ঢাকা, শনিবার 05 November 2016 ২১ কার্তিক ১৪২৩, ৪ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খুলনার কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদাম থেকে সরকারি চাল পাচারের ঘটনায় বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য

খুলনা অফিস : খুলনার  বৈকালী এলাকায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় খাদ্য গুদাম (সিএসডি) থেকে সরকারি চাল পাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। পাচারযজ্ঞের সঙ্গে এ প্রতিষ্ঠানের প্রধানসহ অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। মূলত সিএসডি গোডাউনের এ সব অসাধু কর্মকর্তা, ডিলার এবং গুদাম হ্যান্ডলিং শ্রমিক নেতাদের যোগসাজশে ১০ সদস্যের একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এ কর্মকা- করছে। ডিলারদের ট্রাক থেকে জোর করে চাল নামিয়ে রাখা, কিছু ডিলারের কাছ থেকে কালোবাজারে চাল কেনা, সেই চাল সরকারি গুদামেই সংরক্ষণ এবং সরকারি চাল ক্রয় কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ হয় এই সিন্ডিকেটের ইশারাতেই। র‌্যাবের হাতে শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক গ্রেফতার এবং র‌্যাবের তদন্তে এই বিষয়গুলো বেরিয়ে এসেছে। এদিকে খাদ্যগুদাম থেকে চাল চুরির ঘটনায় গঠিত পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি করেছে খাদ্য বিভাগ। কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদামের ম্যানেজার এবং ১৮, ২৬ ও ৩২ গুদামের ইনচার্জকে শোকজ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সিএসডি’র কর্মকর্তাদের অর্থ না দিলে গোডাউন থেকে চাল উত্তোলনে ডিলারদের হয়রানির শিকার হতে হয়। লভ্যাংশের ভাগ দিতে হয় জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের। এমনকি সরেজমিনে গেলে পরিদর্শকদেরও একটি নির্দিষ্ট অর্থ দিতে হয়। ফলে ডিলাররাও খোলাবাজারের চাল কালোবাজারে বিক্রির উৎসাহ পায়। এছাড়া হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নাসির সরদার ও সাধারণ সম্পাদক আলী আসগর সরদারের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা শক্তিশালী সিন্ডিকেট পুরো সিএসডি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। এই চক্রটির বিরুদ্ধে এলাকায় মাদক ও জুয়ার ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। নাসির সরদার নিহত শ্রমিক নেতা নাজেম সরদারের ছেলে।
 খুলনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দপ্তর সূত্র জানায়, ডিও লেটার নিতে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের একাধিক বিভাগে ডিলারদের অর্থ দিতে হয়। এর মধ্যে ইউনিয়ন, লেবার বকশিশ, মসজিদ ফান্ড, ব্রীজ স্কেল ও ট্রাক ইউনিয়নের চাঁদা বাবদ এক হাজার টাকা, এছাড়াও চাহিদাপত্র দেয়া, ডেলিভারি অর্ডার এবং নগর খাদ্য পরিদর্শক বাবদ পাঁচশ’ টাকা করে দিতে হয়। এ সব দপ্তরে টাকা দিতে না পারলে ডিলারদের চাল দিতে গড়িমসি করা হয়।
তবে এ সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফরহাদ খোন্দকার। তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযোগ কেউ করেননি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ডিলার জানান, প্রতি দুই টন চাল বিক্রি করে একজন ডিলারের লাভ হয় তিন হাজার টাকা। এর মধ্যে লেবার থেকে শুরু করে কর্মকর্তা পর্যন্ত কমিশন এবং ট্রাক সেলে ব্যয় হয়। খাদ্য বিভাগের ওএমএস ডিলার সমিতির মাধ্যমে এ সব টাকা ডিলারদের কাছ থেকে উত্তোলন করে সমভাবে টাকা ভাগ করে দেন বলে সূত্র জানিয়েছে। টাকা কমবেশি অনেককেই দিতে হয় বলে স্বীকার করেছেন ডিলার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেন।
র‌্যাব-৬’র স্পেশাল কোম্পানি কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. এনায়েত হোসেন মান্নান জানান, সিএসডি গোডাউনের অসাধু কর্মকর্তা এবং গুদাম হ্যান্ডলিং শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে যোগসাজশে স্থানীয় একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে চাল পাচার করে আসছে। তারা গুদামে খাওয়ার অনুপযোগী, নিম্নমান এবং পচা চাল রেখে ভাল চাল উচ্চমূল্যে বিক্রির উদ্দেশ্যে পাচার করে থাকে। চাল পাচারের ঘটনায় গোডাউন ম্যানেজার ও দু’গুদাম ইনচার্জসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
র‌্যাব ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গুদাম থেকে চাল চুরি করে পাচারের সঙ্গে খোদ গোডাউন ম্যানেজার মাহবুবুর রহমান খানসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত। এর মধ্যে ২৬ নম্বর গোডাউন ইনচার্জ ইলিয়াস হোসেন এবং ১৭ নম্বর গোডাউন ইনচার্জ নূর নবীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে র‌্যাব। এছাড়াও এ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে খলিল মোল্লাসহ কয়েকজন ডিলার ও চাল ব্যবসায়ী এবং গুদাম হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নাসির উদ্দিন সরদার, সাধারণ সম্পাদক আলী আসগর সরদার এবং মোস্তফা কামাল ভুট্টসহ বেশ কয়েকজন শ্রমিক নেতা জড়িত রয়েছে।
গ্রেফতার চাল ব্যবসায়ী খলিল মোল্লা র‌্যাবের কাছে স্বীকার করেন, ৬ লাখ টাকা মূল্যের চাল তার কাছে ৪ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নাসির উদ্দিন সরদার, সাধারণ সম্পাদক আলী আসগর সরদার ও মোস্তফা কামাল ভুট্ট তার কাছ থেকে দুই লাখ টাকা অগ্রীম নিয়ে ট্রাকে (সাতক্ষীরা-ট-১১-০০২০) চাল তুলে দেন। বাকি টাকা নেয়ার জন্য মোস্তফা কামাল ভুট্ট তার সঙ্গে মোটরসাইকেলে ট্রাকের পেছনে যাচ্ছিলেন। এরা দীর্ঘদিন ধরে এভাবে চাল পাচার করে সেসহ অন্যান্য ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে আসছে বলেও জানান তিনি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খালিশপুর থানার এস আই কানাই লাল মজুমদার জানান, গ্রেফতারকৃত দুই আসামীকে বৃহস্পতিবার আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রোববার আদালতে রিমান্ডের আবেদন জানানো হবে। রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে চাল পাচার সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যদের সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি।
সিএসডির শ্রমিক, কর্মকর্তা ও র‌্যাব থেকে জানা গেছে, সিএসডি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নাসির সরদার এবং সাধারণ সম্পাদক আলী আজগর সরদার গুদামের ভেতরে চোরাই চালের ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করেন। তার সঙ্গে রয়েছেন ইউনিয়নের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম মোস্তফা ভুট্টো। এর মধ্যে ভুট্টো সম্পর্কে নাসির সরদারের ফুপা হন। তাদের তিন জনের বিরুদ্ধেই মামলা করেছে র‌্যাব। র‌্যাবের হাতে আজগর সরদার গ্রেফতারের পর বাকি দুইজন পলাতক রয়েছেন।
র‌্যাবের  গোয়েন্দা শাখা থেকে জানা গেছে, নগরীতে প্রতিদিন ওএমএস কর্মসূচির জন্য খাদ্যগুদাম থেকে ৪০ জন ডিলারকে ৮০ টন করে চাল দেয়া হয়। প্রত্যেক ডিলার ৪০ বস্তা করে চাল পান। ডিলাররা গুদাম থেকে চাল উত্তোলনের সময় বেশকিছু বস্তা চাল বিক্রি করে দেন নাসির ও আজগর সরদারের কাছে। শ্রমিক নেতারা গুদামের ভেতরেই এই চাল মজুদ করেন। পরে সুবিধামতো সময়ে ট্রাকে করে চাল বের করে নেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শ্রমিকরা জানান, খুলনার প্রতিদিন ৮০ টন চাল দরিদ্রের মাঝে বিক্রির জন্য নেয়া হয়। এছাড়া ভিজিএফ, অতিদরিদ্রদের জন্য ১০ টাকার চাল কর্মসূচিসহ সরকারের নেয়া বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচির চাল বিক্রি হয়ে যাচ্ছে কালোবাজারে। বিষয়টি অনেক কর্মকর্তাই জানেন। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা সরকারি দলের নেতা হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নিতে দেখা যায় না। এই চক্রের বিরুদ্ধেও র‌্যাবের অভিযান জোরদার করার দাবি তাদের।
এ ব্যাপারে র‌্যাব-৬ এর কোম্পানি কমান্ডার  মো. এনায়েত হোসেন মান্নান জানান, চোরাই চাল কিনে গুদামে রাখার বিষয়টি খাদ্য কর্মকর্তারা জানেন। কিন্তু শ্রমিক নেতাদের বাইরে তাদের কিছু করার থাকে না। এজন্য তিন গুদাম সংরক্ষকের বিরুদ্ধেও মামলা করেছে র‌্যাব। গুদামগুলোও সিলগালা করা হয়েছে। এখন খাদ্য কর্মকর্তারা বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখবেন।
খুলনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মাহবুবুর রহমান খান বলেন, গুদাম থেকে চাল চুরির ঘটনায় ঢাকা থেকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিবকে প্রধান করে একটি কমিটি করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফরহাদ খোন্দকারকে প্রধান করে এবং খাদ্য পরিদর্শক গোপাল চন্দ্র দাস ও ইব্রাহিম খলিলকে সদস্য করে পৃথক আরেকটি কমিটি করা হয়েছে। খাদ্য বিভাগ থেকে ম্যানেজারসহ তিন গুদাম ইনচার্জকে শোকজও করা হয়েছে। তদন্তের পর মূল ঘটনা বেরিয়ে আসবে। তিনি বলেন, শোকজের জবাবে তাদের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার রাতে সিএসডি গোডাউন থেকে সরকারি চাল গোপনে পাচার হওয়ার পর তা দৌলতপুর বাজারের কাছে অবস্থান করছে-এমন খবর পেয়ে র‌্যাবের একটি দল অভিযান শুরু করে। দৌলতপুর এলাকায় র‌্যাবের গাড়ি উপস্থিত হলে চাল বোঝাই ওই ট্রাকটি দ্রুত ওই এলাকা থেকে পালিয়ে যায়। পরে তাদেরকে ধাওয়া করে শিরোমণি পুলিশ ক্যাম্প এলাকা থেকে পাচার হওয়া চালসহ ট্রাকটি আটক করা হয়। দুই দিনের অভিযানে র‌্যাব ১৩ হাজার ৭৫০ কেজি চালসহ একটি ট্রাক আটক করে। এ ঘটনায় একজন শ্রমিকনেতাসহ দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়। বুধবার দুপুরে র‌্যাব অভিযান চালিয়ে তিনটি গোডাউন সিলগালা করে দেয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ