ঢাকা, বুধবার 02 November 2016 ১৮ কার্তিক ১৪২৩, ১ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভারতীয় অবৈধ অস্ত্রে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চলছে বাংলাদেশে

নাছির উদ্দিন শোয়েব : ভারত থেকে আসা অবৈধ অস্ত্রে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চলছে বাংলাদেশে। বিভিন্ন সময় চোরাই পথে ভারতের তৈরি অবৈধ অস্ত্র দেশে আসলেও তা নিয়ে তেমন তদন্ত হয়নি। সাম্প্রতিক সময় গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁসহ কয়েকটি জঙ্গি হামলার পর বিষয়টি আলোচিত হয়। তদন্ত শুরু করে দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থা। এরই মধ্যে সোমবার রাতে রাজধানীতে ১০টি আগ্নেয়াস্ত্রসহ এক ভারতীয় অস্ত্র ব্যবসায়ী পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট তথ্যমতে-বাংলাদেশে অবৈধ অস্ত্রের ভারতীয় সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। অবৈধভাবে অস্ত্র নিয়ে এসে সেগুলো বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছে বিক্রি করে এমন একটি ভারতীয় সিন্ডিকেটের সন্ধান পেয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। ভারতীয় জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) বলেছে, গুলশান হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র ভারতের তৈরি। এর আগে বাংলাদেশের কাউন্টার টেরোরিজম ও ট্রান্স ন্যাশনাল ইউনিটও জানিয়েছে, গুলশান হামলার অস্ত্র ভারত থেকেই এসেছে এবং এ অস্ত্র তৈরিও হয়েছে সেখানকার একটি রাজ্যে।
গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) জানায়, সোমবার রাতে রাজধানীর গাবতলী এলাকা থেকে খায়রুল নামের এক ভারতীয় অস্ত্র ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা হয়। তার কাছ থেকে ১০টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৩৫টি বুলেট, ১২টি ম্যাগাজিন জব্দ করা হয়। ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) আব্দুল বাতেন জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে খায়রুল স্বীকার করেছে, সে অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সে অবৈধভাবে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে অন্প্রুবেশ করে বাংলাদেশ ও ভারতের একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের যোগসাজশে অস্ত্র নিয়ে আসতো। পরে সেগুলো ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গার সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছে বিক্রি করতো। তিনি আরও জানান, ‘জিজ্ঞাসাবাদে খায়রুল আরও জানিয়েছে, ভারতের অস্ত্র ব্যবসায়ীরা বিহার থেকে বালুর ট্রাকে করে অস্ত্রগুলো পশ্চিমবঙ্গের আস্তানায় নিয়ে আসে। তারপর সুযোগ বুঝে তারা সেগুলো বাংলাদেশে পাচার করে। ডিবির উপ-পুলিশ কমিশনার শেখ নাজমুল আলম জানান, বেনাপোল সীমান্ত হয়ে ভারত থেকে অবৈধ অস্ত্রের চালান আসছে। যা দেশের অবৈধ অস্ত্রধারীদের কাছে ছড়িয়ে পড়েছে।
গত ২৮ অক্টোবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার অনলাইনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থাকে (এনআইএ) বলেছে গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলায় ব্যবহৃত রাইফেল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলায় তৈরি করা হয়। বর্ধমানের খাগড়াগড়ে বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত অভিযোগে গত সেপ্টেম্বরে গ্রেফতার ছয় জঙ্গির একজন এমনটাই জানিয়েছেন। এনআইএ-কে ওই জঙ্গি বলেছেন, মালদার আস্তানায় পাকিস্তানী বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় অস্ত্র বানানো হয়। বিহারের মুঙ্গের থেকে আসা অস্ত্র প্রস্ততকারকদের প্রশিক্ষণ দিতে গোপনে মালদা আসেন পাকিস্তানী ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অস্ত্র প্রস্ততকারকরা। একে-২২ রাইফেল তৈরির জন্য সীমান্তবর্তী জেলায় ঘাঁটি স্থাপন করা হয়। সেখানে তৈরি করা অস্ত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ দিয়ে বাংলাদেশে পাচার করা হয়। গুলশান হামলার এক মাস আগে একে-২২ রাইফেল ও পিস্তল ঢাকার জঙ্গিদের কাছে পৌঁছায় বলে এনআইএর ধারণা।
এদিকে গুলশান হামলার পর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শুরুতেই অভিযোগ ওঠে এতে ব্যবহৃত অস্ত্র পার্শ্ববর্তী দেশ থেকেই প্রবেশ করে। পরবর্তী সময়ে হামলায় সুনিশ্চিতভাবে মুঙ্গের সংযোগ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছিলেন কাউন্টার টেরোরিজম ও ট্রান্স ন্যাশনাল ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম। এ অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করে ভারতের বিহার পুলিশ। গত ১ জুলাই জঙ্গিরা হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা চালিয়ে ২০ জন দেশী-বিদেশী নাগরিককে হত্যা করে। তাৎক্ষণিক অভিযান চালাতে গিয়ে নিহত হন পুলিশের দুজন কর্মকর্তা। ২ জুলাই সকালে সেনা কমান্ডোরা অভিযান চালিয়ে হলি আর্টিজান থেকে ১৩ জনকে উদ্ধার করেন। কমান্ডো অভিযানে হামলায় জড়িত পাঁচ জঙ্গি নিহত হন। পুলিশ বলছে, এই হামলায় ‘নব্য জেএমবি’ জড়িত। পুলিশ জানায়, কমান্ডো অভিযানের পর গুলশানের হলি আর্টিজান থেকে অত্যাধুনিক ৫টি পিস্তল, ৩টি একে-২২ রাইফেল, বিস্ফোরিত শক্তিশালী গ্রেনেডের ৯টি সেইফটি পিন ও ৩০০ রাউন্ড গুলীর খোসা উদ্ধার করা হয়। অত্যাধুনিক ভয়ঙ্কর এ অস্ত্রশস্ত্র দেশে এসেছে গোপন পথে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃষ্টি এড়িয়ে।
কয়েক দিন আগে রাজধানীর সবুজবাগ থেকে ৩টি বিদেশী পিস্তলসহ চারজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পুলিশী জেরায় তারা জানিয়েছেন, যশোর সীমান্ত থেকে অস্ত্র কিনে এনে তারা ঢাকায় বিক্রি করেন। ৭.৬৫ বোরের পিস্তলগুলো তারা ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় বিক্রি করেন। অস্ত্রগুলো বেশিরভাগ ভারত ও পাকিস্তানের তৈরি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীসহ সারা দেশে এখন ভয়ঙ্কর সব অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি। হাত বাড়ালেই মিলছে আগ্নেয়াস্ত্র। বেশির ভাগ অস্ত্রই আসছে সীমান্ত এলাকা থেকে। সহজেই চলে যাচ্ছে সন্ত্রাসীদের হাতে। প্রতিনিয়ত হাতবদলও হচ্ছে এসবের। ভাড়ায় খাটছে অনেক অবৈধ অস্ত্র। এমনকি বৈধ অস্ত্রধারীরাও তাদের অস্ত্র ভাড়া দিচ্ছেন সন্ত্রাসীদের কাছে। আবার ভুয়া লাইসেন্স দেখিয়েও অস্ত্র কিনছে অনেক সন্ত্রাসী চক্র। পাড়া-মহল্লায় উঠতি মাস্তানরাই শুধু নয়, ছিঁচকে ছিনতাইকারীরাও ব্যবহার করছে আগ্নেয়াস্ত্র। ৩০ হাজার থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে অবৈধ অস্ত্র।
সংশি¬ষ্টরা বলছেন, দেশের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে কেনা ক্ষুদ্রাস্ত্র রাজধানীতে দেদার বিক্রি হচ্ছে। চাহিদা মেটাতে দেশের অন্তত ৩০টি সীমান্ত রুট দিয়ে ঢুকছে বিপুলসংখ্যক অবৈধ অস্ত্রের চালান। ভয়ঙ্কর একে সিরিজের অস্ত্র আসছে সমুদ্রপথে। ভারত, মিয়ানমার হয়ে দেশে আসা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীসহ সারা দেশে। এ কারণে রাজধানীতে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে গুলীর ঘটনা। সম্প্রতি পৃথক কয়েকটি অভিযানে ডিবি ও থানা পুলিশ কিছু অস্ত্র উদ্ধার করেছে। বিক্রির উদ্দেশ্যে অস্ত্র ব্যবসায়ীরা এসব অস্ত্র ঢাকায় এনেছিলেন।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ঢাকাসহ সারা দেশে দুই শতাধিক অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসায়ী রয়েছেন। সীমান্তপথে ভারত ও মিয়ানমার থেকে এসব রুটে সহজেই বাংলাদেশে আনছেন অস্ত্রের চালান। এ ছাড়া চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ে দেশী প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিপুলসংখ্যক অস্ত্র তৈরি করা হয়। খুন-ডাকাতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ ছিনতাই কাজেও অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু বেশির ভাগ অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। গতবছর ইতালির নাগরিক তাভেলাকে খুন করার ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্রটিও উদ্ধার করা যায়নি এখনো।
দেশের অন্তত ৩০টি পয়েন্ট দিয়ে অবৈধ অস্ত্র দেশে আসছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, সন্দ্বীপ, সীতাকু-, রাঙ্গুনিয়া, বান্দরবান, রাঙামাটির সাজেক, খাগড়াছড়ির রামগড় ও সাবরুম, ফেনী, নোয়াখালী, চাঁদপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, কুষ্টিয়া, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, মংলা, উখিয়া, রামু, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, রাউজান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, হিলি ও সিলেটের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিনই অবৈধ অস্ত্র আসছে। দেশেও নিজস্ব পদ্ধতিতে অস্ত্র তৈরির কারখানা রয়েছে। সূত্র জানায়, অস্ত্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের ব্যবসা রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। অনেক সময় গডফাদারদের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবৈধ অস্ত্রের কারবারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ