ঢাকা, বুধবার 02 November 2016 ১৮ কার্তিক ১৪২৩, ১ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খুলনায় অন্যরকম ভালোবাসায় সিক্ত মেহেদী হাসান মিরাজ

আব্দুর রাজ্জাক রানা : ফুলেল শুভেচ্ছা আর ভালোবাসায় সিক্ত বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের নতুন নায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। সোমবার ঢাকা থেকে বিমানযোগে যশোর, পরে গাড়িতে খুলনার বাড়িতে এসে পৌঁছান তিনি। মাইক্রোবাস থেকে নেমেই ক্যামেরার ঝলকানিতে হাস্যোজ্জ্বল মিরাজ সরলতায় বললেন, মাঠে তো ছবি তুলেছেনই, এখন তো বাসায় এসেছি। এরপরেই বাসায় ছোট্ট গলিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন মিরাজের মা। দীর্ঘদিন পর ছেলেকে পেয়ে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন। নিয়ে যান নিজের ঘরে। ছেলেকে মিষ্টি খাওয়ান। ততক্ষণে এলাকার সব লোকজন বাসায় ভিড় করে ফেলেছে। এ সময় ক্রিকেটপ্রেমীরা ফুল দিয়ে তাকে স্বাগত জানান। কিছুক্ষণ সবার সাথে থেকে মিরাজ বললেন-বাইরে যাবো। বাইরে এসে খুঁজতে শুরু করলেন, নিজের প্রথম জীবনের কোচ মো. আল মাহমুদকে। খুঁজতে শুরু করেন নিজের বন্ধুদের। রাস্তায় ফিরেও খ্যাতির বিড়ম্বনায় পড়তে হয় মিরাজকে। এলাকার সবাই নিজেদের ঘরের ছেলেকে যাকে একটা দিন টিভিতে দেখেছে, তাকে কাছে পেয়ে উল্ল¬াসে মেতে ওঠে। মিষ্টি মুখ, ফুলের শুভেচ্ছা, কোলাকুলি, করমর্দন আর সেলফির অত্যাচারে কাবু হয়ে পড়েন ইংল্যান্ড বধের নায়ক মেহেদি হাসান মিরাজ। ভক্তদের ভালোবাসায় মাঝে মধ্যে বিড়ম্বনায় পড়লেও ক্ষিপ্ত নন তিনি।
সোমবার রাতে নিজ শহর খুলনায় আসার পর থেকে ব্যস্ত সময় পার করেছেন মিরাজ। রাতে গাড়ি থেকে নেমে নিজ ঘরে প্রবেশের পর উৎসুক ভক্তদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, মঙ্গলবার সবার সঙ্গে দেখা করবো। তার সে কথা রক্ষা করতে ভোর থেকে দিনভর ভক্তদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও সেলফির সাথী হতে হাস্যোজ্জ্বল মিরাজ অনেকটা ক্লান্ত। ভক্তদের ভিড়ে রাস্তায় নামলেও খ্যাতির বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে তাকে। এলাকার সবাই ঘরের ছেলেকে কাছে পেয়ে উল্লাসে মেতে ওঠেন।
মিরাজের বাসার সামনে তার সঙ্গে সেলফি তুলে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে হাজী মহসিন কলেজের ছাত্র হৃদয় ইসলাম বলেন, মিরাজ ভাইয়া আগের মতোই আছেন। তিনি আমাদের সময় দিয়েছেন। আমাদের সঙ্গে ছবি তুলেছেন। তিনি বলেন, সেলফির অত্যাচারে কাবু মিরাজ ভাইয়া। তবুও যতোটা পারছেন সবাইকে সময় দিচ্ছেন। হালে মোবাইল ফোনে তোলা ছবির বড় অংশই সেলফি। মিরাজকে ফ্রেমে বন্দি করার বাসনাতে তার বাসার সামনে ভিড় করছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি বিএল কলেজ এবং মহসিন কলেজসহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শত শত শিক্ষার্থী।
দুপুরে একটি দাওয়াতের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন মিরাজ। এজন্য বাসায় না থাকলেও তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে খুলনার খালিশপুরের হাউজিং স্টেটের বিআইডিসি রোডের নর্থ জোন বি ব¬কের ৭নং প্লটের নিজ বাসার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন অনেকে।
মিরাজের বাড়িতে শুভেচ্ছা জানাতে ভুল করেননি রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি, জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, ক্রীড়া সংগঠকরা। সকালে খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য মুহাম্মদ মিজানুর রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম, খুলনা সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র আনিছুর রহমান বিশ্বাসসহ নানা পেশার প্রতিনিধিরা তার বাড়িতে উপস্থিত হন। এ সময় তাকে ফুল দিয়ে ও মিষ্টিমুখ করে স্বাগত জানানো হয়। সংবর্ধনার জবাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভোলেননি মিরাজ। তিনি খুলনাবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন।
এর আগে রাতে বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড টেস্ট সিরিজে সবার সেরা মেহেদী হাসান মিরাজ-কে ফুল দিয়ে সংবর্ধনা জানান বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কাউন্সিলর, খুলনা জেলা ফুটবল এসোসিয়েশন সভাপতি এডভোকেট মো. সাইফুল ইসলাম। এসময় উপস্থিত সকলকে মিষ্টি বিতরণ ও  মিরাজের পরিবারকে দোয়া করা হয়। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিন দিনেই ম্যাচ জিতেছে বাংলাদেশ। না হলে হয়তো এ সুযোগটা হতো না মিরাজের। আগামী ৪ নভেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে বিপিএল। এরপর আবার নিউজিল্যান্ড সফর। সব মিলিয়ে ব্যস্ততাই কাটবে মিরাজ-সাকিবদের। এর মধ্যে পারফরমেন্সেই ছুটি তৈরি করে নিয়েছেন মিরাজরা।
ক্রিকেট বিশ্বের আলোচিত তারকা মেহেদী হাসান মিরাজের ক্রীড়া নৈপুণ্যের প্রশংসা চারদিকেই। ৩০ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকেই মিরাজের বাড়িতে প্রশাসনের কর্মকর্তা, আত্মীয়-স্বজন, রাজনৈতিক, ক্রীড়া সংগঠক, হিতাকাক্সক্ষী-শুভাকাক্সক্ষী ও মিডিয়াকর্মীদের লাগাতার ভিড়। আতিথেয়তায় বাড়ির ছোট্ট উঠানে পাতানোই রয়েছে চেয়ার। মিষ্টি মুখ ও ফুলেল ভালবাসায় সিক্ত মিরাজের বাবা-মা ও একমাত্র বোন। আনন্দ-উল্লাসে মিরাজের বাড়ি এখন অন্যরকম উৎসবস্থলে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বইছে মিরাজকে ঘিরে স্বপ্নীল আগামীর শুভ কামনা। জেলা প্রশাসন তাদের ব্যবহারের জন্য একটি গাড়ি লিফট দিয়েছে। তাকে যশোর বিমান বন্দরে রিসিভ করেন খুলনা জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি এনডিসি আতিকুল ইসলাম। তার সাথে ছিলেন মিরাজের গর্বিত পিতা মো. জালাল হোসেন তালুকদার ও বোন রুমানা আক্তার মিম্মা।
মিরাজের বন্ধু বাঁধন জানালেন, ‘মিরাজ ক্রিকেটার হিসেবে যত ভালো, মানুষ হিসেবে তার চেয়ে অনেক ভালো। সেই ক্লাস ওয়ান থেকে এক সাথে আমরা। খেলা শেষ করে নিজেই ফোন দিয়ে বলবে, কেমন পারফর্ম করেছে। আমরাও উৎসাহ দিয়ে যাই। ক্রিকেট তার কাছে সব কিছু। ক্রিকেটের জন্য সে সব করতে পারে। তার যতটুকু সামর্থ্য আছে, ক্রিকেটের জন্য তার চেয়ে বেশি দিতে চায়। ক্রিকেটের ব্যাপারে সে খুব কমিটেড।’
আরেক বন্ধু সোহান জানালেন, ‘মিরাজ ক্রিকেটার হওয়ার আগে যেমন ছিল, এখনও তেমন, কোনো পরিবর্তন নেই। মিরাজ ওই টাইপের না। বন্ধু মানে বন্ধু।’
অভিষেকে আলো ছড়ানো মিরাজকে নিয়ে বন্ধু বাঁধন মনে করেন বাংলাদেশকে আরও অনেক কিছু দেয়ার সামর্থ্য আছে মিরাজের, ‘মিরাজকে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের আসনে দেখতে চাই। সে সাকিব ভাইয়ের টাইপের ক্রিকেটার। আমরা জানি সে ব্যাটসম্যান হিসেবেও কত ভালো। তার দ্বারা এটা সম্ভব। জানি না সাকিব ভাইকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে কিনা, তবে তার সমপর্যায়ের ক্রিকেটার হোক মিরাজ।’
মিরাজ আজ বুধবার খুলনা ছাড়বেন বলে তার পরিবার সূত্র জানিয়েছে। এরপর বিপিএলের দল ‘রাজশাহী কিংস’ এ যোগ দিবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ