ঢাকা, বুধবার 02 November 2016 ১৮ কার্তিক ১৪২৩, ১ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

‘আমরা সৃজিব নতুন জগৎ, আমরা গাহিব নতুন গান’

সাদেকুর রহমান : ‘আমরা সৃজিব নতুন জগৎ, আমরা গাহিব নতুন গান’ প্রতিপাদ্যে রাজধানীর বাংলা একাডেমিতে হয়ে গেলো তিনদিনব্যাপী (২৭-২৯ অক্টোবর) ‘নজরুল মেলা’। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের চেতনাকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে এই মেলার আয়োজন করে নজরুল সঙ্গীত শিল্পী পরিষদ। এ আয়োজন উৎসর্গ করা হয় শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমেদ, ফিরোজা বেগম ও সোহরাব হোসেনকে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতার পাশাপাশি মেলার পৃষ্ঠপোষকতা করে ব্র্যাক ব্যাংক। জাতীয় কবিকে নিয়ে এটি এ দেশে সবচেয়ে বড় আয়োজন।
কবি কাজী নজরুল ইসলাম কারও কাছে বিদ্রোহের কবি, কারও কাছে প্রেমের কিংবা তারুণ্যের কবি। নজরুলের রচনায় এ সব কিছুই প্রমাণ মেলে। কবি নজরুলের বিভিন্ন দিক বিভিন্ন মানুষকে আলোড়িত কিংবা আন্দোলিত করেছে। গান এবং কবিতায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিল্পীরা নজরুল মেলায় এভাবেই বাংলাদেশের জাতীয় কবিকে তুলে ধরেছেন। মেলাঙ্গন  প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা ও বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নানান পরিবেশনায় মুখর ছিল।
মেলায় সারা দেশের নজরুল সঙ্গীত শিল্পী পরিষদের ৪৮টি শাখা থেকে শিল্পীরা অংশ নেন। মেলার সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেন নজরুল ইনস্টিটিউট, নজরুল একাডেমি, আইইউবি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, দোলনচাঁপা, আজনাবি একাডেমি, আব্বাসউদ্দিন সঙ্গীত একাডেমিসহ অন্যান্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিল্পীরা। অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মেলাস্থলে ছিল বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, নিমফিয়া, নজরুল ইনস্টিটিউট, এন এস এস পি ও লেজার ভিশনের স্টল।
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে মেলার উদ্বোধন করেন শিল্পী ফেরদৌসী রহমান, কবি-নাতনি খিলখিল কাজী ও অনিন্দিতা কাজী এবং ব্র্যাক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী সেলিম আর এফ হোসেন।‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’, ‘আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন’, ‘সাকি দিল দোলা প্রাণে’, ‘মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম’, ‘সখী মোর বনলতা’ - এমনি নজরুলের নানা মাত্রার গানে মুখর ছিল অনুষ্ঠানস্থল। শিল্পীদের গানে, নানা আলোচনায় উঠে আসেন নজরুল।
মেলার উদ্বোধনী দিনে পরিষদের পক্ষ থেকে সম্মাননা জানানো হয় শিল্পী ফাতেমা তুজ জোহরা, সুজিত মোস্তফা ও নাশিদ কামালকে। সম্মাননা হিসেবে তাদের ক্রেস্ট ও ৫০ হাজার টাকার সম্মানী দেয়া হয়। সে সঙ্গে ছিল পরিষদের সাংগঠনিক অধিবেশন ও জেলা পর্যায়ের নজরুল সঙ্গীতশিল্পীদের গান। উদ্বোধনী পর্বে অতিথি ছিলেন ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, শিল্পী মোস্তফা জামান আব্বাসী, শিল্পী খালিদ হোসেন ও এম এ মান্নান। অনুষ্ঠানে আব্বাস উদ্দীনের গাওয়া ৬৯টি গানের সিডি ‘ভুলিতে পারিনি তাই’ এবং পরিষদের শিল্পীদের গাওয়া গান নিয়ে আরেকটি সিডির মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করেন ব্র্যাক ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুর রশীদ। একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন খিলখিল কাজী, অনিন্দিতা কাজী, শাহীন সামাদ, মুস্তফা জামান আব্বাসী, ফেরদৌস আরা, ইয়াকুব আলী খান, মুরশীদ জাহান, সালাউদ্দিন আহমেদ, নাশিদ কামাল এবং আরমিন মুসা ও তার ব্যান্ড দল। নৃত্যনাট্য ‘বাদল বরিষণে’ পরিবেশন করে লুবনা মারিয়াম ও তার দল।
এর আগে সকালে জাতীয় কবি ও ফিরোজা বেগমের সমাধিতে পরিষদের পক্ষ থেকে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মেলার আনুষ্ঠানিকতা। এরপর বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে বসে সাংগঠনিক অধিবেশন। এতে অংশ নেন পরিষদের ৬১ জেলা শাখার দুইজন করে প্রতিনিধি। তৃণমূলে নজরুল চর্চা বেগবান করতে জেলা কমিটির করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা দেন শিল্পী শাহীন সামাদ, ফাতেমা তুজ জোহরা, পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সুজিত মোস্তফা ও এম এ মান্নান। এর পর বৈকালিক পর্বে ছিল বিভিন্ন জেলার শিল্পীদের পরিবেশনা। অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মেলাস্থলে ছিল বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, নিমফিয়া, নজরুল ইনস্টিটিউট, এন এস এস পি ও লেজার ভিশনের স্টল।
প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে দ্বিতীয় দিন লোক সমাগম তেমন না হলেও শেষ দিনে শনিবার নজরুল ভক্তদের ঢল নেমেছিল মেলায়। সমাপনী দিনের বিশেষ আকর্ষণ ছিল নজরুলশিল্পী ইয়াসমিন মুস্তারির সঙ্গীত পরিবেশনা। এদিন সকাল থেকেই বিভিন্ন জেলার নজরুল সঙ্গীতশিল্পীরা সঙ্গীত পরিবেশন করেন। আরো গান পরিবেশন করেন নাসরিন জাহান, সৈয়দ হোসেন রাজা, অসিম কুমার ধ্রুব, তাসলিমা বেগম নীতা, শায়লা শারমিন বেনু, শামসুল হুদা প্রমুখ। এরপর সমবেত কণ্ঠে সঙ্গীত পরিবেশন করে ‘সুর সপ্তক’, ‘দোলন চাঁপা’ ‘বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টস’ ও আব্বাস উদ্দিন আহমেদ সঙ্গীত একাডেমির শিল্পীরা।
সঙ্গীতশিল্পী সাদিয়া আফরিন মল্লিক ও নাসিম আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের সান্ধ্য পর্বে নৃত্যশিল্পী মুনমুন আহমেদের নির্দেশনায় নজরুলের ‘রিমঝিম রিমঝিম ঘন দেয়া বরষে’ গানের সাথে নৃত্য পরিবেশন করে রেওয়াজ পারফর্মাস স্কুল। এরপর নজরুলের কামাল পাশা কবিতার অংশ বিশেষ আবৃত্তি করেন সিমা ইসলাম। তারপর পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠানের মঞ্চে সঙ্গীত পরিবেশন করেন মরহুম সোহরাব হোসেনের কন্যা কণ্ঠশিল্পী রওশন আরা সোমা, ইউসুফ আহমেদ খান, ডালিয়া নওশিন, বুলবুল মহলানবিশ, আশিষ কুমার সরকার, ছন্দা চক্রবর্তী, মুনতারিন মহল, নওশিন লায়লা, নাসিমা শাহিন ফেন্সি, প্রদীপ নন্দি, রাহাত আরা গীতি। সবশেষে একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন ইয়াসমিন মুশতারি।
মেলার প্রথম দিনই ‘নজরুল সঙ্গীত তরুণদের কতটা টানছে’ শিরোনামে একটি খবর আপলোড করে বিবিসি বাংলা অনলাইন। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের জাতীয় কবির কাজ দেশের প্রতিটি জেলায় আরো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্য থেকেই এ আয়োজন। শিল্পীরা বলছেন, দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় তরুণরা যাতে নজরুল সঙ্গীত শিখতে আগ্রহী হয় সেজন্য তারা কাজ করবেন।
বিবিসি বাংলা’র প্রশ্ন ছিল, “কিন্তু এ ডিজিটাল যুগে তরুণদের কতটা টানতে পারছে নজরুল সঙ্গীত?” জবাবে চাঁদপুরের নজরুল সঙ্গীত শিল্পী রূপালী চম্পক জানান, তরুণরা নজরুল সঙ্গীত শিখতে আগ্রহী। কিন্তু এ সঙ্গীত নিয়ে তাদের মনে এক ধরনের ভয় কিংবা দ্বিধা কাজ করে। ইদানীং নজরুল গীতির ক্ষেত্রে রেস্ট্রিকশনটা বেড়ে গেছে। আমার মেয়ে বলে, নজরুল গীতি গাইতে ভয় পাই। এই বুঝি কেউ বলল আমার ভুল হয়েছে। তিনি বলেন, একজন ওস্তাদের কাছে নজরুল সঙ্গীত শিখলে আরেকজন ওস্তাদ ভুল ধরে। নজরুল সংগীতের চর্চা এখনো অনেকটা শহর কেন্দ্রীক বলে মনে করেন অনেক শিল্পী। তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রে আয়োজনগুলো নজরুলের জন্মবার্ষিকী কিংবা মৃত্যুবার্ষিকীকে কেন্দ্র করেই হচ্ছে।
নজরুল মেলায় আসা শিল্পীরা আলোচনা করেছেন জেলা পর্যায়ে কীভাবে এ সঙ্গীতকে আলো ছড়িয়ে দেয়া যায়। মেলার আয়োজনকারী সংগঠন নজরুল সঙ্গীত শিল্পী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সুজিত মুস্তাফা বলেন, ঢাকার বাইরে আরো বেশি স্টেজ শো করার মাধ্যমে নজরুল সঙ্গীতকে তারা আরো ছড়িয়ে দিতে চান। তিনি বলেন, লোকাল যারা ধনী ব্যক্তি আছেন, যারা কালচারাল মাইন্ডের, একেক জন যদি একেকটা প্রোগ্রাম স্পন্সর করেন, তাহলে প্রতি জেলায় আমরা মাসে একটা শো করতে পারবো।
বিবিসি বাংলা’র আরেকটি প্রশ্ন ছিল, সময় ও কালের ব্যবধানে নজরুল কি এখনকার প্রজন্মের কাছে দুর্বোধ্য? ‘নজরুলের সৃষ্টি সবসময়ের এবং সর্বকালের জন্য প্রযোজ্য - এ আবেদন ফুরিয়ে যাবার নয়। সে আবেদনকে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ছড়িয়ে দিতে হবে’- মনে করেন কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাতনি খিলখিল কাজী।
খিলখিল কাজী বলেন, দাদু নিজেও ইন্সট্রুমেন্টাল পছন্দ করতেন। আমার মনে হয় নজরুলের সুর ঠিক রেখে আমরা যদি ইন্সট্রুমেন্টাল-ওয়েতে না? অনেক গুরুজন একটা গোঁড়ামি করেছেন যে নজরুলের গানে হাত দেয়া যাবেনা। কিন্তু তা নয়। সুরে হাত দেয়া যাবেনা। সুরকে বিকৃত করে ফিউশন করা যাবেনা।
মেলা আয়োজকদের কবি নজরুলের কাজকে ধারাবাহিকভাবে এক প্রজন্ম থেকে অপর প্রজন্মে ছড়িয়ে দেয়ার যে অভিপ্রায় তার উজ্জ্বল দ্যুতি ঝলকে দিয়েছে নজরুল প্রেমীদের। তেমনি বিবিসি বাংলা’র প্রশ্নের জবাবও মিলেছে অনেকাংশে। মেলার বৃষ্টি বিঘিœত দ্বিতীয় ও শেষ দিনে নজরুলের গান পরিবেশন করে মঞ্চ মাত করেন দিনাজপুরের ড. শহিদুল ইসলাম খান, জামালপুরের জহিন আখতার, কিশোরগঞ্জের সিরাজুল ইসলাম, কুষ্টিয়ার ই¯্রাফিল হোসেন, ময়মনসিংহের বিজয় কুমার তপাদার, নোয়াখালির কামাল উদ্দিন, পঞ্চগড়ের সত্যেন্দ্রনাথ রায়, পিরোজপুরের মাহফুজুর রহমান, রাজশাহীর সুখেন্দু শেখর সরকার, সিরাজগঞ্জের হানিফ মোহাম্মদ, সুনামগঞ্জের দেবদাস চৌধুরী, সিলেটের বিজন রায়, ঠাকুরগাঁওয়ের মোজাম্মেল হক বাবলু, নরসিংদীর সন্তোষ কুমার সূত্রধর, ঝিনাইদহের তানজিম তাবাসসুম অর্থি প্রমুখ।
আমাদের জাতীয় কবি নজরুলের দর্শন ও চেতনাকে জাতীয় জীবনে ধারণ করতে হবে। আজ দেশে যে জঙ্গিবাদ ছড়িয়ে পড়ছে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজী নজরুল ইসলামের উদারতা ও মানুষে মানুষে সাম্যের চেতনাকে ছড়িয়ে দিতে হবে। তরুণ প্রজন্মের মাঝে এই সাম্যের বাণী ছড়িয়ে দিতে পারলে তারা এক সুন্দর নতুন পৃথিবী গড়ে তুলবে। - আয়োজকদের এ প্রত্যয়ে শুরু হওয়া মেলা অনেক আশা জাগিয়ে শেষ হয়েছে। আমরা আশা করবো নজরুলের দ্রোহ আর সাম্যের বাণী এবং শোষণের বিরুদ্ধে গর্জে উঠার সুপ্তশক্তি হিসেবে এ মেলা অনেক কার্যকর হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ