ঢাকা, বুধবার 02 November 2016 ১৮ কার্তিক ১৪২৩, ১ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গার্মেন্ট শিল্প প্রসঙ্গ

দেশের রফতানি আয়ের অন্যতম প্রধান খাত গার্মেন্টের সংকট ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। সেই সাথে বিপন্ন হচ্ছে জাতীয় অর্থনীতি। এতদিন নানা কারণে শুধু রফতানি ও আয়ের পরিমাণ কমে যাওয়ার কথা শোনা যেতো। এবার প্রাধান্যে এসেছে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, গত আড়াই বছরে বন্ধ হয়ে গেছে অন্তত ৫৩০টি গার্মেন্ট কারখানা। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এসব কারখানা শিল্পঘন এলাকা হিসেবে পরিচিত আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ এবং চট্টগ্রামে অবস্থিত। এ চারটি এলাকায় সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি শিল্প-কারখানা রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে গার্মেন্ট কারখানার সংখ্যা ছিল তিন হাজার দুইশ’। চলতি বছরের জুলাই মাসের হিসাবে এই সংখ্যা নেমে এসেছে আড়াই হাজারের সামান্য উপরে। অর্থাৎ বিগত আড়াই বছরে প্রতিদিন গড়ে ১৭টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। 

জানা গেছে, শ্রম আইনের কিছু ফাঁকের সুযোগ নিয়ে মালিকপক্ষ অনেক সময় কৌশল হিসেবে তাদের কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেন এবং পরবর্তী সময়ে সুবিধা অনুযায়ী আবারও চালু করেন। ৫৩০টি গার্মেন্ট কারখানার ব্যাপারেও প্রথমে সে রকম অনুমানই করা হয়েছিল। কিন্তু অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আশংকাজনক তথ্য। এমন অবস্থার পেছনে মালিকপক্ষের কোনো কৌশল বা কারসাজি নেই, কারখানাগুলো আসলেও বন্ধ হয়ে গেছে। বড় কথা, এসবের কোনো একটিও আর চালু হয়নি, চালু হওয়ার সম্ভাবনাও নেই।  দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে বন্ধ হওয়ার কারণ হিসেবে কাজ বা অর্ডার না থাকা, মূলধনের অভাব ও যথেষ্ট পরিমাণে ব্যাংক ঋণ না পাওয়া, ব্যাংকের দায় শোধ করতে না পারা, আর্থিক লোকসান, সময়মতো গ্যাস সংযোগ না পাওয়া ও নিয়মিত গ্যাস সংকট, কর্মপরিবেশ না থাকা এবং অগ্নিকা-সহ দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষ ও ধর্মঘট এবং মালিকপক্ষের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাতও এসেছে একটি কারণ হিসেবে। তবে অর্ডার বা কাজ না পাওয়ার বিষয়টিকেই সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া ৫৩০টি কারখানার মধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি এমন অনেক কারখানা রয়েছে, যেগুলো বড় বড় কারখানার সঙ্গে সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করতো। এসব কারখানার মালিকরা বিজিএমইএ বা অন্য কোনো সংগঠনের সদস্য নন। কিন্তু বিশেষ করে রানা প্লাজা ধসের পর থেকে ক্রেতা দেশগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা কারখানার কর্মপরিবেশ এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকারের প্রশ্নে চাপের সৃষ্টি করলে সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করা ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলো একের পর এক বন্ধ হতে থাকে। সর্বশেষ চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত হিসাবে এগুলোর সংখ্যা ৫৩০ বলা হলেও বাস্তবে আরো বেশিসংখ্যক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে তথ্যাভিজ্ঞরা অনুমান করেছেন। এর ফলে বেকার হয়েছে প্রায় তিন লাখ শ্রমিক। রিপোর্টে জানানো হয়েছে, এসব শ্রমিকের বেশিরভাগই অন্য কোথাও চাকরি পায়নি এবং বাধ্য হয়ে ফিরে গেছে গ্রামের বাড়িতে। তাদের কারণে গ্রামীণ সমাজেও সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক এলাকায় হঠাৎ করে চুরি-ডাকাতির মতো অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় এসব বেকার শ্রমিককেই দায়ী করা হচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, মাত্র আড়াই বছরে ৫৩০টি গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর নিঃসন্দেহে ভীতিকর। কারণ, জিএসপি সুবিধা না পাওয়া এবং কারখানার কর্মপরিবেশসহ বিভিন্ন কারণে প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যেও গার্মেন্ট তথা তৈরি পোশাকের রফতানি থেকেই এখনো বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার বড় অংশ আয় হয়। পোশাকের গুণগত মান ভালো হওয়ায় এবং ক্রেতা দেশগুলোর সঙ্গে মালিকপক্ষ সুসম্পর্ক বজায় রাখায় গার্মেন্ট রফতানিতে বাংলাদেশ দ্রুত সাফল্যের পথে এগিয়ে চলছিল। এই সাফল্যকে অব্যাহত রাখা গেলে কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রফতানিতে সকল প্রতিযোগী রাষ্ট্রকে টপকে যেতে পারতো। এমন এক সম্ভাবনার মুখে এসে দরকার যখন ছিল কারখানার সংখ্যা এবং উৎপাদন ও রফতানির পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ানো ঠিক তেমন এক সময়ে দেশ শিকার হয়েছে উল্টো পরিস্থিতির। 

আমরা মনে করি, সরকারের উচিত এমন সুদূরপ্রসারী পকিল্পনার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া, যাতে কোনো গার্মেন্ট কারখানাই বন্ধ না হয় এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোও যাতে আবার চালু হতে ও নতুন করে উৎপাদনে যেতে পারে। রফতানি আয়সহ জাতীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেয়ার স্বার্থেই গার্মেন্টের ব্যাপারে অত্যধিক গুরুত্ব দেয়া দরকার। কারণ, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দ্বিতীয় প্রধান খাত রেমিট্যান্স এরই মধ্যে প্রবল প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছে। ফলে রেমিট্যান্স কমছে আশংকাজনক হারে। তাছাড়া বাংলাদেশীদের জন্য অনেক দেশেই চাকরির বাজার বন্ধ হয়ে গেছে। সুতরাং গার্মেন্টের ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া দরকার সময় নষ্ট না করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ