ঢাকা, মঙ্গলবার 01 November 2016 ১৭ কার্তিক ১৪২৩, ৩০ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিষ

আফরোজ ইসলাম : গুমোট, ভ্যাপসা গরমে দরদর করে ঘামছে তাপসী, ধর্মেও মুসলিম, কিন্তু লোকজন ওর নামটা শুনেই অন্যকিছু ভেবে বসে। আসলে তাদেরই বা দোষ কি! ওর পুরো নাম তাপসী রাবেয়া। নামের শেষটুকু ধরে পলাশ ছাড়া আর তেমন কেউ একটা ডাকে না। আষাঢ়ে কোথায় ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি হবে, তা না! কেমন বদ্ধ আবহাওয়া! এই পড়ন্ত বিকেলেও কেমন গরম। ধানমন্ডি লেকে’র সামনের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে আধঘন্টা ধরে। সাথে যদিও ননদ তন্বী রয়েছে, তবুও এভাবে এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করতে বিরক্ত লাগছে ওর।পলাশের আসার কথা, অফিসের কাজে গাজীপুর গিয়েছিল,আজ ফিরছে। এই শুক্রবারও ফুরসত নেই, নেই একটু দম ফেলার মত সময়। প্রাইভেট চাকরির এই একটাই সমস্যা। গাধার মত খাটতে হয়।পলাশই ফোনে বলল, তুমি তন্বীকে নিয়ে বের হও, তুমি পৌঁছার আগেই আমি পৌঁছে যাব। কত যে আগে পৌঁছবে তাতো বুঝতেই পারছে তাপসী। তাপসী চাকরি করে ব্র্যাক ব্যাংকে। ম্যাটারনিটি লিভ শুরু হয়েছে তার গতকাল থেকে। সাড়ে আট মাস চলছে তার।অবশ্য এত আগেই লিভ নেওয়ার ইচ্ছে ছিল না ওর, কিন্তু পরিবারের সবার চাপে নিতে হল। শারীরিকভাবে ও অন্যসব হবু মায়েদের চাইতে অনেক সুস্থ আছে, এটা ডাক্তারও বলেছে। গত সপ্তাহে চেকআপ করাতে ড.মাহবুবের কাছে গিয়েছিল, চেকআপ শেষে যখন জানলেন তাপসী এখনও লিভ নেয়নি, বললেন, আপনি সত্যিই অনেক ভাগ্যবান, এখনও যেভাবে হনহনিয়ে চলাফেরা করেন! তাপসী নিজেও বুঝতে পারে সে তুলনামূলক অনেক সুস্থ সবল আছে
এমন অবস্থায়ও।বাচ্চা পেটে আসার পর নরম্যালি যেসব সমস্যা হয় মেয়েদের তার কোনকিছুই তাপসী’র হয়নি। আরামসে খেতে পেরেছে, কোনকিছুতেই অরুচি, বমি হয়নি।বরং মনে হয় রুচি আগের চাইতে বেড়েছে।সাতমাস হলেও বাচ্চাটা পেটের ভেতর তেমন একটা লাথি না দেওয়ায় প্রথমে ভয় পেয়েছিল সবাই,কিন্তু ডাক্তার পরীক্ষা করে হেসে বলল-সবই ঠিক আছে, আপনার আগত সন্তান হয়ত কল্যাণকর, তাই মা’কে জ্বালাতন করছে না। ডাক্তারের কথা শুনে মনের মধ্যে অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করছিল তাপসীর,পলাশও খুশি ছিল অনেক। দুজনই সেদিন বাসায় ফিরে দু’রাকাত নফল নামাজ পড়ে মহান আল্লাহ’র দরবারে শুকরিয়া আদায় করেছিল।
নাহ, পলাশের দেখা নেই। তন্বী ফুসকাওয়ালার কাছ থেকে একটা চেয়ার এনে দিল বসার জন্যে।একটু আরাম করে হেলান দিয়ে বসে তাপসী। পাশের ভেলপুরি, চটপটি, ফুসকা আর ঝালমুড়িতে দেওয়া ঘুঘনি আর লেবু’র গন্ধের মিশেলে একটা ঝাঁঝালো, জিভে পানি আনা গন্ধ একটু পরপর নাকে এসে ধাক্কা দিচ্ছে। আড়চোখে একবার লোভাতুর দৃষ্টিতে ওদিকে তাকাতেই তন্বীর হালকা ধমক—উহু ভাবী, ওদিকে তাকিওনা। ওসব খাওয়া ঠিক হবেনা। সবেমাত্র থার্ড ইয়ার প্রফ দিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল থেকে ছুটিতে এসেছে ও। কিন্তু এখনি এক্সপেরিয়েন্সড ডাক্তারদের মত কথা বলে, এটা নিষেধ, ভাবী ওভাবে বসোনা, ভাবী এটা বেশি খাও-এটা বাচ্চার জন্য ভালো। বাসার সবাই ওকে তাপসীর ফ্রি নার্স বলে! গাড়িতে বসে থাকতে দম বন্ধ হয়ে আসছিল, তাই ড্রাইভারকে গাড়ি পার্ক করতে বলে ওরা লেকের সামনে বসেছে। কিন্তু লাভ হল কইই! বাতাস নেই! টিং টিং আওয়াজে ফোন বাজল মনে হয় তন্বীর। কথা শেষ করে ও ড্রাইভারকে কি বলে তাপসীকে গাড়িতে উঠতে বলল।
-আহ, ছাড় না, আমি একাই পারব। -হুম বললেই হল! ভাবী তোমার সাহস অনেক বেড়েছে আজকাল ...এখন
একটু সাবধানে চলতে হবে তোমার।
-মা হতে গেলে এমন একটু সাহস লাগে। ওসব তুই বুঝবিনা।
-থাক, আমার কাজ নেই বুঝে। উঠ, পা মেলে দিয়ে বস, আমি কুশন ঠিক করে দিচ্ছি। তন্বীর কথা না শুনে লাভ নেই, নাছোড়বান্দা। গাড়ি চলতে থাকে। কিছুক্ষণ পর এসে থামে অভিজাত এক রেস্টুরেন্টের সামনে। অবাক হয় তাপসী, ওদের তো ড.মাহবুবের ওখানে যাওয়ার কথা! গাড়ি থেকে নেমে পার্কিং লট ছেড়ে ভেতরে লবিতে প্রবেশ করে। এখানে আগেও বেশ কয়েকবার এসেছে ওরা। এখানকার স্যুপ আর চাওমিনটা তাপসীর খুব পছন্দের। প্রথম দিককার কয়েকটা টেবিল পেরিয়ে ভেতরে কোনার দিকে এগোতে পলাশ আর ওর শ্বশুর শ্বাশুড়িকে দেখে তন্বীর দিকে তাকালে ও বলে—-আজ যে তোমার জন্মদিন সেটা মনে আছে ? হাসে ও। আনন্দে ওর চোখেমুখে খুশির ঝিলিক দেখা দেয়। সবাই মিলে ওর জন্মদিন সেলিব্রেট করে। পলাশ ওকে গলার একটা ভারী সুন্দর নেকলেস উপহার দেয়। বাসায় ফেরার পথে কানে কানে বলে, —স্টুডেন্ট থাকতে অনেক দিতে চেয়েছি, পারিনি। এখন ইচ্ছেমত দিব, তুমি চুপ থাকবে। আর কিছু বলেনা তাপসী পলাশকে। পরম নির্ভরতায় পলাশের কাঁধে মাথা রাখে। এভাবে কতক্ষণ পেরিয়েছে কে জানে! একটু চোঁখ লেগে এসেছিল ওর বোধহয়। তাকিয়ে দেখে বিশাল জ্যাম, গাড়ি সব মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রয়েছে। অহেতুক হর্ন বাজিয়ে কানের পর্দা ফাটাচ্ছে। রাতে আসাদগেটের এই জ্যামটা খুবই পেইনফুল! মোবাইলের স্ক্রীনে ঘড়ি দেখে তাপসী, রাত ৯টা বাজে। আজ কি জ্যাম একটু বেশি! কোথাও কি যেন হয়েছে মনে হচ্ছে। কিন্তু বাকিদের ক্লান্ত, ঘুমঘুম, নির্বিকার মুখভঙ্গি দেখে শান্ত হল তাপসী। নাহ, এমনিই জ্যাম হয়ত! ঢাকা শহরে কখন যে জ্যামে আটকে থাকতে হয় তার পূর্বাভাস কেউ দিতে পারেনা। আধোঘুম চোখে আবারও পলাশের কাঁধে মাথা রাখল। জানালা দিয়ে দৃষ্টি  পড়ল পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাসের জানালাটার দিকে। একজোড়া প্রেমিকজুটি’র খুনসুটি দেখে ঠোঁটে এক চিলতে হাসির রেখা পড়ে ওর। মনে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় ওদের নিজেদের কথা। কত মান অভিমান! তাপসীই দোষ করত,আবার দোষ স্বীকার না করে  অভিমানও করত। আর পলাশ ওর রাগ ভাঙাতে হলের গেটের সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকত। ওর বান্ধবীরা বলত-এখনি ওমন করবে, বিয়ের পর সব পাল্টে যাবে। না,পলাশ বদলায়নি,বরং আগের চাইতে আরও কেয়ারফুল হয়েছে তাপসীর প্রতি। জ্যাম ছাড়ল মনে হয়! গাড়িগুলোর নড়াচড়া চোখে পড়ছে। বাসায় ফিরতে ফিরতে পৌনে দশটা বেজে গেল। যে যার মত ফ্রেশ হতে গেল। তাপসী জুসের বোতলটা হাতে ড্রয়িং রুমেই সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে টিভি অন করল। জুসটা মাত্র মুখে ধরেছে, ওমনি নিচে জ্বলজ্বল করতে থাকা ব্রেকিং নিউজে চোখ পড়ল-”গুলশানে  হলি আর্টিজান রেস্তোঁরায় হামলা, জিম্মি করে রাখা হয়েছে ভেতরে থাকা মানুষকে।” বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে থাকে টিভিতে। হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে ওর। চেঁচিয়ে ডাকে পলাশ আর বাকিদেরকে। সবাই নিউজ দেখে হতবাক হয়ে যায়। ওরাও আজ ওখানে থাকতে পারত! ভয়ে, শঙ্কায় বুক শুকিয়ে যায়। ওর শ্বাশুড়ি দোয়া পড়তে থাকেন, তাপসী নিজেও কাঁপা গলায় দরূদ পড়ে। হঠাৎ পেটে হালকা ব্যথা মনে হয়। প্রথমে পাত্তা না দিলেও ক্রমশঃ ব্যথাটা বাড়তে থাকে। মুখ কুঁচকে যায় ব্যথায়,ভাবে এখনিতো ব্যথা উঠার কথা না, ডেটতো আরও কিছুদিন পর। পলাশই খেয়াল করে আগে।আর সহ্য করতে পারছেনা ব্যথাটা, ওর শ্বাশুড়ি অবস্থা দেখে দ্রুত গাড়ি বের করতে বলেন। হসপিটালে নিতে হবে। পরদিন সকাল ১১ টা। ক্লিনিকের বেডে তাপসীর পাশে সদ্যজাত মেয়েশিশু! সবাই হাসিমুখে কথা বলছে। মিষ্টি খাওয়ানো হচ্ছে হসপিটালের সবাইকে। নরম্যাল ডেলিভারি হয়েছে তাপসীর। দুজনই সুস্থ। কাছেই চেয়ারে পলাশ বসা। ঝুকে মেয়েকে দেখছে গভীর আগ্রহে। তাপসী’র দিকে তাকিয়ে একটু হাসল পলাশ,ওর চোখেমুখে প্রথম বাবা হওয়ার খুশির বিদ্যুৎ আভা ঝলক দিচ্ছে। পলাশের ওই দৃষ্টিতে তাপসী’র জন্য যে কতখানি ভালোবাসা, মমতা, স্নেহ আর কৃতজ্ঞতা ছিল, তা শুধু তাপসীই বুঝতে পারল।মেয়ের গাল ছুঁয়ে দিল ও আলতো করে! মায়ের আঙ্গুলের স্পর্শ বুঝতে পেরে বোধহয় তাপসীর আঙ্গুল মুখে লাগিয়ে চুষতে লাগল! আহ! কি ভালোলাগা! কেমন যেন অনুভূতি। কতটা সময় একে পেটে নিজের ভেতরে রেখেছে। ছোট্ট, একরত্তি পুতুলসদৃশ সন্তানের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ও ভাবে-ওর জন্য নিজের জীবন দেওয়াটাও পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজের একটি হবে! চোখের কোনায় পানি জমা হয় তাপসীর। পলাশকে বলে মেয়েকে ওর কোলে দিতে। নিবিড় মমতায় কোলে তুলে নেয় নিজেরই শরীরের একটা অংশ হয়ে থাকা মেয়েকে। নরম হাতের অনিয়ন্ত্রিত আঙ্গুলগুলো দিয়ে মায়ের মুখে স্পর্শ করে একদিন বয়সী কুতকুতে ছোট শরীরের মানবটি। আর তাপসীর কাছে মনে হয়-এটাই বুঝি দুনিয়ার সবথেকে সেরা স্পর্শ! মা হওয়া বুঝি একেই বলে! ওদের  দেখতে আসা এক আত্মীয় কেবিনের টিভিটা অন করে। সবার দৃষ্টি একমুহূর্ত টিভির দিকে সরে যায়। পলাশ, তাপসী, তন্বী যেন ভুলেই ছিল কাল রাতে গুলশান হামলার কথা! খবর চলছে—”গুলশান হামলায় জিম্মিদের উদ্ধারে কমান্ডো অভিযান শেষ। পাঁচ জঙ্গির লাশ উদ্ধার।” খবরে আরও জানতে পারল আগের রাতেই ২০ জন বিদেশীকে গলা কেটে হত্যা করেছে, তার মাঝে একজন ছিল হবু মা! চোখমুখ শক্ত হয়ে যায় তাপসীর।
ঘৃণায় তেতো হয়ে উঠে মন। মেয়েটাকে বুকের মাঝে আরও শক্ত করে চেপে ধরে! যেন ওই হিংস্র নরপশুদের মত কেউ ছিনিয়ে নিতে না পারে। নিজের ভেতর একটা নতুন জীবনকে ধারনকারী ওই মা কেও রেহাই দিলনা ওরা? ইসলাম তো এসব শেখায়নি, তবে ওরা কিসের ভিত্তিতে এসব করছে? ইশ! কাল যখন ওর নিজের সন্তান পৃথিবীর আলো দেখায় উন্মুখ, তখন ওই মায়ের সন্তানের পৃথিবীতে আসার পথ চিরতরে বন্ধ করে দিল হায়েনারা! ওই মা টাও নিশ্চয়ই সন্তানকে বাঁচাতে কত কাকুতি মিনতি করেছে! মনের অজান্তেই হিংস্র দৃষ্টিতে টিভিতে অদেখা খুনিদের দিকে  তাকায় তাপসী। আহত, হিংস্র বাঘিনীর দৃষ্টি! মনের ভেতরে তীব্র বিষে হিসহিস করা কু-লী পাঁকিয়ে উঠা হায়েনাদের ছোবল দিতে উদ্যত বিষধর মনসর্পটা কেবলই বলছে— ওরে ইবলিশের বংশধর হায়েনার দল, মায়েদের তীব্র ঘৃণার দৃষ্টিতে যে মরণবিষ পুঞ্জীভূত রয়েছে তা যদি অনুভবযোগ্য না হয়ে প্রয়োগযোগ্য হত তবে তোদের ধ্বংস করতে ওই কামান গোলা বারুদের প্রয়োজন হত না, সন্তান হারানো পৃথিবীর সব মায়েদের হিংস্র দৃষ্টির ওই বিষই যথেষ্ট হত!!!!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ