ঢাকা, রোববার 06 November 2016 ২২ কার্তিক ১৪২৩, ৫ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

শিশু চিকিৎসার অন্যতম পথিকৃৎ ডা. এম আর খান আর নেই

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশের শিশু চিকিৎসার অন্যতম পথিকৃৎ জাতীয় অধ্যাপক ডা. এম আর খান আর নেই। গতকাল শনিবার তিনি রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তিকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। খ্যাতনামা এই শিশু বিশেষজ্ঞের বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। তিনি একমাত্র মেয়ে দৌলতুন্নেসা ম্যান্ডিসহ অসংখ্য ছাত্র, বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন।
সেন্ট্রাল হাসপাতালের পরিচালক ডা. এম এ কাশেম এ তথ্য নিশ্চিত করে আরো জানান, বিকেল ৪টা ২৫ মিনিটে গ্রীনরোডে সেন্ট্রাল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে থাকা তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কাশেম আরো বলেন, বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা নিয়ে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। সম্প্রতি দেশে ও দেশের বাইরে তার দুই-তিনটি অস্ত্রোপচার হয়েছিল। বরেণ্য চিকিৎসকের লাশ সেন্ট্রাল হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, বরেণ্য এই চিকিৎসকের মৃত্যুতে চিকিৎসা অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট মো. ফজলে রাব্বী মিয়া এবং স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম আলাদাভাবে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। আরো শোক জানিয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)সহ বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান।
ডা. এম আর খান বেশ কয়েক মাস ধরেই কোমর ব্যথা, উচ্চ রক্তচাপ ও নিউমোনিয়াসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। গত ২৯ সেপ্টেম্বর অবস্থা গুরুতর হয়ে পড়লে তাকে রাজধানীর সেন্ট্রাল হাসপাতালের কেবিন থেকে আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) স্থানান্তর করা হয়। তখন থেকেই তিনি আইসিইউতে ছিলেন।
সেন্ট্রাল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. ফরিদ উদ্দিন ফারুকী জানান, আজ রোববার সকাল ১০টায় মরহুমের নিজ হাতে গড়া এ হাসপাতালে তার প্রথম জানাযা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ১১টায় মিরপুর শিশু স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশনে দ্বিতীয় নামাযে জানাযা ও দুপুর ১২টায় বিএসএমএমইউতে তৃতীয় নামাযে জানাযা শেষে সাতক্ষীরা গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হবে।
এম আর খান দেশের জাতীয় অধ্যাপক, বাংলাদেশের শিশু চিকিৎসার জনক হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। তিনি এ দেশের শিশুস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের পথিকৃৎ। তিনি গড়ে তুলেছেন একের পর এক চিকিৎসা ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। পেনশনের টাকা দিয়ে গড়েন ডা. এম আর খান-আনোয়ারা ট্রাস্ট। দুস্থ মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, তাদের আর্থিক-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে এ ট্রাস্টের মাধ্যমে তিনি নিরন্তর কাজ করে চলেছেন। তার উদ্যোগে গড়ে উঠেছে জাতীয় পর্যায়ের শিশুস্বাস্থ্য ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
এ ছাড়া তিনি দেশ থেকে পোলিও দূর করতে উদ্যোগী ভূমিকা রেখেছেন, কাজ করেছেন ধূমপানবিরোধী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠান ‘আধুনিক’-এর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে। শিক্ষা, চিকিৎসা, শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষা, দুর্গত অসহায় মানুষের সেবাসহ সমাজকল্যাণমূলক কাজে অসামান্য অবদান রাখায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) ডা. এম আর খানকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দিয়েছে ও বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি স্বর্ণপদকে ভূষিত করেছে। পেয়েছেন স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক ও আন্তর্জাতিক ম্যানিলা এওয়ার্ড সহ আরো অনেক পুরস্কার-সম্মাননা। প্রতিষ্ঠানতুল্য এই মানুষটির জীবনী স্থান পেয়েছে ক্যামব্রিজ থেকে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল হু ইজ হু অব ইন্টেলেকচুয়ালে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে তার ৩৭টি গবেষণাধর্মী রচনা প্রকাশিত হয়েছে। শিশুরোগ চিকিৎসা সংক্রান্ত সাতটি বই লিখেছেন, যেগুলো দেশে ও বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে।
ডা. এম আর খান নামে বহুল পরিচিত এই শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পুরো নাম মো.রফি খান। ১৯২৮ সালের ১ আগস্ট সাতক্ষীরা শহরতলীর রসুলপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাবা আব্দুল বারী খান ও মা জায়েরা খানমের চার ছেলের মধ্যে তিনি ছিলেন মেঝ। ১৯৫৩ সালে এমবিবিএস পাস করেন কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে। তিনি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিটিএমএন্ডএইচ, এমআরসিপি, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিসিএইচ, ঢাকার পিজি থেকে এফসিপিএস, ইংল্যান্ড থেকে এফআরসিপি ডিগ্রি লাভ করেন।
খ্যাতনামা এই চিকিৎসকের মৃত্যুতে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় শিশু বিশেষজ্ঞ ও মিরপুর ইন্সটিটিউট অব চাইল্ড হেলথের পরিচালক ড. এখলাসুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, এমআর খান ছিলেন বাংলাদেশে শিশু বিভাগের প্রথম অধ্যাপক। এমন কোনো শিশু বিশেষজ্ঞ নেই যিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে স্যারের ছাত্র ছিলেন না। তাকে বলা হয়, ‘ফাদার অব পেডিয়াট্রিশিয়ান এন্ড ইন্সটিটিউশন’।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ