ঢাকা, শুক্রবার 04 November 2016 ২০ কার্তিক ১৪২৩, ৩ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিশ্বের সবচেয়ে সফল মুসলিম সংখ্যালঘু হুই

(গতকালের পর) : ৩ নবেম্বর, ইকোনমিস্ট : তারপর আরবিতে দোয়া-দরূদ পড়া হলো। মৃত ব্যক্তিটির নাতির বাড়িতে কোরআন তেলায়াত করার পর সবাই কবর জিয়ারত করতে যান। কিন্তু বিকেলটা হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন। নাতি মা জিনলংয়ের লেখা ১৮ মিটার দীর্ঘ একটি স্ক্রল থেকে আবৃতি হলো। এ ধরনের আবৃতিতে ১৮ শতকের ক্লাসিক চীনা কবিতাও স্থান পায়। মা কেবল মসজিদের মোতাওয়াল্লিই নন, স্থানীয় চীনা সুধী সমাজের অন্যতম নেতাও। চীনা সমাজের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই হুইদের বিশেষ বিশেষত্ব। চীনা ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত বেশ কয়েকজন ব্যক্তিত্ব হুই। বিষয়টা খুব কম চীনাই জানে। এদের একজন হলেন ঝেন হি। অনেকে তাকে ‘চীনা কলম্বাস’ বলে জানে। ১৪০০ সালের দিকে তিনি সমুদ্রপথে নানা দেশ সফর করেছিলেন, নতুন নতুন ভূখ- আবিষ্কার করেছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের সাথেও চীনের একটা সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ের কথায় আসা যাক। জিঙসু প্রদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান এবং সেই সাথে জাতিগতবিষয়ক কমিশনের প্রধানও ছিলেন হুই। হ্যানদের সাথে তাদের সম্পর্ক সব সময় ভালো ছিল না। ১৮৬০ ও ১৮৭০-এর দশকের তথাকথিত ডানগান বিদ্রোহগুলো ছিল রক্তাক্ত। কিন্তু ১৯৭৬ সালে মাওয়ের মৃত্যুর পর থেকে দুই পক্ষই নিজেদের পরস্পরের সাথে মানিয়ে নিয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার পোমোনা কলেজের দ্রু গ্ল্যাডনি বলেন, হুইদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো তারা চীনা রাজনৈতিক ব্যবস্থার ধূসর এলাকাগুলোতে আলোচনায় পারদর্শী। এ কারণেই তারা অর্থনৈতিকভাবেও সফল। তারা হালাল খাবার উৎপাদনে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। মধ্যএশিয়া ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে চীনা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মধ্যস্ততা করতে বেশ কার্যকর বলে তারা নিজেদের প্রমাণ করেছে। চীনের আরবি বিষয়ক বৃহত্তম স্কুলটি হলো একটি বেসরকারি কলেজ। এটি ইয়িচুয়ানের উপকণ্ঠে হুইদের আর্থিক সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখানকার বেশির ভাগ ছাত্রকে করপোরেট দোভাষী হিসেবে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। সরকার কিভাবে হুইদের মেনে নিচ্ছে, তার একটি উদাহরণ হলো তারা একটা সীমিত পর্যায় পর্যন্ত তাদের শরিয়াহ বিধিবিধান পালন করার অনুমতি দিচ্ছে। অথচ চীনা আইনি কাঠামোতে শরিয়া স্বীকৃত নয়। আবার নাজিয়াহু মসজিদে ইমাম সাহেব এবং স্থানীয় পল্লী আদালত একই সালিসি আদালতে বসেন। ইমাম সাহেব প্রতিনিয়ত এখানে বসে শরিয়াহ বিধানের আলোকে পারিবারিক বিরোধ মীমাংসা করেন। তিনি যখন ব্যর্থ হন, তখনই কেবল সরকারি বিচারব্যবস্থা হস্তক্ষেপ করে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, শতকের পর শতক ধরে মিলেমিশে বসবাস করার পরও হুইরা তাদের ধর্ম বা পরিচিতি খুইয়ে ফেলেনি। অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মা বলেন, হুইরা সম্প্রদায়ের সাথে দৃঢ়বন্ধন বজায় রাখে। তারা সাধারণ একই ধরনের পেশা অনুসরণ করে। তাদের অনেকে রেস্তরাঁ চালায়, কেউ নগরগুলোতে ট্যাক্সি চালায়। কিন্তু তার পরও তাদের মধ্যকার সবচেয়ে শক্ত বন্ধন হলো ধর্ম। হুইরা চমৎকার একটি ভারসাম্য বজায় রাখে। মিলেমিশে বসবাস করার ফলে তাদের ধর্মচর্চায় বাধা আসে না। আবার এই ধর্ম তাদের অন্যদের থেকে আলাদাও করে না। এটা একটা সূক্ষ¥ রেখা। এর অর্থ হলো চীনের পরিবর্তনশীল ধর্মীয় মনোভাবে হুইরা অরক্ষিত। এখন পর্যন্ত তারা ইসলামফোবিয়া থেকে মোটামুটিভাবে রক্ষা পেয়েছে। ইসলাম ধর্মকে অপমান করার জন্য অনলাইনে প্রায় ‘দি গ্রিন’ (ইসলামের বিশেষ রঙ) শব্দটির ব্যবহার হয়। এখন পর্যন্ত সরকার হুইদের সংস্কৃতিকে মেনে নিয়েছে। কিন্তু নিঙজিয়ায় গত জুলাইয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তার শ্রোতাদের বলেছেন, অবৈধ অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে কঠোর হতে, এমনকি যদি তা অতি সামান্যও হয়। তার সরকার অনেক ধর্মীয় গ্রুপের বিরুদ্ধে কঠোর হয়েছে। হয়তো হুইরাও এরপর কোপানলে পড়বে। কিন্তু তার পরও বলা যায়, হুইদের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি ইতিবাচক। হুইরা দেখিয়েছে, ইসলাম পার্টি নেতাদের প্রতি হুমকি নয়। তারা প্রমাণ করেছে, তারা একই সাথে চীনা ও মুসলিম। ইয়িচুয়ান বিমানবন্দরে এক হাজি তার লাগেজের জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি সাদা জোব্বা পরে আছেন। তাতে মুদ্রিত লাল চীনা পতাকার নিচে সবুজ আরবি হরফে লেখা রয়েছে : ‘চীনা হজ্বযাত্রী’। এটা একই সাথে তার মুসলিম পরিচিতি এবং নাস্তিক পার্টি-রাষ্ট্রীয় পরিচয় তুলে ধরছে। তিনি হজ্ব সম্পর্কে বলেন, ‘এটা সারা জীবনের সেরা অভিজ্ঞতা। ’ তারপর তিনি তাকে স্বাগত জানাতে আসা সাদা টুপি পরা হাজারো উল্লসিত মুসলমানের ভিড়ে হারিয়ে গেলেন।  (সমাপ্ত)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ