ঢাকা, শুক্রবার 04 November 2016 ২০ কার্তিক ১৪২৩, ৩ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভারতে মুসলিম ছাত্র হত্যা

এটা আর মোটেও নতুন খবর নয় যে, ধর্মনিরপেক্ষতার আড়াল নিয়ে ভারতে বিশেষ করে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর হত্যা ও দমন-নির্যাতনের নিষ্ঠুর অভিযান চালানো হয়। মুসলিম বিরোধী অভিযানের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রকাশিতও হয়ে থাকে। এ ধরনের একটি সাম্প্রতিক খবরই বিশ্বব্যাপী প্রচন্ড আলোড়ন তুলেছে। এবারের ঘটনাস্থল দেশটির মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ভুপাল নগরী। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা, বিভিন্ন পত্রিকার খবর ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও চিত্রের ভিত্তিতে খোদ ভারতীয় গণমাধ্যমের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, গত ৩০ অক্টোবর রাতে ভুপাল কেন্দ্রীয় কারাগারে আগে থেকে বন্দী হিসেবে অবস্থানরত আটজন মুসলিম ছাত্র নেতাকে পুলিশ গুলী করে হত্যা করেছে। নিহতরা ভারতে নিষিদ্ধ সংগঠন স্টুডেন্টস মুভমেন্ট অব ইন্ডিয়ার সদস্য ছিলেন। পুলিশ অবশ্য হত্যার কথা অস্বীকার করে বলেছে, ওই আট ছাত্র নেতা নাকি ভুপাল কারাগারের একজন রক্ষীকে হত্যা করে পালিয়ে গিয়েছিলেন! তাদের ধরিয়ে দেয়ার জন্য রাজ্য সরকার নাকি পাঁচ লাখ রুপি পুরস্কার ঘোষণা করেছিল, যে সম্পর্কে সাধারণ মানুষ কিছুই জানে না। 

ওদিকে রাজ্যের বিজেপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপাশি পুলিশের বক্তব্যেও জিজ্ঞাসা ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, তারা জানিয়েছে, ৩০ অক্টোবর রাত দুটো থেকে তিনটার মধ্যে  ওই আট ছাত্র নেতা নাকি প্রথমে একটি কাঁটা চামচ দিয়ে একজন কারারক্ষীকে হত্যা করেন এবং তারপর কয়েকটি চাদর দিয়ে দড়ি বানিয়ে সেই দড়ি বেয়ে দেয়াল টপকে পালিয়ে যান! পরে পুলিশ এবং অ্যান্টি-টেরোরিজম স্কোয়াড এটিএস-এর যৌথ অভিযানে ছাত্র নেতারা ভুপালের অদূরে মালিখেড়া নামক স্থানে ধরা পড়েন। কিন্তু পুলিশ ও এটিএস-এর সদস্যদের দেখা মাত্র ছাত্র নেতারা নাকি তাদের ওপর গুলী বর্ষণ শুরু করেন। তখন আত্মরক্ষার স্বার্থে যৌথ বাহিনী পাল্টা গুলী চালালে আট ছাত্র নেতারই মৃত্যু ঘটে! 

পুলিশ তথা সরকারের পক্ষ থেকে প্রচার করা বক্তব্য কিন্তু হালে মোটেও পানি পায়নি। ভারতের তো বটেই, বিশ্বের কোনো সাধারণ মানুষও এই সাফাইকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেনি। কারণ, ভুপালের যে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেটা সুরক্ষিত এবং অত্যন্ত উচ্চ নিরাপত্তাপূর্ণ কারাগার। সেখানে রয়েছে সার্বক্ষণিক কঠোর প্রহরার ব্যবস্থা। সশস্ত্র কারারক্ষীদের সংখ্যাও অনেক। সুতরাং একজন কারারক্ষীকে হত্যা করতে পারলেই কারো পক্ষে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। অথচ বলা হচ্ছে আটজনের পালানোর কথা। তাছাড়া কাঁটাচামচ দিয়ে গলা কেটে হত্যার অভিযোগটিকেও বানানো কেচ্ছাই মনে করা হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় জিজ্ঞাসা ও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে কথিত বন্দুকযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে। কারণ, যারা কাঁটাচামচ দিয়ে হত্যা করে পালিয়েছিলেন তাদের কাছে কোনো রকমের আগ্নেয়াস্ত্র থাকার প্রশ্ন উঠতে পারে না। পুলিশও বলেনি যে, কারাগার থেকে পালানোর পর ওই আটজনের সঙ্গে অন্য কারো দেখা বা যোগাযোগ হয়েছিল, যারা তাদের অস্ত্র দিয়ে থাকতে পারে। তাহলে তারা অস্ত্র পেলেন কিভাবে? কথা আরো আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও চিত্রে পরিষ্কার দেখা গেছে, আটজনই হাতে ঘড়ি এবং পায়ে জুতাসহ সুন্দর পোশাক পরা অবস্থায় ছিলেন, যে পোশাকে বিচারাধীন আসামীদের কারাগারে থাকতে পারার কথা নয়। ভিডিও চিত্রে এক পুলিশকে নিহত একজন ছাত্রনেতার পকেটে একটি কাঁটাচামচ ঢুকিয়ে দিতেও দেখা গেছে। বড় কথা, ভিডিও চিত্রে প্রমাণিত হয়েছে, আটজনকেই খুব কাছ থেকে গুলী করেছে পুলিশ ও এটিএস-এর সদস্যরা। এসব কারণেই একজন রক্ষীকে হত্যা করে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার তত্ত্বটি মাঠে মারা গেছে। ভারতের কোনো সাধারণ মানুষই এই কাহিনী বিশ্বাস করেনি। মধ্য প্রদেশের বিরোধী দল অল ইন্ডিয়া ইত্তেহাদুল মুসলিমিন এবং জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বরং একে পরিকল্পিত হত্যাকান্ড হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং পুলিশ ও এটিএস-এর ঘাতক সদস্যদের বিচার ও শাস্তি দাবি করেছে।  

আমরাও ভারতের ভুপালে আটজন মুসলিম ছাত্র নেতাকে হত্যার বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানাই। নিষ্ঠুর এ হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে আরো একবার প্রমাণিত হলো, সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার আড়াল নেয়া হলেও ভারতে এখনো বিশেষ করে সংখ্যালঘু মুসলিমরা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। যখন-তখন যে কোনো অজুহাতে দাঙ্গা বাঁধানোর মাধ্যমে তো বটেই, ভুপালের মতো সুপরিকল্পিত হত্যাকান্ডের মাধ্যমেও ভারতীয় মুসলমানদের ওপর দমন-নির্যাতনের স্টিম রোলার চালানো হচ্ছে। দেশটির মুসলমানরা এমনকি নিজেদের ন্যূনতম অধিকারের জন্যও দাবি জানাতে পারেন না। মুসলমানদের গণতান্ত্রিক তথা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন চেষ্টাকেও ভারতে নিষ্ঠুরভাবে দমন ও ধ্বংস করে দেয়া হয়। ভুপালের হত্যাকান্ডটি এর সর্বশেষ প্রমাণ। কারণ, স্টুডেন্টস মুভমেন্ট অব ইন্ডিয়া নামের যে সংগঠনের আটজন ছাত্র নেতাকে বন্দুকযুদ্ধের নাম দিয়ে হত্যা করা হয়েছে সে সংগঠনটি বহু বছর ধরে ভারতজুড়ে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষা ও অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করে আসছে। কিন্তু সম্পূর্ণ গণতন্ত্রসম্মত পন্থায় আন্দোলন করলেও ‘সিমি’ নামে বেশি পরিচিত সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে ভারত সরকার। এর নেতা কর্মীদের শুধু তাড়িয়েই বেড়ানো হচ্ছে না, নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডেরও শিকার হচ্ছেন তারা। আমরা মনে করি, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে নিজের পরিচিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পরিবর্তে ভারতের উচিত এ ধরনের হত্যা ও দমন-নির্যাতন অবিলম্বে বন্ধ করা এবং ভারতীয় মুসলিমদের সকল বিষয়ে সমান সুযোগ ও অধিকার দেয়ার পদক্ষেপ নেয়া।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ