ঢাকা, শুক্রবার 04 November 2016 ২০ কার্তিক ১৪২৩, ৩ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সিটিসেলের তরঙ্গ খুলে দিতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ

স্টাফ রিপোর্টার : দেশের প্রথম বেসরকারি মোবাইল ফোন অপারেটর সিটিসেলের বন্ধ তরঙ্গ খুলে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। তবে এর জন্য সিটিসেলকে আগামী ১৯ নবেম্বরের মধ্যে ১০০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। এর ফলে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কতৃক বন্ধ করে দেয়া সিটিসেলের কার্যক্রম ফের শুরু করার সুযোগ সৃষ্টি হলো। আদালত বলেছেন, সিটিসেল নির্ধারিত তারিখের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করলে বিটিআরসি আবারও তরঙ্গ বন্ধ করে দিতে পারবে।
এছাড়াও টাকার অংকের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সর্বোচ্চ আদালত অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। পদমর্যাদায় বিটিআরসির কমিশনার (স্পেক্ট্রাম) এবং টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবের নিচে নন-এমন একজন কর্মকর্তা এ কমিটিতে থাকবেন। কমিটি বিরোধ নিষ্পত্তি করে এক মাসের মধ্যে যে সিদ্ধান্ত দেবে, তাই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।
তরঙ্গ বরাদ্দ খুলে দেয়ার নির্দেশনা চেয়ে সিটিসেলের করা আবেদনের শুনানি শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ এই আদেশ দেন।
আদালতে সিটিসেলের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী এ এম আমিন উদ্দিন, ব্যারিস্টার মোস্তাফিজুর রহমান খান। বিটিআরসির পক্ষে শুনানি করেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ও ব্যারিস্টার খন্দকার রেজা-ই-রাব্বী।
আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খান জানান, বাংলাদেশের প্রথম মোবাইল ফোন অপারেটর সিটিসেলের তরঙ্গ বরাদ্দ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে ১৯ নবেম্বরের মধ্যে সিটিসেলকে ১০০ কোটি টাকা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
বিরোধ নিষ্পত্তিতে কমিটি
বিটিআরসি ৪৭৭ কোটি টাকা পাওনা থাকার কথা বলে এলেও সিটিসেলের আইনজীবী ১ গত মঙ্গলবার আপিল বিভাগের শুনানিতে বলেন, তাদের হিসাবে এই অংক ২৩০ কোটি টাকা, যার দুই-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ১৪৪ কোটি টাকা তারা প্রথম কিস্তিতে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিশোধ করেছে। তারপরও সিটিসেলের তরঙ্গ বন্ধ করা সরকারের ঠিক হয়নি।
সিটিসেলের আইনজীবী অভিযোগ করেন, তার মক্কেল কোম্পানির ১০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ বরাদ্দ পাওয়ার কথা থাকলেও কার্যত ঢাকায় ৬ মেগাহার্টজ এবং ঢাকার বাইরে ২ মেগাহার্টজের কিছু বেশি তরঙ্গ দেয়া হয়েছে। যতোক্ষণ পুরো তরঙ্গ সিটিসেল না পাচ্ছে, ততোক্ষণ জরিমানা, সুদ দিতে তারা অপারগ।
এরপর বিটিআরসি গতকাল বৃহস্পতিবার আদালতে তাদের দাবি ৩৯৭ কোটি টাকা বলে জানায়। কিন্তু ওই অংক নিয়েও সিটিসেল আপত্তি তোলে। এই প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় কিস্তিতে সিটিসেলকে কতো টাকা দিতে হবে তা নির্ধারণ করে দেয় আদালত। বলা হয়, ১৯ নবেম্বরের মধ্যে সিটিসেল ১০০ কোটি টাকা না দিলে বিটিআরসি আবার তরঙ্গ বন্ধ করে দিতে পারবে।
পাশাপাশি টাকার অংক নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আদালত অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি কমিটি করে দিয়েছে। এ ছাড়া পদমর্যাদায় বিটিআরসির কমিশনার (স্পেক্ট্রাম) এবং টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবের নিচে নন- এমন একজন কর্মকর্তা এ কমিটিতে থাকবেন। কমিটি বিরোধ নিষ্পত্তি করে এক মাসের মধ্যে যে সিদ্ধান্ত দেবে, তাই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে বলে জানিয়েছে আদালত।
কমিটির চেয়ারম্যান সম্মানী হিসেবে ৫ লাখ টাকা এবং অপর দুই সদস্য আড়াই লাখ টাকা করে পাবেন। সিটিসেল ও বিটিআরসি এই অর্থ যোগাবে।
আইনজীবী খন্দকার রেজা-ই-রাব্বী খন্দকার পরে সাংবাদিকদের বলেন, যদি টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরের সঙ্গে অপারেটরের কোনো বিরোধ হয়, আইনে সেটা নিষ্পত্তির কোনো ব্যবস্থা নাই। আদালত মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে, যেনো এ ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করে। এমন বিধান যেনো তারা সংযোজন করে, যেখানে আপিল বা রিভিউয়ের ব্যবস্থা থাকবে। মন্ত্রণালয়কে সেভাবেই অ্যাডভাইস করবো বলে আমরা আদালতকে জানিয়েছি।
এই আইনজীবী বলেন, সিটিসেলের প্রত্যেকদিন যে ফি বিটিআরসিকে দেয়ার কথা, তা তাদেরকে দিতে হবে। তাতে ব্যর্থ হলে বিটিআরসি আইন অনুসারে ব্যবস্থা নিতে পারবে বলে আপিল বিভাগ আদেশে জানিয়েছে।
বিটিআরসির দাবির অংক কমার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, বিটিআরসি এখন যেটা বলছে, তাদের দাবি করা অর্থে আর কোনো বিরোধের সুযোগ নেই। এটা হচ্ছে প্রি-ডিসাইডেড একটা ফিগার। অংকের হিসাব। আগে আমরা ১০ মেগাহার্টজের হিসাবে দাবি করেছিলাম, আজ সংশোধিতভাবে ৮ দশমিক ৮২ মেগাহার্টজের জন্য দাবির অংক বলেছি। এটা আমরা ইতোমধ্যে সিটিসেলকে দিচ্ছি। এজন্য আমরা ৩৯৭ কোটি টাকার একটা সংশোধিত অংক বলেছি।
এক প্রশ্নের জবাবে রেজা-ই-রাব্বী বলেন, সিটিসেলকে ১০ মেগাহার্টজ স্পেক্ট্রাম দেয়ার কথা থাকলেও বরাদ্দ দেয়ার মতো স্পেক্ট্রাম বিটিআরসির হাতে নেই। যখন থাকবে তখন দেয়া হবে।
সিটিসেলের আইনজীবী মোস্তফিজুর রহমান খান বলেন, বিটিআরসি আগের দাবি থেকে ৩৯৭ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এটা থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট- কারণ দর্শানোর দাবিতে টাকার পরিমাণ ভুল ছিল। এটা আদালতও রেকর্ড করেছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের হিসাবে তারা ২১৬ কোটি টাকা পায়। এ পর্যন্ত দিয়েছি ১৪৪ কোটি টাকা। এখন আবার ১০০ কোটি টাকা দিলে আমাদের স্বীকৃত দায়ের চেয়ে বেশি টাকা চলে যাবে। আমরা সেটা দিচ্ছি। কিন্তু যদি নিষ্পত্তির পর আমরা থাকি- সেটা পরে সমন্বয় করা হবে।
গত ২০ অক্টোবর পাওনা টাকা পরিশোধ না করায় সিটিসেলের তরঙ্গ কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় বিটিআরসি। বিটিআরসির এই সিদ্ধান্ত স্থগিত চেয়ে গত ২৪ অক্টোবর আবেদন করে সিটিসেল। এরপর গত মংগলবার শুনানি শেষে আদালত ৩ নবেম্বর আদেশের দিন রাখেন।
বিটিআরসির দাবি, সিটিসেলের কাছে সরকারের পাওনা রয়েছে ৪৭৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা। যদিও এই পাওনা নিয়ে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য রয়েছে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ালে আপিল বিভাগ ছয় সপ্তাহের মধ্যে পাওনা টাকার তিন ভাগের দুই ভাগ এবং অবশিষ্ট টাকা দুই মাসের মধ্যে জমা দেয়ার জন্য সিটিসেল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। সিটিসেল তাদের হিসাব মতে বকেয়া টাকার মধ্যে ১৩০ কোটি বিটিআরসিকে এবং ১৪ কোটি টাকা এনবিআরের খাতে জমা করেছে। কিন্তু বিটিআরসি দাবি করে, প্রথম কিস্তির টাকার অঙ্ক ৩১৮ কোটি টাকা। টাকার অঙ্ক নিয়ে দুই পক্ষের এই মতবিরোধের মধ্যে বিটিআরসি সিটিসেলের তরঙ্গ বরাদ্দ স্থগিত করে।
এ পরিস্থিতিতে তরঙ্গ বরাদ্দ ফিরে পেতে সিটিসেল আপিল বিভাগে এই আবেদন করে।
এ প্রসঙ্গে সিটিসেলের আইনজীবী মাহবুব শফিক এর আগে বলেছিলেন, আদালত যে কিস্তি নির্ধারণ করে দেন, তা দুই পক্ষের সম্মতিক্রমে টাকার অঙ্ক নির্দিষ্ট করার নির্দেশনা ছিল। বিটিআরসি সিটিসেলকে ১০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ বরাদ্দ দেয়ার কথা ছিলো। কিন্তু তারা বরাদ্দ দেয় ৮ দশমিক ৮২ মেগাহার্টজ। এই হিসাবে বিটিআরসির কিস্তি পাওনা হবে ১৪৪ কোটি টাকা। সে টাকা সিটিসেল জমা দিলেও বিটিআরসি তরঙ্গ বরাদ্দ স্থগিত করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ