ঢাকা, শুক্রবার 04 November 2016 ২০ কার্তিক ১৪২৩, ৩ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খুলনার কেন্দ্রীয় খাদ্য গুদাম থেকে চাল পাচারের ঘটনায় তোলপাড়

  • সিবিএর সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ আট জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের 
  • কর্মকর্তা সিবিএ নেতা ও কতিপয় প্রভাবশালী ডিলাররা পাচারের সাথে জড়িত

খুলনা অফিস : খুলনার কেন্দ্রীয় খাদ্য গুদাম (সিএসডি) থেকে পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণ চাল উদ্ধারের ঘটনায় ব্যপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এদিকে গ্রেফতার হওয়া দুইজনকে আগামী রোববার রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। চাল পাচারের সাথে খাদ্যবিভাগের কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা থাকার ঘটনায় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হতবাক হয়েছেন। একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে চাল পাচার করে আসছে। অসাধু কর্মকর্তা এবং গুদাম হ্যান্ডলিং শ্রমিক নেতা ও কতিপয় প্রভাবশালী ডিলাররা এ পাচারের সাথে সরাসরি জড়িত। তারা গুদামে খাওয়ার অনুপযোগী, নিম্নমান এবং পচা চাল রেখে ভাল চাল উচ্চমূল্যে বিক্রির উদ্দেশ্যে পাচার করে থাকে বলে র‌্যাবের অভিযানে উঠে এসেছে।

গত মঙ্গলবার রাতে সিএসডি গোডাউন থেকে সরকারি চাল গোপনে পাচার হওয়ার পর তা দৌলতপুর বাজারের কাছে অবস্থান করছে- এমন খবর পেয়ে র‌্যাবের স্পেশাল কোম্পানি কমান্ডার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. এনায়েত হোসেন মান্নান ও স্কোয়াড কমান্ডার মোঃ নুরুজ্জামানের নেতৃত্বে র‌্যাবের একটি দল অভিযান শুরু করে। দৌলতপুর এলাকায় র‌্যাবের গাড়ি উপস্থিত হলে চাল বোঝাই ওই ট্রাকটি দ্রুত ওই এলাকা থেকে পালিয়ে যায়। পরে তাদেরকে ধাওয়া করে শিরোমণি পুলিশ ক্যাম্প এলাকা থেকে পাচার হওয়া চালসহ ট্রাকটি আটক হয়। দুই দিনের অভিযানে র‌্যাব ১৩ হাজার ৭৫০ কেজি চালসহ একটি ট্রাক আটক করে। এ ঘটনায় একজন শ্রমিকনেতাসহ দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সর্বশেষ গত বুধবার দুপুরে র‌্যাব অভিযান চালিয়ে তিনটি গোডাউন সিলগালা করে দেয়। 

র‌্যাব-৬ সূত্র জানায়, নগরীর বৈকালীতে অবস্থিত সরকারি খাদ্য গুদাম থেকে পাচারের গোপন খবর পেয়ে মঙ্গলবার রাতে নগরীর শিরোমণি পুলিশ ক্যাম্প এলাকা থেকে এক ট্রাক ওএমএস-এর চাল জব্দ করা হয়। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে দৌলতপুর চালপট্টি থেকে খলিলুর রহমান নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। ওই সূত্রের তথ্য ধরেই র‌্যাব রাতে সিএসডি গোডাউনে প্রথম দফা অভিযান চালায়। তারই ধারাবাহিকতায় বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত আবার সিএসডি গোডাউনে অভিযান চালানো হয়। এ সময় জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আব্দুল আউয়াল উপস্থিত ছিলেন।

অভিযানকালে র‌্যাব দেখতে পায়, ১৮ এবং ৩২ নম্বর গোডাউনে থাকা চালের বেশির ভাগই খাওয়ার অনুপযোগী, নিম্নমানের এবং পচা। এ সময় ৯৯ দশমিক ৮৮০ মেট্রিক টন চালসহ ১৮ নম্বর গুদাম এবং ৬৬ দশমিক ৬২০ টন চালসহ ৩২ নম্বর গুদাম সিলগালা করে দেয়া হয়। এছাড়া মঙ্গলবার পাচার হওয়া চাল গোডাউনের ২৬ নম্বর গুদাম থেকে বের হওয়ায় সেটিও সিলগালা করে দেয়া হয়। এ সময় চাল পাচারে জড়িত অভিযোগে সিএসডি খাদ্য গুদাম হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আলী আসগর সরদারকেও গ্রেফতার করা হয়।

সিএসডি গুদামের সূত্র জানায়, অভিযানের খবর পেয়ে ২৬ নম্বর গুদাম ইনচার্জ মো. ইলিয়াস হোসেন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সিলগালা করা ১৮ নম্বর গুদামে জাহাঙ্গীর হোসেন এবং ৩২ নম্বর গুদাম ইনচার্জ হিসেবে মহসিন আকন দায়িত্বে রয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নাসির সরদার ও সাধারণ সম্পাদক আলী আসগর সরদারের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা শক্তিশালী চক্র পুরো সিএসডি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের পেশিশক্তির সামনে অনেক সময় সিএসডি কর্মকর্তারাও জিম্মি হয়ে পড়েন। ডিলারদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়। এই চক্রটির বিরুদ্ধে এলাকায় মাদক, জুয়া পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। নাসির সরদার নিহত শ্রমিক নেতা নাজেম সরদারের ছেলে। আর খালিশপুর গাবতলী এলাকার আঃ কুদ্দুসের ছেলে আলী আসগর সরদার র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়েছে। 

র‌্যাব-৬’র স্পেশাল কোম্পানি কমান্ডার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. এনায়েত হোসেন মান্নান জানান, সিএসডি গোডাউনের অসাধু কর্মকর্তা এবং গুদাম হ্যান্ডলিং শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে যোগসাজসে স্থানীয় একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে চাল পাচার করে আসছে। তারা গুদামে খাওয়ার অনুপযোগী, নিম্নমান এবং পচা চাল রেখে ভাল চাল উচ্চমূল্যে বিক্রির উদ্দেশ্যে পাচার করে থাকে। এভাবে সরকারি গুদাম থেকে চাল পাচার হলেও কর্তৃপক্ষ কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। এ ছাড়া সরকারি গুদাম হওয়ায় বিষয়টি জেলা প্রশাসনের কাছে প্রতিবেদন আকারে পেশ করা হবে। জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্তক্রমে ঘটনার সঙ্গে জড়িত গুদাম কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া হবে।

অভিযানকালে খাদ্য গুদামের ১৮ ও ৩২ নম্বর গুদামে বেশির ভাগই খাওয়ার অনুপযোগী ও নিম্নমানের চাল পাওয়া যায়। ফলে ৯৯ দশমিক ৮৮০ মেট্রিক টন চালসহ ১৮ নম্বর গোডাউন ও ৬৬ দশমিক ৬২০ মেট্রিক টন চালসহ ৩২ নম্বর গুদাম সিলগালা করা হয়। এ ছাড়া মঙ্গলবার পাচার হওয়া চাল গোডাউনের ২৬ নম্বর গুদাম থেকে বের হওয়ায় সেটিও সিলগালা করা হয়।

খুলনার কেন্দ্রীয় সরকারি খাদ্য গুদাম (সিএসডি) থেকে পাচার হওয়া সাড়ে ১৩ হাজার কেজি চাল ওএমএস কর্মসূচির। সিএসডি গোডাউন থেকে শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের সহযোগিতায় চালগুলো পাচার হয়ে যাচ্ছিল। খলিলুর রহমান নামের এক পাচারকারী এই কাজ সমন্বয় করছিলেন। র‌্যাব-০৬ এর তদন্তে এই বিষয়গুলো বেরিয়ে এসেছে। 

ঘটনার সঙ্গে জড়িত শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নাসির সরদার পলাতক রয়েছে। এসব ঘটনায় ৮ জনকে আসামী করে খালিশপুর থানায় মামলা করেছে র‌্যাব-৬ এর ডিএডি আহমেদ হোসেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এস আই কানাই লাল মজুমদার জানান, গ্রেফতারকৃত দুই আসামীকে গতকাল বৃহস্পতিবার আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। রোববার তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমান্ডের আবেদন জানানো হবে।

সিএসডি গোডাউনের ব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমান খান জানান, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ঘটনা তদন্তে গতকাল বৃহস্পতিবার তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফরহাদ খন্দকারকে প্রধান করে এ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অপর দুই সদস্য হচ্ছেন মহানগর খাদ্য পরিদর্শক গোপাল চন্দ্র দাস এবং খাদ্য পরিদর্শক ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ। কমিটির রির্পোট ও জেলা প্রশাসনের রিপোর্ট পাওয়ার পর আরো একটি তদন্ত কমিটি হবে। এরপর পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে সিএসডি’র কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অর্থ না দিলে ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস)’র চাল উত্তোলনে ডিলারদের চাল দিতে গড়িমসি করার অভিযোগ উঠেছে। লভ্যাংশের ভাগ দিতে হয় জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দফতরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের। ফলে ডিলাররাও খোলা বাজারের চাল কালোবাজারে বিক্রির উৎসাহ পাচ্ছে। 

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দফতরের সাবেক এক পরিদর্শক জানান, ডিলাররা কালোবাজারে বিক্রির উৎসাহ পায় কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই। একাধিক বিভাগে ওএমএস’র চাল নিতে আসা ডিলারদের চাঁদা দিতে হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে- ইউনিয়ন চাঁদা, লেবার বকশিশ, মসজিদ ফান্ড, ব্রীজ স্কেলের চাঁদা ও ট্রাক ইউনিয়নের চাঁদার জন্য ১ হাজার টাকা, এ ছাড়াও চাহিদাপত্র দেয়া, ডেলিভারি অর্ডার এবং নগর খাদ্য পরিদর্শক বাবদ ৫শ’ টাকা করে দিতে হয়। এ সব দফতরে টাকা দিতে না পারলে ডিলারদের চাল দিতে গড়িমশি করা হয়। প্রত্যেক দফতরেই ভোগান্তি সৃষ্টি করা হয়। 

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মাহবুবুর রহমান খান। তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ কেউ কখনো করেননি। অভিযোগ আসলে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো। খাদ্য অধিদফতর কোনো অনিয়মের বিষয়ে ছাড় দেয় না। ডিলাররা যদি লোভ সম্বরণ করে তাহলে এ চাল বিক্রিতে কোনো অনিয়ম হওয়া সম্ভব নয়। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ডিলারের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি দুই টন চাল বিক্রি করে একজন ডিলারের লাভ হয় তিন হাজার টাকা। এর মধ্যে লেবার থেকে শুরু করে কর্মকর্তা পর্যন্ত কমিশন, ট্রাক সেলের খরচ বাদ দিয়ে লাভ থাকে না। যে কারণে বাধ্য হয়ে ডিলাররা সরকারি চাল কালো বাজারে বিক্রি করতে বাধ্য হন। খাদ্য বিভাগের ওএমএস ডিলার সমিতিই এসব টাকা ডিলারদের নিকট থেকে উত্তোলন করে সমভাবে ভাগ করে দেন বলে জানা গেছে। 

ডিলার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেন বলেন, টাকা তো কমবেশি অনেককেই দিতে হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ