ঢাকা, বুধবার 02 November 2016 ১৮ কার্তিক ১৪২৩, ১ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সন্ত্রাস প্রতিরোধে রোবট

এম এস শহিদ : সন্ত্রাসবাদ বা জঙ্গিবাদ নিয়ে বর্তমান বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ আতঙ্কিত। সন্ত্রাসবাদী বা জঙ্গিবাদীদের নৃশংস তৎপরতার ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিনিয়ত অসংখ্য মানুষের প্রাণ যাচ্ছে এবং সেইসাথে সহায় সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। সন্ত্রাসবাদী বা জঙ্গিবাদীদের হামলার হাত থেকে জীবন ও সম্পদ কিভাবে রক্ষা করা যায় তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা এমন একটি রোবট উদ্ভাবন করেছেন, যা দিয়ে সন্ত্রাসবাদী বা জঙ্গিবাদীর ওপর হামলা চালানো যায়। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ভাবিত এ জাতীয় রোবট বা ড্রোন অনেকদিন ধরেই তাদের সামরিক অভিযানে ব্যবহার করে আসছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র্র সামরিক কাজের বাইরে এই প্রথম বেসামরিক জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় এ জাতীয় রোবট ব্যবহারের ঘোষণা দিয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী রোবটের মাধ্যমে বিস্ফোরক ডিভাইস সরবরাহ করে সন্দেহভাজন বন্দুকধারীকে হত্যা করে। ডালাসের ওই বন্দুকধারী নিহত হওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে ঘাতক রোবট বিতর্ক। এ ব্যাপারে ডালাস পুলিশ প্রধান তার প্রতিক্রয়ায় বলেন, রোবট ছাড়া অন্য কোন প্রতিক্রিয়া নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে। তবে নিরাপত্তা কিংবা যুদ্ধবিগ্রহে দীর্ঘদিন ধরেই রোবট কিংবা মানুষ্যবিহীন যন্ত্রের ব্যবহার চলে আসছে। ইতোমধ্যে রোবট ব্যবহার ও বিতর্ক বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। 

ঘাতক ড্রোন : রিমোটচালিত রোবটের মাধ্যমে হত্যার ঘটনা যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরেই সামরিক বাহিনীতে নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে প্রযুক্তির ব্যবহার চলে আসছে। দুরবর্র্র্তী স্থানে হামলা চালাতে এর ব্যবহার সর্বাধিক। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বাহিনীর প্রচলিত ব্যবস্থাপনার বাইরে প্রেডেটর বা রিপার নামের ড্রোন তথ্য আনম্যানড অ্যারিয়াল ভেহিকেলের ব্যবহার শুরু করেছে। ২০০৯ সাল থেকে ৪৭৩ টি ড্রোন হামলার মাধ্যমে ২ হাজার ৫০০ যোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের দাপ্তরিক হিসেবে জানানো হয়েছে। এসব হামলায় শতাধিক সাধারণ মানুষও নিহত হয়েছে। যদিও সমালোচকদের মতে, নিহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডা উপত্যকায় অবস্থিত ক্রিক এয়ারফোর্স বেজ থেকেই ড্রোন ওড়ানো হয়। ২০০৮ সালের দিকে বিবিসির একটি প্রতিনিধি দল ওই স্থান ভ্রমণ করেন। এ সফরের সময় প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ বৈমানিকরা ক্রিক এয়ারফোর্স বেজ থেকে ড্রোনের মাধ্যমে অস্ত্র ব্যবহার শুরু করে। এসময় বিবিসির সদস্যরা ড্রোন চালনাকে ভিডিও গেম খেলার অনুভূতির সাথে তুলনা করা যায় কিনা এমন বহুল আলোচিত প্রশ্ন করতেই একজন বৈমানিক তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। ড্রোন ব্যবহারকারীদের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হয়, মানুষ্যবিহীন প্লেন ব্যবহার অধিকতর কার্যকরী। কারণ ব্যাখ্যা করে বলা হয়, ড্রোন চালনার জন্য যথেষ্ট সময় পাওয়া যায় এবং লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানা সম্ভব হয়। এ ছাড়া এর মাধ্যমে বৈমানিকেরা ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস পায়। যেমন নিরাপদ অবস্থানে ডালাসের পুলিশ অফিসাররা বন্দুকধারীর ওপর আক্রমণ পরিচালনা করতে সমর্থ হয়ে ছিলেন। তবে সমালোচকরা বলছে, এ ধরনের নিরাপদ অবস্থান থেকে কোনো অভিযানের গতিপ্রকৃতি পুরোপুরি পাল্টে দেয়। এর ফলে প্রাণঘাতী আক্রমণের সীমা অনেকটাই কমে আসে। 

গান রোবট : সর্বপ্রথম দক্ষিণ কোরিয়া গার্ড হিসেবে রোবটের ব্যবহার শুরু করে। দক্ষিণ কোরিয়া উত্তর কোরিয়ার সাথে সংযুক্ত বেসামরিক এলাকাতে এর ব্যবহার করে। রোবটটির বিশেষ ধরনের একটি অস্ত্র যা তাপ ও গতি শনাক্ত করতে পারে। এর উপকারিতা সম্পর্কে রোবটটির উদ্ভাবকরা বলেন, মানুষের মতো রোবট গার্ডগুলো ঘুমিয়ে পড়ে না কিংবা ক্লান্ত হয়ে পড়ে না। এ রোবটটি কোনো কিছুকে হুমকি হিসেবে আাঁচ করতে পারলে তা কন্ট্রোল রুমকে জানিয়ে দেয়। যদিও মানুষকেই গোলাগুলির সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এমনকি পুলিশ ডালাসে যে রোবটটি ব্যবহার করেছিল সেটি ব্যবহারকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বাস্তবিক স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালিত রোবটিক সিস্টেমে গুলি ছুঁড়তে বা বোমা বিষ্ফোরণ ঘটাতে মানুষের সিদ্ধান্তের প্রয়োজন পড়বে না। সেজন্য কোরিয়ান বিশেষজ্ঞরা রোবটের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে প্রশিক্ষণের জন্য নিজেদেরই শত্রু হিসেবে শনাক্ত করে গোলাগুলি শেখানো হতে পারে। রোবটের স্বয়ংক্রিয় ব্যবহার নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কিভাবে এর কমান্ডকে সাজানো হবে। তাছাড়া কোথায় গুলি চালাতে হবে, কোথায় হবে না কিংবা গোলাগুলির সময় বেসামরিক জনগনের যাতে ক্ষয়ক্ষতি না হয় তা মাথায় রেখে কীভাবে এর ব্যবহার করা হবে তা প্রশ্নবিদ্ধ। বিষয়টা অনেকটা এমন যে, বাচ্চাদের একটি দল চালকবিহীন গাড়ির মুখোমুখি কিংবা যাত্রীরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে এমন সময় গাড়িটির কী করার থাকে? 

সাইবার নিরাপত্তার সূচনা : যুক্তরাষ্ট্র স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত নিউক্লিয়ার আক্রমণ মোকবিলায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে কম্পিউটারের ব্যবহার শুরু করে। এর কিছুদিনের মধ্যে সরাসরি প্লেন ভূপাতিত করতে এই সিস্টেমে ক্ষেপণাস্ত্র সংযুক্ত করা হয়। সর্বপ্রথম বিমান বাহিনীর একজন ক্যাপটেন কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত মিসাইল ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কেনোনা এ ধরনের কম্পিউটার সিস্টেমে মিসাইল ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কেনোনা এ ধরনের কম্পিউটার সিস্টেমে যে কেউ অনুপ্রবেশ করে মিসাইলের লক্ষ্য সোভিয়েত বোমারুদের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শহরের দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এ ধরনের প্রশ্নের পর থেকেই সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ শুরু হয়। এখনো পর্যন্ত রিমোট কন্ট্রোলড কিংবা স্বয়ংক্রিয় উভয় ধরনের ব্যবহার যথেষ্ট নিরাপদ নয়। সামরিক বাহিনী অস্ত্র গোলাবারুদ চালনাকারী রোবট নিয়ন্ত্রণে সাংকেতিক মাধ্যম ব্যবহার করে।  

তবে এটা সত্য যে, প্রতিটি সিস্টেমে কিছু না কিছু সমস্যা থাকে যা হ্যাকররা বের করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে পারে। ইতোমধ্যে আমরা মানবচালিত চলন্ত গাড়ি রিমোট কন্ট্রোলে নিয়ে নেয়ার ঘটনা দেখেছি। সুতরাং অদূর ভবিষ্যতে রোবটের নিয়ন্ত্রণ অন্য কেউ নিয়ে ভুল লক্ষ্য বস্তুতে আঘাত হানলেও তা অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। রোবটের রিমোট কন্ট্রোল কিংবা স্বয়ংক্রিয় ব্যবহারের সাফল্য কিংবা ঝুঁকি সম্পর্কিত বিষয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো পর্যন্ত পরিষ্কার ধারণা দিতে পারেনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ