ঢাকা, শনিবার 05 November 2016 ২১ কার্তিক ১৪২৩, ৪ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

দেশজুড়ে ইয়াবার ছোবল

ইয়াবা একটি ঘাতক নেশা। এ নেশায় কাউকে পেলে আর সহজে রেহাই পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়ে। তরুণ-যুবকদের মধ্যে এ নেশাদ্রব্যের প্রভাব মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অনেকে নেশার কবলে চলে গেছেন বলে প্রকাশ। কোনও কোনও শিক্ষকও ইয়াবাতে আসক্ত হয়ে পড়ছেন। অনেক ব্যবসায়ীও ইয়াবার নেশায় মজে ব্যবসা-বাণিজ্য নাকি খুইয়ে বসেছেন। একশ্রেণির ছাত্রীও ইয়াবা ছাড়া চলতে পারেন না বলে জানা গেছে। অনেকে ছাত্রাবাস ও ক্লাস ফেলে ইয়াবার পেছনে ছোটেন। অভিভাবকদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থে না কুলোলে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, রাহাজানি, এমনকি চুরি-ডাকাতিতেও জড়িয়ে পড়ছেন অনেক শিক্ষার্থী ইয়াবার জন্য। এদের মধ্যে কেউ কেউ ইয়াবার ব্যবসাতেও নাকি নিয়োজিত হয়ে পড়েছেন। অথচ এই সর্বনাশা ইয়াবা মানুষের মেধাশক্তি বিনষ্ট করে ফেলে। কোনও কাজে মনোযোগ থাকে না। জীবনীশক্তি ধীরে ধীরে হ্রাস পায়। অনেকে নিজের জীবন সম্পর্কেও হতাশ ও অনাগ্রহী হয়ে পড়েন। বাড়ির কথা মনে থাকে না ইয়াবায় আসক্তদের। এমনকি মা-বাবা, ভাইবোনদেরও নাকি মনে রাখতে পারেন না বিনাশী নেশা ইয়াবা আসক্তরা। এরা ধীরে ধীরে ক্ষুধামন্দায় ভোগেন। শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। শরীরে নানা অসুখ-বিসুখ বাসা বাঁধে। লেখাপড়াসহ সব কাজেই অমনোযোগী হয়ে পড়েন ইয়াবা আসক্তরা। অর্থাৎ ইয়াবার নেশায় যাদের পায় তারা আর মানুষ থাকেন না। সব কাজে তাদের মধ্যে মারাত্মক ঔদাসীন্য দেখা যায়। এভাবেই এই সর্বনাশা ইয়াবা আমাদের সম্ভাবনাময় তরুণসমাজকে ধ্বংসের দিকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের তরুণ ও যুবসমাজ কিভাবে এর কবল থেকে রক্ষা পাবে তা সমাজবিদ ও সচেতন মানুষকে চিন্তিত করে তুলেছে। এই ইয়াবার ছোবল ভয়াবহ আকার ধারণের জন্য সামাজিক অপরাধ ও অবক্ষয়ও দ্রুত বাড়ছে বলে সমাজচিন্তকদের ধারণা।
ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক বলে পরিচিত একটি দৈনিকে গত বৃহস্পতিবার ইয়াবা আগ্রাসনের ভয়াবহ রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৪২টি পাচার পয়েন্ট, মিয়ানমার সীমান্তে ২৩টি পয়েন্ট ও ৩৮টি কারখানা রয়েছে। নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করে বাংলাদেশের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে ইয়াবা। ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে গডফাদাররা। ঢাকা মহানগর পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের বিরামহীন অভিযান সত্ত্বেও থামছে না ইয়াবাবাণিজ্য। কতিপয় প্রভাবশালী গডফাদার ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এরা মহানগরী ঢাকা ও চট্টগ্রামের অভিজাত এলাকায় বাসাভাড়া নিয়ে ইয়াবাসহ আরও কয়েক রকম নেশাদ্রব্যের ব্যবসা পরিচালনা করেন। এই গডফাদারদের মধ্যে অনেকে রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছেন। তাদের চিহ্নিত করা গেলেও পাকড়াও করা মুশকিল হয়ে পড়ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পক্ষে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চপদস্থ অবসরপ্রাপ্তদেরও কেউ কেউ মাদকদ্রব্য ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া পুলিশসহ আরও কয়েকটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়িতে পর্যন্ত ইয়াবার মত মাদকদ্রব্য পরিবহনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সবমিলিয়ে ইয়াবা ব্যবসা জটিল আকার ধারণ করেছে। ইয়াবার মত মারাত্মক মাদক ঢাকা মহানগরী ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরের অলিগলিতে খুব সহজেই পাওয়া যায় বলে পত্রিকার রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। ইয়াবা ছোট ছোট ট্যাবলেট ফর্মে পাওয়া যায় বলে এটি সহজে বহন করা যায়। একজন লোক শার্ট-প্যান্টের পকেটে কয়েক হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট সহজেই বহন করে নিয়ে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম। আর হাত বাড়ালেই মাদক ট্যাবলেট ইয়াবা নাগালের মধ্যে চলে আসে। ফলে মুড়িমুড়কি যেমন মুদির দোকানে পাওয়া যায়, তেমনই ইয়াবা ট্যাবলেট পাওয়া যাচ্ছে সর্বত্র। শুধু এর দামটা বেশি। তাতে কী? নেশাখোরদের কাছে টাকা কোনও ব্যাপার না। তাদের চাই কেবল ট্যাবলেট। ইয়াবা। ফেন্সিডিলের বোতল। শুধু মিয়ানমার সীমান্তেই নয়, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের অসংখ্য জায়গায় ফেন্সিডিল কারখানা স্থাপিত হয়েছে। বসেছে ইয়াবাসহ আরও কয়েক রকমের মাদক বিক্রয় পয়েন্ট। এসব পয়েন্ট থেকে ইয়াবা-ফেন্সিডিলসহ প্রতিদিন মাদক ঢুকছে বাংলাদেশে। ধ্বংস হচ্ছে আমাদের দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ।
এই মাদকের ছোবল থেকে তরুণসমাজকে রক্ষা করতে না পারলে সমাজব্যবস্থা যেমন হুমকিতে পড়বে, তেমনই দেশ হবে মেধাশূন্য। এমনকি কষ্টার্জিত আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব পর্যন্ত হয়ে পড়তে পারে বিপন্ন। তাই যেকোনও মূল্যে রুখতে হবে ইয়াবাসহ সবরকম মাদকের আগ্রাসন। প্রতিহত করতে হবে মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ