ঢাকা, শনিবার 05 November 2016 ২১ কার্তিক ১৪২৩, ৪ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জন বর্ণ ক্রস ফায়ার কোন্ বর্ণ

জিবলু রহমান : [চার]
ফয়জুল্লাহ নিহত হয়েছে বুকে গুলী খেয়ে। এটি প্রমাণ করে তাকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরানো হয়নি। পুলিশ বলেছে সে তার সহযোগীদের গুলীতে নিহত হয়েছে। দুর্ধর্ষ অপরাধীদের সহযোগীদের ধরতে গেলে তারা গুলী করবে, পালানোর চেষ্টা করবে, এটি তো খুবই অনুমেয়। আগেও এটি হয়েছে আমরা শুনেছি। সব জেনে-শুনে তাকে তার জঙ্গি সহযোগীদের ধরতে অরক্ষিত অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার তাই গ্রহণযোগ্য একটিই অর্থ হতে পারে এবং তা হচ্ছে তার মৃত্যুই হয়তো কাম্য ছিল পুলিশের কাছে। এই সন্দেহ সত্যি নয় তা অকাট্যভাবে প্রমাণের দায়দায়িত্ব শুধুই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। তা যদি প্রমাণ না করা যায় তাহলে সংশ্লিষ্ট সব পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ঘটনার জন্য সরকারকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে মানুষের সন্দেহ করার অধিকার রয়েছে যে ফয়জুল্লাহর মৃত্যু কাম্য ছিল সরকারের কোনো না কোনো মহলের কাছেও।
ফয়জুল্লাহ্ হত্যাকাণ্ডের আর একটি মাত্র ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব। তা হচ্ছে, রিমান্ডে থাকা অবস্থায় অত্যাচার-নির্যাতনে তার মৃত্যু ঘটা এবং এই হত্যাকাণ্ডকে আড়াল করার জন্য বন্দুকযুদ্ধ নামক নাটক সাজানো। ফয়জুল্লাহর সত্যিকার পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পেলে বা এই হত্যাকাণ্ডের উপযুক্ত তদন্ত হলে আমরা এ সম্পর্কে জানতে পারব। কিন্তু সাগর-রুনী থেকে নিয়ে সাম্প্রতিক তনু হত্যাকা- পর্যন্ত ঘটনাগুলো দেখার পর আমার মনে হয় না উপযুক্ত তদন্ত হবে-এমন বিশ্বাস আর আছে মানুষের মনে?
আইনের একজন ছাত্র হিসেবে আমার বক্তব্য একটাই। এই হত্যাকাণ্ডের দায় সরকারের কোনো না কোনো মহলের। ফয়জুল্লাহ যদি রিমান্ডে থাকা অবস্থায় নির্যাতনে মারা গিয়ে থাকে বা যদি তাকে পুলিশই গুলী করে থাকে, তাহলে এর দায় সরাসরিভাবে পুলিশ তথা সরকারের। আর যদি সত্যি সে তার সহযোগীদের গুলীতে নিহত হয়ে থাকে, তবু এর দায় সরকারের। আমাদের পেনাল কোড অনুসারে হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে এটি জানা থাকার পর তা ঘটতে দেওয়া অপরাধমূলক নরহত্যার প্ররোচনা হিসেবে কঠোরভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ফয়জুল্লাহর জঙ্গি সহযোগীদের ধরতে গেলে তারা পালানোর জন্য গুলী করতে পারে, এটি অবশ্যই পুলিশের জানার কথা। এটি জানার পরও তাকে অরক্ষিত অবস্থায় সহযোগী ধরার অভিযানে নিয়ে যাওয়া এবং মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া অবশ্যই অপরাধ...।’ (সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো ২১ জুন ২০১৬)
প্রভাষ আমিন লিখেছেন, (ফাহিমের জন্য বেদনা) ‘...নীতিগতভাবে আমি বরাবরই ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে। গত এক দশক ধরে আমি ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে বিরামহীনভাবে লিখছি। কিন্তু ক্রসফায়ার বন্ধ হয়নি। কখনো কমেছে, কখনো বেড়েছে। ক্রসফায়ার কমলে বেড়ে যায় গুম। তাই বিচারবহির্ভূত হত্যার মিছিল খালি লম্বাই হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সবচেয়ে প্রিয় অস্ত্র ক্রসফায়ার। বিরোধী দলে থাকতে আওয়ামী লীগ ক্রসফায়ারের বিপক্ষে সোচ্চার ছিল। ক্রসফায়ারের বর্তমান ফর্মেট যার হাত দিয়ে শুরু সেই বেগম খালেদা জিয়া এখন ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে সোচ্চার। আমি নিশ্চিত, বেগম জিয়া আবার কখনো ক্ষমতায় গেলেই ক্রসফায়ারের প্রেমে পড়ে যাবেন। বিএনপি’র হাত ধরেই ক্রসফায়ারের যাত্রা শুরু, এটা লিখলেই কয়েকজন দাবি করেন, বাংলাদেশে ক্রসফায়ারের প্রথম শিকার সিরাজ শিকদার। যেই আমলেই শুরু হোক, অমুক করেছে বলে আমরাও করব; এ ধরনের কোনো যুক্তি দিয়েই ক্রসফায়ারকে জায়েজ করা যাবে না। ক্রসফায়ার মানে ঠাণ্ডা মাথায় খুন। প্রতিটি ক্রসফায়ারই একেকটি খুন।
কিন্তু ক্রসফায়ার বাংলাদেশে খুব জনপ্রিয় প্রবণতা। শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেত্রী থাকার সময় দলীয় নেতাদের পরামর্শ উপেক্ষা করেই ক্রসফায়ারের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু এখন তার আমলেই ক্রসফায়ার হচ্ছে দেদার। সাধারণ মানুষের আপাত পছন্দকে পুঁজি করেই সবগুলো সরকার দিনের পর দিন ক্রসফায়ার চালাচ্ছে। ক্রসফায়ারের পক্ষের সবগুলো যুক্তি আমি জানি। এসব সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের বিচার করা সহজ নয়। গ্রেফতারের কিছুদিন পরই তারা জামিন পেয়ে হাওয়া হয়ে যায়। জামিন না পেলেও বিচার চলে বছরের পর বছর। তাদের বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ সাক্ষী দিতে চায় না। তাই তাদের অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে যায়। তাই স্বাভাবিক বিচার প্রক্রিয়ায় তাদের সাজা দেওয়াই কঠিন, ফাঁসি তো অনেক পরের ব্যাপার। তাই ধরে এনে তাৎক্ষণিকভাবে ক্রসফায়ারে দিয়ে দিলে সাধারণ মানুষ খুশি হয়, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। ক্রসফায়ারের পর মিষ্টি বিতরণ, আনন্দ মিছিলের ঘটনাও ঘটেছে। ক্রসফায়ার সন্ত্রাসীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করে। তাই ক্রসফায়ারে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়, এটা ঠিক।
কিন্তু একটা দেশে দুই ধরনের বিচার ব্যবস্থা থাকতে পারে না। প্রচলিত বিচার ব্যবস্থায় মামলা হবে, তদন্ত হবে, বিচার হবে, আপিল হবে, রিভিউ হবে। আর ক্রসফায়ারের নামে ধরে তাৎক্ষণিকভাবে খুন করে ফেলা হবে, এটা চলতে পারে না, চলা উচিত নয়। বঙ্গবন্ধুর খুনিরা, যুদ্ধাপরাধীরা আইনের সর্বোচ্চ প্রটেকশন পাবে; আর সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের ধরে তাৎক্ষণিকভাবে রায় কার্যকর করে ফেলা হবে, এটা মানা যায় না। প্রতিটি ক্রসফায়ারের পর র‌্যাব বা পুলিশের পক্ষ থেকে একটা প্রেস রিলিজ দেওয়া হয়। সেই প্রেস রিলিজে একই গল্প-আসামিকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারের অভিযানে গেলে সন্ত্রাসীরা গুলী করে। আর তাতে মারা যায় শুধু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে থাকা ব্যক্তিটি। এই গল্পটি যে মিথ্যা, তা সবাই জানেন। প্রতিটি গল্প কিন্তু র‌্যাব-পুলিশের একেকটি অদক্ষতার দলিলও। তাদের গল্প যদি বিশ্বাস করি, তার মানে দাঁড়ায় পুলিশ বা র‌্যাব তাদের হেফাজতে থাকা একজন আসামিকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ। পুলিশ ভয়ঙ্কর কোনো আসামিকে আদালতে নেয় বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট এবং হেলমেট পরিয়ে।
তাহলে অস্ত্র উদ্ধারের সময় কেন সেই ব্যবস্থা থাকে না? পুলিশ বা র‌্যাবের প্রেস রিলিজে নিহত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কয়টি মামলা আছে, সে কত বড় সন্ত্রাসী তা প্রমাণের চেষ্টা থাকে; যেন মামলা বেশি হলেই ক্রসফায়ারটি জায়েজ হয়ে যায়। কিন্তু সেই মামলায় কি আসামির ফাঁসি হতে পারত? আর হলেও সেটা তো আদালত বিবেচনা করবে, পুলিশ বা র‌্যাব নয়। অনেকে কোনো ক্রসফায়ারের সমালোচনা করেন, কোনো ক্রসফায়ারের পক্ষে বলেন। কিন্তুযেটা অপরাধ সেটা সব ক্ষেত্রেই অপরাধ। যতক্ষণ আমাদের ঘাড়ে না আসছে, ততক্ষণ আমরা দূর থেকে সমালোচনা বা প্রশংসা করে সন্তুষ্ট থাকি। আমি বা আমার কোনো স্বজন ক্রসফায়ারের শিকার না হলে আমরা আসলে বুঝব না ক্রসফায়ারের বেদনা। আমি কখনোই মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলায় বিশ্বাসী নই। তারপরও যদি সবাই মনে করেন, ক্রসফায়ারেই সব সমাধান নিহিত, তাহলে সংসদে দুটি আইন পাস করে নিতে হবে, একটি হলো ‘প্রচলিত বিচার ব্যবস্থা বিলুপ্তকরণ বিল’, অপরটি হলো ‘তাৎক্ষণিক বিচার ও রায় কার্যকর বিল’। তখন আর আমরা ক্রসফায়ারকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলব না। মানুষের জীবনের চেয়ে দামি আর কিছু নেই। কারণ বিজ্ঞান সবকিছু দিতে পারলেও মানুষের জীবন দিতে পারে না। এ কারণেই কাউকে ফাঁসি দেওয়ার আগে আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ অনেক কিছু বিবেচনা করেন। ফাঁসি কার্যকরের আগে আইনের অনেকগুলো ধাপ পেরুতে হয়। এমনকি সব ধাপ শেষ হলেও রাষ্ট্রপতি চাইলে যে কাউকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। কিন্তু ক্রসফায়ারে কোনো ক্ষমা নেই। ধর আর মার। বিচারের ধারণাটাই হলো প্রয়োজনে দোষী ছাড়া পাক, কিন্তু একজন নির্দোষ মানুষও যেন সাজা না পায়। কিন্তু ক্রসফায়ারে তো বিচারই নেই, বিচারের ধারণা আসবে কোত্থেকে...। (সূত্র: দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ২১ জুন ২০১৬)
১৯ জুন ২০১৬ ভোরে ঢাকার খিলগাঁওয়ে গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে একই রকম বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন শরিফুল ওরফে সাকিব, যাকে ধরতে গত ১৯ মে পুরস্কার ঘোষণা করে পুলিশ গণমাধ্যমে তার ছবি প্রকাশ করে। পুলিশ দাবি করছে, নিহত শরিফ লেখক অভিজিৎ রায়সহ অন্তত সাতটি হত্যা ও হামলার ঘটনায় জড়িত। তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সামরিক ও আইটি শাখার প্রধান ছিলেন।
ডিবি’র উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেছেন, সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া পুরস্কার ঘোষিত জঙ্গি সুমন হোসেন পাটোয়ারীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। এর অংশ হিসেবে ভোররাতে খিলগাঁও এলাকায় অভিযানে যায় ডিবি। এ সময় সন্দেহভাজন তিন যুবকের সঙ্গে ডিবির গুলীবিনিময় হয়। এতে একজন নিহত হন। তবে নিহতের স্বজনেরা জানিয়েছে, তার নাম শরিফুল ওরফে হাদি নয়। সে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র মুকুল রানা। তার জাতীয় পরিচয়পত্রেও মুকুল রানা নাম উল্লেখ আছে।  [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ