ঢাকা, রোববার 06 November 2016 ২২ কার্তিক ১৪২৩, ৫ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

চোরাচালানের অবারিত দ্বার ‘সীমান্ত’ ॥ বেপরোয়া সিন্ডিকেট

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : ‘আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নাই, টহল দেওয়ার জন্য সড়ক নাই। যেসব এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নাই এবং নদী আছে সেসব এলাকা দিয়ে চোরাচালান বেশি হয়’-এমনটাই জানালেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ। গত ৭ অক্টোবর শুক্রবার সকালে রাজধানীর পিলখানায় আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান বিজিবির প্রধান।
চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ০৫ অক্টোবর পর্যন্ত ভারতের নয়া দিল্লীতে বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত সম্পর্কিত সকল বিষয় নিয়ে সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক থেকে ফিরে ওই দিন বিজিবির সদরদপ্তরে প্রেস ব্রিফিংয়ে বিজিবি মহাপরিচালক জানান, সীমান্তে ২৮২ কি.মি. কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিয়েছেন। এখন বরাদ্দ পেলেই কাঁটাতার নির্মাণের কাজ শুরু হবে।
সীমান্তে কাঁটাতারের যৌক্তিকতা তুলে ধরে সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীটির প্রধান বলেন, কাঁটাতার নির্মিত হলে চোরচালান কমে আসবে। ‘সীমান্তে টহলের জন্য রাস্তা এবং কাঁটাতারের বেড়ার নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। ২৮২ কি.মি এর কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ টেকনাফ সীমান্ত থেকে শুরু হবে। ইয়াবা আমাদের জন্য এলার্মিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কাঁটাতার নির্মাণ হলে ইয়াবাসহ অন্যান্য চোরাচালান বন্ধ হবে। তিনি বলেন, ‘ভারত তাদের সীমান্তের ৭৯ শতাংশে কাঁটাতারের বেড়া সম্পন্ন করেছে। এই বেড়া নির্মাণে দীর্ঘদিন কাজ করছে ভারত। এতে প্রচুর অর্থ খরচ হয় তাদের।’
বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যেকার সীমান্ত বেড়ে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটারে এসে দাঁড়িয়েছে। এই সীমান্তের অধিকাংশ স্থানে কাঁটাতারের বেড়া (ফেন্সিং) দিয়েছে নয়াদিল্লী।
সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ হলে চোরাচালান বন্ধ হবে বিজিবি প্রধানের এমন বক্তব্যের পক্ষে কোন যুক্তিই খুঁজে পাচ্ছেন না পর্যবেক্ষকমহল। তাদের মতে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটারের বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ৭৯ শতাংশ স্থানেই নয়াদিল্লী কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করেছে, ঢাকাও বেশ কিছু এলাকায় কাঁটাতার বসিয়েছে, এখন বাকী আছে মাত্র ২৮২ কিলোমিটারের সীমান্ত এলাকা। অথচ সীমান্তে বিজিবির প্রতিদিনের-প্রতি মাসের অভিযানের চিত্র ওই বাহিনী প্রধানের যুক্তির ধার ধারে না। কারণ কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা সম্ভব হলেই যদি চোরাচালান ঠেকানো যাবে, তাহলে ঢাকা ও দিল্লীর পক্ষে পৃথকভাবে তৈরি কাঁটাতারের বেড়া এখন কোন কাজে আসছে।
সীমান্তের প্রতিটি এলাকা, প্রতিটি স্থানই যেন চোরাচালানের অবারিত দ্বার হয়ে উঠছে। চোরাচালানের যে সিন্ডিকেট এলাকা ভেদে গড়ে উঠেছে, তাদের রুধিবার সাধ্য নেই বলেই আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে। তা না হলে সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরীদের ফাঁক গলে হেন পণ্য নেই যে এপার-ওপার হচ্ছে না। বাংলাদেশ - ভারত সীমান্ত কিংবা বাংলাদেশ - মিয়ানমার সীমান্ত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণেই চোরাচালানের মাত্রা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে বলে ওই মহলের অভিমত।
বিজিবির পরিসংখ্যান কি বলছে.....
চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে ৭৯৬ কোটি ২৭ লাখ ৩৯ হাজার টাকা মূল্যের বিভিন্ন প্রকারের চোরাচালান ও মাদক দ্রব্য আটক করতে সক্ষম হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এছাড়া গত ১০ মাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাদকদ্রব্য আটক করা হয়েছে। এরমধ্যে ৫৭ লাখ ৬৪ হাজার ১৬৭ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ২ লাখ ১৫ হাজার ১৯৬ বোতল ফেনসিডিল, ১৫ হাজার ৬২১ কেজি গাঁজা, ২ লাখ ২১ হাজার ৮৬০ বোতল বিদেশী মদ, ২৪ কেজি ৫৮ গ্রাম হেরোইন, ৫৮ হাজার ৬৫টি নেশাজাতীয় ইনজেকশন, ১ কোটি ৪২ লাখ ৫০ হাজার ৫৮৯ পিস বিভিন্ন প্রকারের অবৈধ ট্যাবলেট। এছাড়া আটককৃত অন্যান্য চোরাচালান দ্রব্যের মধ্যে রয়েছে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬৭৩ টি শাড়ি, ৪০ হাজার ৫৮৪ টি থ্রিপিস ও শার্টপিস, ৯ লাখ ২১ হাজার ৮২৪ মিটার থান কাপড়, ৫০ হাজার ৫১০ সিএফটি কাঠ, ২৫ কেজি ৯১২ গ্রাম স্বর্ণ এবং ৫টি কষ্টি পাথরের মূর্তি।
বিজিবি গত ১০ মাসে ৫৬টি পিস্তল, ৩৭টি বিভিন্ন প্রকারের বন্দুক, ৪ হাজার ৭ রাউন্ড গোলাবারুদ, ৫৮টি ম্যাগাজিন, ৭টি ইলেকট্রনিক ডেটনেটর এবং ৫৫২ কেজি ৭শ’ গ্রাম গান পাউডার উদ্ধার করেছে। গত ১০ মাসে বিজিবি’র অভিযানে মাদক পাচারসহ অন্যান্য চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে ১ হাজার ৪৬৮ জন এবং অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের দায়ে ১ হাজার ৪১২ জন বাংলাদেশী নাগরিককে আটক করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে ৩ হাজার ৩৯৬ জন মিয়ানমার নাগরিকের অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিহত করা হয়েছে। এছাড়া গতমাসে দেশের সীমান্ত এলাকাসহ অন্যান্য স্থানে অভিযান চালিয়ে ৮৫ কোটি ১৯ লাখ ৭৩ হাজার টাকার চোরাচালান ও মাদক দ্রব্য আটক করেছে।
আটককৃত মাদকের মধ্যে রয়েছে ১০ লাখ ১১ হাজার ৭৫৭ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ২৯ হাজার ৬৪১ বোতল ফেনসিডিল, ১ হাজার ৪১৫ কেজি গাঁজা, ২০ হাজার ৮৮৭ বোতল বিদেশী মদ, ৭৫ গ্রাম হেরোইন এবং ১৪ লাখ ৬৩ হাজার ৪৪৭ পিস বিভিন্ন প্রকারের অবৈধ ট্যাবলেট। আটককৃত অন্যান্য চোরাচালান দ্রব্যের মধ্যে রয়েছে ১৬ হাজার ৬৫২টি শাড়ি, ২ হাজার ৯৮৯টি থ্রিপিস ও শার্টপিস, ৪ হাজার ৫২ মিটার থান কাপড়, ১ লাখ ৫২ হাজার ৬১৫টি তৈরি পোশাক, ৫ হাজার ৫৭৯ সিএফটি কাঠ, এবং ৪টি তক্ষক।
এর আগে অক্টোবর মাসে বিজিবির অভিযানে উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ২টি পিস্তল, ৪টি বিভিন্ন প্রকারের বন্দুক এবং ১৮ রাউন্ড গুলী। গত অক্টোবর মাসে বিজিবি’র অভিযানে মাদক পাচারসহ অন্যান্য চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৮০ জন এবং অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের দায়ে ২৮৭ জন বাংলাদেশী নাগরিককে আটক করে থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। এছাড়া ভারত থেকে বাংলাদেশে অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের দায়ে ৬ জন ভারতীয় নাগরিককে আটক করে বিএসএফ’র কাছে হস্তান্তর এবং বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে ২৪৬ জন মায়ানমার নাগরিকের অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিহত করা হয়েছে।
এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে জব্দ করা হয়েছে ৩ লাখ ৬১ হাজার ৩২৪ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ২২ হাজার ১৮৬ বোতল ফেনসিডিল, ১ হাজার ১৩০ কেজি গাঁজা, ১৭ হাজার ৪৪০ বোতল বিদেশি মদ, ৪ কেজি ১৩৫ গ্রাম হেরোইন, ১৬ হাজার ৪১৩টি নেশাজাতীয় ইনজেকশন এবং ১৩ লাখ ১৯ হাজার ২৭৫ পিস বিভিন্ন প্রকারের অবৈধ ট্যাবলেট। এ ছাড়া আটককৃত অন্য চোরাচালান দ্রব্যের মধ্যে রয়েছে ৮ হাজার ৪৫৮টি শাড়ি, ১ হাজার ৪৮৯টি থ্রি-পিস-শার্ট পিস, ২৩ হাজার ৩০৫ মিটার থান কাপড়, ৪ হাজার ৯৩৬ সিএফটি কাঠ, ১৯ কেজি ৮৫৬ গ্রাম স্বর্ণ এবং ২টি তক্ষক।ওই মাসে উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ৬টি পিস্তল, ২টি বিভিন্ন প্রকারের বন্দুক, ৯টি ম্যাগজিন, ২৮ রাউন্ড গুলী এবং ৫০০ কেজি গান পাউডার। এ সময়ে মাদক পাচারসহ অন্য চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৪৫ জন এবং অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের দায়ে ১৫৯ জন বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে ৩৪৫ জন মায়ানমার নাগরিকের অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিহত করা হয়েছে।
আগস্ট মাসে ১৩৩ কোটি ৯৫ লাখ ১৩ হাজার টাকা মূল্যের চোরাচালান পণ্য ও মাদকদ্রব্য আটক করেছে বিজিবি। এর মধ্যে ৬ লাখ ৬২ হাজার ৫৯৭ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ২০ হাজার ৫৪ বোতল ফেনসিডিল, ১ হাজার ৬৩৫ কেজি গাঁজা, ২২ হাজার ১৩৮ বোতল বিদেশী মদ, ৪ কেজি ৩২৮ গ্রাম হেরোইন, ৬ হাজার ৮০৯টি নেশাজাতীয় ইনজেকশন এবং ২৩ লাখ ৩৫ হাজার ৭০৯ পিস বিভিন্ন প্রকারের অবৈধ ট্যাবলেট রয়েছে।
এ ছাড়া আটককৃত অন্যান্য চোরাচালান দ্রব্যের মধ্যে রয়েছে ১৪ হাজার ১৯১টি শাড়ি, ৪ হাজার ৪৭০টি থ্রিপিস-শার্টপিস, ৭ হাজার ৯১৮ মিটার থান কাপড়, ২ হাজার ৯১৭ সিএফটি কাঠ, ১ কেজি ৩২৯ গ্রাম স্বর্ণ, দুটি তক্ষক এবং দুটি কষ্টিপাথরের মূর্তি।এ সময় বিজিবি ৩টি পিস্তল, ৪টি ম্যাগজিন, ১৬ রাউন্ড গুলী এবং ৩ কেজি গান পাউডার উদ্ধার করে।
আগস্টে মাদক পাচারসহ অন্যান্য চোরাচালানে জড়িত ১৩৫ জন এবং অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের অভিযোগে ১৮৪ জন বাংলাদেশী নাগরিককে আটক করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে ৯৮ জন মায়ানমার নাগরিকের অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো হয়েছে।
গত তিন মাসের বিজিবির পরিসংখ্যানই সীমান্তে চোরাচালানের মাত্রা বাড়ার যুক্তিকে এগিয়ে নেয়। অথচ কাঁটাতারের বেড়া ডিঙ্গিয়েই এসব চোরাচালানের ঘটনা ঘটছে। সীমান্ত এলাকার একসূত্রের দাবি, বিজিবির অভিযানে যে পরিমাণ চোরাচালান পণ্য আটক কিংবা উদ্ধার হয় তা মোট চোরাচালানের এক চতুর্থাংশই বলা চলে। দু‘দেশের সীমান্তের সকল আইন আর কাঠামো ভেদ করে গড়ে উঠা চোরাচালান সিন্ডিকেট চোরাচালানে তৎপর রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোন কোন সীমান্তে দায়িত্বপ্রাপ্তদের ম্যানেজ করে চোরাচালানের পণ্য এপার ওপার হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পর্যবেক্ষক মহলের মতে, চোরাচালান একটি বেআইনী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কার্য্যক্রম। সীমান্তের আইন-নির্দিষ্ট পথ এবং শুল্কঘাঁটি এড়িয়ে পণ্য আমদানি বা রপ্তানি করলে চোরাচালান সংঘটিত হয়। যারা চোরাচালান করে তাদের বলা হয় চোরাচালানকারী। অনেক সময় চোরাচালানকে পণ্য পাচার হিসেবেও বর্ণনা করা হয়।
তাদের মতে, চোরাচালানের উদ্দেশ্য প্রধানত দুটি। একটি হলো পণ্য আমদানি-রপ্তনির ওপর কোন নিষেধাজ্ঞা থাকলে তা এড়িয়ে অবৈধ সীমান্ত পথে পণ্য আনা-নেয়া করা। দ্বিতীয়ত আমদানি-রপ্তানির বৈধ পথ এবং শুল্ক ঘাঁটি এড়িয়ে বাণিজ্যের অর্থাৎ পাচারের মাধ্যমে সরকার ধার্য্য শুল্ক-কর ফাঁকি দেয়া।

চোরাচালানির নিরাপদ রুট দহগ্রাম সীমান্ত
লালমনিরহাটের সীমান্ত এলাকা দহগ্রাম। চারদিকে ভারত মাঝখানে বাংলাদেশ; চোরাচালানিরা নিরাপদ রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে দহগ্রামকে। বিজিবির নীরব অ্যাকশন, বেপরোয়া চোরাচালানিরা। সীমান্তে ভারতীয় কাঁটাতারের বেড়া না থাকায় দিন-রাত ভারত থেকে অবৈধ পথে আসছে গরু। গরু চোরাচালানের এ সীমান্তে বিএসএফ কেড়ে নিচ্ছে বাংলাদেশি তাজা প্রাণ। নতুন কৌশলে চোরাচালানিরা চালাচ্ছে এ ব্যবসা।
খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, লালমনিরহাটের দহগ্রাম সীমান্ত এখন ওপেন চোরাচালানের বাণিজ্য। আসছে ভারতীয় গরু, কাপড়, মসল্লা, মাদক- এমন কোনো অবৈধ পণ্য নেই যে আসে না। রাতে এসব চোরাই পণ্য তিন বিঘা করিডোর অতিক্রম করাচ্ছে চোরাচালানিরা। সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব। দহগ্রামে বিজিবি অঘোষিত গরুর করিডোর দেয়ায় চোরাচালানিরা নিরাপদ অবৈধ ব্যবসায় বেছে নিয়েছে এ রুটকে। ফলে সরকারঘোষিত বুড়িমারী ইসলামপুর গরুও করিডোর ভারত থেকে বৈধভাবে গরু না এনে চোরাইভাবে দহগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে আনছে গরু চোরাচালানিরা। জানা গেছে, পাটগ্রামের বুড়িমারী ইসলামপুর করিডোর থেকে রসিদ নিয়ে বিজিবি দহগ্রামে অঘোষিত করিডোর করলেও অনেক সময় বিজিবিকে ফাঁকি দিয়ে ইসলামপুর গরুর করিডোরের অসাধু লোকজন ও চোরাচালানিরা রসিদ ছাপিয়ে ওই রসিদে অবৈধভাবে ভারত থেকে আসা গরুর ব্যবসা জমজমাটভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। রাতভর চোরাচালানিদের দৌরাত্ম্য ঘুমাতে পারে না গ্রামবাসীরা। সীমান্ত এলাকা যেন তাদের দাপটে চলে।
চুনারুঘাট সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে মাদক
চুনারুঘাট সীমান্তে অভিনব কৌশলে চলছে মাদক পাচার। মাদক পাচারকে নিরাপদ রাখতে নেয়া হয়েছে ভিন্ন কৌশল। এ কৌশলে ফাঁকি দিচ্ছে বিজিবিকে কর্তৃপক্ষ। সীমান্ত সূত্র জানায়, মাদক চোরাচালানকে নিরাপদ রাখতে ঘাট লিডাররা গ্রহণ করেছে অভিনব পন্থা।তারা ভারত থেকে নকল হুইস্কি (স্থানীয় ভাষায় ‘রয়েল’) এনে বিজিবি’র হাতে আটক দেখায়। এ কৌশল চলে প্রতি সপ্তাহেই। নকল অফিসার চয়েস-এর কর্ক প্লাস্টিকের হয়ে থাকে। অপরদিকে আসল হুইস্কি পাচার করে দেয় দেশে বিভিন্ন স্থানে। বাল্লা সীমান্তে বিজিবি’র হাতে এ পর্যন্ত যে সমস্ত হুইস্কি আটক হয়েছে প্রায় সবই নকল। গত মাসে বিজিবির হাতে ৫ লাখ ৮০ হাজার টাকার মাদক আটক হয়েছে বলে বিজিবি জানিয়েছে। সূত্র জানায়, আটক মাদকের ৯০ শতাংশই নকল। বাল্লা সীমান্তের ১৯৬৫ মেন পিলারের পাশ দিয়েই মাদকের চালান প্রবেশ করে দেশে। এখান দিয়েই অবৈধভাবে মানুষ পারাপার করা হয়ে থাকে। খোয়াই নদী পাড় হয়ে ত্রিপুরা রাজ্যের ঘোষপাড়ার কাছে লাল চড়া সেতুর নিচ দিয়ে মাদক ব্যবসায়ীরা রাতের আঁধারে প্রবেশ করে ভারতে।
পাহাড়, চা-বাগান ঘেরা ঝুঁকিপূর্ণ ওই সীমান্ত পাহারায় রয়েছে সাতছড়ি, চিমটিবিল, গুইবিল,বাল্লা, রেমা ও কালেঙ্গা সীমান্ত ফাড়ি। ভারত সরকার ২০০৫ সালে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন করেছে কিন্তু পানি প্রবাহের ছড়াগুলোতে কোন বেড়া দেয়া হয়নি। ওই ছড়াগুলোই মুলত চোরাচালানের করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত করা হচ্ছে এখন।

টেকনাফ সীমান্তে বাড়ছে স্বর্ণ চোরাচালান
কক্সবাজার জেলার টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে বাড়ছে স্বর্ণ চোরাচালান। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাসে ধরা পড়েছে পাঁচটি চালান। এর আগে এক বছরে ধরা পড়ে ছয়টি চালান। মিয়ানমার থেকে আনা এসব স্বর্ণ বাংলাদেশ হয়ে ভারতে পাচার হচ্ছে বলে জানান বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কর্মকর্তারা।
 টেকনাফ ২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবুজার আল জাহিদ বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে স্বর্ণ চোরাচালান আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। নাফ নদী অতিক্রম করে টেকনাফ আনার সময় বিজিবি সদস্যরা কিছু স্বর্ণ জব্দ করলেও বেশির ভাগ সমুদ্রপথে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার হচ্ছে। ভারতে স্বর্ণের চাহিদা বেশি। তাই চক্রের সদস্যরা টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারের স্বর্ণ এনে কুমিল্লা দিয়ে ভারতে পাচার করছে।
বিজিবি ও পুলিশ সূত্র জানায়, মিয়ানমার, টেকনাফ, চট্টগ্রাম ও ভারতভিত্তিক একাধিক সিন্ডিকেট স্বর্ণ চোরাচালানে যুক্ত। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, সাবরাং, নাজিরপাড়া, মৌলভীপাড়া, চৌধুরীপাড়া, টেকনাফ-মিয়ানমার ট্রানজিট ঘাট, নাইট্যংপাড়া, টেকনাফ স্থলবন্দর, জাদিমোরা, আলীখালী ও চৌধুরীপাড়া দিয়ে স্বর্ণের চালান আসে। তবে বেশির ভাগ চালান সমুদ্রপথে পাচার হয় বলে ধরা সম্ভব হয় না।

চোরাচালান আসছে অত্যাধুনিক ভারী অস্ত্র
সীমান্তের ওপার থেকে আসছে অত্যাধুনিক ভারী অস্ত্র। মিয়ানমার সীমান্ত ব্যবহার করে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ স্থল ও সাগর পথে অস্ত্র নিয়ে আসছে। সীমান্তে সক্রিয় চোরাচালান সিন্ডিকেট মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার পাশাপাশি বিভিন্ন চোরাই পণ্যও নিয়ে আসছে ওপার থেকে। কক্সবাজারভিত্তিক উখিয়া-টেকনাফের চোরাচালান সিন্ডিকেটও এখন ব্যাপক তৎপর হয়ে উঠেছে। ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, মদসহ বিভিন্ন প্রকার মাদকদ্রব্যের বিশাল অংকের চালান আসছে কক্সবাজার টেকনাফ নাইক্ষংছড়ি বান্দরবান সীমান্তে। বিভিন্ন প্রকার চোরাইপণ্য আটকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন যতই তৎপর হচ্ছে ততই চোরাচালান সিন্ডিকেট পাচারের ধরন পাল্টানোর কারণে পাচারকারী চক্রের গডফাদারেরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সীমান্তের ওপার থেকে ভারী অস্ত্রও আসছে। বিশেষ করে মিয়ানমার সীমান্ত হয়ে স্থল ও সাগর পথে আসছে ভারী অস্ত্র।
সূত্র জানায়, উপকূলীয় অঞ্চল হওয়ায় টেকনাফ উখিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা থাকে অরক্ষিত। যে কারণে চোরাকারবারিরা এ রুটটিই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে থাকে। মিয়ানমার ও ভারত হয়েই সাধারণত অস্ত্র ঢুকছে। তবে ভারী অস্ত্রগুলো ঢুকছে মিয়ানমার সীমান্ত হয়ে এ পথেই। একে-৪৭ রাইফেল, এলএমজি, এম-১৬ রাইফেলসহ নানা ধরনের ভয়ঙ্কর অস্ত্র। স্প্যানিশ অস্ত্রের মতো অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের বেশির ভাগই আসে মিয়ানমার থেকে। চাইনিজ রাইফেল, পিস্তল, রিভলবার, স্টেনগান, মেশিনগান, সাব-মেশিনগান, কালাশনিকভ সিরিজের একে-৪৬, একে-৪৭, একে-৫৪, একে-৫৬, একে-৭৪ ও এম-১৬-এর মতো ভয়ঙ্কর অস্ত্র আসছে।
পুলিশ বলছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশক্রমে মানবপাচারকারী ও চোরাচালান সিন্ডিকেটের চিহ্নিত সদস্যদের ধরতে অভিযান চলছে। তাদের মতে, সীমান্তে চোরাচালান রোধে বিজিবিসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। তবে বাস্তব চিত্র বিভিন্ন বলে দাবি করছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ।
বিজিবি সূত্র বলেছে, দেশের সীমান্ত এলাকায় অবৈধ অস্ত্র চোরাচালান বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কক্সবাজার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় ডাকাতের উপদ্রবও বৃদ্ধি পেয়েছে। সীমান্তে আরও কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে আছে বলে দাবি করা হয়েছে।
জানা গেছে, মিয়ানমার বিচ্ছিন্নতাবাদী দলসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ সীমান্ত দিয়ে আসা অস্ত্রের ব্যবহার এবং অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে সক্রিয় রয়েছে। টেকনাফ-উখিয়ার বিভিন্ন রুটেই অবৈধ অস্ত্রের চালান আসছে। সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো অস্ত্র কেনা বেচার জন্য সাগর পথকেও ব্যবহার করছে। ভারী অস্ত্রের বড় ব্যবসায়ী টেকনাফের ইয়াবা ব্যবসায়ীরা। অস্ত্র নেয়ার ক্ষেত্রে অগ্রিম অর্ধেক টাকা জামানত হিসেবে দিতে হয় এবং দুই এক দিনের মধ্যেই অস্ত্র এসে পৌঁছে যায় ক্রেতার হাতে। সীমান্তের ওপার থেকে অস্ত্র বাংলাদেশের সীমান্ত গলিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। সেখান থেকে নির্ধারিত পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও বিভিন্ন উপায়ে দেশের অভ্যন্তরে নিয়ে আসছে অস্ত্র। এক্ষেত্রে রোহিঙ্গারাই অস্ত্র বহন করে থাকে বেশি। বিশেষ করে শ্রমজীবী রোহিঙ্গাদের এ কাজে এখন বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে।
জানা গেছে, সীমান্তের ওপার থেকে চোরাই পথে আসা অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য পাচারের ক্ষেত্রে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক ও মেরিন ড্রাইভ সড়কটি অন্যতম নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত একদিকে যেমন পেশাদার সন্ত্রাসী ও চোরাকারবারিদের নিরাপদ অভয়ারণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, তেমনি পাচারের ক্ষেত্রেও নিরাপদ রুট হিসেবে বেছে নেওয়া হয় কক্সবাজার-টেকনাফ-আরাকান সড়ক। এছাড়াও অঘোষিত অস্ত্র চোরাচালানের গডফাদারেরা সাগর পথেও অস্ত্র পাচার করছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে।
একটি গোয়েন্দা সূত্র মতে, আন্তর্জাতিক অস্ত্র ও মাদক পাচারকারীদের কাছে বাংলাদেশ ট্রানজিট রুট হিসেবে বেশ নির্ভরযোগ্য হয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। ২০০১ সালে জাতিসংঘ প্রদত্ত একটি প্রতিবেদনে এর মূল কারণটা চিহ্নিত হয়েছিল। বলা হয়েছিল ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে। কারণ, মাদক উৎপাদনকারী ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ এবং ক্ষুদ্র অবৈধ অস্ত্র উৎপাদনকারী ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্টের’ মাঝামাঝিতে বাংলাদেশের অবস্থান। একই মত পোষণ করে লন্ডনভিত্তিক বেসরকারি সংগঠন ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকশন নেটওয়ার্ক অন স্মল আর্মস’ ও কলম্বো ভিত্তিক ‘সাউথ এশিয়ান স্মল আর্মস নেটওয়ার্ক’।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, মিয়ানমার থেকে আসা চোরাইপণ্য পাচারে নিরাপদ রুট হিসাবে চিহ্নিত নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু, ঘুমধুম, জলপাইতলী, কুমির প্রজনন কেন্দ্র, উখিয়ার ডেইলপাড়া, চাকবৈঠা, আমতলী, তুলাতলী, বালুখালী, রহমতের বিল, আনজুমানপাড়া, নলবনিয়া, ধামনখালীসহ টেকনাফের অর্ধশতাধিক পয়েন্ট দিয়ে মরণনেশা ইয়াবা, হেরোইন, বোতলজাত মদসহ চোলাই মদ পাচার হয়ে আসছিল দীর্ঘদিন থেকে। সীমান্তরক্ষী বিজিবি সদস্যরা মাঝে মধ্যে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কসহ সীমান্ত পারাপারের সময় অভিযান চালিয়ে মাদকদ্রব্যসহ বিভিন্ন চোরাইপণ্য আটক করতে সক্ষম হলেও চোরাচালানির গডফাদারেরা ধরা না পড়ার কারণে সীমান্তে চোরাচালান বন্ধ হচ্ছে না বলে মনে করছেন স্থানীয় লোকজন।
স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, বিজিবিসহ আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে চোরাচালান চক্রের তালিকা থাকলেও রহস্যজনক কারণে এদের অধিকাংশই রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, স্থানীয় থানা প্রশাসনের সাথে গভীর সখ্যতা গড়ে তোলায় এসব ইয়াবা ও চোরাচালানকারী ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। প্রশাসনের নীরবতার কারণে দিনদুপুরে চষে বেড়াচ্ছে এসব চোরাকারবারিরা। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন স্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই দুই উপজেলার সীমান্ত এলাকার ৯টি পয়েন্ট দিয়ে অবৈধ অস্ত্রের চালান আসছে। অবৈধ অস্ত্র প্রবেশের অন্যতম রুট হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তের। দেশি-বিদেশি অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীরাও এই অঞ্চলে ভীষণ তৎপর। কখনো কখনো অস্ত্রের চালান থেকে খোয়া যাওয়া এক দুটি অস্ত্র আটক করে পুলিশ। অধিকাংশের কোনো খবর থাকে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। এতে করে অস্ত্রের চালান আসছে নিয়মিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ