েছে, যদিও অভিযোগের অনুকূলে প্রামাণ্য কোনো দলিলপত্র বা সাক্ষ্য-প্রমাণ তারা পাচ্ছেন না। অবশ্য পাওয়া কঠিন হলেও এ ধরনের মিথ্যা ডকুমেন্ট তৈরি করা সহজ এবং তাও উপরের নির্দেশে।
ইতোমধ্যে গত এক সপ্তাহে দু’টি সহযোগী দৈনিক এবং একটি মানবাধিকার সংস্থা ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ এবং বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের উপর আলাদা আলাদাভাবে তিনটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, বন্দুকযুদ্ধ এবং ক্রসফায়ারের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। একটি দৈনিকের হিসাব অনুযায়ী গত ১০ মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ ও অভিযানে প্রায় পৌনে দুইশ’ লোক নিহত হয়েছে। এর মধ্যে গত তিন দিনে ঝিনাইদহে খুন হওয়া জামায়াতের শহর আমীর ও শিবির নেতাসহ ৩৮ জন হতভাগ্য ব্যক্তির তথ্য অন্তর্ভুক্ত নেই। বর্তমানে এমন অবস্থা হয়েছে যে, এমন কোনো দিন নেই যেদিন দেশের কোথাও না কোথাও লাওয়ারিশ প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী অথবা শিশুসহ সাধারণ মানুষের লাশ পাওয়া যাচ্ছে না কিংবা বন্দুকযুদ্ধে কেউ না কেউ প্রাণ হারাচ্ছে না।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিস কেন্দ্র পরিবেশিত তথ্যানুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে ও ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে ১২৯ জন। এর মধ্যে গ্রেফতারের আগে ক্রসফায়ারে ৮৭ জন, গ্রেফতারের পর ক্রসফায়ারে ২০ জন, গ্রেফতারের আগে শারীরিক নির্যাতনে ৪ জন, গ্রেফতারের পর শারীরিক নির্যাতনে ৫ জন, পুলিশ-বিজিবির গুলীতে ৭ জন, গ্রেফতারের পর অসুস্থ হয়ে ৪ জন এবং ২ জন রহস্যজনকভাবে নিহত হয়েছে। এর মধ্যে র‌্যাবের হাতে ৩৪ জন, পুলিশের হাতে ৮০ জন, ডিবি পুলিশের হাতে ১২ জন, রেল পুলিশের হাতে ১ জন এবং বিজিবি -পুলিশের হাতে ২ জন নিহত হয়েছে।
আবার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে তিন মাসে নিহত হয়েছে ৩১ জন উগ্রবাদী, একজন সন্দেহভাজন। গত ৮ অক্টোবর র‌্যাব-পুলিশের তিনটি পৃথক অভিযানে দেশের দুই জেলায় ১১ জন উগ্রবাদী নিহত হয়েছে। এর মধ্যে গাজীপুরের পাতারটেকে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের অভিযান ‘অপারেশন শরতের তুফান’-এ ৭ ব্যক্তি নিহত হয়েছে। এছাড়া শহরের হাড়িনালে র‌্যাবের অভিযানে দুইজন উগ্রবাদী নিহত হয়েছে। অপরদিকে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কাগমারী মীর্জা মাঠ এলাকায় র‌্যাবের অভিযানে নিহত হয়েছে দুই উগ্রবাদী।
পাঠকদের নিশ্চয়ই স্মরণ আছে যে, ১লা জুলাই রাজধানীর গুলশানের আর্টিজান রেস্তোরাঁয় বন্দুকধারী উগ্রবাদীরা হামলা চালায়। এই হামলায় ১৭ জন বিদেশী ও ২ পুলিশ কর্মকর্তাসহ মোট ২৩ জন নিহত হয়। সেখানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কমান্ডো অভিযানে নিহত হয় ৫ বন্দুকধারী ও ১ সন্দেহভাজন। ক্রসফায়ার, হত্যা, গুমসহ বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড প্রভৃতির বিস্তারিত বিবরণ দেয়ার প্রয়োজন বাংলাদেশে এখন নেই বললেই চলে। এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের কয়েকটি জেলা এখন অনেকটা বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে বলে অনেকে অভিযোগ করেছেন। মানুষ গুম হচ্ছে, ডিবি পরিচয় দিয়ে সাদা পোশাকে প্রকাশ্য দিবালোকে অথবা শত শত মানুষের সামনে দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী অথবা টার্গেট করা বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। কোথাও তাদের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। থানায় জেনারেল ডায়রি নেয়া হচ্ছে না, তদন্ত হচ্ছে না। আবার দেখা যাচ্ছে কয়েক দিন অথবা কয়েক সপ্তাহ পর গুম হওয়া কিংবা অপহৃত ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের লাশ পাওয়া যাচ্ছে পথের ধারে, মাঠে, পুকুরে কিংবা নদীতে। এ ধরনের জানা-অজানা, সন্দেহজনক কোন ঘটনারই বিচার বা তদন্ত হচ্ছে না।
সংবিধান অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের যে কোন নাগরিকের মানবিক অধিকার ও সামগ্রিক নিরাপত্তা প্রদানের দায়িত্ব সরকারের। বিনা বিচারে যে কোন ধরনের হত্যা মানবতাবিরোধী অপরাধ। এই অপরাধের বিচার হওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু পরিতাপের সাথে আমরা লক্ষ্য করছি যে, গত কয়েক বছর ধরে এই দেশে অব্যাহতভাবে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটছে। এই হত্যাকা-গুলোর সাথে কোথাও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আবার কোথাও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আবার কোথাও সন্ত্রাসী চক্র কিংবা সাধারণ মানুষ জড়িত রয়েছে। হত্যা, গুম, খুন, অপহরণ অথবা মারাত্মক অপরাধের সাথে জড়ানোর ঘটনায় আবার উপরের নির্দেশের কথাও বলা হচ্ছে; নিবন্ধের শুরুতে যা আমি উল্লেখ করেছি। কোনও একটি বোমা হামলার মামলায় বিএনপি নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামী হিসেবে সম্পৃক্ত করার খবরও পাওয়া গেছে যার সাথে তার কোনও সম্পর্ক নেই। আবার জামায়াত আমীর জনাব মকবুল আহমাদসহ বর্ষীয়ান বেশ কয়েকজন নেতাকে মিছিলে অংশ নিয়ে গাড়ি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগে অংশ নেয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করার ঘটনাও ঘটেছে। অথচ এদের কেউই মিছিলে অংশ নেয়া তো দূরের কথা, ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে শারীরিক অক্ষমতার কারণে চেয়ারে বসে ছাড়া নামাযও পড়তে পারেন না। এসব ক্ষেত্রে হুকুম দাতা চিহ্নিত করার দাবি উঠেছে।
ইনসাফের দাবি হচ্ছে যে, কোনও গুম, অপহরণ অথবা সাদা পোশাকে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে কোনও ব্যক্তিকে গ্রেফতারের বিষয় সরকার অথবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসার সাথে সাথেই তা তদন্ত করে অপহৃত ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা, তারা যদি গ্রেফতার করে থাকেন তা হলে তাৎক্ষণিকভাবে তা স্বীকার করা। এই ধরনের ঘটনার ব্যাপারে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে যা উপেক্ষা করা আদালত অবমাননার সামিল। দুর্ভাগ্যবশত এর কোনও তদন্ত হচ্ছে না। অতি সম্প্রতি অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জনাব আযমী, জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর পুত্র ব্যারিস্টার আরমান এবং পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের তৎকালীন স্পিকার ফজলুল কাদের চৌধুরীর নাতি ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পুত্র হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাদের গ্রেফতারের বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী স্বীকার করেনি। পরিবারের তরফ থেকে থানায় জিডি নেয়া হয়নি; তদন্ত করে তাদের হদিস বের করা তো দূরের কথা। তারা কোথায় আছেন কিভাবে আছেন, জীবিত না মৃত কেউ বলতে পারবে না। বাংলাদেশে স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী আমলেও এ ধরনের কোনও ঘটনা ঘটেনি।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পুরানা পল্টনে প্রকাশ্য দিবালোকে জামায়াত শিবিরের ৭/৮ জন কর্মীকে লগি বৈঠা দিয়ে সাপের মতো পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এর জন্য মামলা হয়েছিল। সে মামলা থেমে গেল কেন? ঐ সময়ে লগি বৈঠা নিয়ে সমাবেশে আসার নির্দেশ কে দিয়েছিলেন? যিনি দিয়েছিলেন তিনি কি হুকুমের আসামী হন না? একইভাবে নাটোরের বড়াইগ্রামের বিএনপি নেতা ও উপজেলা চেয়ারম্যান সানাউল্লাহকেও রাস্তায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু অর্ধ যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সানাউল্লাহ হত্যার বিচার হয়নি। কেন হয়নি, কার নির্দেশে হয়নি, এটা সাধারণ মানুষের প্রশ্ন। প্রত্যেকটি মানুষের জীবন পবিত্র। আল্লাহর দেয়া জীবন হরণের অধিকার কারুর নেই। যে জীবন দিতে পারে না সে জীবন নিতেও পারে না। আবার ক্রসফায়ারের নামে খুন, গুম করে হত্যা বা বিনা বিচারে রাস্তায় পিটিয়ে হত্যা, নেতা নেত্রীর নির্দেশ মেনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নির্মূল করে ক্ষমতার রাস্তা প্রশস্ত করার ধারা অব্যাহত থাকতে পারে না। এর পূর্ণাঙ্গ ও সঠিক তদন্ত হওয়া অপরিহার্য। সঙ্গত কারণে আমরা এককভাবে দেশীয় তদন্তের উপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেছি। এ প্রেক্ষিতে দেশী বিদেশী বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গর্বিত নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক টিম দিয়ে এই ঘটনাগুলোর তদন্ত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এই ধারা রোধ করতে না পারলে এই দেশে মানবিক মূল্যবোধ বলতে আর কিছু থাকবে না। যারা ক্ষমতাসীন তাদের দায়িত্ব বেশি এবং তাদের স্বার্থেই এই ধরনের তদন্ত বেশি প্রয়োজন। পাকিস্তানী নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর ফাঁসি হয়েছিল একজন রাজনৈতিক নেতাকে হত্যার হুকুমের আসামী হিসেবে। সে দেশের উচ্চ আদালত মামলার যাবতীয় কাগজপত্র ও সাক্ষ্য প্রমাণ পরীক্ষা ও পর্যালোচনা করে হুকুমের আসামী হিসেবে তার ফাঁসির এই আদেশ দিয়েছিলেন। তার এই ফাঁসির আদেশটি কার্যকর করেছিলেন তার অত্যন্ত প্রিয়ভাজন একজন জেনারেল, যাকে তিনি পদোন্নতি দিয়ে শীর্ষে তুলে এনেছিলেন। যারা ক্ষমতায় থাকেন, ক্ষমতার মোহ যাতে তাদের উন্মাদ ও আচ্ছন্ন করতে না পারে তা দেখা তাদেরই দায়িত্ব। প্রতিহিংসার ক্ষেত্রে সংযত থাকা ভাল। ফেরআউনের ঘরে মুসা (আঃ) প্রতিপালিত হয়েছিলেন। তিনি জানতেন বনি ইসরাইলরা তার শত্রু এবং মুসা (আঃ) তাদেরই কারু সন্তান। তথাপিও তিনি তাকে হত্যা করেননি। আমরা তার থেকে নিকৃষ্ট হতে পারি না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ