ঢাকা, শুক্রবার 04 November 2016 ২০ কার্তিক ১৪২৩, ৩ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিপুল তরঙ্গে

তমসুর হোসেন : একটি বিষয় নিয়ে খুব ভাবে রুমা। ভেবে ভেবে ক্লান্ত হয়। বিশ বছরের একটানা শূন্যতায় তার জীবন থেকে কি অন্তরীণ হয়ে গেছে সুখ নামক বস্তু? নিরাশার আঁধারে বাস করে সে ভাবতে পারে না জীবনে আবার স্বপ্নের রূপালী চাঁদ আসবে। দেয়ালের আড়ালে নিশ্চুপ হয়ে থেকে আলোর উজ্জ্বলতা ভুলে গেছে সে। কখন দিন ফুরিয়ে রাত আসে কখন ভোর হয় কিছুই সে বুঝতে পারে না। সেই গতিহীন জীবনের কপাটে সহসা কার যেন কড়া নাড়ার শব্দ পায় সে। কে যেন দ্বিধাগ্রস্ত হাতে মাঝে মাঝে মনের দরজায় কড়া নেড়ে যায়। মানুষকে বিশ^াস করা ভুলে গেছে রুমা। বিশেষ করে পুরুষ মানুষকে। বুকের ভেতরের সমস্ত আবেগ দিয়ে যৌবনের প্রথম দিনগুলোয় যে মানুষটিকে সে পাগলের মতো ভালোবেসেছে সেই তার অন্তরে অবিশ^াসের বীজ পুঁতে গেছে। সেই বীজ থেকে গজিয়ে ওঠা চারা এখন পরিণত হয়েছে বিশাল মহীরূহে। দশ বছরের দাম্পত্য জীবনের ফসল একমাত্র কন্যাসহ তাকে অনিশ্চয়তার রাজ্যে ছুঁড়ে ফেলে আরিফ অন্য নারীর হাত ধরে সুখের ঘর বেঁধেছে।
কিছুদিন থেকে রুমার কাছে কল আসে অচেনা নাম্বার থেকে। সে যখন স্কুলে ক্লাস নেয় অথবা ঘরে এসে জানালা খুলে নিসর্গ দেখে তখন মোবাইলটা হু হু করে বেজে ওঠে। বেজে বেজে মোবাইল আপনাতেই বন্ধ হয়ে যায়। রুমা নাম্বারটা ডিলেট করে দেয়। ডিজিটগুলোর দিকে একটু চোখও রাখেনা সে। বেশ বিরক্ত করছে একজন তাকে। লোকটা যে খুবই বাজে তার আচরণ থেকে বুঝতে পারে রুমা। মাঝে মাঝে সে কলটা ধরতে চায়। আবার ভাবে কী হবে কল ধরে! একবার লাই পেলে গল্প ফাঁদিয়ে বসবে। আরিফের সাথে সেপারেশনের পর অনেক বিরক্তিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। বিদেশে অবস্থানরত এক ভদ্রলোকের ছেলেকে টিউশনি পড়াতো রুমা। সেই লোক প্রায় তাকে বিরক্ত করতো সিঙ্গাপুর থেকে। কেমন করে নাম্বার সংগ্রহ করেছে তা সে ভেবে পায় না। ‘তোমাকে মারাত্মক ভালোবাসি। তোমাকে না পেলে আমি বাঁচবো না’ এসব ধাঁচের কথা বলে ভোলাতে চেষ্টা করেছে লোকটা। সেই লোকটাকে কল করা থেকে নিবৃত করতে তার বেশ সমস্যা হয়েছে। অনেক অর্থ ছিলো লোকটার। মস্তান টাইপের চেহারা আর বিদেশি টাকার গরমে সে ধরাকে সরা জ্ঞান করেছে। কিন্তু রুমা তাকে একদম পাত্তা দেয়নি। অনেকদিন ঘ্যান ঘ্যান করে কেটে পড়েছে শেষ পর্যন্ত।
এই লোকটাকে আচ্ছা করে ধমক দিতে হবে। যখন তখন কল করে বসে। বিকেলে বেলকনিতে বসে সে যখন ফেলে আসা স্মৃতিকে রোমন্থন করতে চায় তখন বেখাপ্পা বেজে ওঠে মোবাইলটা। তখন রুমার আছড়ে দিতে ইচ্ছে করে মোবাইল। বিয়ের পর বেশ ক’টা বছর আরিফের সাথে ভালোই কেটেছে তার। বিকেল হলে আরিফ বাজার সেরে বাসায় ফিরতো। মিশু তখন চার বছরের। গুঁড়ি গুঁড়ি পা ফেলে হেঁটে বেড়াতো মেয়েটা। ফিরে এসে আরিফের কাজ হলো মিশুর সাথে খেলা আর রুমার মন জোগানো। কী খেতে চায় রুমা? প্রতিটি মুহূর্ত ওর পছন্দের পেছনে ছুটে বেড়ানো ছিলো আরিফের কাজ। দেশের বাড়ি থেকে ওর চাচাতো ভাই বেড়াতে এসেছে সে সময়। হাবাগোবা গ্রাম্য যুবক ক’টা দিন ভালোই বিরক্ত করে গেছে। তখন আরিফের সাথে ভেতরে ভেতরে প্রচুর মনোমালিন্য চলছিলো রুমার। সেই ছেলেটার সাথে বীচে যাবার বেশ চাপ দিয়েছে আরিফ। অমন একটা আনকালচারড ছেলের সাথে বীচে যেতে বয়ে গেছে রুমার। প্রকাশ্যে না বলে দিয়েছে  সে। তাতে দু’জনের তিক্ততা আরও বেড়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত সেপারেশন কেউ ঠেকাতে পারেনি। কিছু না বুঝে সেই ছেলেটাকে হুট করে একটা চিঠি লিখেছে রুমা।
তখন রুমার মাথায় যতোসব হঠকারী চিন্তার উদয় হতো। তড়িঘড়ি বিয়ে করে দেখিয়ে দিতে ইচ্ছে করতো তারও জীবন সুখে চলতে পারে। জিদের বসে সেই গ্রাম্য যুবককে সে চিঠির পর চিঠি লিখতো। বিনিময়ে সেও পেতো কবিত্বে ভরা প্রচুর চিঠি। অন্যের লেখা নকল করে ভালই লিখতো ছেলেটা। অমন নিদারুণ শূন্যতায় চিঠিগুলোকে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরেছে রুমা। একটার পর একটা চিঠি তার ভেতরের অগোছালো মনটাকে বড়ই সান্ত¦না দিয়েছে। তারপর কী যে হলো চিঠি দেয়া বন্ধ করে দিলো আপন নামের ছেলেটা। হৃদয়ের অবরুদ্ধ যন্ত্রণা নিয়ে অনেক লিখলো রুমা। কিন্তু একটা চিঠিরও জবাব পেলোনা সে। একবুক হতাশা নিয়ে শুকনো মৃত্তিকায় মুখ থুবড়ে পড়ে থাকলো রুমা। সেই আপন তাকে পাগলের মতো কল করছে সুদীর্ঘ বিশ বছর পর। সেদিন প্রচুর ক্লান্তি নিয়ে বাসায় ফিরেছে রুমা। দুপুরের খাবার কলিগদের সাথে টিফিন রুমে বসে খেয়ে নেয় সে। রাতে খুব একটা খায় না। বিস্কিট আর এককাপ চা তার রাতের খাবার। সন্ধ্যার পর বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে রুমা। অন্যদিনের মতো মোবাইল বেজে উঠলো। কল রিসিভ করে সাটানো গলায় প্রশ্ন করলো সে,
‘কেন কল করছেন জানতে পারি?’
‘অবশ্যই। জানানোর জন্য তো কল করেছি।’
‘সময় নেই। ঝটপট বলে ফেলুন।’
‘আপন নামের কাউকে মনে আছে?’
‘আপন? কোথাকার আপন। বলুন কি দরকার?’
‘দরকার পরে। আগে তো চিনুন।’
কণ্ঠ শুনে রুমার মনে হলো সেই আপনই হবে। তখন চিঠি লিখে মনের ভাব প্রকাশ করা হতো। বিশ বছর আগে মোবাইল ছিলো না মানুষের হাতে। কতো সুন্দর করে চিঠি লিখতো। মাঝপথে থেমে গেলো। রুমার বুকে নতুন দিনের স্বপ্ন জাগিয়েছে সে। সেই মনে হয় কথা বলছে। খুব রাগ হয় রুমার। তার সন্তানের বাবা হতে চেয়েছিলো সে। তখন আপন বিয়ে করেনি। সব জেনেও রুমার সাথে ঘর বাঁধতে চেয়েছিলো। কী কারণে হঠাৎ থমকে গিয়েছিলো আজো জানা হয়নি রুমার!
‘আপনাকে চিনে লাভ কি? পাক্কা প্রবঞ্চক আপনি।’
‘আমি মোটেই প্রবঞ্চক নই। আপনাকে অনেক লিখেছি।’
‘মিথ্যে বলার জায়গা পাননা? আমিতো ঠিকানা পাল্টাইনি।’
‘কেউ বেহাত করেছে চিঠি। আপনি ভুল বুঝেছেন।’
কথাটা বিশ^াস হয় রুমার। সে জানতে পেরেছে আরিফের হাতে আপনের লেখা পড়েছিলো । তখন রুমা আলাদা হয়ে গেছে। ওর বিষয়ে আরিফের মাথাব্যথা থাকার কথা নয়। এ নিয়ে বাড়িতে অনেক ঘটনা হয়েছে। আরিফ চায় না ছোট ভাই তার বউকে নিয়ে সংসার পাতুক।
‘মোটেই ভুল বুঝিনি। সবটা কপাল।’
‘নিজকে দোষী করছেন কেন? না বুঝে পিছানো ঠিক হয়নি।’
বিশ বছর পর কেন আপন এসব বলছে। তার রাতের ঘুম যে কেড়েছে তাকে সে ভালোবেসে ফেলেছিলো। আরিফ তাকে ছুঁড়ে ফেলেছে বলে মাথায় আগুন ধরে গিয়েছিলো রুমার । বাজে মেয়ের সাথে সম্পর্ক ছিলো আরিফের। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তবলা বাজাতো আরিফ। তবলায় হাত ছিলো ওর। সেখানেই পরিচয় শানু নামের সংগীত শিল্পীর সাথে। টিভিতে প্রোগ্রাম করতো শানু। আরিফ ঢাকায় বদলী হলে শানু যোগাযোগ করতো ওর সাথে। আরিফ অনেক মেয়ের সাথে অবাধ মেলামেশা করতো। এসব বিষয়ে প্রমাণ ছিলো রুমার কাছে। তার এতোটা স্খলন সে কোনক্রমেই মেনে নিতে পারেনি। সেই সব দিনের শূন্যতা আপনের লালিত্যে ভুলতে পেরেছিলো রুমা।
তারপর ঘোরের মতো কেটে গেছে সময়। মিশুকে বুকে জড়িয়ে দিনগুলো বয়ে যেতে থাকে। মিশুর পড়াশুনা বিয়ে ভবিষ্যৎ করতে জীবন থেকে কখন সময় চলে গেছে বুঝতে পারেনি রুমা। বাবা অন্যখানে বিয়ে দিতে চেয়েছে। তার একটা জবের জন্য তাকে বিয়ে করতে অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তার পাণীপ্রার্থীদের অনেকের বউ ছিলো। আর যাদের বউ ছিলো না তাদের অনেকেই ছিলো রিটায়ার্ড পারসোনেল। সবক্ষেত্রে প্রবল বাঁধ সেধেছে মিশু। সব সময় রুমাকে ছায়ার মতো আগলে রেখেছে সে। সে এমন সিন ক্রিয়েট করেছে রুমাকে সব অকেশন থেকে সরে আসতে হয়েছে। মাকে কোনক্রমেই হাতছাড়া করতে চায়নি মিশু। সে এমন ভাষা ব্যবহার করতো অথবা এমন সব আচরণ করতো যার জন্য রুমা ঘুণাক্ষরেও বিয়েশাদীর কথা ভাবতে পারেনি। বাবা না থাকলে বাচ্চা মানুষ করতে প্রচুর কষ্ট হয়। সব কষ্টের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মিশুকে বড় করে তুলেছে রুমা। মিশুর বিয়ে হয়েছে উচ্চপদস্থ অফিসারের সাথে। স্বামীর সাথে দিন কাটাচ্ছে মিশু। একটি মেয়ে জন্মেছে মিশুর। রমজানে জন্মেছে বলে নাম রোজা রাখা হয়েছে।
এখন রুমার জীবনটা থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। দিনগুলো বয়ে যেতে চায় না। মিশু হৈ চৈ অট্টহাসি করে বাসাটা মাত করে রাখতো। এখন সবখানে অন্ধকার আর স্থবিরতা। ভোর পাঁচটায় ফজর নমাজ পড়ে জানালা খুলে ঘুমের অতলে নিমগ্ন জগত অচেনা লাগে রুমার। কতো সুন্দর ঘুমিয়ে আছে সমস্ত শহর! অথচ তার চোখে ঘুম আসে না। বিয়ের পর রাত জেগে সংসারের কাজ করা অভ্যেস হয়েছে রুমার। কোথায় মাকড়সার ঝুল কোথায় ময়লা সতর্কভাবে পরিষ্কার করতো সে। সকালে তাকে স্কুলে ছুটতে হয়। সব কাজ সে রাতেই গুছিয়ে রাখতো। বিছানায় যেতে দেরী হলে আরিফ তাকে জড়িয়ে নিয়ে ঘুম পাড়াতো। রাতে দেরীতে খাবার খেতো রুমা। কাটাওয়ালা মাছ গিলতে পারতো না। গলায় কাটা লাগিয়ে তোলপাড় করে ফেলতো। শুয়ে পড়লে রাতে খাওয়া হতো না তার। আরিফ তাকে মাছের কাটা বেছে খাওয়াতো। রুমার পছন্দের জিনিষ সংগ্রহ করা ছিলো আরিফের নেশা। সেই আরিফ তাকে কষ্টে রেখে নতুন বউ নিয়ে সুখে আছে। দু’টো সন্তান আরিফের। আরিফ আগের জব বাদ দিয়ে মার্চেন্ট শিপে দেশবিদেশ ঘুরে বেড়ায়। কেন এমন হলো। কেন আরিফকে নিয়ে সুখী হতে পারলোনা রুমা।
রুমাকে কল করে হয়রান হয় আপন। সে বিয়ে করেও ঘর করতে পারেনি। ভালবেসে করেছিলো আপন বিয়েটা। কিছুদিন সংসার করে বউ বাবার বাড়িতে চলে গেছে। সেই থেকে সে প্রতিজ্ঞা করেছে দারিদ্র দূর না হলে বিয়ে করবে না। বিশ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে নিজকে প্রতিষ্ঠিত করেছে আপন। সে একথাও ভেবেছে রুমা ছাড়া কাউকে বউ করবে না। আপনের কথা বিশ^াস হয় রুমার। আপন রুমার চেয়ে চার বছরের বড়। সেজন্য ওকে আপনি করে বলে সে। আর আপন বলে তুমি করে । সারাদিন রুমার সেটে মেসেজ পাঠায় আপন। তার মেসেজের বড় অংশ জুড়ে থাকে নজরুল সংগীত আর পুরণো দিনের গান। রুমার মনের অবস্থা বুঝে সে মেসেজের বাণী নির্বাচন করে। ‘সুরের ও বাণীর মালা দিয়ে তুমি আমারে ছুঁইয়েছিলে’ ‘যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পারো নাই কেন মনে রাখো তারে’, ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধ’ এসব কালজয়ী গানের কলি যখন রুমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে তখন সে অবাক হয় আপন কি করে বুঝতে পেরেছে কী অপরিসীম আবেগে এই গানগুলো তাকে টানে। তার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় অশ্রুপাত হয় যখন আপন লেখে,‘তোমার সজল কালো কাজল চোখে কার ছবি ভাসে বলো সেকি আমি সেকি আমি। দেবতার কোন অভিশাপে জনমে জনমে এলো বিরহ আর কতো আছে বাকি বলো তুমি শুনি আমি।’ কেঁদে কেঁদে সজল মেঘের মতো বিহ্বল হয়ে পড়ে রুমা। তার হৃদয়ে মেঘের আনাগোনা হয়। আপন তার মনের মৃত নদীতে নতুন করে জলের ধারা বইয়ে দেয়। একটা হতচ্ছাড়া মাথাব্যথা প্রতিদিন তাকে বড় কষ্ট দিতো। আপনের সরস সম্ভাষণ আর কোমল পরশ তার সে কষ্টকর শীরঃপীড়া দূর করে দিয়েছে। এখন রুমার মনে সারাক্ষণ আনন্দের সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়। আপনের সাথে বিদ্রোহী কবির কালজয়ী প্রেমের গানগুলো নিয়ে গভীর মতবিনিময় হয় রুমার। একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে সহজেই তারা পৌঁছে যায়। ‘আজি মধুর বাঁশরী বাজে, মলিন সাঁঝে বুকের মাঝে’ এ গানের বেদনা রুমাকে টেনে নিয়ে যায় অনেক দূরের এক নির্জন নদীতটে যেখানে প্রাণের আপন তাকে নিয়ে রোজ সন্ধ্যায় বাঁশি বাজায়। আপনকে ভালবেসে ফেলে রুমা। ওকে ভেবে আত্মবিস্মৃতের মতো তন্ময় হয়ে পড়ে।
আপনের সাথে জড়িয়ে মড়কলাগা পল্লবের মতো কুঁকড়ে যায় রুমা। মেয়েকে একই শহরে বিয়ে দিয়েছে সে। জামাই একটা ফার্মের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার।  ইপিজেড এলাকায় তার অনেক ফ্লাট আছে। সেগুলো ভাড়ায় খাটিয়ে অনেক টাকা রোজগার করে। রোজা নামের ফুটফুটে নাতনি হয়েছে তার। মোবাইলে কথা বলে রুমাকে ব্যস্ত করে রাখে রোজা। এতোটা মমতার বাঁধন ছিঁড়ে আপনের টানে কী করে সাড়া দেবে সে। এসব কথা শুনে জামাই যদি মিশুর সাথে খারাপ আচরণ করে। অথবা মেয়ে যদি নিগ্রহের স্বীকার হয়। মেয়ের কষ্ট সে কেমন করে সহ্য করবে। এসব কথা ভেবে মরমে মরে যায় রুমা। আপনকে নিয়ে বেড়ে ওঠা ভাবনাটা লবণদেয়া জোঁকের মতো চুপসে যায়। চোখের জলে বুক ভাসানো ছাড়া কোন উপায় থাকে না তার। অনেক থমথমে সন্ধ্যা নিশব্দ রাত কাটিয়ে দেয় এসব কল্পনা করে। তার পক্ষে আপনকে নিয়ে ঘর বাঁধা সম্ভব হবে না। আরিফকে বিয়ের সময় নিজের জিদকেই প্রাধান্য দিয়েছে রুমা। বাবার সম্মানের কথা সে একটুও খেয়াল করেনি। সেপারেশনের পর বাবা সে কথাটাই স্মরণ করে দেয় তাকে। সেদিন রুমা লজ্জায় এতোটুকু হয়ে যায়। বাবার খোঁজে শিক্ষিত বর ছিলো। ওসব রুমার মনে ধরেনি। সে ভেবেছে একমাত্র আরিফকেই দরকার তার। অন্যকে দিয়ে জীবন সুশোভিত হবে না। আবারো ভুল পথে পা দিলে তার দায় নিজকেই নিতে হবে। সন্দেহ নেই আপন তাকে ভালবাসে। শুধু ভালবাসা দিয়ে তো জীবন চলে না। সমাজ পরিবেশ সংস্কৃতি এডজাস্ট না হলে ভালবাসার বুলিটা মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে। আরিফ কি তাকে কম ভালবাসতো! তার ভালবাসা আবেগঘন ধূ¤্রজাল ছাড়া কিছুই দিতে পারেনি তাকে।
এতকিছু ভাবলেও আপনের কলের আশায় ব্যাকুল থাকে রুমা। আপন কল করবে ভেবে সময় গড়াতে চায় না। এনজিওতে কাজ করে আপন। অফিস হতে বের হতে আটটা বেজে যায়। মেসেজে রুমাকে সান্ত¦না দেয় সে। একটি বাক্য গুরুত্ব দিয়ে বারবার লেখে। ‘তোমাকে ভালোবাসি খুব ভালোবাসি’। এই বাক্যের বৃষ্টিতে রুমার অন্তর ভিজিয়ে দেয়। আগামীর অনেক স্বপ্ন রুমার অন্তরে মূর্তমান করে তোলে। রুমার জন্য বাড়ি তৈরী করবে সে। যার সামন দিয়ে বয়ে যাবে নদী। পশ্চিমে থাকবে খোলা ফসলের মাঠ। প্রাণখোলা বাতাস লাফিয়ে পড়বে বাড়ির বারান্দায়। গাছপালা আর মেঘের ছায়ায় বাড়িটি শান্তির নিভৃত ঠিকানা হবে। রুমাও চায় শহর হতে দূরে এমন একটি বাড়িতে হৃদয়ের শান্তি খুঁজবে। কোন মানুষ সহজে যে বাড়ি খুঁজে পাবে না। আপনের কথায় আপ্লুত হয় রুমার মন।
‘রুমা তুমি আসবে আমার কাছে?’
‘আসবো না কেন? অবশ্যই আসবো।’
‘একটি বাগান থাকবে। সেখানে ফুল ফুটবে।’
‘চন্দ্রমল্লিকা থাকবে সেখানে?’
‘সেটা তোমার পছন্দ?’
‘খুব পছন্দ চন্দ্রমল্লিকা।’
‘আর কি পছন্দ তোমার?’
‘টগর রক্তচন্দন জবা ঝুমকোলতা অপরাজিতা। এসব আমার পছন্দ।’
‘একটি কথা মনে পড়লো।’
‘কি কথা?’
‘আমি তোমার নতুন নাম দিতে চাই।’
‘কি নাম?’
‘অপরাজিতা। এ নামে খুব ভালো লাগবে তোমাকে।’
‘কি দরকার?’
‘আমার ভালো লাগছে তাই।’
‘রুমা নাম কি খারাপ? ও নামে ডাকলে বেশি খুশি হবো।’

ক’দিন থেকে মিশু একটা জিদ ধরেছে। রুমাকে ওদের সাথে একই ফ্লাটে উঠতে হবে। বেশ কাছেই বাসা নিয়ে থাকছে ওরা। জামাই অফিসে গেলে রোজাকে নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়। জামাই রোজাকে নার্সারীতে রেখে যায়। সমস্যা ওকে নিয়ে আসা নিয়ে। ছুটির সময়ে রাস্তায় জ্যাম পড়ে যায়। এক ফ্লাটে থাকলে সমস্যা মিটে যাবে তা কিন্তু নয়। মিশুর অভ্যেস যে কোন বিষয়ে কান ঝালাপালা করা। সব ঝামেলা মায়ের মাথায় গড়িয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে চায়। মেয়ের বাসায় থাকা রুমার পছন্দ নয়। মিশু কথা শুনলে তো। এমন চেঁচামেচি করবে যে কান রাখা যাবে না। ওর ইচ্ছে হয়েছে করে ছাড়বে। মায়ের কথার দাম নেই ওর কাছে। ক’দিন আগে বলেছে চাকরি করা চলবে না। টিচারের জব করলে মানুষ পাগল হয়ে যায়। মা কাছে থাকলে মিশু বাচ্চা নিতে পারবে। রোজাটা একা কতো খেলবে। লোক পাঠিয়ে বাসা খুঁজছে মিশু। জামাই সমেতও সে বাসা খুঁজতে যায়। রুমাকেও ডাকে। সে কিছুই বলে না। এসব করে জীবন সেদ্ধ হয়ে গেছে। সংসারের মালপত্র টানা হ্যাঁচড়া করে কয়লা হয়ে গেছে অন্তর । এখন ওসব একটুও ভালো লাগে না। জীবনের প্রথম থেকে দু’কক্ষের বাসাটা সে আঁকড়ে ধরে আছে। এর প্রতিটি ইটের সাথে তার সখ্য। প্রশস্ত বেলকনি ঘেঁষে ঝাঁকালো নারকেল গাছ। যার ডালপালা সারাক্ষণ আল্পনা এঁকে যায়। সেই আল্পনায় ডুবে রুমার মন ভরে যায়। বাসাটা ছাড়ার কথা মনে করলে বেদনায় ভরে যায় রুমার মন। এ বাসার নীরবতায় আপনকে নিবিড় করে পায় সে। অফিস শেষে প্রতিদিন মোবাইলে মন খুলে কথা বলে আপন। জীবনের গভীর স্বপ্নগুলো সে রুমার মনের মাঠে বিছিয়ে দেয়। মিশুর সাথে থাকলে আপনের সাথে কথা বলবে কেমন করে। মেয়ের দৃষ্টির সামনে কেমন করে হৃদয়ের আবেগ গোপন করে চলবে। আপনের প্রেম চরণে এনেছে সীমাহীন জড়তা। চলতে ফিরতে সে হোঁচট খায়। আপনের মেসেজ ডিলেট করতে ভুলে যায় সে। মিশু যেভাবে মোবাইল ঘাঁটাঘাঁটি করে ওর চোখ বাঁচিয়ে ঠিকটাক থাকা তার পক্ষে সম্ভব হবে না। তারপরও মেয়ের জেদে এক বাসায় ওঠতে হবে রুমাকে। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বাসা খুঁজে জিনিসপত্র টেনে হিঁচড়ে তুললো হাসান । মাকে কাছে এনে মিশু অনেক স্বস্তি পেলো।
সকাল ছ’টায় হাসান জগিঙ করতে যায়। বাসার নিকটে জিমনেসিয়াম আছে। হাসানের সাথে মিশুও যায় জগিং করতে। রোগাটে মিশুটা কেমন মুটিয়ে গেছে। সংসারের কাজে ডুবে থাকে মেয়েটা। রান্নাবান্না কাপড়কাঁচা চোখের নিমিষে করে ফেলে। কাজ শেষে মায়ের কাছে নসটিখসটি করে। মায়ের মোবাইল ঘেঁটে ঘুঁটে দেখে। মোবাইল নিয়ে বাইরেও চলে যায় মিশু। স্যামসাং গ্যালাক্সির চেয়ে কমদামী সেটের আসক্তি বুঝতে পারে না রুমা। সকালে জগিঙের সময়ও সে মায়ের সেটটাই নিয়ে যায়। মেয়েকে নিষেধ করতে পারেনা সে । তার অভ্যেসও নেই। মুখের ওপর হুট করে কিছু বলতে পারে না। এর মধ্যে আপন যদি কল করে বসে। মিশু যদি জানতে পারে মায়ের অভিসার চলছে তাহলে হয়েছে! এমন কথা বলবে কানে হাত দিতে হবে। মিশু মোবাইল নিয়ে গেলে রুমার প্রাণ হাওয়ায় উড়ে বেড়ায়। মনে হয় জানটা আর ধড়ে ফিরে আসবে না। পাখিকে দিয়ে যদি আপনকে খবর পাঠানো যেত। সে যেন কোনক্রমেই কল না করে। আর বাসায় আসার পর থেকে রোজাটা সারাদিন লেজে লেজে থাকে। ওর সামনে কাউকে কল করার জো নেই। কথা বলা শুরু করলেই ও চিল্লাতে শুরু করে, ‘কার সাথে কথা বলছো, ও হ্যাঁ কার সাথে কথা বলছো?’ চিল্লার শব্দে জামাই মিশু ছুটে আসে। তখন সংকোচে এতোটুকু হয়ে পড়ে রুমা। দরজা লাগিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে হয় তার। রোজাকে রুমে নিয়ে দরজা দেয় মিশু। স্বামী কন্যার সঙ্গে রাত যাপন করে সতেজ চোখে সকালের অরুণিমা প্রত্যক্ষ করে সে। কিন্তু রুমা বাইরের ভুবন দেখে নিজের ভেতর কুঁকড়ে যায়। মেয়ে তার সম্পর্কে গোপন কিছু জেনে ফেলেছে কিনা? অতটুকু রোজা সেও তাকে আগলিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। জামাইর চোখের সামনে সে সংকোচবোধ করে। মেয়ের মাধ্যমে জামাই কিছু জেনে ফেলতে পারে। অফিসের কলিগ, প্রতিবেশী আর তিনজোড়া চোখের সামনে সে নিজকে কেমন করে আড়াল করে রাখবে। সতর্ক হতে চেষ্টা করে রুমা। আপনকে বলে দেয় যাতে সে যখন তখন কল না করে । সাবধানে চলে সে লালিত স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে।
মায়ের দিকে খুব খেয়াল রাখে মিশু। যে মাকে অবলম্বন করে সে দিনের পর দিন বেড়ে ওঠেছে তার সুখের দিকে নজর রাখে সে। মায়ের মুখে হাসি নামক জিনিসটি দেখতে পায়নি মিশু। মা যেন অনুভূতিহীন জড়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। চরম খুশির দিনেও মা পুতুলের মতো নিষ্পৃহ হয়ে থাকে। যা দেখে মিশুর মন হাহাকার করে ওঠে। মা কী কোনদিন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠবে না! পৃথিবীর আলো বাতাসের সাথে মিতালি করে জীবনের মহা আয়োজনে মা কী ফিরে আসবেনা! মায়ের লক্ষ্য ছিলো মিশুকে বড় করে তোলা। আজ সে স্বামীর ঘর করছে। একটি ফুটফুটে মেয়ে এসেছে তার কোলে। মেয়েকে বুকে নিয়ে সে তার ভেতরের মাতৃহৃদয়ের সন্ধান পায়। তার সত্তার গভীরে যে একটি মমতার তটিনী বয়ে যাচ্ছে তার ঢেউয়ের গর্জন সে শুনতে পায়। মায়ের নিরাবেগ মুখের দিকে তাকিয়ে গোপনে অশ্রুপাত করে মিশু। মায়ের মুখে হাসি ফোটাবার প্রাণপন চেষ্টা করে সে। সারাদিন সে রোজাকে নিয়ে মায়ের বিছানায় গড়াগড়ি খায়। মায়ের মোবাইল ঘেটে সে মায়ের পছন্দের মানুষের খোঁজ করে। বাবার পরে মায়ের কী কোন পছন্দের পুরুষ নেই! মা কী চোখ খুলে এই শস্য-শ্যামল ধরণীর ঝলমলে রুপের সমারোহ দেখেনা! আশাহীন তরী বেয়ে মা অবসন্ন দেহখানা কোন ঘাটে ভিড়াবে। অনেক খুঁজে মায়ের মোবাইলে একটি নামের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে মিশু। আপন নামের একজনের সাথে মায়ের ফোনালাপের বিষয় আঁচ করতে পেরে সে মনের ভেতরে আনন্দই অনুভব করে। মা তাহলে হতাশার সমুদ্রে নিমজ্জিত হতে চায় না। কোন সহৃদয় মানুষের হাত ধরে মা যদি জীবনের পথে হেঁটে যেতে চায় তা হলে মিশুর মনটা প্রসন্নই হবে। মাকে ঘুণাক্ষরেও বিষয়টি বুঝতে দেয়না সে। বরং তার গোপন হৃদয়বৃত্তির সন্ধান লাভের মানসে সে আরও মনোযোগী হয়ে ওঠে।
প্রায় রাতে মায়ের দরজায় কান পাতে মিশু। ছিটকিনি লাগানো মায়ের অভ্যেস নেই। দরজাটা আধভেজা হয়ে থাকে। মিশু শোনে মা যেন কার সাথে কথা বলে একান্ত আগ্রহের সাথে। খুব প্রাণবন্ত মনে হয় মায়ের কথাগুলো। কথার মাঝে মিষ্টিমধুর হাসে মা। হৃদয়ের বাণী কার উদ্দেশ্যে যেন ছুঁড়ে দেয় অতুলনীয় মাধুর্যের সাথে। সবকথা শুনতে পায় না মিশু। মা এতোটা নি¤œস্বরে কথা বলে যে বুঝতে অসুবিধা হয়। তবু বাড়ি, বাগান, চন্দ্রমল্লিকা, অপরাজিতা, রক্তচন্দন শব্দগুলো হতে মায়ের হৃদয়ের সুপ্ত বাসনার প্রতিধ্বনি শুনতে পায় সে। মায়ের নিঃশব্দ আলাপচারিতা খুবই উপভোগ্য মনে হয় তার। মা তাহলে জীবনের বৈচিত্র্যময় আহ্বান শুনতে পায়? এখনো নিঃশেষ হয়ে যায়নি মায়ের প্রাণশক্তি? মিশু ভেবেছিলো মাকে আর চাকুরি করতে দেবে না। তার তো আর কোন সন্তান নেই। তার বেতন, উৎসব ভাতা, লাম্পগ্রান্ড, জিপি ফান্ড এবং পেনশনের সব টাকার মালিক সেই। সব উপার্জন হস্তগত করার জন্য মাকে নিজের কাছে টেনে এনেছে। তার দিন ফুরিয়ে গেলে আলাদীনের প্রদীপের মতো আশ্চর্যজনক উপায়ে অনেক সম্পদের অধিকারী হতে পারবে। বাসা ভাড়ার অর্ধেক টাকা সে মায়ের কাছ থেকে আদায় করে। লজ্জার কারণে অনেক অর্থ প্রতিমাসে খরচ করে মা। কিন্তু রোজাকে বুকে জড়ালে মায়ের বিধ্বস্ত হৃদয়ের জরাজীর্ণ প্রতিচ্ছবি প্রত্যক্ষ করতে পারে সে। সে কি পারবে অমন দুরবস্থায় মায়ের মতো করে রোজাকে বড় করে তুলতে? একেকটা বুভুক্ষু দিন মায়ের মনে কতোটা রুক্ষতা ঢেলে গেছে তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী তো নিজে। আজ মিশু এতোটা নিচে নেমে গেছে। মায়ের অন্তিম প্রশ্বাসের অপেক্ষায় দিন গুনছে? এমনটা হওয়া তার পক্ষে কি শোভনীয় হচ্ছে? ভেবে ভেবে অস্থির হয়ে যায় মিশু। মাকে সে আগের মতো প্রাণময় এবং টগবগে দেখতে চায়। সে চায় বাবার মতো হৃদয়বান কেউ আবার মায়ের জীবনে আসুক। যাকে সে বাবা বলে ডাকতে পারবে না সত্য কিন্তু মাকে কেন্দ্র করে তার সাবলীল বিচরণকে অন্তর দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবে। রাতের অন্ধকারে দরজা খুলে অতি সন্তর্পণে মায়ের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে চুপ করে মায়ের ফোনালাপ শোনে সে। মায়ের কথা সে স্পষ্ট শুনতে পায়। অনেক সময় ধরে মা এবং আপনের নিবিড় আলাপ শ্রবণ করে। মায়ের প্রশ্বাসের উষ্ণতা, আকাক্ষার তীব্রতা তাকে দারুণভাবে আহত করে। মায়ের হৃদয়ের চাপা আর্তনাদ মিশুর অন্তরের কঠিন শিলা ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেয়। মিশু যেন আরেক মিশু হয়ে মায়ের সামনে দাঁড়ায়। মেয়েকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লজ্জায় এতোটুকু হয়ে যায় মা। মিশু তাহলে সব জেনে গেছে?  এতোবড় অপমান নিয়ে সে কেমন করে মেয়ের সাথে বাস করবে। কিন্তু মিশু মাকে অন্য কথা বলে। মায়ের তপ্ত কপালে হাত বুলিয়ে তাকে সামনে চলার মন্ত্র শেখায়। জীবনের অনিশেষ আনন্দের বিপুল তরঙ্গে সে তাকে ভাসিয়ে দেয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ