ঢাকা, বুধবার 02 November 2016 ১৮ কার্তিক ১৪২৩, ১ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

এতো কোটিপতি গেলো কোথায়!

এইচ এম আকতার : এতো কোটিপতি গেলো কোথায়। আইন করেও কর ফাঁকি ঠেকানো যাচ্ছে না। প্রকাশ্যে হাজার কোটি টাকার মালিক শত শত থাকলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তালিকায় নেই একজনও। প্রতি বছর সর্বোচ্চ করদাতাদের পুরস্কার দেয়া হলেও এই তালিকায় নেই শীর্ষ সম্পদশালীরা। ব্যক্তিপর্যায়ে বরাবরই এর বাইরে থেকেছেন শীর্ষ সম্পদশালীরা। ব্যতিক্রম হয়নি এবারো।
জানা গেছে, এবার ২০১৫-১৬ করবর্ষেও শীর্ষ ১০ করদাতার তালিকায় নেই এসব সম্পদশালীরা। আগের ধারাবাহিকতায় এবারো সর্বোচ্চ করদাতার পুরস্কার পেতে যাচ্ছেন জর্দা ব্যবসায়ী মো. কাউছ মিয়া। এ নিয়ে টানা তিনবার এ স্বীকৃতি পাচ্ছেন তিনি। এবার শীর্ষ করদাতার সম্পদের পরিমাণ ২৭৫ কোটি টাকা। সারা দেশে এমন একজনও নেই যিনি ব্যক্তিগতভাবে হাজার কোটি টাকার মালিক। অথচ প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে হাজার কোটি টাকার মালিক এমন লোকের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। তাহলে তারা গেলো কোথায়। এনবিআরের করের আওতায় তাদের এসব সম্পদ নেই কেন। তাহলে কি তারা লাখ লাখ মানুষের চোখ ফাঁকি দিয়ে সম্পদ গোপন করছেন।
জর্দার ব্যবসায়ী কাউছার মিয়াকে কিনতে পারে এমন সম্পদশালীর সংখ্যা হবে কয়েক হাজার। কাউছার এনবিআরের করের আওতায় আসলেও বাহিরে রয়ে যাচ্ছে এসব চিহ্নিত সম্পদশালীরা। এতে করে রাষ্ট্র হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পাচ্ছে না। আইনের ফাঁকে কিভাবে তারা বের হয়ে যান এমন প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে নিট সম্পদের হিসাবে শীর্ষে ছিলেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী শওকত আলী চৌধুরী। তার প্রদর্শিত নিট সম্পদের পরিমাণ ২৭৫ কোটি টাকা। ফিনলে প্রপার্টিজের অংশীদার ও ইস্টার্ন ব্যাংকের পরিচালক এ ব্যবসায়ী শীর্ষ করদাতার তালিকায় এবার রয়েছেন ৪২তম স্থানে। ওই বছর সম্পদশালীর তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা নাভানা গ্রুপের সাইফুল ইসলামের নিট সম্পদ ছিল ২৭০ কোটি টাকার। ২০১৫-১৬ করবর্ষে সর্বোচ্চ করদাতার তালিকায় তার অবস্থান ৯৮তম।
সম্পদশালীর তালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকা বসুন্ধরা গ্রুপের সাদাত সোবহান ২০৫ কোটি টাকার নিট সম্পদের মালিক হলেও এবারের শীর্ষ ১০০ করদাতার তালিকায় নেই তার নাম। ওই বছর ২০০ কোটি টাকা নিট সম্পদ নিয়ে তালিকার চতুর্থ স্থানে থাকা হোসাফ গ্রুপের মোয়াজ্জেম হোসেনের নাম এবার শীর্ষ করদাতার তালিকায় ৯৩তম স্থানে।
২০১৪ সালে ১৬৫ কোটি টাকার নিট সম্পদ নিয়ে সম্পদশালীর তালিকায় পঞ্চম স্থানে ছিলেন বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান। এবার সেরা ১০০ করদাতার তালিকায় নেই তিনিও। ওই সময় শীর্ষ সম্পদের তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে থাকা আফরোজা বেগমও নেই এবারের শীর্ষ ১০০ করদাতার তালিকায়। যদিও ২০১৪ সালে ১৫৮ কোটি টাকার মালিক ছিলেন তিনি। ওই বছর ১৫৫ কোটি টাকার নিট সম্পদ নিয়ে তালিকায় সপ্তম স্থানে থাকা সাফওয়ান সোবহানও সেরা ১০০ করদাতার তালিকায় নেই। তবে একই গ্রুপের সায়েম সোবহান তরুণ করদাতার তালিকায় পঞ্চম স্থানে রয়েছেন।
দেশে সম্পদশালীদের তালিকায় রয়েছেন আকিজ পরিবারের পাঁচ সদস্য শেখ বশির উদ্দিন, শেখ জামিল উদ্দিন, শেখ জসিম উদ্দিন, শেখ শামীম উদ্দিন ও শেখ নাসির উদ্দিন। প্রত্যেকেই ১৪০ কোটি টাকার নিট সম্পদের মালিক। ১৪০ কোটি টাকার নিট সম্পদের মালিক প্রাইম ব্যাংকের এমএ খালেকও। ২০১৪ সালে যৌথভাবে তারা ছিলেন সম্পদশালীদের তালিকায় অষ্টম স্থানে। ২০১৫-১৬ করবর্ষে শীর্ষ ১০০ করদাতার তালিকায় নেই তাদের কেউই। ওই বছর ১৩৭ কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে তালিকার নবম স্থানে থাকা বেক্সিমকো গ্রুপের চেয়ারম্যান সোহেল এফ রহমানও নেই শীর্ষ ১০০ করদাতার তালিকায়।
ব্যক্তি পর্যায়ে সর্বোচ্চ আয়কর প্রদানকারীদের মধ্যে এবার সর্বোচ্চ কর প্রদানকারী ঢাকার ব্যবসায়ী মো. কাউছ মিয়া। চাঁদপুরে জন্মগ্রহণকারী এ জর্দা ব্যবসায়ী এ নিয়ে দশমবারের মতো এ সম্মাননা পাচ্ছেন। আর সর্বোচ্চ করদাতার স্বীকৃতি পাচ্ছেন টানা তৃতীয়বারের মতো। ১৯৫০ সাল থেকে ৬৬ বছর ধরে ব্যবসা পরিচালনাকারী এ ব্যবসায়ীর বয়স এখন ৮৬ বছর। কর অঞ্চল-২ ঢাকায় কর প্রদান করেন তিনি।
জানতে চাইলে মো. কাউছ মিয়া বলেন, কর দেয়ার যোগ্য হওয়ার পর থেকেই নিয়মিত তা দিয়ে আসছি। দেশে ব্যবসা করে কর দেয়া দায়িত্ব ও সম্মানের। এবার পেলে ১০ বার এ পুরস্কার পাওয়া হবে। টানা তৃতীয়বার সর্বোচ্চ করদাতা হতে পারার মতো আনন্দ আর কিছুতে নেই।
এনবিআরের শীর্ষ করদাতার তালিকায় আরেক চমক এম এম আমজাদ পরিবার। শীর্ষ ১০ করদাতার মধ্যে এ পরিবারেরই রয়েছেন ছয়জন। চার বছর ধরে এ পরিবারের ছয় সদস্য থাকছেন শীর্ষ ১০ করদাতার তালিকায়। আইটি প্রতিষ্ঠান এটিআই লিমিটেডের বাংলাদেশ প্রতিনিধি এ পরিবার। দেশে তাদের প্রধান ব্যবসা ওষুধ খাতের। মরহুম ডা. এম এম আমজাদ প্রতিষ্ঠিত ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ হায়দার হোসেন সেরা করদাতার তালিকায় রয়েছেন ৬ নম্বরে। এম এম আমজাদের স্ত্রী খাজা তাজমহল শীর্ষ করদাতার তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে। তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছেন একই পরিবারের সদস্য ও ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক রুবাইয়াৎ ফারজানা হোসেন, চতুর্থ লায়লা হোসেন, পঞ্চম হোসনে আরা হোসেন ও সপ্তম স্থানে রয়েছেন মোহাম্মদ ইউছুফ। তারা সবাই এনবিআরের কর অঞ্চল ৮ ও ৩-এর অধীন কর প্রদান করেন।
আমজাদ হোসেনের ছেলে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ হায়দার হোসেন বলেন, একই পরিবার থেকে ছয়জন একসঙ্গে একই করবর্ষে শীর্ষ আয়করদাতা হতে পেরে আমরা গর্বিত। এটা আমরা বাবার কাছ থেকে শিখেছি। গত বছরও আমরা এ স্বীকৃতি পেয়েছিলাম। ১৯৫২ সাল থেকে করনীতি পরিপালন করে আয়কর দিয়ে গেছেন আমার বাবা। আয়কর পরিশোধের ব্যাপারটা এখন আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
এবারের শীর্ষ ১০ করদাতার তালিকায় অন্যদের মধ্যে অষ্টম স্থানে রয়েছেন প্রকৌশলী খন্দকার বদরুল হাসান। নবম স্থানে রয়েছেন সংসদ সদস্য কামরুল আশরাফ খান ও দশম স্থানে আরেক সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজী। এর মধ্যে কামরুল আশরাফ খান বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার এসোসিয়েশনের সভাপতি। গোলাম দস্তগীর গাজী হচ্ছেন গাজী গ্রুপের কর্ণধার।
বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে যারা শীর্ষ ১০০ করদাতার তালিকায় আছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মুক্তাদির। তালিকায় তার অবস্থান ১১তম। নরসিংদীর ব্যবসায়ী আব্দুল কাদির মোল্লা রয়েছেন ১২তম স্থানে। এ ছাড়া স্কয়ার গ্রুপের স্যামুয়েল এস চৌধুরী রয়েছেন ১৫তম, তপন চৌধুরী ১৮তম, অঞ্জন চৌধুরী ২০তম, ট্রান্সকম গ্রুপের লতিফুর রহমান ২২তম, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ ২৩তম ও একমির মিজানুর রহমান সিনহা রয়েছেন ৪০তম স্থানে। সেরা ১০০ করদাতার তালিকায় মিজানুর রহমান সিনহা ছাড়াও এ পরিবারের আরো চার সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার রয়েছেন ৪৮তম, বিএসআরএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আলী হোসাইন আকবর আলী ৫২তম ও এ কে খান গ্রুপের সালাহউদ্দিন কাশেম খান রয়েছেন ৫৭তম স্থানে।
উল্লেখ্য, জাতীয় পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ব্যক্তিক্ষেত্রে কমপক্ষে সাড়ে ৪ কোটি টাকার কর প্রদান করলে করদাতারা ট্যাক্স কার্ড পাওয়ার যোগ্য হন। এর মধ্য থেকে বাছাই করে সেরা ১০ জনকে জাতীয় পর্যায়ে ট্যাক্স কার্ড, ক্রেস্ট ও সম্মাননা সনদ দিয়ে আসছে এনবিআর। তবে গতকাল ট্যাক্স কার্ডের সংখ্যা বাড়িয়ে জাতীয় ট্যাক্স কার্ড নীতিমালার সংশোধনী অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। এতে ব্যক্তিপর্যায়ে ১০ জনের পরিবর্তে ৬৪ জন ট্যাক্স কার্ড পাবেন। ট্যাক্স কার্ডধারীরা বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার, তারকা হোটেলসহ সব আবাসিক হোটেল বুকিং প্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার পান। বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠান, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাসহ স্থানীয় সরকার কর্তৃক আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনায় আমন্ত্রিত হন তারা। যেকোনো ভ্রমণে বিমান, রেলপথ ও জলপথে সরকারি যানবাহনে টিকিট প্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার পেয়ে থাকেন ট্যাক্স কার্ডধারীরা। এর বাইরে তারা মা-বাবা, স্ত্রী, ছেলেমেয়ে ও নিজের চিকিৎসার ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে বিশেষ সুবিধাও পেয়ে থাকেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ