ঢাকা, শুক্রবার 04 November 2016 ২০ কার্তিক ১৪২৩, ৩ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জন বর্ণ : ক্রস ফায়ার কোন্ বর্ণ

[তিন]

জিবলু রহমান : ২১ এপ্রিল ২০১৫ রাত আনুমানিক আড়াইটায় কুষ্টিয়া-মেহেরপুর সড়কের চুনিয়াপাড়া নামক জায়গায় সড়ক সংলগ্ন মাঠে কুষ্টিয়ার মিরপুরে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দকযুদ্ধে মিরপুর উপজেলার লক্ষ্মীধরদিয়া গ্রামের অধিবাসী মিলন আলী (৩২) নামে এক যুবক নিহত হন। পুলিশ দাবি করেছে, নিহত যুবক ডাকাত দলের নেতা। মিলন এলাকার একাধিক মামলার আসামী। পরিবারের দাবি, তিনদিন আগেই মিলনকে আটক করেছিল পুলিশ। নিহত মিলন আলীর স্ত্রী ইয়াসমিন আক্তার এবং তার বোন ফেরদৌস আরা অভিযোগ করেন, ১৮ এপ্রিল রাত আনুমানিক ১১টায় গ্রামের আলিম শাহর মাজারে যখন ওরশ হচ্ছিল; তখন সেখান থেকে মিরপুর থানার এসআই হালিম এবং এএসআই আতিক এসে মিলনকে ধরে নিয়ে যায়। পরদিন সকালে মিরপুর থানায় গিয়ে খোঁজ জানতে চাইলে সেখান থেকে পুলিশ মিলনের কোন খোঁজ জানে না বলে জানায়। মিরপুর থানার এসআই হালিম ঘটনার কথা অস্বীকার করে। 

৬ মে ২০১৫ খুলনার বাগমারা সদরের রায়পাড়ায় পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে আল মামুন (২৮) নামে এক যুবক নিহত হয়। এ ঘটনায় ওমর ফারুক নামে অপর এক যুবক আহত হয়েছে। এদিকে তাদের আটকের পর ওসি জানিয়েছিলেন, পুলিশের একটি বিশেষ দল সকাল থেকেই রায়পাড়া ক্রসরোডের মিস্ত্রি পাড়ায় টহল দিচ্ছিল। এ সময় রিকশায় দুই যুবককে দেখে সন্দেহ হলে পুলিশ তাদের থামিয়ে দেহ তল্লাশি করে। পরে অস্ত্রসহ তাদের আটক করা হয়। রাতে পুলিশ গণমাধ্যমকে জানায়, আটককৃতদের মধ্যে মামুন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে।

২০ মে ২০১৫ ভোর সোয়া পাঁচটার দিকে সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের নন্দবালায় র‌্যাবের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আলমগীর (৩৪) ও রিপন (৩১) নিহত হয়েছেন। র‌্যাব’র দাবি, নিহতরা বনদস্যু মাইঝ্যা বাহিনীর সদস্য। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে বেশ কয়েকটি অস্ত্র ও গুলী উদ্ধারের দাবি করেছে র‌্যাব।

র‌্যাব জানান, সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের নন্দবালা খালে মাইঝ্যা বাহিনীর উপ-বাহিনী প্রধান আলমগীরসহ তার বাহিনী সদস্যরা অবস্থান করছে। একই দিন ভোররাত ৩টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার সোনাপাড়া সৈকত এলাকায় পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে জাফর মাঝি (৪৫) নামে শীর্ষ এক মানবপাচারী নিহত হয়েছে বলে দাবি করছে র‌্যাব। এ সময় এক পুলিশ সদস্য ও এক আনসার সদস্য আহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে একটি দেশীয় তৈরি এলজি বন্দুক ও ৫ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করা হয়। এর আগে টেকনাফে বন্দুকযুদ্ধে তিন মানবপাচারকারী নিহত হয়। নিহতরা হলেন- টেকনাফের শাহ্পরীর দ্বীপ বাজারপাড়ার আবুল হোসেনের ছেলে ধলু হোসেন (৫৫), সাবরাং ইউনিয়নের কাটাবুনিয়া এলাকার আবদুল মাজেদের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম (৩৪) ও একই ইউনিয়নের খাড়িয়াখালির কবির আহমেদের ছেলে জাফর আলম (৩৮)।

২৯ জুন ২০১৬ জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস প্রতিরোধে বাগেরহাটে সাধারণ মানুষের মধ্যে লাঠি বিতরণ করেছে জেলা পুলিশ। এর আগে আরও কয়েকটি জেলা-উপজেলায় জনতার হাতে লাঠি-বাঁশি তুলে দেয়া হয়েছে।

ক্রসফায়ারের চেয়ে লাঠি-বাঁশি যে ভালো, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু তাতে কি বন্দুকযুদ্ধ বন্ধ হচ্ছে? দেশের সব আইন-কানুন, রীতি-নীতি, সর্বপ্রকার মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন পরিপন্থী ১,৭১৫টি ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে’র পরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের বুলি ‘বন্দুকযুদ্ধ ইচ্ছাকৃত নয়, আত্মরক্ষার্থে’ (সূত্র: দৈনিক যুগান্তর ২৫ জুন ২০১৬)।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সম্প্রতি এক বৈঠকের পর গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনায় আমরা অপরাধীদের চিহ্নিত করেছি। অনেকেই ধরা পড়েছে। আর যারা এখনও ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়েছে তাদেরও ধরা হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এ ব্যাপারে কাজ করছে।’ তিনি বলেন, আমরা এই সব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বন্ধে ও যে কোন ধরনের নাশকতার ঘটনা প্রতিহত করার জন্য গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়িয়েছি। এ জন্য আমাদের দেশের যত গোয়েন্দা সংস্থা আছে তারা সবাই প্রতিদিন বৈঠকে বসছে। তাদের যে যে সংস্থার কাছে তথ্য রয়েছে ওই সব তথ্য তারা আদান প্রদান করছে। এই ব্যাপারে তারা সমন্বয়ও করছে। মন্ত্রী বলেন, এই বৈঠক সম্প্রতি শুরু হয়েছে। আর এই বৈঠকের সমন্বয় করছে এনএসআই। তাদের নেতৃত্বে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাবৃন্দ ও পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তাবৃন্দ। (সূত্র: দৈনিক সংগ্রাম ২৬ মে ২০১৬)

এর আগে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বেআইনি কাজের প্রশংসা করে বক্তব্য দিয়েছিলেন। (সূত্র: দৈনিক আমার দেশ ৮ মার্চ ২০১৩)

নিরপরাধ মেধাবী ছাত্রদের হত্যা করে সরকার ও পুলিশ দেশে বর্বরতার নিকৃষ্ট নজির স্থাপন করেছে। বিগত কয়েক দিনে ঝিনাইদহে সরকার ও পুলিশের টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছে নিরপরাধ অনেক মেধাবী ছাত্র। তাদেরকে গ্রেফতারের পর অস্বীকার ও নির্যাতনের পর রাতের আঁধারে গুলী চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশের নৃশংসতা এখানেই থেমে থাকেনি। একই সাথে চলেছে স্বীকারোক্তির সাজানো নাটক ও মিথ্যাচার। 

৫ জুন ২০১৬ চট্টগ্রামে পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রীকে হত্যার পর দুই সপ্তাহে ঢাকা, রাজশাহী, বগুড়া, গাইবান্ধা ও মাদারীপুরে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় সাতজন সন্দেহভাজন জঙ্গি। সব কটি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে প্রায় একই রকম কথা বলা হয়েছে।

এর মধ্যে একমাত্র মাদারীপুরে কলেজ শিক্ষক রিপন চক্রবর্তীকে কুপিয়ে পালানোর সময় জনতার হাতে ধরা পড়েন ফয়জুল্লাহ ফাহিম (১৯)। তিনি চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। মাদারীপুরের পুলিশ সুপারের ভাষ্য, ফাহিম হিযবুত্ তাহ্রীরের সদস্য বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন। আর প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ফাহিম শিবিরের সদস্য।

হাতেনাতে কোনো সন্দেহভাজন জঙ্গির ধরা পড়ার এটি দ্বিতীয় ঘটনা। এর আগে ২০১৫ সালের ৩০ মার্চ রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমানকে হত্যার পর পালানোর সময় দুই হামলাকারীকে ধরে ফেলেন এক হিজড়া। ২০১৫ সালেই ওয়াশিকুর হত্যা মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে।

হাতেনাতে ধরা পড়া ফাহিমকে হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে বিকেলেই মাদারীপুরের আদালতে নেওয়া হয়েছিল। পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত তাঁর ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পুলিশ ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার পর প্রথম দিন ১৮ জুন ২০১৬ ভোরে মাদারীপুরের মিয়ারচর গ্রামে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। এর মধ্য দিয়ে তাঁর কাছ থেকে আরও তথ্য পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেল কি না, সে প্রশ্ন ব্যাপকভাবে উঠেছে। 

প্রথমদিকে পুলিশ কর্মকর্তারা বিষয়টি সাংবাদিকদের কাছে খোলাসা করেননি। সাংবাদিকদের হাজারও চেষ্টা এবং অনুরোধ সত্ত্বেও সবাই ‘স্পিকটি নট’। শেষমেশ পুলিশ সুপার দুপুর ২টার দিকে সবার হাতে একটা প্রেস রিলিজ ধরিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন। মাদারীপুরের পুলিশ সুপার সারওয়ার হোসেন বলেছেন, ঘটনার দিন সকাল সাতটার দিকে ২০ সদস্যের পুলিশ দল ফয়জুল্লাহকে নিয়ে সদর থানার মিয়ারচর এলাকায় অভিযানে যায়। সেখানে আগে থেকে অবস্থান করা ফয়জুল্লাহর সহযোগীরা পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে গুলী ছোড়ে। পুলিশের গাড়িতে গুলী লাগে, এক পুলিশ সদস্যও আহত হন। এ সময় ফয়জুল্লাহ গুলীবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র ও গুলী উদ্ধার করা হয়েছে।

এরপর আবার লাশ হস্তান্তর নিয়ে পদে পদে নাটকীয়তা, লাশ নিতে আসা ফাহিমের আত্মীয় বা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে সাংবাদিকদের কথা বলতে বাধা দেয়া; এসব ঘটনা অনেক প্রশ্নে জন্ম দিয়েছে। এমনকি মিয়ারচরের যে স্থানকে পুলিশ বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাস্থল হিসেবে দাবি করেছে, ওই স্থানের লোকজন সাংবাদিকদের জানিয়েছে, ওইদিন ওই সময় তারা কোনো গোলাগুলীর শব্দ শোনেনি। (সূত্র: দৈনিক যুগান্তর ১৯ জুন ২০১৬)

পরে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ট্রলির ওপর ফেলে রাখা হয়েছে ফয়জুল্লাহর দেহ। হাতে হাতকড়া। পরনে স্যান্ডো গেঞ্জি আর জিনস। বুকের বাঁ পাশে কালচে রক্তে ঢাকা বুলেটের ছিদ্র। অভিযানে নেওয়ার সময় বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরানো থাকলে শরীরের এ অংশটি সুরক্ষিত থাকার কথা। ২০১৬ সালের জুন মাসের ১৮ তারিখ পর্যন্ত এ নিয়ে ছয় সন্দেহভাজন জঙ্গি কথিত বন্দুকযুদ্ধে বা গুলীতে নিহত হলো। ৬ জুন রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে জামাল উদ্দিন, ৭ জুন রাজধানীর কালশীতে তারেক হোসেন মিলু ওরফে ইলিয়াস ও সুলতান মাহমুদ ওরফে রানা, ৭ জুন বগুড়ায় মিজানুর রহমান ওরফে কাউসার গুলীবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। পুলিশের দাবি, জামালউদ্দীন ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বাগমারার শিয়া মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায়, ইলিয়াস রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যা, সুলতান মাহমুদ বাগমারা শিয়া মসজিদে গুলীর ঘটনা এবং মিজানুর ২০১৫ সালে নভেম্বরে বগুড়ার শিয়া মসজিদে হামলায় অংশ নিয়েছিলেন। এ ছাড়া ৮ জুন গাইবান্ধায় একইভাবে নিহত জেএমবি সদস্যের পরিচয় জানা যায়নি।

এর আগে ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে প্রিজন ভ্যান থেকে জেএমবি’র মজলিসে শুরা সদস্য সালাহউদ্দিন ওরফে সালেহীন (৩৮), হাফেজ মাহমুদ ওরফে রাকিব হাসান (৩৫) ও জাহিদুল ইসলাম ওরফে মিজান ওরফে বোমা মিজানকে (৩৫) ছিনিয়ে নিয়ে যায় সহযোগীরা। পালানোর কয়েক ঘণ্টা পরেই পুলিশের হাতে ধরা পড়েন অন্যতম জঙ্গিনেতা হাফেজ মাহমুদ। ধরা পড়ার ১৪ ঘণ্টা পরেই পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন তিনি। এ ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়া দুই জঙ্গির আর কোনো খোঁজ মেলেনি। 

 সবগুলো মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। মানবাধিকারকর্মী, জঙ্গি-বিষয়ক বিশ্লেষক, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শকেরা জঙ্গি দমনে পুলিশের সদিচ্ছা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলছেন, হত্যার পরিকল্পনাকারীদের খুঁজে বের করতে ফয়জুল্লাহ গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারত। ‘টার্গেট কিলিং’য়ের সঙ্গে জড়িত কোনো হিযবুত সদস্যের ধরা পড়ার ঘটনা এটাই প্রথম। বড় কোনো ঘটনাকে আড়াল করতে তাঁকে ‘হত্যা’ করা হলো কি না, সেটাও দেখার বিষয়। জনতা যাঁকে ধরে পুলিশের হাতে দিল, তাঁর কাছে তথ্য সংগ্রহের আগেই ‘মেরে ফেলাটা’ পুলিশের বড় ব্যর্থতা।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেছেন, এভাবে জঙ্গিবিরোধী অভিযানের সময় এ রকম হত্যার অর্থ হচ্ছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতরেই হয়তোবা জঙ্গিদের চর লুকিয়ে আছে বা জঙ্গিবাদকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে এমন কেউ রয়েছেন। যাঁরা চাইছেন না ওই ছেলের কাছ থেকে সব তথ্য বের হয়ে আসুক। কারণ, এ রকম তথ্য বেরিয়ে এলে তাঁদের মুখোশ উন্মোচন হতে পারে।

মিজানুর রহমান বলেন, ‘রাষ্ট্রের হেফাজতে যখন আসামি থাকে, তখন সকল দায় রাষ্ট্রের। একজন শিক্ষককে হত্যা করতে গিয়ে সে ধরা পড়ল। পরে পুলিশও বলেছে, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এরপর রিমান্ডে থাকা অবস্থায় কীভাবে এটা হলো, তা সাধারণ বুদ্ধিতে আমাদের মাথায় ধরে না।’

মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল মনে করেন, রাষ্ট্র কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। ১৮ জুন ২০১৬ রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সুশাসনের অভাব থাকলে পদে পদে মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘটতে থাকে।

‘আদালতে নেওয়ার সময় বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে নেওয়া হয়। অপারেশনে যাওয়ার সময় কেন পরানো হয় না?’ দৈনিক প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণের সংবাদের নিচে এ প্রশ্নটি রেখেছিলেন পাঠক মোঃ জাকির হোসেন। ওই সংবাদটির নিচে যারাই মন্তব্য করেছিলেন, এর মধ্যে ৮০ জনই পুলিশ হেফাজতে ফয়জুল্লাহর নিহত হওয়ার ঘটনার সমালোচনা করেছেন। সোলায়মান নামে আরেক পাঠকের প্রশ্ন, ঘটনা আড়াল করতেই তাঁকে মারা হয়েছে কি? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেছেন, যেখানে ফয়জুল্লাহকে দিয়ে অনেক তথ্য উদ্ঘাটন সম্ভব হতো, সেখানে তাঁকে ক্রসফায়ারে দেওয়াটা বিশেষ কোনো মহলের সংশ্লিষ্টতা সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ করে। 

রিজওয়ান আহমেদ নামে আরেকজনের মন্তব্য, ‘পুলিশের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা বলব এটাকে। এত দিন এত খুন হয়ে গেল, একজনকে ধরতে পারেনি পুলিশ। আর মানুষ যখন একজনকে ধরে দিল, তখন তার কাছ থেকেও তথ্য বের করতে পারেনি। বরং তথ্য বের হওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হলো।’ (সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো ১৯ জুন ২০১৬)

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মুহাঃ নূরুল হুদা বলেছেন, ‘ফয়জুল্লাহ একটা গুরুত্বপূর্ণ সূত্র ছিল। তার এভাবে মৃত্যু নিয়ে তো কথা উঠতেই পারে। যেহেতু সে ঘটনায় সরাসরি অংশ নিয়ে ধরা পড়েছে, তাই ঘটনা উদ্ঘাটনের জন্য, মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণের জন্য সে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমার তো মনে হয়, তাকে বাঁচিয়ে রাখাটাই জরুরি ছিল। ওই আসামির নিরাপত্তার বিষয়ে পুলিশের যথেষ্ট সতর্কতা নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এটা তো বলাই যায়, তাকে যেভাবে নিরাপত্তা দিয়ে রাখা উচিত ছিল সেভাবে রাখা হয়নি। সব মিলিয়ে এটা কোনো ইতিবাচক ঘটনা নয়।’

জঙ্গি-বিষয়ক বিশ্লেষক এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) নূর খান বলেছেন, বড় কোনো ঘটনাকে আড়াল করার জন্য এ ঘটানো হলো কি না, এ ধরনের প্রশ্ন জনগণের মধ্যে আসতে পারে। কারণ, পুলিশ বলছে, ছেলেটি হিযবুত তাহ্রীরের সদস্য ছিল। শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্বে কোথাও হিযবুতের সদস্যদের এ রকম টার্গেট কিলিংয়ে অংশ নেওয়ার কথা শোনা যায়নি। এখন এই জঙ্গিদের পরিকল্পনা, অর্থায়নসহ বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িতদের চিহ্নিত করতে পুলিশকে আরও সহনশীল হওয়া উচিত ছিল। 

আসিফ নজরুল লিখেছেন, (কেন মারা গেল ফয়জুল্লাহ?) ‘...পুলিশের হাতে বন্দী অবস্থায় সন্দেহভাজন জঙ্গি ফয়জুল্লাহ ফাহিম নিহত হয়েছেন। আমাদের সহ্যক্ষমতা অসাধারণ। অথবা আমরা মূলত পলায়নবাদী। এ সমাজে বহু অন্যায়, অনাচার আর অত্যাচার আমরা তাই মেনে নিই। কখনো নানা অজুহাতে, কখনো ভুল ধারণা থেকে, কখনো স্রেফ চোখ বন্ধ রেখে। তবু কিছু ঘটনা আমাদের বদ্ধ বিবেক আর ভোঁতা চিন্তাশক্তিতে কশাঘাত করে। পুলিশের হাতে বন্দী অবস্থায় সন্দেহভাজন জঙ্গি ফয়জুল্লাহ ফাহিম হত্যাকাণ্ড তেমনি একটি ঘটনা।

এই হত্যাকাণ্ডকে বন্দুকযুদ্ধ বলা হচ্ছে। বন্দী মানুষ কখনো যুদ্ধ বা গোলাগুলীতে অংশ নিতে পারে না। কাজেই মূলত এটি হত্যাকাণ্ডই। এই হত্যাকাণ্ডের দায় দেওয়া হচ্ছে রাষ্ট্রকেও। সরকারকে সরাসরি দায়ী না করার জন্যই হয়তো আমাদের কিছু মানবাধিকারকর্মী কয়েক বছর ধরে রাষ্ট্র নামক এক বিমূর্ত সত্তাকে এসব ঘটনার জন্য দায়ী করে চলেছেন। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় রাষ্ট্র মানে সরকার, জনগণ, রাষ্ট্রের ভূমি ও সার্বভৌমত্ব। এই হত্যাকাণ্ডের দায় জনগণের বা রাষ্ট্রের ভূমি বা সার্বভৌমত্বের হতে পারে না। দায়ী করতে হলে তাই সরকারকে করতে হবে, রাষ্ট্রকে নয়।

সরকারের জিম্মায় বন্দী থাকা অবস্থায় শুধু ফয়জুল্লাহ খুন হয়নি। এমন অবস্থায় আগে খুন হয়েছে আরও বহু মানুষ। তারা জঙ্গি হতে পারে, বিএনপি-জামায়াত-শিবির হতে পারে, ঠাণ্ডা মাথার খুনিও হতে পারে। কিন্তু কোনো কিছুই তাদের মানুষ পরিচয়কে আড়াল করতে পারে না। আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আইন সব মানুষের মানবাধিকার রক্ষা করার কথা বলে। জঘন্য খুনিকেও সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে দোষী প্রমাণিত করে উপযুক্ত শাস্তি দিতে বলে। বঙ্গবন্ধুর মতো বাংলাদেশের স্বাধীনতার জনকের নির্মম হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আমরা বিচার করে শাস্তি দিয়েছি। একাত্তরের ঘাতকদেরও আমরা শাস্তি দিয়েছি বিচার করার পর। তাহলে অভিযুক্ত জঙ্গি বা ভিন্নমতাবলম্বী লোকজনদের কেন মেরে ফেলা হচ্ছে কোনো বিচার না করে? কেন তারা প্রাণ হারাচ্ছে, তারা আসলেও দোষী কি না তা নির্ণীত হওয়ার আগেই?

সরকারেরই নিযুক্ত মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেছেন-সম্প্রতি ২৩টি এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের জন্য তিনি তদন্ত চেয়েছেন, তা করা হয়নি। সরকারের হেফাজতে থাকা অবস্থায় হত্যাকাণ্ডের তদন্ত না হলে সরকারই কিছু লুকাতে চাইছে ধরে নেওয়া কি যৌক্তিক নয়? প্রশ্ন হচ্ছে, কী লুকাতে চায় সরকার? এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে বিএনপি, জামায়াত-শিবির বা জঙ্গিরা রয়েছে এটি? নিশ্চয়ই না! তাহলে কী?

ফয়জুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পর এসব প্রশ্ন এখন আরও উচ্চকিত হয়ে উঠেছে। ফয়জুল্লাহ জনতার কাছে হাতেনাতে গ্রেফতার হওয়া একজন আসামি। সে সংখ্যালঘু একজন শিক্ষককে হত্যা করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। সংখ্যালঘুদের ওপর এ ধরনের ক্রমাগত আক্রমণ আমাদের চরমভাবে বিক্ষুব্ধ করেছে।

যেকোনো বিচারে তাই ফয়জুল্লাহ সবচেয়ে স্পর্শকাতর একজন আসামি ছিল। যেকোনো বিবেচনায় তাকে হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে রাখা অত্যাবশ্যকীয় ছিল। বহু অভিযুক্ত ব্যক্তিকে এমনকি কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কর্মীকেও আমরা এ ধরনের সুরক্ষা দিয়ে আদালতে নিতে দেখেছি। ফয়জুল্লাহকে আদালতে নেওয়ার ক্ষেত্রে তা-ই করা হয়েছিল। এর চেয়ে তুলনামূলকভাবে বহু গুণ ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে তাকে নিয়ে সহযোগীদের গ্রেফতার করতে যাওয়া। সেখানে তাকে হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট কেন পরানো হলো না? কেন? [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ