ঢাকা, শুক্রবার 04 November 2016 ২০ কার্তিক ১৪২৩, ৩ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

বাঙ্গাল আবদুল কুদ্দুস : (এক) বাংলা সাহিত্যে প্রথম এবং একমাত্র সার্থক মহাকবি মধুসূদন। রবীন্দ্রনাথের কথা স্মরণ রেখেও এ কথা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে উচ্চারণ করা হয় যে, তাঁর মত শক্তিধর কবি আমাদের বাংলা সাহিত্যে তুলনাহীন। অথচ জীবনে তিনি হয়েছেন নিষ্ঠুর নিয়তির নির্মম শিকার এবং শেষ পর্যন্ত একটা দাতব্য চিকিৎসালয়ে এই মহান কবিকে অনাথের মত মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে।
বাংলাদেশের কবি সধুসূদন। ছেলেবেলায় তিনি যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামেই মায়ের কাছে মানুষ হয়েছেন। সাগরদাঁড়ি কপোতাক্ষ নদের তীরে অবস্থিত। ক্ষীণস্রোতা কপোতাক্ষ এবং সাগরদাঁড়ির মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ তাঁর হৃদয়পটে এক আশ্চর্য প্রভাব সঞ্চার করে। এমন প্রাকৃতিক পটভূমিতে কবি মধুসূদনের কল্পনা শক্তি স্ফুর্তিলাভের সুযোগ পায়।
কিন্তু মধুসূদন কৈশোরে পদার্পণ করতেই বাবা উচ্চ শিক্ষা দেয়ার মানসে কলকাতায় নিয়ে এলেন। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি হিন্দু কলেজে প্রবেশ করলেন। হিন্দু কলেজে মধুসূদনের মানস সম্পূর্ণ নতুনভাবে গড়ে উঠে। ফলে তাঁর জীবন-চরিত্র অভূতপূর্বরূপে সূচিত ও রূপান্তরিত হয়।
ইয়ং বেঙ্গলদের অন্যতম মধুসূদন ইংরেজি সভ্যতার দ্বারা আচ্ছন্ন হলেন এবং বাঙ্গালী হিন্দুদের অত্যন্ত অবজ্ঞার চোখে দেখতে লাগলেন। তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে ‘Abion’s distant shore ’ যাবার জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠলেন এবং প্রথম জীবনে যে সকল কবিতা ও কাব্য রচনা করলেন তা বাংলায় নয়, ইংরেজিতে। শুধু তাই নয়, তিনি পিতৃদত্ত নাম পরিহার করে M.S. Dutt নামে পরিচিত হবার আকাক্সক্ষায় উৎকণ্ঠ হলেন।
হিন্দু কলেজের ছাত্র মধুসূদন যৌবনে পদার্পণ করতে না করতেই ইংরেজি কাব্য- রস সুধা আকণ্ঠ নিমগ্ন হয়ে পান করলেন। ফলে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে বিভোর এবং ইংরেজি সভ্যতার দ্বারা আচ্ছন্ন হলেন।
ইংরেজি সাহিত্যই তাঁর প্রাণ-মনের অবাধ স্ফুর্তি ঘটায় এবং তাঁর কল্পনা শক্তিকে উদ্দীপ্ত, সঞ্জীবিত ও সচকিত করে তোলে। বাঙ্গালীর প্রাত্যহিক জীবনের ক্লেদ, গ্লানি, দীনতা, জড়তা, গতানুগতিকতা, সংকীর্ণতা ও পরশ্রীকাতরতার মধ্যে তিনি এক নতুন জগতের সন্ধান লাভ করলেন এবং ইংরেজি কাব্য তার কাছে সেই নতুন জগতের বার্তা বহন করে নিয়ে এল।
ইংরেজি সাহিত্যের মাধ্যমে তিনি যে এক নতুন বিশ্বের সাক্ষাৎ লাভ করলেন, সেই বিশ্বকে নিজ প্রচেষ্টায় আয়ত্তাধীন করার দুর্বার আকাক্সক্ষা তাঁর মধ্যে দেখা দেয়। মধুসূদন জানেন, বীর ভোগ্যা বসুন্ধরা। যে বীর, যে শক্তি সাধক সেই আপন শক্তিবলে বিপুল-বিশাল এই পৃথিবীকে ভোগায়ত্ত করতে পারে। তাই তাঁর মধ্যে জীবনোপভোগের দুর্দমনীয় বাসনা দেখা যায়। ভিখারীর মত জীবনের কাজে তিনি কিছুই হাত পেতে নেবেন না, বরং জীবনের যত সুধা, মাধুর্য তা দস্যুর মত লুট করে নেবেন। এই অমিত বাসনাই তার মধ্যে প্রচন্ড শক্তিরূপে কার্যকরী হয়েছে। এবং এর দ্বারা তিনি আজীবন জ্বলন্ত আতশবাজীর মতেই তীব্রগতিতে তাড়িত ও সাধিত হয়েছেন। জীবনে সাফল্য লাভ করতে হলে যে শক্তি, যে প্রতিভার প্রয়োজন, সে- সবই তাঁর মধ্যে দেখা যায়। সেই শক্তি ও প্রতিভা নিয়ে তিনি সারাজীবন ধরে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্যে প্রাণান্তকর সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু নিয়তির কি নিষ্ঠুর পরিহাস এই মহান কবির জীবনে এক অন্ধ নিয়তিলীলাই প্রত্যক্ষ করা যায়।
(দুই)
প্রথম যৌবনে মধুসূদন যখন বিলাত যাবার স্বপ্নে মশগুল, সে সময় একটি অপ্রাপ্তবয়স্কা বালিকাকে বিয়ে করার প্রস্তাব, তাঁর কাছে রূঢ় স্বপ্নভঙ্গের মতই মনে হল। তাঁর পক্ষে সুবোধ বালকের ন্যায় পিতৃআজ্ঞা পালন করা সম্ভব নয়। ফলে তাঁকে পারিবারিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে এবং ধর্মান্তরিত হতে হল। ধর্মত্যাগে তাঁর কোন আক্ষেপই দেখা যায় না।
কিন্তু একমাত্র সন্তান বিধর্মী হওয়ায় জাহ্নবী দেবী যে মনে দুঃখ পান, তাই তাঁকে দারুণভাবেই পীড়া দেয়। তিনি মায়ের স্নেহাশ্রয়ে বড় হয়ে উঠেন। তাই হয়ত তাঁর মধ্যে মায়ের প্রতি অত্যধিক মাত্রায় হৃদয় দৌর্বল্য দেখা যায়।
ধর্মান্তরিত হবার পর জাহ্নবী দেবী আবার ছেলেকে প্রায়শ্চিত্ত করে হিন্দু ধর্মে ফিরে আসতে মিনতি করেন। কিন্তু প্রবল আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মধুসূদনের নিকট এটি একটি প্রহসন বলেই মনে হল। তাই তাঁর পক্ষে মায়ের অনুরোধ রক্ষা করা সম্ভব হল না। তবুও মায়ের কথা ভোলা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাই সুদূর প্রবাসে মায়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে তিনি নিদারুণভাবে ব্যথিত হয়ে কলকাতায় ছুটে এলেন এবং মায়ের অকালমৃত্যুর জন্যে বাবাকেই অভিযুক্ত করলেন।
ধর্মান্তরিত হবার পর মধুসূদন বিশপ কলেজে প্রবেশ করেন। এ কলেজে তিনি চার বছর অধ্যয়ন করেন। এখানে তিনি প্রাচীন ভাষা ও সাহিত্যে- হিব্রু, গ্রীক, ল্যাটিন ও সংস্কৃতে দীক্ষালাভের সুযোগ পান।
ধনী পিতার একমাত্র আদরের দুলাল মধুসূদন হিন্দু কলেজে থাকতেই বিলাসিতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। হিন্দু কলেজের ছাত্র মধুসূদন ঘণ্টায় ঘণ্টায় পোশাক বদল করেছেন। রাজনারায়ণ দত্তের ছেলে মধুসূদন শুধু টাকাই খরচ করেন নি। চুল কেটে নাপিতকে এক মোহর করে বকশিশ দিয়েছেন। এই দারুন অমিতব্যয়িতা ও উচ্ছৃংখলতাই পরবর্তীকালে তাঁর জীবনে ভয়াল হয়ে দেখা দেয়।
বিশপ কলেজে অধ্যয়নকালীন বাবার কাছে তিনি নির্ধারিত পরিমাণ মাসোহারা পেয়েছেন; সাথে সাথে মাও তাঁকে প্রচুর অর্থ সাহায্য করেছেন। কিন্তু অমিতব্যয়িতায় আবাল্য অভ্যস্ত মধুসূদনের এতে চলে কী? তাই মাঝে মাঝে অর্থাভাবে তিনি বই পর্যন্ত বন্ধক দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘Was the neediest raseal in Bishop’s college : I used to pawn my books’।
তারপর বাবা কোন কারণে রাগ করে তাঁর টাকা দেয়া বন্ধ করে দেন। তিনি এই অবস্থায় বেশ বিপাকে পড়লেন। একটা চাকরি তার বেশি দরকার। তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পদপ্রার্থী হলেন। কিন্তু সেটা সময়সাপেক্ষ। তাই কপর্দকহীন মধুসূদন ভাগ্যের অন্বেষণে সুদূর মাদ্রাজে পাড়ি জমালেন।

[তিন]
আট বছরের প্রবাস জীবন একদিকে দুঃখ, দৈন্য অপরদিকে পারিবারিক জীবনে চরম অশান্তি তাকে ভোগ করতে হয়েছে। অর্থোপার্জনের জন্যে তিনি স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন, সাময়িক পত্রিকাতে লিখেছেন।
প্রবাসের নিঃসঙ্গ দিনগুলোতে তিনি এক নীলনয়না রমনীর সান্নিধ্যে আসেন। তিনি কৈশোর থেকে মনের নায়ের blue eyed maid-এর স্বপ্ন দেখেছেন এবং রেবেকার মধ্যে সেই স্বপ্নচারিণীর সাক্ষাৎ লাভ করে উৎফুল্ল হয়ে উঠেন। রেবেকার বাবা একজন নীলকর। তিনি এই অজ্ঞাত কুলশীল যুবকের সাথে রেবেকার বিয়েতে সম্মত হননি। কেবল মধুসূদনের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক মাদ্রাজের এডভোকেট জেনারেল জর্জ নর্টনের উদ্যোগেই এই বিয়ে হয়। কিন্তু এই বিয়ে তার জন্যে আদৌ কোনো সৌভাগ্য বয়ে আনেনি। সংসারে অভাব-অনটন তো লেগেই আছে। গৌরদাসের কাছে এক পত্রে তিনি লিখেছেন, ‘‘I am badly off and have hardly anything to jingle in my pocket.
কিন্তু দারুণ আর্থিক অনটন ও অশান্তির মধ্যেও তিনি কাব্য রচনা করেছেন।
Captive ladie-এর ত্রুটির কারণ সম্পর্কে তিনি নিজেই ভ’মিকায় লিখেছেন : ‘দুঃখ দৈন্য ক্লিষ্ট জীবন সংগ্রামে তার ব্যস্ততা এবং কাজের সৃজনে তার পরিপূর্ণ মন-সংযোগের অভাব।’
Captive ladie মাদ্রাজের সুধী সমাজের প্রশংসা অর্জন করলেও এতে তার অর্থাগম ঘটেনি। অথচ দারুণ অর্থাভাব সত্ত্বেও কাব্যটি তিনি নিজ ব্যয়ে প্রকাশ করেন। ফলে অর্থ সংকট তার কাছে আরও প্রকট হয়ে উঠে। তাছাড়া ইংরেজ রমণীকে বিয়ে করে তার বিলাসী ব্যয়ভার ও অর্থচিন্তা অনেক পরিমাণে বেড়ে যায়।
যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি মাদ্রাজে পাড়ি জমান তা আদৌ সফল হয়নি। ইংরেজী ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হওয়ার স্বপ্নও আকাশ কুসুমে মিলিয়ে যায়। ইংরেজ রমণীকে বিয়ে করে ইংরেজ সমাজে বাস করতে গিয়ে তিনি বেশ বিব্রত বোধ করেন। শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতা করে যা আয় হয় তা ইউরোপীয় রীতিতে ভদ্রভাবে জীবন ধারণের জন্যে পর্যাপ্ত নয়। এই নিত্য অভাব-অনটনের ফলে রেবেকার সাথে তার কলহ বিবাদ অবশ্যম্ভাবী।
রেবেকার সাথে তার সম্পর্ক ক্রমাগত তিক্ত হয়ে উঠে। রেবেকার অসহিষ্ণু মনোভাব দাম্পত্য জীবনের দিনগুলো অত্যন্ত বিষময় করে তোলে এবং এরই অনিবার্য পরিণাম ঘটে বিবাহ বিচ্ছেদ। তার জীবননাট্য থেকে রেবেকা ও তার চারটি ছেলেমেয়ের স্মৃতি চিরতরে মুছে যায়।

[চার]
তারপর মধুসূদনের অতৃপ্ত প্রেমানুভূতি হেনরিয়েটাকে অবলম্বন করে তৃপ্ত হতে চেয়েছে। কিন্তু ফরাসী রমণী হেনরিয়েটাই বা তাকে কতখনি সুখী করতে পেরেছে! হেনরিয়েটাকে বিয়ে করার পর মধুসূদন বাবার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে দ্রুত কলকাতায় ছুটে এলেন কপর্দকহীন অবস্থায়। অর্থাভাবে তিনি পত্নী হেনরিয়েটাকে মাদ্রাজে রেখে এলেন। বন্ধু কিশোরী চাঁদের কৃপায় একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই এবং পুলিশ অফিসে কেরাণীগিরির একটা চাকরি জুটল। মাইনে মাত্র চল্লিশ টাকা। দু’বছর চাকরি করার পর তার উন্নতি ঘটে দোভাষী পদে- একশ’ টাকা বেতনে। অথচ তার বদ্ধমূল ধারণা এই যে, বছরে অন্তত চল্লিশ হাজার টাকা না হলে ভদ্রলোকের মত বাঁচা যায় না। সেই মধুসূদন সামান্য বেতনে ছয়-সাত বছর চাকরি করেছেন। একেই বলে অদৃষ্টের পরিহাস।
যে সময় তাকে পৈতৃক সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। রাজনারায়ণের মৃত্যুর সাথে সাথে জ্ঞাতিরা বিষয়-সম্পত্তি জবরদখল করে নেয় এবং সম্পত্তিতে মালিকানা সাব্যস্ত করার জন্য একটি জাল উইল তৈরি করে, এমনকি স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে মধুসূদনকে মৃত বলে রটনা করে। বন্ধুদের চেষ্টা ও যত্নে মধুসূদন সম্পত্তি উদ্ধার করলেন বটে, কিন্তু পঁচাত্তর হাজার টাকার সম্পত্তি তার গরুদের মত প্রচ- ক্ষুধা নিবৃত্তি করার জন্যে যথেষ্ট নয়। তার প্রয়োজনের কোনো অবধি দেখা যায় না। তাই তার অর্থাভাব কোনদিনই ঘুচেনি।
মধুসূদন কলকাতায় ফিরে আসার দু’বছর পর অত্যন্ত আকস্মিকভাবে বাংলা সাহিত্য ক্ষেত্রে অবতরণ করলেন। তিনি ইংরেজীকে সাহিত্যের মাধ্যমরূপে বেছে নেন। হিন্দু কলেজে তিনি যে সকল কবিতা রচনা করেন তা বাংলায় নয়, ইংরেজীতে এবং মাদ্রাজ প্রবাসে রচিত তার প্রথম কাব্য Captive ladie নামেই প্রকাশ ইংরেজীতে রচিত।
Captive ladie পরে বেথুন সাহেব মধুসূদনকে মাতৃভাষায় কাব্য রচনা করতে উপদেশ দেন। বেথুন সাহেবের হিতোপদেশ তার হৃদয়গ্রাহী হলো। এর পেছনে অবশ্য আরও একটি মনস্তত্তমূলক হেতু রয়েছে। তিনি প্রত্যাশা করেন যে, Captive ladie প্রকাশিত হওয়া মাত্র বাংলাদেশে তুমুল হৈ চৈ পড়ে যাবে। কিন্তু অবাক ব্যাপার এই যে, বাংলাদেশে সবশুদ্ধ আঠারোখানা Captive ladie  বিক্রি হয়। তিনি বড় আশায় নিরাশ হলেন।
তারপর ‘রত্নাবলী’ নাটকের অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যের সান্নিধ্যে এলেন এবং অনেকটা আত্মপ্রত্যয়ের বশবর্তী হয়েই এ সাহিত্যে মনোনিবেশ করলেন। ফলে ‘শাম্মিষ্ঠা’ নাটক প্রকাশিত হলো।
মধুসূদনের সাহিত্যিক জীবন মূলতঃ বা প্রধানত মাত্র তিন-চার বছরের (১৮৫৯-৬৩)। এই স্বল্পকালের মধ্যে তিনি যা রচনা করেছেন- একটি মহাকাব্য, দুটি প্রহসন, তিনটি নাটক এবং তিনটি কাব্য-- তা বিস্ময়কর।

পাঁচ
সাহিত্যিক জীবনে মধুসূদন খ্যাতি ও যশ লাভ করলেও এবং তাঁর মহাকাব্য রচনার আকাক্সক্ষা চরিতার্থ হলেও তিনি সন্তুষ্ট বা তৃপ্ত হতে পারলেন না। শুধু খ্যাতি বা যশ তাঁর কাম্য নয়। অর্থ ও প্রতিপত্তিও তাঁর অভিলিপি¦ত। জীবনোপভোগের দুর্দমনীয় আকাক্সক্ষাই তাঁকে সাহিত্যিক জীবন থেকে শৃংখলিত করে এবং তিনি প্রায় প্রৌঢ় বয়সে অর্থোপার্জনের আশায় ব্যারিস্টারি পড়ার সংকল্প করলেন।
স্থির হল, তিনি একাই বিলেত যাবেন এবং স্ত্রী হেনরিয়েটা ছেলেমেয়েদের নিয়ে কলকাতায় থাকবেন।
মধুসূদন বিলেত যাত্রা করলেন ৯ই জুন, ১৮৬২ সাল। জুলাই মাসের শেষভাগে তিনি বিলেত গিয়ে পৌঁছলেন। কৈশোরের স্বপ্নপুরী Albeion’s distant shores-এ পৌঁছে তিনি যে স্বর্গসুখ অনুভব করেন নি, তা গৌরদাশকে লেখা একটি চিঠি থেকে সুস্পষ্ট : ‘The Wilberness of solitudes in London is more apalling than that of a desert’
তিনি ব্যারিস্টারি পড়ার জন্যে লন্ডনের গ্রেজ হলে ভর্তি হলেন। এই সময় এক অভাবনীয় ঘটনা তাঁকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে দেয়। তিনি বিলেত যাবার আগে সম্পত্তির পাহারাদার ও প্রতিভূদের সাথে এই ব্যবস্থা করেন যে, তাঁরা ইউরোপে তাঁর যাবতীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে টাকা পাঠাবেন এবং কলকাতায় তার স্ত্রীকে মাসিক দেড় শ’ টাকা করে দেবেন। কিন্তু কিছুদিন পর পাহারাদার মোক্ষদা দেবী তাকে ইউরোপে ও তাঁর স্ত্রীকে কলকাতায় টাকা দেয়া বন্ধ করে দিলেন। ফলে বিলেতে তিনি এবং কলকাতায় তাঁর স্ত্রী ও পুত্র-কন্যা সবাই বিপদে পড়লেন।
হেনরিয়েটা নিতান্ত নিরুপায় হয়ে কোনরকমে পাথেয় সংগ্রহ করে ছেলেমেয়েদের নিয়ে স্বামীর কাছে লন্ডনে গিয়ে পৌঁছলেন (২ মে, ১৮৬৩) মধুসূদন নিজে অর্থাভাবে কষ্টে আছেন। এই অবস্থায় স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে এসে পড়ায় তিনি মহাসংকটে পড়লেন। সম্পত্তির প্রতিভূ দিগম্ভর মিলের নিকট পর পর আটটি চিঠি লিখেও কোন জবাব পেলেন না। তিনি দারুণ হতাশ হয়ে পড়লেন। দারুণ অর্থাভাবে তিনি ব্যারিস্টারি পড়া ছেড়ে দিলেন। কম খরচ হবে ভেবে তিনি স্বপরিবারে প্রথমে পারী এরপর ভার্সাই গিয়ে ঠাঁই নিলেন।
কয়েক মাস ধরে দেশ থেকে কোন টাকা না আসায় তাঁর অবস্থা এমন শোচনীয় হয়ে উঠে যে, তিনি স্ত্রীর গহনা, বাড়ির আসবাবপত্র, এমন কি বই পর্যন্ত বন্ধক রাখতে বাধ্য হন। হোটেল, দোকানে সর্বত্র তাঁর প্রচুর দেনা জমে যায়। বাড়ি ভাড়া বাকী পড়ে। শেষে অবস্থা এমন চরমে উঠে যে, কেবল অর্ধাহার, অনাহার এবং ঋণের দায়ে জেলে যাবার উপক্রমও ঘটে।
এই চরম দুরবস্থার মধ্যে তিনি বিদ্যাসাগরকে স্মরণ করলেন। উল্লেখ্য যে, বিদ্যাসাগরকে চিঠি লিখতেও টিকেটের যে পয়সা লাগে তাঁও তাঁকে জিনিস বন্ধক রেখে সংগ্রহ করতে হয়েছে। সে সময় বিদ্যাসাগরের অকৃপণ অর্থ সাহায্যের ফলেই তার পক্ষে বিদেশে বিভূঁইয়ে প্রাণরক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।
বিদ্যাসাগর তাঁর আর্থিক সমস্যার সমাধান করলে মধুসূদন ১৮৬৫ সালের শেষ ভাগে ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ড যান এবং ব্যারিস্টারী পরীক্ষার জন্যে প্রস্তুত হতে থাকেন। ব্যারিস্টারি পাস করতে তাঁর তিন বছরের জায়গায় পাঁচ বছর লাগে এবং আর্থিক অসুবিধাই এর একমাত্র কারণ।

(ছয়)
অবশেষে মধুসূদন ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফিরে এলেন। অর্থাভাবে পরিবার সাথে নিয়ে আসা সম্ভব নয়, তাই ফরাসী দেশে রেখে এলেন। বিদ্যাসাগর তাঁর জন্যে সুকিয়া স্ট্রীটে একটি বাড়ি ঠিক করে রাখলেন। কিন্তু M.S. Dutt, Bar-at-Law-এর পক্ষে বাঙ্গালী পাড়ায় থাকা শোভন নয়। তাই তিনি সোজাসুজি সাহেবদের একটা হোটেলে গিয়ে উঠলেন এবং বড় বড় তিনটি ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতে লাগলেন।
প্রথমে আইন ব্যবসায়ে তাঁর আয় ভালই হয়। কিন্তু তিনি আয়ের চাইতে প্রচুর ব্যয় করতে লাগলেন। এ সময় তাঁর চরিত্রগত অমিতব্যয়িতা ও অমিতচারিতা বিশেষভাবেই প্রশ্রয় পায়।
হেনরিয়েটা ছেলেমেয়েদর নিয়ে আরও প্রায় দু’ বছর ফরাসী দেশে থাকলেন। কিন্তু উড়চন্ডী মধুসূদনের পক্ষে তাঁদের নিয়মিতভাবে টাকা পাঠানো সম্ভবপর হয়ে উঠেনি। ফলে হেনরিয়েটা ছেলেমেয়েদের নিয়ে বেশ অসুবিধায় পড়েন। তাই তিনি তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেন। এবং অর্থাভাবের দরুণ তাঁকে জাহাজের টিকেটের মূল্যহ্রাসের জন্যে আবেদন জানাতে হয়েছে।
হেনরিয়েটা ফিরে এলে তিনি লাউডট স্ট্রীটে মাসে চারশ’ টাকার একটি রাজপ্রাসাদতুল্য বাড়ি ভাড়া করলেন। আবাল্য তার স্বপ্ন মাত্র এই যে, জীবনটা ভোগ-বিলাস ও ঐশ্বর্য আড়ম্বরে অতিবাহিত এবং যতভাবে সম্ভব স্বার্থকায়িত করা। সাধারণ তুচ্ছ মানুষ প্রাত্যহিক জীবনে দিনের পর দিন যে দুঃসহ গ্লানি, অসম্মান, লাঞ্ছনা ও দৈন্যের মধ্যে কোনমতে টিকে থাকে, সে জীবন তার ঘৃণ্য। মানুষের এ জীবনটা কেঁচোর মত কাটিয়ে যাবার মধ্যে বিন্দুমাত্র বাহাদুরি নেই। তাই তো মধুসূদনের মধ্যে ক্ষণস্থায়ী নশ্বর জীবন উপভোগের দুর্বার স্পৃহা দেখা যায়।
জীবনটা ভোগ করতে হলে অর্থের প্রয়োজন। মধুসূদন যা আয় করেন, তাতে কুলায় না বলেই তাকে ধার-দেনা করতে হয়। ফলে তিনি ঋণভারে জর্জরিত হয়ে পড়লেন। তার অনবদ্য শরীর নানা কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হলো। তিনি মানসিক ধৈর্য হারালেন।
মধুসূদন স্বাধীন আইন ব্যবসা ছেড়ে চাকরি নিলেন- হাইকোর্টের প্রিভি কাউন্সিলে আপীলের অনুবাদ বিভাগের পরীক্ষকের পদ (১৮৭০), বেতন হাজার টাকা। কিন্তু চাকরি করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই চাকরি ছেড়ে তিনি আবার আইন ব্যবসায় শুরু করলেন। কিন্তু পাওনাদারদের জ্বালায় অতিষ্ট হয়ে তিনি কলকাতা ছাড়লেন এবং পঞ্চকোট দেশীয় রাজার অধীনে আইন উপদেষ্টার কাজ নিলেন। কিন্তু স্বাধীনচেতা মধুসূদনের পক্ষে এ চাকরি করাও সম্ভব হয়নি। আবার তিনি কলকাতায় ফিরে এসে ব্যারিস্টারি শুরু করলেন।
এ সময় তিনি বেশ অসুস্থ। কণ্ঠনালীর প্রদাহ, হৃৎপি-ের দুর্বলতা, প্লীহা ও যকৃতের বৃদ্ধি, জ্বর ও রক্ত বমন প্রভৃতি নানা রোগে তিনি আক্রান্ত হয়ে পড়লেন। অসুস্থতার জন্যে শেষ পর্যন্ত তাকে ব্যারিস্টারি ব্যবসায় একেবারে বন্ধ করতে হলো। রোগ-শোক-অভাব-অনটন তার দেহ-মনকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে দেয়। তিনি দুঃখ ভোলার জন্যে প্রচুর পরিমাণে মদ খেতে শুরু করলেন। অসুস্থ শরীরে মদ্যপান মৃত্যুর শামিল এবং জীবনের গ্লানি ও হতাশ থেকে তিনি মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করতে চেয়েছেন।
বেনিয়াপুকুর রোডের বাড়িতে মধুসূদন মৃত্যুশয্যায় শায়িত হয়ে মৃত্যুর ধীর অথচ নিশ্চিত পদধ্বনি শুনতে পেলেন। ভোর হতে রাত পর্যন্ত উত্তমার্ণদের জ্বালায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়। পাশের ঘরেই প্রাণপ্রিয়া হেনরিয়েটা শয্যাশায়িনী। অথচ তাকে ডাক্তার দেখাবার পর্যন্ত সামর্থ নেই। চরম লাঞ্ছনা, গঞ্জনা ও দারিদ্যের মধ্যে সহায়হীন ও বান্ধবহীন মধুসূদন মৃত্যুর সম্মুখীন হয়ে বিগত জীবনের স্মৃতি রোমন্থন করতে লাগলেন। এই তো স্বাভাবিক। কেননা জীবনের কাছে তার আর প্রত্যাশা করার কিছুই নেই। সমগ্র জীবনভর তিনি মানুষের মত মানুষ হয়ে বাঁচার জন্যে কিনা প্রচেষ্টা করেছেন! কিন্তু এক দুর্জ্ঞেয় ভাগ্যের অঙ্গুলি হেলনে তাকে চূড়ান্ত পরাজয় স্বীকার করতে হয়েছে। তাই এ সময়ে তার মধ্যে আত্মঘাতী প্রচেষ্টা প্রবলভাবে দেখা দেয় এবং জীবনের অসারতা সম্পর্কে তিনি নিঃসহায় হন।
শেষ পর্যন্ত মধুসূদনকে দাতব্য চিকিৎসালায়ে স্থানান্তরিত করা হয়। আলীপুর জেনারেল হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় শায়িত মধুসূদন স্ত্রী হেনরিয়েটার মৃত্যুসংবাদ শুনতে পেলেন (২৬ শে জুন, ১৮৭৩)। অনুজপ্রতিম মনোমোহনের কাছে এই সংবাদ শুনে তার দু’চোখ দিয়ে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
তারপর জীবনযুদ্ধে পরাজিত হ্যাকাবেথের মতই মধুসূদন উচ্চারণ করেন-
out, out brief candle,
Life’s but a walking shadow; a poor player,
that struts and frets his hour upon the stage,
and then is heard no more; it is a tube
Told by an idiot, full of sound and funy,
signifying nothing.....
প্রিয় কবি শেক্সপীয়ারের এই কয়টি চরণ আবৃত্তি করে মধুসূদনকে একরূপ আশ্বস্ত লাভ করতে দেখা যায়।
এর তিনদিন পরেই তার জীবনেরও শেষ মুহূর্তটি ঘনিয়ে আসে। জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত, পর্যুদস্ত, ভাগ্যহত মধুসূদনকে শেষ পর্যন্ত একটা সাধারণ দাতব্য চিকিৎসালয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হয়েছে (২৯শে জুন, ১৮৭৩)।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ