ঢাকা, রোববার 06 November 2016 ২২ কার্তিক ১৪২৩, ৫ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খুলনার উপকূলীয় অঞ্চলের তিন লাখ মানুষ ঝুঁকিতে

আব্দুর রাজ্জাক রানা : জলবায়ু পরিবর্তনে খুলনার উপকূলীয় এলাকাগুলোতে নেমে আসছে একের পর এক প্রাকৃতিক ও মানবিক বিপর্যয়। আর এসব দুর্যোগে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে এসব এলাকার বাসিন্দারা। গত তিনদশকে সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে একাধিকবার লন্ডভন্ড হয়েছে সুন্দরবন। একইসঙ্গে ঝড়ের তান্ডবে সব হারিয়ে পথে বসেছে উপকূল ঘিরে বাস করা খুলনা জেলার কমপক্ষে তিন লাখ মানুষ।
উপকুলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, ‘গ্রীণ হাউস প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় একদিকে যেমন সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে উপকূলীয় নদ-নদীগুলোতে বাঁধ দেয়ার কারণে পলি জমে নাব্যতা হারিয়ে গতিপথ পাল্টাচ্ছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সাগরের পানি এখন ঢুকছে উপকূলীয় এলাকাগুলোতে। আর এ কারণে ঘটা ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছেন খুলনার উপকূলীয় দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছার কমপক্ষে তিন লাখ মানুষ।’
সিপিআরডি’র নির্বাহী পরিচালক মো. শামছুদ্দোহা এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেকেই এলাকা, এমনকি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। কেউ ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের কারণে বাড়ি-ঘর ও সম্পদ হারিয়েছে। কারো বাড়ি-ঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আবারো দুর্যোগের কারণে এলাকায় খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। আবার কোথাও ফসলি জমি নষ্ট হয়েছে। ফলে অনেকেই এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু জলবায়ু সম্মেলনে এই বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়নি। বিষয়টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি দাবি করেন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের প্রধান প্রফেসর ড. দিলীপ কুমার দত্ত জানান, ‘১৯৮৮ সালের ২৯ নবেম্বর সুন্দরবন উপকূলে প্রলয়ংকরী সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল খুলনা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চলে স্মরণকালের সামুদ্রিক ঝড়, ২০০৭ সালের ১৫ নবেম্বর সিডরের তান্ডব এবং ২০০৯ সালের ২৫ মে আইলার কারণে ঘটা ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস গোটা উপকূলীয় এলাকার প্রাকৃতিক দৃশ্যপট পাল্টে দিয়েছে। শুধুমাত্র আইলার পরবর্তী সময়ে স্থায়ীভাবে প্রায় ১৬ হাজার এবং অস্থায়ীভাবে এক লাখ ২৫ হাজার মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে। এছাড়া সিডরের সময়ে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ স্থায়ীভাবে উদ্বাস্তু হয়। এর সঙ্গে নদী ভাঙন লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে এসব এলাকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। সর্বশেষ রোয়ানু ঝড়েও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ অঞ্চলের মানুষ নিজের ভিটেবাড়ি, জমি-জিরাত সহায়-সম্বল হারিয়ে শহরে এসে আশ্রয় নিয়েছেন বস্তিতে। এ সব মানুষের মধ্যে অনেকে দিনমজুর, রিকশা, ঠেলাগাড়ি চালিয়ে দিন যাপন করছেন। আর মহিলারা বাসাবাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে জীবনযাপন করছেন। সরকারি উদ্যোগে উপকূলের মানুষের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প ও একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তুচ্যুতদের পুনর্বাসন করার উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।’
জেজেএস খুলনার কো অডিনেটর জিয়া আহমেদ জানান, ‘উপকূলীয় অঞ্চলের মাটিতে লবণাক্ততার প্রভাব দেখা দেয়ায় এ সব অঞ্চলে কৃষিসহ নানা রকম ফসল চাষেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। শিল্প কারখানারও ক্ষতি করছে। বিশেষ করে শুষ্ক মওসুমে মাটির নিচে থাকা লবণাক্ত পানির উপরের দিকে বা পাশের দিকে প্রবাহিত হওয়ায় মাটিতে লবণের পরিমাণ বেড়ে যায়। যা মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে। এতে শুধু চাষের ক্ষতি হচ্ছে না একই সঙ্গে এসব অঞ্চলের মানুষকে সুপেয় পানির জন্য ক্ষেত্র বিশেষ ১০-১২ কিলোমিটার দূরে গিয়ে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে হয়। উপকূলীয় অঞ্চলের ৬টি জেলার ভূমি সমতল, জোয়ার-ভাটা সমৃদ্ধ, এসব এলাকার পশ্চিম অংশের নদী-নালার পানি অধিকাংশ সময়ে লবণাক্ত থাকে। পূর্ব অংশে বর্ষাকালে নদী-নালা দিয়ে মিঠা পানি প্রবাহিত হলেও শুষ্ক মওসুমে পানির লবণাক্ততা প্রতি লিটারের ৩-৫ গ্রাম বেড়ে যায়। বর্তমানে লবণাক্ত জমির পরিমাণ প্রায় ৫৫ লাখ হেক্টর। কম বৃষ্টিপাতের কারণে উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ত জমির পরিমাণ বাড়ছে। বর্তমানে নদীমাতৃক বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে এবং দূরবর্তী দ্বীপগুলোর ৫৫ লাখ হেক্টর এলাকায় নোনা পানি প্রবেশ করার ফলে উপযুক্ত জলাশয় ও ভূগর্ভস্থ পানি লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। লবণাক্ততার কারণে এ সব অঞ্চলের বিশাল পরিমাণ আবাদি জমি পতিত বা অনাবাদি থাকছে।
পরিবর্তন খুলনার নির্বাহী পরিচালক নাজমুল আযম ডেভিড জানান, ‘এত ভূগর্ভস্থ পানি ও মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের লাখো মানুষের কৃষি নির্ভর অর্থনীতি, জীবন জীবিকার উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। উপকূলীয় এলাকার ব্যাপক জনগোষ্ঠীর জীবন-যাপনে প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। নোনা পানি অনুপ্রবেশের মাধ্যমে মাটি লবণাক্ততা বৃদ্ধি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিতে এক মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করছে। শুষ্ক মওসুমে নিয়মিত সামুদ্রিক জোয়ারের সঙ্গে ভূ-ভাগের অনেক গভীরে মিঠাপানির অঞ্চলে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে নদীর পানিকে আউশ ধান ও অন্যান্য আগাম ফসলের সেচের কাজে ব্যবহারে অনুপোযোগী করে তুলেছে। সমুদ্র উপকূলে এসব অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে মিষ্টি পানির মাছ মারা যাচ্ছে ও মাছের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। উন্মুক্ত জলাশয়ের মাছ ও চিংড়ির প্রজাতির বৈচিত্র্য পরিবর্তন হচ্ছে। লবণাক্ত এলাকার গবাদি পশুর কাঁধে বিভিন্ন প্রকার রোগ-বালাই দেখা দিচ্ছে। লবণাক্ত এলাকাগুলোকে ক্ষতিকর প্রভাবের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে সঠিক পদক্ষেপ ও সংশি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা প্রহণের দাবি ভুক্তভোগীদের। তাদের দাবি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলবর্তী মানুষকে লবণাক্ততা, নদী ভাঙন, সামুদ্রিক জোয়ারের তীব্রতা থেকে রক্ষায় বাংলাদেশ জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটিএফ)সহ দেশি-বিদেশি সংস্থার অর্থায়নে কার্যকর পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। তবেই এসব এলাকার মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা পাবে। একই সঙ্গে শহরাঞ্চলে ভাসমান মানুষের সংখ্যা হ্রাস পাবে।’
মৃত্তিকা সম্পদ ইনস্টিটিউট খুলনার তথ্য মতে, মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত নদীগুলোর লবণের মাত্রা ১২-১৬.৭ পিপিটি (পার্টস পার ট্রিলিয়ন) পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। খুলনা জেলা ও এর আশপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলোর পানিতে লবণাক্ততা অধিক ক্ষতিকর মাত্রায় পৌঁছেছে এবং তা প্রতিবছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কয়রা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার প্রশান্ত কুমার রায় বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় এলাকায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। যদিও সরকার ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপকূলীয় এলাকার ব্যাপক ক্ষতির দিকটি বিবেচনায় এনে টেকসই প্রকল্প হাতে নিয়ে তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট রয়েছে।’ 
দাকোপের কৃষক আবুল বাশার বলেন, ‘ভাঙ্গনের কবলে উপজেলার তিনটি পোল্ডার এলাকার মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক এখানে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে তা যথেষ্ট না। এই বাঁধ নির্মাণ হলে ভাঙন ও দুর্যোগ ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে বলেও আশায় রয়েছেন তারা। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে সহসাই মুক্তি মেলার সম্ভাবনা নেই এসব এলাকার মানুষের। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এরইমধ্যে তারা ঘের ও ফসলি জমিতে টের পাচ্ছেন।’
পাইকগাছা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস এম রাসেল বলেন, ‘পাইকগাছা ও কয়রাসহ এ অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বেশি বোঝা যাচ্ছে ঘের ব্যবসায়। নদী ভাঙনের সময়েও এর তীব্রতা বোঝা যাচ্ছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ঘেরের পানির তাপমাত্রা হ্রাস-বৃদ্ধির ফলে চাষকৃত মাছ যারা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, তীব্র তাপদহে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠে যাচ্ছে। আবার গরমের মধ্যেই বৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা হঠাৎ করেই ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যাচ্ছে। তাপমাত্রার এই অস্বাভাবিক হ্রাস-বৃদ্ধি ঘেরের মাছের ওপরেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে।’
কয়রা উপজেলায় বাস করেন হারুণ অর রশীদ। স্থানীয় এই ব্যক্তি তাপমাত্রার এমন অস্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে দেখছেন প্রকৃতির আচরণে বিশাল অসামঞ্জস্যতা। তিনি বলেন, ‘যতোই দিন যাচ্ছে উপকূলীয় এলাকায় প্রকৃতির আচরণ ততোই উল্টাপাল্টা লাগছে। উপর্যুপরি নদী ভাঙন কেড়ে নিচ্ছে কৃষি জমি, বসত ভিটা, চিংড়ি ঘের ও রাস্তাঘাট। আবহাওয়া হচ্ছে রুক্ষ। অনেকে জমি হারিয়ে এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাচ্ছেন।’ তিনি বলেন, ‘দাতা সংস্থা ও জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা উপকূলীয় অঞ্চলগুলো পরিদর্শন করে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও দুর্যোগের ঝুঁকিহ্রাস কমাতে সরকারকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন। জলবায়ু ফান্ডের অর্থায়নে সরকার উপকূলীয় এলাকার উন্নয়নে কাজ করছে বলেও তিনি জানান।’
ক্লিন’র প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী জানান, ‘ক্লিন, ইসলামিক রিলিফ, সুশীলন, জেজেএস, রূপান্তর, প্রদীপন, উত্তরণ, অ্যাওসেড, পরিবর্তন খুলনাসহ অর্ধ শতাধিক বেসরকারি সংস্থা উপকূলীয় মানুষের জলযায়ু ঝুকি হ্রাস করার জন্য কাজ করছে। এসব বেসরকারি সংস্থা খাল খনন, মেলে, কাঁকড়ার হ্যাচারী বানাতে সহযোগীতা ও সচেতনা বৃদ্ধির জন্য কাজ করছে। যাতে করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা লাভবান হচ্ছেন বলে তিনি জানান। এ ছাড়া সরকারিভাবে জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে বেড়িবাঁধ সংস্কারের কাজ করছে।’
ইসলামিক রিলিফের প্রকল্প ম্যানেজার সৈয়দ আবুল বাশারও মনে করেন, ‘পরিকল্পনা মাফিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে উপকূলীয় এলাকার মানুষ ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে। সরকারের পাশাপাশি দাতা সংস্থাগুলো এনজিওদের মাধ্যমে বাঁধ সংস্কার, কাঁচা রাস্তা নির্মাণ, ঝড় সহনশীল ঘর তৈরি, পয়ঃনিস্কাশন কার্যক্রম বাস্তবায়ন, গভীর-অগভীর নলকূপ স্থাপন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।’
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর মো. মিজানুর রহমান ভূইয়া বলেন, ‘মাটিতে লবণের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে তার উর্বরতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে। ধানের থোড় হবে না চিটা বেশি হবে। অনেক সময় চারাই গজাবে না। দীর্ঘমেয়াদীভাবে লবণ পানিতে মাছ চাষ করলে সেই মাটিতে ঘাস পর্যন্ত জন্মাবে না। স্যালাইন জোনে বাতাসেও লবণের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এতে করে শহরের দালান-কোঠা, লোহার তৈরি স্থাপত্য, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি মরিচা পড়ে নষ্ট হয়ে যাবে।’
খুলনা পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মলি¬¬ক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘পানিতে ৫-৬ পিপিটি পর্যন্ত লবণের মাত্রা এ অঞ্চলের পরিবেশের জন্য সহায়ক। এই মাত্রায় টক ফল ধরে এমন গাছপালা ভালভাবে বেড়ে উঠতে পারে। তবে এর বেশি হলে তা পরিবেশ ও অন্যান্য গাছের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। মাত্রাতিরিক্ত লবণ পানি জমিতে প্রয়োগ করলে ধান ও গমসহ অন্যান্য ফসলের ফলন ব্যাহত হতে পারে। পানিতে অতিরিক্ত মাত্রায় সোডিয়াম ক্লোরাইড থাকলে ক্লোরিন আয়ন শিকড় দিয়ে গাছের পাতায় পৌঁছে সালেকসংশ্লেষণ বাধাগ্রস্ত করে। অনেক সময় গাছ মারা যেতে পারে। এছাড়াও মাটি ও পানিতে লবণের উপস্থিতি বেশি হলে ঘনত্বের কারণে ডি-অসমোসিস প্রক্রিয়ায় গাছের তরল মাটিতে উল্টো ফিরে যেতে পারে। এতে গাছ রোগগ্রস্ত হয়ে মারা যেতে পারে।’
বিআরডিবি’র মহাপরিচালক ড. মো. আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সুন্দরবনসংলগ্ন নদ-নদীর কিনার ড্যাম্পিং করে বেড়িবাঁধে ব্লক বসানোর কারণে নদী ভাঙন কিছুটা কমেছে। উপকূলীয় এলাকার বেড়িবাঁধ রক্ষায় বিশ্বব্যাংকের বাস্তবায়নাধীন চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হলে এ বিষয়ে আরও উপকার পাবেন স্থানীয়রা। তিনি আরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অনেক এলাকায় জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে তারা এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাদের আশ্রয় ও পুনর্বাসনে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। আগামীতে এবিষয়ে প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা নেয়া হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।’
এ ব্যাপারে খুলনা জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসান বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনে খুলনা জেলায় পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বেশকিছু বেসরকারি সংস্থা কাজ করছে। জেলা প্রশাসন প্রধানত এগুলোকে সমন্বয় করে থাকে। তবে পরিবর্তনশীল ব্যবস্থায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য জেলা প্রশাসন তার আওতাধীন এলাকায় বৃক্ষরোপণ, বৃক্ষনিধন থেকে মানুষকে নিবৃত করা এবং ইটভাটার কারণে জলবায়ু পরিবর্তনে বিরূপ ভূমিকা পড়ছে কিনা সে দিকে সার্বক্ষণিক নজর রাখে। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসনের নিয়মিত দায়িত্ব মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ইটভাটায় কাঠ পোড়ানো বন্ধ করা এবং প্রয়োজন বোধে ইটভাটা বন্ধ করার মতো ভুমিকা রাখা হয়। তিনি বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বেসরকারি সংস্থাগুলোকে এ ব্যাপারে মাঝে মধ্যে উপদেশ ও নির্দেশ দেয়া হয়।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ