ঢাকা, রোববার 06 November 2016 ২২ কার্তিক ১৪২৩, ৫ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

শিশু ধর্ষণ আতঙ্কজনক পর্যায়ে

নাছির উদ্দিন শোয়েব : দেশজুড়ে ধর্ষণ এখন মহামারি রূপ নিয়েছে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ঘটছে নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা। জড়িতদের মধ্যে প্রভাবশালী লোকজনই বেশি। অনেক ঘটনায় নির্যাতিত পরিবারকে নানাভাবে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে নির্যাতিত পরিবারটি অসহায় হয়ে পড়ে। অনেকে থানায় মামলা করতেও সাহস পায় না। সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু ধর্ষণের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। একটির রেষ না কাটতেই আরেকটি ঘটছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) প্রতিদিন ভর্তি করা হচ্ছে ধর্ষিত শিশু-নারীকে।
এমনকি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভেতরে কয়েকজন আনসার সদস্যের বিরুদ্ধেও ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। বাড্ডায় এক শিশুকে ধর্ষণের পর পরিবারটি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার ভয়ে থানায় মামলা করতে সাহস পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করা হয়। গোপালগঞ্জে ৭০ বছরের এক বৃদ্ধের বিরুদ্ধে শিশু ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। খিলক্ষেতে এক আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে দুই শিশু ধর্ষণের অভিযোগ করা হয়। দিনাজপুরে পাশবিক নির্যাতনের শিকার একটি শিশু ঢাকা মেডিকেলে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার অক্টোবর মাসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এ মাসে দেশে ৪৪ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে শিশু ১৯ জন ও ১৪ জন নারী। ১০ জন নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ১ জনকে। হবিগঞ্জের বাহুবলে চতুর্থ শ্রেণীর এক ছাত্রীকে অপহরণ করে জোরপূর্বক রাতভর গণধর্ষণ করে একদল দুর্বৃত্ত। দিনাজপুরে ৫ বছরের শিশুকে ধর্ষণের ঘটনা সারা দেশে নিন্দার ঝড় তোলে এ মাসে। তাছাড়া ১৪ জন নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে এ মাসে।
এদিকে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই ৯ মাসে ৪৬৬ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছে সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম। গত শুক্রবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সারা দেশে নারী ও শিশুদের ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে এক সমাবেশে এ তথ্য তুলে ধরে সংগঠনটি। সমাবেশে সংগঠনটির নেতারা বলেন, প্রতিমাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫২ নারী ও শিশু। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ২৫০টি। শুধু অক্টোবরেই ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১১৫ নারী ও শিশু।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, সারা দেশে নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যা বেড়েই চলছে। এসব ঘটনা ঘটলেও দোষীদের বিচার এবং শাস্তি না হওয়ায় নারী নির্যাতনের ঘটনা আরও বেড়ে গেছে। এসব ঘটনার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় অপরাধীরা অর্থ ও ক্ষমতার দাপটে পার পেয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। বিশ্লেষকরা এর জন্য আইনের শাসন ও সুশাসনের অভাবকেই দায়ী করেছেন। অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করা যায় না।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিগমা হুদা বলেন, বিচারহীনতার জন্য এমনটা হচ্ছে। কারণ থানাগুলো এখনো নারী ও শিশুবান্ধব হয়ে উঠেনি। নির্যাতিত নারী ও শিশু থানায় গিয়ে আইনের সহায়তা ঠিকমত পায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, পুলিশ অপরাধীদের পক্ষ নিয়ে থানা থেকেই আপস রফা করে দেয়। এছাড়াও সারা দেশের নারী-শিশু নির্যাতন আদালতের বিচারকের অভাব। ফলে মামলা বছরের পর বছর ঝুলতে থাকে। আক্রান্তরা বিচার পায় না। যে কারণে অপরাধীরা আরো সক্রিয় হচ্ছে।
কয়েকটি ঘটনা : ২৯ অক্টোবর রাজধানীর ভাটারায় পঞ্চম শ্রেণীর এক ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার। রাতে শিশুটিকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শিশুটির বাবা রোববার বলেন, সকালে তার মেয়ে বাসায় ফেরার পথে স্থানীয় শাহীন (২৫) ও নাজমুল (২৭) ডেকে নিয়ে পাশের সমির উদ্দিন মার্কেটের ২য় তলায় নিয়ে যায়। এদের সহযোগিতায় ভাটারা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল আমিনের ছোট ভাই রাশিদুল (৩০) তাকে ধর্ষণ করে এবং কাউকে না বলার জন্য হুমকি দেয়। সন্ধ্যায় মেয়েটি বাসায় এসে ঘটনা খুলে বলে। পরে তাকে রাত একটার দিকে ঢামেক হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করা হয়। তবে ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার বলছে, মেয়েটির শরীরে মারধর ও নিপীড়নের আলামত আছে। পরীক্ষা না করে ধর্ষণ চিহ্নিত করা যাবে না। এদিকে মেয়েটির ভাই জসিম জানান, আওয়ামী লীগ নেতার ভয়ে তারা থানায় মামলা করার সাহস পাচ্ছে না। তিনি বলেন, ওই নেতার বাবা বার বার তাদের ফোনে হুমকি দিচ্ছে এবং বলছে, থানায় গিয়ে মামলা করবি কিছুই হবে না আমাদের। তোরা আমাদের কিছুই করতে পারবি না।
অপরদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বহির্বিভাগে তরুণী ধর্ষণের ঘটনায় ৬ আনসার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত ও পরে একজনকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। অভিযুক্ত ছয় আনসার সদস্য হলেন-এপিসি একরামুল, মিনহাজুল, বাবুল, সিরাজুল, আমিনুল ও আতিকুর। ঢামেক হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের সমন্বয়কারী ডা. বিলকিস বেগম জানান, ওই তরুণী জানিয়েছেন, গত ২৯ অক্টোবর বহির্বিভাগের তৃতীয় তলায় ছয় আনসার তাকে ধর্ষণ করে। ওই দিন গাইনি বিভাগে চিকিৎসা নিয়ে পরদিন ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি হয়। তিনি আরো জানান, তার ফরেনসিকসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষায় কয়েকজনের ধর্ষণের আলামত মিলেছে। মেয়েটির মানসিক সমস্যা থাকায় তাকে মানসিক বিভাগে পাঠানো হয়েছে। শাহবাগ থানার ওসি আবু বকর সিদ্দিক বিষয়টি নিশ্চিত করে মেয়েটির ভাইয়ের বরাত দিয়ে জানান, তাদের বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। কয়েক দিন আগে মেয়েটি মানসিক সমস্যার কারণে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। আমরা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছি।
২৩ অক্টোবর মানিকগঞ্জের দৌলতপুর এলাকায় চতুর্থ শ্রেণীুর এক শিক্ষার্থী ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে তার স্বজনরা অভিযোগ করেছেন। ২ নবেম্বর ওই শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শিশুটির বাবা এই অভিযোগ করেন। এদিকে ওই ঘটনায় অভিযুক্ত হুরমুজ মৃধার বয়স নিয়েও পরস্পর বিরোধী তথ্য পাওয়া গেছে। শিশুটির স্বজনরা তার বয়স ৬০ বছর বলে জানালেও দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হুরমুজের বয়স ৮৫ বলে দাবি করেছেন। শিশুর এক স্বজন জানান, গত ২৩ অক্টোবর প্রতিবেশী হুরমুজ মৃধা শিশুটিকে বাড়িতে একা পেয়ে ধর্ষণ করে। বিষয়টি শিশুটির মা দেখে ফেলেন। এরপর ২৪ অক্টোবর তাকে মানিকগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ওই হাসপাতাল কোনও রিপোর্ট দেয়নি। এরপর থানায় গেলেও পুলিশ তাদের তেমন সহযোগিতা করেনি। তারা ২৭ অক্টোবর দৌলতপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেন।
১ নবেম্বর রাজধানীর খিলক্ষেত থানার ডুমনী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুক্তার হোসেনের বিরুদ্ধে দুই শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ করা হয়। এ বিষয়ে থানায় পৃথক দুটি অভিযোগ দায়ের করেছে ওই দুই শিশুর মায়েরা। তবে, তদন্ত শুরু করলেও এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক বলে সন্দেহ করেছে পুলিশ। এদিন বিকালে খিলক্ষেত থানায় মুক্তার হোসেনের বিরুদ্ধে পৃথকভাবে দুই শিশুকে ধর্ষণের লিখিত অভিযোগ করেছেন নির্যাতিতাদের মায়েরা। খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুল হক এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, অভিযোগ পেয়েছি। আমাদের একজন কর্মকর্তাকে বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
অভিযোগ দুটির তদন্ত করছেন খিলক্ষেত থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ হানিফ। তিনি অভিযোগের বিষয়ে বলেন, ‘দুটি পৃথক ঘটনায় দুই শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে তাদের মায়েরা লিখিত অভিযোগ করেছেন। ডুমনী ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুক্তার হোসেনের বিরুদ্ধে তারা এই অভিযোগ এনেছেন। অভিযোগ পাওয়ার পরপরই আমরা বিষয়টি তদন্ত শুরু করি। তিনি বলেন, ‘দুটি ঘটনাই ছয়মাস আগের।
২৯ অক্টোবর রাজধানীর উত্তর বাড্ডা এলাকায় এক আদিবাসী তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় অভিযুক্ত এক তরুণকে আটক করেছে পুলিশ। গত ২৬ অক্টোবর উত্তর বাড্ডার পুরান থানা রোডের একটি বাসায় ওই তরুণীকে ধর্ষণ করা হয়। সন্ধ্যায় বাড্ডা থানায় অভিযোগ করলে পুলিশ ওই তরুণীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পরীক্ষার জন্য পাঠায়। বর্তমানে তাকে ঢামেকের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে। এদিকে তরুণীর অভিযোগ পাওয়ার পর বাড্ডা এলাকায় অভিযান চালিয়ে সালাউদ্দিন নামে এক অভিযুক্তকে আটক করেছে পুলিশ। বাড্ডা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ফারুক বলেন, ওই তরুণী একটি পার্লারে কাজ করেন। তার অভিযোগ পাওয়ার পর অভিযান চালিয়ে ইতোমধ্যে একজনকে আটক করেছি। বাকিদের আটকের চেষ্টা চলছে।
৩০ অক্টোবর গোপালগঞ্জে ৭ বছর বয়সের একটি শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ করে পরিবার। শিশুটিকে ৭০ বছর বয়সের এক বৃদ্ধ যৌন নির্যাতন চালিয়েছে এমন অভিযোগে ওঠে। শিশুটি নিজ গ্রামের একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। অভিযোগে জানানো হয়, ঘটনার দিন বৃদ্ধের বাড়িতে তার নাতির সঙ্গে খেলতে যায় শিশুটি। এ সময় নিজের নাতিকে টেলিভিশন দেখার কথা বলে সরিয়ে দিয়ে কাচারী ঘরে আটকে শিশুটিকে ধর্ষণ করে। ধর্ষিতার পরিবার জানায়, বৃদ্ধ বাকাদ্দেস পরিকল্পিতভাবে নিজের নাতনিকে দিয়ে শিশুটিকে খেলার কথা বলে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে। চিৎকার করতে গেলে মুখ চেপে ধরে এবং কাউকে বললে হত্যা করার হুমকি দেয়। গোপালগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), মো. সেলিম রেজা বলেন, এ বিষয়ে নির্যাতনের শিকার শিশুটির মা বাদী হয়ে শনিবার বিকেলে থানায় অভিযোগ করেছেন।
এদিকে দিনাজপুরে পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষণের মামলায় আসামী সাইফুল ইসলামকে আটক করে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। পরিবারের অভিযোগ- গত ১৮ অক্টোবর শিশুটি নিখোঁজ হয়। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ওই দিন তাকে পাওয়া যায়নি। পরদিন ভোরে শিশুটিকে তার বাড়ির কাছে হলুদ ক্ষেতে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় পাওয়া যায়। প্রথমে স্থানীয় হাসপাতাল, পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়ে শিশুটি এখন ঢাকা মেডিকেলে। ওর মাথা, গলা, হাত ও পায়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল। ঊরুতে সিগারেটের ছ্যাঁকার ক্ষত। শিশুটির চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ড শিশুটিকে পর্যবেক্ষণ করেছে। শিশুটির প্রজনন অঙ্গে সংক্রমণ দেখা গেছে। এই সংক্রমণ এখন পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ঘটনার পর শিশুটির বাবা ২০ অক্টোবর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। মামলায় সাইফুল ইসলাম (৪২) ও আফজাল হোসেন কবিরাজ (৪৮) নামের দুজনকে আসামী করা হয়। ২৪ অক্টোবর রাতে দিনাজপুর শহর থেকে গ্রেফতার হয় সাইফুল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ