ঢাকা, বুধবার 02 November 2016 ১৮ কার্তিক ১৪২৩, ১ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কোচিংয়ে ছেলে-মেয়েদের অবাধ মেলামেশা সামাজিক অবক্ষয়কে উসকে দিচ্ছে

খুলনা অফিস: খুলনার মুহসীন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী সাবরিনা (ছদ্মনাম)। কোচিং করতে এসে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে কোচিংয়ের এক শিক্ষকের সাথে। গত আগস্টে দৌলতপুরের এক ছাত্রাবাসে মেয়েটি ধর্ষিত হয়। থানায় ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয় ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে।

খ- চিত্র-২: কোচিংয়ে পৌঁছে দিতে এসে সরকারি স্কুলের শিক্ষকের সাথেই সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এক ছাত্রীর মা। তাদের সম্পর্ক বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গেলে ১৭ বছরের দাম্পত্য জীবনে টানাপোড়েন দেখা দেয়। পরে অভিযোগের পর শিক্ষা অফিস ওই শিক্ষককে অন্যত্র বদলি করে (তথ্য সূত্র-মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি), খুলনা)।

খুলনায় অনিয়ন্ত্রিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কোচিং সেন্টারগুলোতে এই ধরণের ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটছে অহরহ। কোচিংয়ের শিক্ষকের সাথে ফেসবুকে বন্ধুত্ব, গল্প-আড্ডায় পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর রূপ নিতে শুরু করেছে। তার ওপর কয়েকটি কোচিংয়ে ছেলে-মেয়েদের অবাধে মেলামেশা ও ‘ফেসবুক-ইন্টারনেট’ ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হয় বলে জানা গেছে। কোন কোন প্রতিষ্ঠানে রয়েছে মাদকের সহজলভ্যতাও।

গত কয়েকদিনে নগরীর বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের গিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাথে কথা বলে এসব ভয়ঙ্কর তথ্য জানা গেছে। মূলত, নানা রঙে ঢঙে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে অর্থ উপার্জনই এ সব প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য। কলেজের ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দিয়ে ক্লাস করানোর কথা বলা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় কমবয়সী বেকার যুবকরা পার্টটাইমে কোচিং করাচ্ছেন।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, খুলনার সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে নামীদামী বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও মাদকে জড়িয়ে পড়ছেন। খুলনার ঐতিহ্যবাহী একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে দুই শিক্ষার্থীকে মাদকে অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় বহিষ্কার করা হয়।

সরকারি করোনেশন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লায়লা আরজুমান বলেন, কোচিংয়ের শিক্ষকদেরকে মেয়েদের (ছাত্রী) মা সম্বোধন করেন ‘ভাইয়া’ বলে। আবার মেয়েরাও তাদেরকে ডাকেন ‘ভাইয়া’ বলে। এই ‘ভাইয়া টিচার’ই ডুবিয়েছে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নগরীর শামসুর রহমান রোডে একটি কোচিং একাডেমীর সামনের খোলা অংশে মোবাইল ফোন নিয়ে ফেসবুকে ব্যস্ত কয়েকজন তরুণ-তরুণী। কিছুক্ষণ পর এক তরুণ মোটরসাইকেল নিয়ে আসতেই একটি মেয়ে তাতে চড়ে বসলেন। আরও কিছুক্ষণ পর ২/৩ ভাগে ভাগ হয়ে অন্যরা ফিরে চললো। বোঝা গেলো কোচিং সেন্টারে ক্লাস নয় এতক্ষণ আড্ডাতেই মেতে ছিলেন তারা।

সম্প্রতি, নগরীর দোলখোলা মেইন রোডের এম্বিশন কমার্স একাডেমীতে গিয়ে দেখা যায়, কোচিং সেন্টারের প্রবেশ পথে কালো বোরকা পরা এক মেয়েকে ঘিরে রয়েছে ৩/৪ জন তরুণ। কাছে যেতেই সহপাঠী তরুণের কথা শোনা গেলো- ‘এই ফেসবুক খুললা, মিষ্টি খাওয়াবা না?’ জবাবে মেয়েটি ব্যাগ থেকে চকলেট বের করে এগিয়ে দিলো। অন্য একজন তখন মেয়েটির মোবাইল নম্বর ও ফেসবুক আইডি নিতে ব্যস্ত। এদেরকে পাশ কাটিয়ে কোচিং সেন্টারের ভেতরে ঢুকতেই ডান দিকের একটি কক্ষে দেখা গেলো-একটি ছেলে ও একটি মেয়ে একান্তে কথা বলছে। পাশের কক্ষে ৮/১০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে তখন ক্লাস করছেন কম বয়সী এক তরুণ শিক্ষক।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি), খুলনা অঞ্চলের সহকারী স্কুল পরিদর্শক শেখ হেদায়েত হোসেন বলেন, গত ১৭ অক্টোবর আহসান আহমেদ রোডের কয়েকটি কোচিং সেন্টারে গিয়ে দেখা যায় ছেলে- মেয়েদেরকে কোচিংয়ে ঢুকিয়ে তাদের মায়েরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন মোবাইল ফোন নিয়ে। কেউ ফেসবুক চ্যাটিং করছেন, কেউ মোবাইল ফোনে গল্প জুড়ে দিয়েছেন। ‘স্কুলের সময় কেন কোচিং করানো হচ্ছে’ শিক্ষকদের এ প্রশ্ন করা হলে এসব মায়েরাই তাদেরকে বাঁচাতে এগিয়ে আসছেন। তাদের জবাব ‘এই ভাইয়া’ কোচিং করাচ্ছেন বলেই আমাদের মেয়েরা ভালো করতে পারছে। কোচিংয়ের ভেতরেও মেয়েদের দেখা গেলো শিক্ষককে ‘ভাইয়া’ বলে সম্বোধন করতে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি), খুলনা অঞ্চলের উপ-পরিচালক টিএম জাকির হোসেন জানালেন আরো তিক্ত অভিজ্ঞাতার কথা। তিনি বলেন, স্কুলের শিক্ষকের সাথে মেয়ের মায়ের সম্পর্ক বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গেলে অভিযোগের পর ওই শিক্ষককে অন্যত্র বদলি করতে হয়। কোচিংয়ে পৌঁছে দিতে এসে সরকারি স্কুলের শিক্ষকের সাথেই সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এক ছাত্রীর মা। তাদের সম্পর্ক বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গেলে ১৭ বছরের দাম্পত্য জীবনে টানাপোড়েন দেখা দেয় ওই দম্পতির। পরে অভিযোগের পর শিক্ষা বিভাগ ওই শিক্ষককে অন্যত্র বদলি করে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই ওই শিক্ষক আবারও আগের স্থানে ফিরলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে মোড় নেয়।

খুলনার সোনাডাঙ্গা থানায় গত ১৪ অক্টোবর রাতে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন বিএল কলেজের আরেক ছাত্রী। এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, পড়তে যাওয়া-আসার পথে এক যুবকের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা হয়। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্কের পর এখন সবকিছু অস্বীকার করছে ওই যুবক। পুলিশ আসামিকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি।

কিছু প্রতিষ্ঠান সহপাঠী শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার জন্য মেয়েদের নির্দিষ্ট অর্থ ছাড় টোকেন মানি) দেয়। এরা সহপাঠীদের মধ্যে প্রচারণা চালায় ও নির্দিষ্ট ওই কোচিং সেন্টারে ভর্তির জন্য উদ্বুদ্ধ করে। ভুক্তভোগী অভিভাবকরা মন্তব্য করেছেন, এটা কোচিং সেন্টার চালাতে মেয়েদের দিয়ে করানো ‘প্রতারণার ফাঁদ’।

সোনাডাঙ্গা ক্লাস্টার বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ফোরামের সভাপতি আরজুল ইসলাম জানান, এক সময় যার কোন কাজ ছিল না, সে হোমিওপ্যাথি করতো। আর এখন কোন চাকরি-বাকরি না থাকলে কোচিং সেন্টার খুলে বসে। এতে শিক্ষার মান কমছে, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অভিভাবকরা। মেধা, দক্ষতা ও সৃজনশীল চিন্তা-ভাবনা দিয়ে শিক্ষকরা ছাত্রদের পড়াবেন এটাই প্রত্যাশা।

অভিভাবকদের মতে, কোন ধরণের দায়বদ্ধতা না রেখেই যেনতেন এ সব প্রতিষ্ঠান খোলা হয়েছে। সন্তানদের কোচিং করানো অনেক গরীব অভিভাবকের জন্য কষ্টসাধ্য। কোচিংমুখিতা বন্ধে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের আরও যত্নবান হওয়া প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।

তথ্য প্রযুক্তি যেমন এনেছে গতি, তেমনি এর নেতিবাচক প্রভাবে ডুবছে তরুণ সমাজ। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা। প্রযুক্তিনির্ভর যুগে ফেসবুক-ইন্টারনেট ছাড়া ছাত্র-ছাত্রী খুঁজে পাওয়াই দায়। শহরের ছেলে-মেয়েদের ক্ষেত্রে আরও বেশি। ফেসবুক-ইন্টারনেটেই ডুবছে শিক্ষা ব্যবস্থা। 

কলেজ শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের কলেজে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ থাকার পরও অনেক ছাত্রী লুকিয়ে ফোন নিয়ে আসে। ছাত্রীরা ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বাথরুমে গিয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলে। আর কোচিং করতে গেলে তারা যেন স্বাধীনতা পেয়ে যায়। তিনি বলেন, অনেক অভিভাবক আবার এসে অভিযোগ করেন, তার মেয়ে রাত জেগে পড়ার নামে মোবাইল ফোনে ফেসবুক খুলে বসে থাকেন। এভাবে ফেসবুক ব্যবহার করার ফলে শিক্ষার মান দিন দিন খারাপের দিকেই যাবে। আগামীতে আরও খারাপ ফল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইন্টারনেটের কুফল দিন দিন আরও বাড়বে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ