ঢাকা, বৃহস্পতিবার 03 November 2016 ১৯ কার্তিক ১৪২৩, ২ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

এতো দিনেও আমরা শিখতে পারলাম না!

কাউকে যদি বলা হয়, মাস্টার্স ডিগ্রী ছাড়াই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া যায়, তাহলে তিনি হয়তো বিশ্বাস করবেন না। অথচ এমন অবিশ্বাস্য ঘটনাও এখন ঘটে চলেছে। এসব কিসের আলামত তা অবশ্যই উপলব্ধি করা যায়। এসব আলামত যে ন্যায় কিংবা সুশাসনের নয়, তা বোধহয় না বললেও চলে। এবার মাস্টার্স ডিগ্রী ছাড়াই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগে ৩ জনকে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। গত ৩১ অক্টোবর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় উক্ত ৩ জনের সঙ্গে ওই বিভাগে মোট ৯ জনকে একই পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। স্নাতক পাস ৩ জনকে নিয়োগ দিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রীধারী একাধিক যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগে  নিয়োগ পাওয়া ওই ৩ জন হলেন তানভীর আহমেদ, নুরুস সাকিব ও সজীব বড়ুয়া। নতুন নিয়োগ পাওয়া ৯ জনই ১ নভেম্বর কাজে যোগদান করেছেন। ২ নভেম্বর তারিখে দৈনিক সমকাল পত্রিকায় মুদ্রিত খবরে আরো বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালায় প্রভাষক পদে আবেদনের প্রাথমিক শর্ত হলো, আবেদনকারীর সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতোকোত্তর ডিগ্রী থাকতে হবে। প্রার্থীকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্কলার হতে হবে, উচ্চতর ডিগ্রীধারীদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। অথচ আলোচ্য নিয়োগের ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটেছে। বিভাগের চাহিদা ছাড়াই সিন্ডিকেট থেকে সরাসরি নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। আবার বিভাগীয় কো-অর্ডিনেশন এন্ড ডেভলাপমেন্ট কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ সংক্রান্ত যাচাই-বাছাই করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। আর ৪টি পদের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়া হলেও নিয়োগ দেয়া হয়েছে ৯ জনকে।
আমাদের শিক্ষাঙ্গন সম্পর্কিত নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর প্রায়ই পত্রপত্রিকায় মুদ্রিত হয়ে থাকে। এমন একটি খবরের শিরোনাম ‘এমপিও যেখানে দুর্নীতিও সেখানে’। ২ নবেম্বর তারিখে কালের কণ্ঠ পত্রিকায় মুদ্রিত খবরাটিতে বলা হয়, বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার (এমপিও) বা বেতন-ভাতা বাবদ মাসিক সরকারী অনুদান সংক্রান্ত কার্যক্রম বিকেন্দ্রীয়করণের সুফল মিলছে না। ঘুষ, দুর্নীতি ও হয়রানি রোধ করার লক্ষ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের হাতে থাকা এই এমপিও কার্যক্রম ৯টি আঞ্চলিক শিক্ষা কার্যালয়ে ভাগ করে দেয়া হয়েছিল এক বছর আগে। কিন্তু এক বছরে লক্ষ্যপূরণ না হয়ে বরং অনিয়ম, ঘুষ, দুর্নীতি ও হয়রানি বেড়েছে কয়েকগুণ। এমপিও কার্যক্রম বিকেন্দ্রীকরণের সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতিরও বিকেন্দ্রীকরণ হয়ে গেছে। বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল আঞ্চলিক শিক্ষা কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। যোগ্যতা থাকলেও ঘুষ ছাড়া কোনো শিক্ষকের পক্ষে এমপিও পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে ঘুষ দিয়ে যোগ্যতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও এমপিও মিলছে অনায়াসে। স্বাভাবিক ক্ষেত্রে একজন শিক্ষককে এমপিও পেতে ঘুষ দিতে হচ্ছে ৩৮ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা। আর যোগ্যতা বা কাগজপত্রে কোনো ঘাটতি থাকলে ঘুষের পরিমাণ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাউশি অধিদপ্তর ও ভুক্তভোগী শিক্ষকদের সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে বলে খবরে উল্লেখ করা হয়।
আমরা জানি শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ড গড়ার প্রতিষ্ঠানগুলোতে যদি অন্যায়, অবিচার এবং ঘুষ-দুর্নীতির তাণ্ডব চলতে থাকে তাহলে মেরুদণ্ড মজবুত হবে কেমন করে? বর্তমান সময়ে আমরা নানা ক্ষেত্রে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের জন্য আফসোস করে থাকি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মূল্যবোধ কি বৃষ্টির মত কোনো বিষয় যে আকাশ থেকে ঝরে ঝরে পড়বে? মূল্যবোধ অর্জন করতে হয়। আর অর্জনের সেই জায়গাগুলো হলো পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র। এইসব প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের দায়িত্ব কতটা পালন করছে তা এখন প্রশ্নবোধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনের খবরও ভাল নয়।
আমরা এ কথা জানি যে, উন্নত সমাজের শর্ত হলো উন্নত শিক্ষা ও মূল্যবোধ। ধর্মই মূল্যবোধের উৎস। আর সমাজকে মানুষের বসবাসযোগ্য রাখতে হলে আইনের শাসন প্রয়োজন। অন্যভাবে বলা যায়, মানুষের সমাজে সুশাসনের কোন বিকল্প নেই। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সমাজে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা তথা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় যাদের অবদান রাখার কথা অনেক সময় এ ক্ষেত্রে তারাই বড় বাধা হয়ে দাঁড়ান। এ কারণেই হয়তো আমাদের সমাজে আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভাকক্ষে হামলার ঘটনা ঘটে যায়। গত ৩০ অক্টোবর সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলা আওয়ামী লীগের দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল হকসহ ৫ জন আহত হয়েছেন। ওইদিন বেলা ১টার দিকে উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে এ ঘটনা ঘটে।
৩১ অক্টোবরে প্রথম আলো পত্রিকায় মুদ্রিত খবরে বলা হয়, ৩০ অক্টোবর উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা চলাকালে স্থানীয় সংসদ সদস্য গাজী ম ম আমজাদ হোসেনের সঙ্গে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হকের বাকবিত-া হয়। এক পর্যায়ে দুই পক্ষের সমর্থকরা এতে জড়িয়ে পড়েন। এই অবস্থায় ইউএনও সভা মুলতবি করে নিজের কক্ষে চলে যান। এর কিছুক্ষণ পরেই সংসদ সদস্যের একদল সমর্থক সভাকক্ষে হাজির হন। তারা উপজেলা চেয়ারম্যান ও তার সমর্থকদের উপর হামলা চালালে উভয়পক্ষের সংঘর্ষ মারাত্মক রূপ নেয়। এক পর্যায়ে উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল হকের মাথায় কেটলি দিয়ে আঘাত করা হলে তিনি গুরুতর আহত হন। তাকে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পরে সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়। আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় এমন করুণ পরিণতি দেখে জনগণ আশাবাদী হবে কেমন করে?
যে কোন সমাজে আইন-শৃঙ্খলা কমিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটি। এই কমিটির যোগ্যতা, ন্যায়নিষ্ঠা এবং অর্পিত দায়িত্ব পালনের সক্ষমতার উপর সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা ও প্রগতি অনেকাংশে নির্ভর করে। কিন্তু আলোচ্য ঘটনায় যে চিত্র লক্ষ্য করা গেল তাতে স্বয়ং আইন-শৃঙ্খলা কমিটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। এমপি ও চেয়ারম্যানের দ্বন্দ্বে সভাকক্ষে লক্ষ্য করা গেল সন্ত্রাসের ঘটনা। আর ইউএনও অসহায়ের মতো চলে গেলেন আপন কক্ষে।
সন্ত্রাস ও অসহায়ত্বের এমন সংস্কৃতি দিয়ে সমাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে কেমন করে? আরো লক্ষণীয় বিষয় হলো, বিরোধী দলের সাথে নয় বরং আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এখন ক্ষুদ্র স্বার্থে নিজেরাই নিজেদের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন। এবং এসব ঘটনা এতটাই নেতিবাচক যে, এ নিয়ে আলোচনা করতেও অনেকের রুচিতে বাধে।
আমরা এ কথা জানি যে, একটি সমাজের সব মানুষ এক রকম করে ভাবে না; দলের মধ্যেও থাকে চিন্তা-চেতনার পার্থক্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মতবৈচিত্র্য বা মতপার্থক্য নিয়েও যে একটি সমাজে বা সংগঠনে শান্তিপূর্ণভাবে থাকা যায় এবং কাজও করা যায়, এত দিনেও আমরা তা শিখতে পারলাম না কেন? এখানে চলে আসে রাজনীতির গুণগত মান ও নেতৃত্বের যোগ্যতার প্রসঙ্গ। আমরা দেখেছি, যে দেশের নেতারা জ্ঞান, সততা, নিষ্ঠা ও ত্যাগের সমন্বয়ে রাজনীতিতে উদাহরণ সৃষ্টি করতে পেরেছেন তারাই সক্ষম হয়েছেন দেশকে প্রকৃত শান্তি ও প্রগতির পথে এগিয়ে নিতে। আমাদের দেশে এসব বিষয়ে দৈন্য রয়েছে। ব্লেমগেমের বর্তমান সময়ে রাজনীতিবিদরা এই বিষয়গুলো স্বীকার করতে চান না। তবে জনগণ মনে করে এই বিষয়গুলো স্বীকার করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ দ্রুত নিজেদের সংশোধন করে নতুন অভিযাত্রা শুরু করতে পারলে দেশ হয়তো কাক্সিক্ষত গণতন্ত্র ও উন্নয়নের মহাসড়কে উঠে যেতে সক্ষম হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ