ঢাকা, রোববার 06 November 2016 ২২ কার্তিক ১৪২৩, ৫ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নাসিরনগরের ঘটনায় বাড়ি-বাড়ি তল্লাশি ॥ আটক আরো ৩৩

স্টাফ রিপোর্টার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সংবাদদাতা : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু বাড়ি ও মন্দিরে দু’দফায় হামলার ঘটনায় আরো ৩৩ জনকে আটক করা হয়েছে। গত শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে গতকাল শনিবার ভোর পর্যন্ত আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী বাড়ি-বাড়ি অভিযান চালিয়ে ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে তাদের আটক করে। পুলিশ বলছে, তাদের সাড়াঁশি অভিযান অব্যাহত থাকবে। এ নিয়ে এ পর্যন্ত ৪৪ জনকে আটক করা হলো। গতকাল দুপুরে কড়া নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে আটকদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
নাসিরনগরের পুলিশের ওসি মো. আবু জাফর জানান, শুক্রবার দিবাগত রাত ১২ থেকে শনিবার ভোর ৪টা পর্যন্ত নাসিরনগরের বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালায় পুলিশ। মন্দির ভাঙচুর ও বাড়িঘরে হামলার সময় মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ থেকে চেহারা দেখে তাদেরকে আটক করেছে পুলিশ। এরা সবাই ঘটনাস্থলের আসে পাশের বাসিন্দা বলে জানান তিনি।
রামুর পুনরাবৃত্তি : শাহরিয়ার কবির : একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেছেন, রামুর ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে নাসিরনগরে। রামুতে প্রশাসন যতোটা তৎপর ছিল এখানে তেমনটা নেই। ইতিমধ্যে স্বরাষ্টমন্ত্রী বলে দিয়েছেন নাসিরনগরে প্রশাসনের তেমন কোনো গাফিলতি নেই। তাই আমরা প্রশাসনের তদন্তে ভরসা রাখতে পারি না। আমরা এ ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করছি। এদিন বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে গৌর মন্দিরে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। তার নেতৃত্বে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল, সদস্য এরোমা দত্তসহ ২০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল রসরাজের বাড়ি ও ক্ষতিগ্রস্ত মন্দিরগুলো পরিদর্শন করেন।
এ সময় শাহরিয়ার কবির বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য ঘটনার তিনদিন পর এলাকায় এসে যা বলেছেন তাতে ঘটনা আরো বেড়েছে। তার কথায় সংখ্যালঘুরা আশ্বস্ত হতে পারেনি। মানুষ মহাজোট সরকারের আমলে এমন ঘটনা দেখতে চায় না। মানুষ নিরাপত্তা চায়, আশ্বাস চায়। কিন্তু প্রশাসন তাদের সে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি আরো বলেন, রসরাজের বাড়িতে গিয়ে আমরা জানতে পেরেছি সে স্বল্প শিক্ষিত। ফলে রসরাজের ফটোশপে ছবি এডিট করা সম্ভব নয়। তার বাড়িঘর দেখে আমাদের মনে হয়েছে সে সংস্কৃতি মনস্ক মানুষ। সে এমন কাজ করতে পারে না।
পরিদর্শন দলের অন্যতম সদস্য বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, ১৬৪ ধারার জবানবন্দী দেয়ার আগে রসরাজকে যাতে আইনজীবীর সাথে দেখা করার সুযোগ দেয়া হয়। তা করা না হলে হামলাকারীরা উৎসাহিত হবে।
মসজিদে লক্ষী প্রতিমা : নাসিরনগরে এবার মসজিদে লক্ষী প্রতিমা পাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সকালে উপজেলার কুন্ডা ইউনিয়নের বিটুই গ্রামের বিটুই উত্তর পাড়া জামে মসজিদের ভেতর থেকে পুলিশ প্রতিমাটি উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। মসজিদের ইমাম মোঃ শাহাব উদ্দিন জানান, ভোরে ফজর নামাযের আযান দিয়ে মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে দেখেন সেখানে প্রতিমা রাখা। পরে তিনি বিষয়টি পুলিশ ও এলাকাবাসীকে জানান।
নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু জাফর ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, সকালে খবর পেয়ে প্রায় ২ ফুট উচ্চতার মূর্তিটি থানায় নিয়ে আসি। পরিস্থিতি ঘোলাটে করার জন্য কেউ এমন করতে পারে।
কুন্ডা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ ওয়াছ আলী জানান, রাজনৈতিক গ্রুপিংয়ের ফলে ফায়দা লুটার জন্য এমন হয়েছে। ঘটনার পর হিন্দু মুসলমান মিলে সভা হয়েছে। পরবর্তীতে যাতে কেউ এমন ঘটনা না ঘটাতে পারে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। তবে এমন ঘটনা ঘটিয়ে কেউ আমাদের এলাকায় হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের ভাটা আনতে পারবে না।
প্রশাসনে দফায় দফায় বৈঠক : নাসিরনগরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পেশার লোকজনের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করেছে জেলা প্রশাসন। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত বৈঠকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ রুহুল আমিন, পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি শফিকুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক মোঃ রেজওয়ানুর রহমান, পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমানসহ প্রশাসনের উর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানান আলেম সমাজ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জামিয়া ইউনুছিয়া মাদরাসার প্রিন্সিপাল মুফতি মোবারক উল্লাহ, মাওলানা আব্দুর রহিম কাশেমী আল্লামা মনিরুজ্জামান সিরাজী, মাওলানা সাজিদুর রহমান প্রমুখ। এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার ও বিচারের আওতায় আনার আশ্বাস দেন।
প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যান ঘটনাস্থলে : এদিকে, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের বিচারপতি মমতাজ উদ্দিন আহমেদ বিকেলে নাসিরনগরের ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি ভাংচুর কবলিত স্থান মন্দিরগুলো দেখে বিষ্ময় প্রকাশ করেন। এ ধরনের হামলার ঘটনা কারো কাম্য নয় বলেন তিনি। তিনি জানান, তাদের সাথে সারা দেশের মানুষ রয়েছে। এ সময় প্রেস কাউন্সিলের সদস্য আকরাম হোসেন খান, প্রেস কাউন্সিলের সচিব শ্যামল কুমার কর্মকার উপস্থিত ছিলেন।
জেলা আওয়ামী লীগের দ্বন্দ নয় : এদিকে, নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলা আওয়ামী লীগের দ্বন্দের যে কথা নিয়ে সর্বত্র আলোচনা হচ্ছে সেটাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি র. আ. ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। এ দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সার্কিট হাউজে প্রেস কাউন্সিল আয়োজিত সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ কর্মশালার সনদ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে, কেউ এ কথার প্রমাণ করতে পারলে ক্ষমা চেয়ে রাজনীতি ছেড়ে দিবেন বলে ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ঘটনার পর আমরা নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়িয়েছি। এ ঘটনার সাথে দলীয় লোকজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠায় দলের তিনজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। উপজেলা বিএনপি’র এক নেতার নেতৃত্বেও গত রোববারের মিছিলে লাঠিসোটা নিয়ে লোকজন আসে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
আমি জীবনে কাউকে ‘মালাউন’ বলিনি : ছায়েদুল হক : নাসিরনগরে হিন্দু আক্রান্ত হওয়ার ঘটনার জন্য তীব্র সমালোচনার মুখে পড়া স্থানীয় এমপি এবং সরকারের মৎস্য মন্ত্রী ছায়েদুল হক গতকাল বিবিসি বাংলার কাছে দাবি করেছেন, সেখানকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনো নিরাপত্তাহীনতা নেই। সাক্ষাৎকারে তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগের যে তিন নেতাকে এই ঘটনায় সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে, তারা সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং এরা বরং হিন্দুদের ওপর হামলা প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিলেন।
এরপর স্থানীয় হিন্দুদের সম্পর্কে মন্ত্রীর কথিত এক মন্তব্য নিয়ে এখন বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার যে তীব্র সমালোচনা-বিতর্ক চলছে - তা অস্বীকার করেছেন এমপি ছায়েদুল হক। মুসলমানদের পবিত্র কাবাঘরের প্রতি অবমাননাসূচক এক ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেছে রসরাজ দাস নামে স্থানীয় এক হিন্দু যুবক - এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে গত রোববার নাসিরনগরে হিন্দুদের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলার ওই ঘটনা ঘটে। রসরাজ দাসকে গত শুক্রবারই গ্রেফতার করে পুলিশ।
মন্ত্রী আরো বলেন, নাসিরনগরের ঘটনা নিয়ে তার সাথে প্রধানমন্ত্রীর কোনো কথা হয়নি। এ ঘটনার পর তিনি স্থানীয় হিন্দুদের ‘মালাউন’ বলে উল্লেখ করে ‘তারা বাড়াবাড়ি করছে’ এমন মন্তব্য করেছেন কিনা - এ প্রশ্নের জবাবে ছায়েদুল হক বলেন, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট, অসত্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি জীবনে কোনোদিন এ কথা বলিনি।
কিভাবে এ ঘটনা ঘটলো, এ সম্পর্কে দলটির একজন গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় নেতা এবং সংসদসদস্য হিসেবে তার মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে মি. হক বলেন - এটা ছিল অসাম্প্রদায়িক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ বা জননেত্রী শেখ হাসিনার ভাবমর্যাদা নষ্ট করার একটা গভীর ষড়যন্ত্র। কিন্তু যারা এ কাজ করেছে বলে অভিযোগ তারা তো তার দলেরই লোক - এ কথা বলা হলে মন্ত্রী বলেন, না, এটা মিথ্যা, বানোয়াট এবং অসত্য। আমি এর নিন্দা জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ