ঢাকা, শনিবার 05 November 2016 ২১ কার্তিক ১৪২৩, ৪ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কারসাজিতে বাড়ছে চালের দাম

আল আমিন : মাছে ভাতে বাঙালি- নদীমাতৃক বাংলাদেশ এর চিরাচরিত প্রবাদ। আবহমান কাল থেকে এ দেশে প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় আছে ভাত। তাই চালের দাম বাড়লে এর প্রভাব পড়ে সর্বত্র। বিশেষ করে দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবৃত্ত ও মধ্যবৃত্ত সমাজের মানুষের জীবনমানের উপর এর প্রভাবটা পড়ে বেশী। আর আমদানি কমে যাওয়া, বাড়তি দামে ধান কেনা ও ব্যবসায়ী  সিন্ডিকেটের কারণে চালের দাম বাড়ছেই বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। পাইকারি চাল ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চালকল মালিকরা কয়েক দফায় পণ্যটির দাম বাড়িয়েছেন। তারা বলছেন, অটোরাইস মিলারদের কাছে এখনো বিপুল পরিমাণ ধান-চাল মজুত রয়েছে। ব্যাংক ঋণ নিয়ে বিপুল পরিমাণ ধান-চাল গুদামজাত করে রেখেছেন তারা। চালের বাজারে দর বৃদ্ধি বা পতন মূলত তাদের ওপরই নির্ভর করছে। ফলে মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করলে কিছুটা হলেও চালের দাম কমত বলে আশাবাদ সাধারণ ক্রেতাদের।
কয়েক বছরের তুলনায় এখন সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে মোটা চাল। মোটা চালের দাম প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৪২ টাকায় দাঁড়িয়েছে। রমজান মাসের পর থেকেই দফায় দফায় দাম বাড়ছে। এতে প্রতি কেজিতে প্রায় ১০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। দুই মাস আগে প্রতি কেজি গুটি ও স্বর্ণা জাতের মোটা চালের দাম ছিল ২৮ থেকে ৩০ টাকা। শুধু মোটা চাল নয়, নাজিরশাইল ও মিনিকেটের মতো সরু ও মাঝারি মানের চালের দামও বেড়েছে কেজিতে চার-পাঁচ টাকা। প্রতি কেজি মাঝারি মানের পারিজা, বিআর-২৮ ও লতা চাল ৪০ থেকে ৪২ টাকা এবং সরু চাল মিনিকেট ৪৮ থেকে ৫২ টাকা ও নাজিরশাইল ৫২ থেকে ৫৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) সূত্রে জানা গেছে, এক বছরের ব্যবধানে সরু চালের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি প্রায় ১২ শতাংশ। অন্যদিকে মোটা চালের দাম ১৪ শতাংশ বেড়েছে। মাঝারি ও সাধারণ মানের চালের দাম এক মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ৫-৬ শতাংশ। রাজধানীর পাইকারি বাজারে এক মাসের ব্যবধানে চালের দামের উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন নেই বলে টিসিবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওই প্রতিবেদনে একই সময়ের ব্যবধানে মোটা চালের দাম ৫ দশমিক ৮০ শতাংশ বেড়েছে বলে জানানো হয়েছে।
২০১৫ সালের শেষ দিকে আমদানিতে শুল্কারোপের ঘোষণার পর থেকেই বাজারে মোটা চালের সরবরাহ সংকট দেখা  দেয়।  ওই সময় দেশের বাজারে পণ্যটির দাম হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। চলতি আমন উত্তোলন মৌসুমে সরকারি চাল সংগ্রহ শুরু হলে ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে কৃষক পর্যায়ে তেমন একটা দাম ওঠেনি চালের। তবে সংগ্রহ কর্মসূচি শেষ হয়ে যাওয়ার পর মজুদপ্রবণতার মাধ্যমে দেশের বাজারে চালের দাম ফের বাড়ানোর চেষ্টা চলছে বলে খুচরা ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন।
কারওয়ান বাজার চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রিয় রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী লোকমান হোসেন বলেন, মোটা চালের দাম বাড়াতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে মিল মালিকরা। তারা কম দামে ধান মজুত করে এখন বেশি দামে বিক্রি করছে। ফলে বাজারে মোটা চালের সংকট তৈরি হয়েছে।
কয়েকজন ব্যবসায়ীর মতে, গত বছরের তুলনায় এবার চালের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়াও দাম বাড়ার একটি কারণ। এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলে বন্যার কারণে চালের উৎপাদন কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে বলেও দাবি করেন কেউ কেউ। ব্যবসায়ীরা জানান, এবার বন্যার কারণে অপেক্ষাকৃত নিম্নাঞ্চলে থাকা কিছু চাতাল মাসখানেকের জন্য বন্ধ থাকায় দামের ওপর প্রভাব পড়েছে বলেও মনে করেন তারা। তবে প্রতিদিনকার এই প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাজার তদারকির ওপর জোর দিলেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, ধানের বাজার বাড়তি, অতি বৃষ্টি, আমদানি চালের ওপর ভ্যাটসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা চালের দাম বাড়িয়েছে। এছাড়া দাম বাড়ার মূল কারণ হলো- মিল মালিকরা চাল স্টক করছেন। মিল মালিকরা স্টক করা বন্ধ করলে চালের দাম এমনিতেই কমে যাবে বলে তারা মন্তব্য করেন।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে চালের দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এ কার্তিকে দেশে আমনের নতুন ধান উঠবে। এ অবস্থায় মিলাররা অতিরিক্ত মুনাফার লোভে দাম বাড়িয়েছেন। আগে মোকাম মালিকরা চাল সরবরাহের পর পাইকারি ব্যবসায়ীরা সুবিধামতো দামে বিক্রি করতো। কিন্তু সমপ্রতি মিল মালিকরা মূল্য নির্ধারণ করে দিচ্ছেন। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কমে বিক্রি করলে তার দায় ব্যবসায়ীদের নিতে হচ্ছে। মিল মালিকরা প্রতিদিনই চালের দাম বাড়াচ্ছেন বলেও জানান পাইকারি ব্যবসায়ীরা। তবে চালের দাম বাড়ার সুফল কৃষকরা পাচ্ছেন না। কারণ মৌসুমের শুরুতেই মিল মালিকদের কব্জায় চলে যায় অধিকাংশ ধান।
হিলি বন্দর দিয়ে আমদানি কমায় বেড়েছে চালের দাম: অতিরিক্ত শুল্কারোপ করায় হিলি বন্দর দিয়ে কমেছে ভারত থেকে চাল আমদানির পরিমাণ। এর প্রভাব পড়েছে বাজারে। বেড়েছে চালের দাম। বাংলাদেশে ভারতের চালের চাহিদা না থাকা এবং অতিরিক্ত শুল্কারোপ করায় আমদানিকারকরা ভারত থেকে চাল আমদানিতে উৎসাহ পাচ্ছেন না। ফলে বর্তমানে এ বন্দর দিয়ে চালের আমদানি প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে।
বাংলাহিলি কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এ বন্দর দিয়ে প্রতিদিন ৪৫/৫০ ট্রাক চাল আমদানি হতো। আর গেল ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এ আমদানির পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চালের আমদানি পর্যায়ে সরকার দু’দফায় শুল্কারোপ করার ফলে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে চালের আমদানি কমেছে।
জানা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরের জুনে চালের আমদানি পর্যায়ে ১০ শতাংশ এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরের ডিসেম্বরে আমদানি পর্যায়ে আরও ১০ শতাংশ শুল্ক বাড়ায় সরকার। ফলে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে চালের আমদানি একেবারে কমে যায়।
বাংলাহিলি বাজারের পাইকারি চাল বিক্রেতা অনুপ কুমার বসাক জানান, অতিরিক্ত শুল্কারোপের কারণে আমদানি কমেছে। ফলে বাজারে দেশি জাতের চালের চাহিদা বাড়ায় চালের দাম কিছুটা বেড়েছে।
১০ টাকা কেজি চাল নিয়ে তেলেসমাতি: হতদরিদ্রদের জন্য সরকারের খাদ্যসহায়তা কর্মসূচির অধীনে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণে বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। চালপ্রাপ্তির জন্য তালিকা তৈরিতে আশ্রয় নেয়া হয়েছে নানা জালিয়াতি ও স্বেচ্ছাচারিতার। ধনী, সচ্ছল ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দেয়া হয়েছে চালপ্রাপ্তির কার্ড। যে কারণে প্রকৃত গরিবরা হয়েছেন বঞ্চিত। আর ডিলারশিপ দেয়া হয়েছে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের। অনেক ডিলার নামমাত্র চাল বিতরণ করে বাকিগুলো কালোবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন। এমনকি কার্ড পেয়েও অনেকে চাল না পেয়ে বিফল মনে ফিরে আসছেন। এলাকার চেয়ারম্যান-মেম্বাররা ১০ টাকা দরে চাল বিক্রির এই হতাশাজনক অবস্থার কথা স্বীকার করেছেন। এ কর্মসূচির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কিছু পদক্ষেপ নিলেও ব্যাপক অনিয়ম বন্ধে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছেন না। চাল নিয়ে নানা তেলেসমাতি চলছেই। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত খবরে দেখা যাচ্ছে যে, ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিতরণের জন্য যে তালিকা করা হয়েছে তাতে বেশির ভাগই জায়গা করে নিয়েছে সরকার দলীয় নেতা-কর্মী, জনপ্রতিনিধিদের আত্মীয়-স্বজন, স্বচ্ছল, কর্মক্ষম ব্যক্তি, এমনকি সরকারী চাকরিজীবীরাও। তালিকায় এমন অনেক নাম রয়েছে যাদের বাস্তবে কোন অস্তিত্বই নেই। সেই সব নামের চাল তুলে নিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বার ও সরকার দলীয় নেতা-কর্মীরা ভাগ-বাটোয়ারা করে লুটেপুটে খাচ্ছে। আর প্রকৃত গরীব লোকেরা তাদের নাম তালিকাভূক্ত করার জন্য ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বার ও আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের পেছনে পেছনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তারা হালে পানি পাচ্ছে না। চাল পাইয়ে দেয়ার নাম করে বহু লোকদের কাছ থেকে চাঁদা ও ঘুষ নেয়া হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ